গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় বিভিন্ন মত ও প্রতিষ্ঠান থাকে। বিরোধ ও বিতর্ক থাকে। তবে এই সব বিরোধী মত ও পথ সমাজের জন্যে অকল্যাণ হয় না, যদি গণতান্ত্রিক মনোভঙ্গি বিরাজ করে। বরং বৈচিত্রের মধ্যেই গণতান্ত্রিক বাতাবরণ পোক্ত ভিত্তি পায়। আর এই রকম পরিবেশ তখনই আমরা আশা করতে পারি যখন সমাজের উপাদানসমূহের মধ্যে সম্পর্কের বোঝাপড়া থাকে। প্রতিটি সমাজব্যবস্থায় তিনটি উপাদানের উপস্থিতি বর্তমান থাকে। এরা হল: রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজ। এদের মধ্যেকার ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক যদি সহনীয় থাকে, প্রতিটি উপাদান নিজ নিজ দায়িত্ব ও কর্তব্যে অবিচল থাকে, তবে সমাজ লাভবান হয়। এই প্রসঙ্গে আমরা বলতে পারি, সদ্য সমাপ্ত বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলনে আমরা লাভবান হইনি। এর অনেক কারণ থাকতে পারে, তবে আসল কারণ হল, সমাজব্যবস্থার এই ত্রিমাত্রিক সম্পর্কের টানাপোড়েন।
বাংলাদেশের প্রেেিত রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের মধ্যেকার সম্পর্ক নিয়ে একটু আলোকপাত করা যেতে পারে। প্রথমে ধরা যাক রাষ্ট্রের কথা। রাষ্ট্রের প্রধান প্রতিষ্ঠানসমূহ_ সরকার, আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ। যেহেতু আমাদের রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক অভিধায় চিহ্নিত, অতএব এখানকার সরকার বলতে বোঝায় মতাসীন ও বিরোধীদলের যুক্ত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর আন্তঃসম্পর্ক জানিয়ে দেয় যে, আমাদের সরকারব্যবস্থা ভাল নেই। মতাসীন ও বিরোধী দলের মধ্যে সু-সম্পর্কের প্রচুর ঘাতটি রয়েছে। একে অপরকে অস্বীকারের মাধ্যমে সংকট স্থায়ী হচ্ছে। এতে করে একদিকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বসে পড়ছে, অন্যদিকে অশুভ শক্তি অর্থাৎ নানাবিধ সন্ত্রাসী, সামপ্রদায়িক ও মৌলবাদের আস্ফালন বাড়ছে। আর বিশ্ব সমাজে কমছে আমাদের দাম, আমাদের ভাবমূর্তি। অন্যদিকে আইন বিভাগ ও বিচার বিভাগ স্বমহিমায় বিরাজমান নেই। নানা অব্যবস্থা ও অরাজকতা অবিরাম আমাদের চোখের সামনে দৃশ্যায়িত হচ্ছে। এই সব মিলে বলা যায় আমাদের রাষ্ট্র স্বাভাবিক নেই, সুষ্ঠ নেই। ল প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত বাংলাদেশকে দেশে ও বিদেশে কেউ কেউ অকার্যকর রাষ্ট্র অভিধায় ইংগিত করে। তবু আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে সুষ্ঠ করার প্রয়াসী হই না! দুর্নীতির শীর্ষে থাকা যেন আমাদের স্থায়ী অর্জনে পরিণত হয়েছে। এবার আসা যাক বাজারের দিকে। বাজার বলতে বুঝি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্পকারখানা, সেবাখাত, কৃষি ইত্যাদি। এই সব নিয়ে আমাদের অর্জন ছোট হয়ে আসছে। আমাদের বাজার অন্যের বাজারে পরিনত হচ্ছে। বাজার উন্নয়নে রাষ্ট্রের কোন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেই। অদৃষ্টবাদী মনোভাব নিয়ে বাজার লাগামছাড়া করে দেয়া হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থা ও আন্তর্জাতিক পুঁজিলগি্নকারী প্রতিষ্ঠান আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের ফমর্ুলা মেনে চলছে আমাদের বাজারব্যবস্থা। নয়া উদারনৈতিক অর্থনীতির পাথরচাপায় আমাদের বাজার তছনছ হয়ে পড়ছে। আমরা শুধু দেখছি! রাষ্ট্র ইচ্ছা করলেও সাহায্যকারী দেশ ও সংস্থার রক্তচু উপো করে বাজার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিতে পারে না। আর আমাদের সরকার, রাজনৈতিক দল ও বেসরকারি সংস্থা মিলেও এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি করতে ঐকমত্য হতে পারে না, যার দরুন তথাকথিত উন্নয়ন সহযোগীরা চুপসে থাকতে বাধ্য হয়। এই েেত্র আমাদের নাগরিক সমাজ বা সিভিল সোসাইটি'র ব্যর্থতা প্রকট। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় যারা নাগরিক সমাজের ভূমিকায় সক্রিয়, তাদের অনেকেরই নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে স্বচ্ছতা নেই। ফলে স্বাধীন মত প্রকাশে দ্বিধা, বিকৃতি, পপাত থাকে। আমাদের নাগরিক সমাজ রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে যতটা সরব দেশের বাণিজ্য অর্থনীতি নিয়ে ততটা নন। তাঁরা জনগনের হয়ে রাষ্ট্র ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের ওপর নিরপে অবস্থান থেকে চাপ প্রয়োগে অনেক সময় নমনীয় থাকেন। তেমনি 'নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠ' জনগনের মধ্যে যথাযথ সচেতনতা গড়ে তুলেন না। অথচ রাষ্ট্র ও সাধারন জনগনের পথের দিশা হয়ে তাদের ভূমিকা রাখার দাবী থাকে।
অতএব বলা যায়, আমাদের রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের মধ্যেকার সম্পর্কে চিড় ধরেছে। অন্যভাবে বলা যায় একে অপরের প্রতিপ হয়ে আছে। ফলে আমাদের সমাজব্যবস্থা ক্রমশ পিছিয়ে যাচ্ছে। আমরা আমাদের স্বার্থগুলোও গ্রাহ্য করছি না। এর প্রতিফলন ঘটেছে এবার বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলনে। এই সম্মেলন আমাদের কিছু দেয়নি। আসলে আমরা কি চাই, এবং কিভাবে চাইতে হয় তার কৌশল ও পরিকল্পনা তৈরি সম্ভব হয়নি। দরকষাকষির দতা আমাদের ছিল না। এই সম্মেলন থেকে আমাদের সর্বোচ্চ চাওয়া পাওয়া ছিল তৈরী পোশাক ও আদম রপ্তানির সুযোগ আদায়। উভয় েেত্র আমরা ব্যর্থ। দোহা সম্মেলনে বাজার উন্নয়নের যে কৌশলপত্র তৈরি করা হয়েছিল, সেখানে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য বিশেষ রফা ও দফা থাকলেও, হংকং সম্মেলনে এসে উন্নয়ন প্রতিশ্রুতিতে অনেক বিকৃতি ঘটেছে, বরং ডবি্লউটিও পরিণত হতে যাচ্ছে আমাদের জন্য পিছিয়ে পড়া এক সিঁড়ি। এইসব নিয়ে রাষ্ট্র নির্বিকার, নাগরিক সমাজ তেমন সক্রিয় নয় আর বাজারের অবস্থা করুন। নাগরিক সমাজের কেউ কেউ যে সক্রিয় না তা নয়, তবে তা ব্যতিক্রমে পরিণত হয়েছে। অথচ ডবি্লউটিও'র সম্মেলন কেন্দ্র করে অনেক দেশের নাগরিক সমাজই সক্রিয় ছিল। তারা রাষ্ট্রকে কৌশল প্রণয়নে সহযোগিতা করেছে, গণসচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। এর ফল কিঞ্চিৎ হলেও আফ্রিকার স্বল্পোন্নত দেশগুলো পেয়েছে। বিশ্বের নানা প্রান্তের নাগরিক সমাজের দল বিশ্ব বিবেক জাগ্রত করেছে , ডবি্লউটিও'র প্রতি খোলা চিঠি প্রদান করে স্বল্পেন্নত দেশের স্বার্থরায় চাপ তৈরী করেছে। আমরা আমাদের নাগরিক সমাজের কাছ থেকেও এরূপ ভূমিকা প্রত্যাশা করি। আরেকটি ব্যাপার হল, ডবি্লউটিও'র প্রেেিত আমাদের নিজস্ব বাজার ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে। নিজেদের বাজার সুরায় বিশ্বায়ন মোকাবেলায় কৌশলপত্র তৈরী করতে হবে। নাগরিক সমাজের এখানে অংশগ্রহণ জরুরি।
হংকং সম্মেলনে, কৃষিপণ্য, অকৃষিজাত পণ্য বিষয়ক কিছু বিষয়ে প্রতীকি মতৈক্য হয়েছে। আরও অনেক এজেন্ডা আছে যা এখনও ফয়সালা হয়নি। আগামী বছরের মার্চ বা এপ্রিলে জেনেভায় আবার বাণিজ্য সম্মেলন হবে। সেখানে চুড়ান্ত চুক্তি বাস্তবায়িত হবে। অতএব এখনও কিছুটা ভরসা আছে। রাষ্ট্র, বাজার ও নাগরিক সমাজের মধ্যেকার ত্রিমাত্রিক সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে বিশ্ব বাণিজ্য সম্মেলন হতে ফায়দা অর্জনের পথ আমাদের রপ্ত করতে হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
