গত কয়েকমাস ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন জলাশয় ও বনবাদারে লাখ লাখ পাখি তাদের নতুন আবাস গড়েছে। শীত ফুরোলে এরা আবার তাদের নিজ ঠিকানায় উড়াল দিবে। এদের আপন আবাসভূমি হল সাইবেরিয়া। এদের আমরা অতিথি পাখি বা অভিবাসি পাখি বলে থাকি। পাখি পর্যটকদের অভিমত প্রজাতি সংখ্যা কম হলেও এবার পাখি এসেছে বেশি। শুধুমাত্র ভোলা চরাঞ্চলের শুমারিতেই দুই লরে অধিক পাখি গণনা করা হয়েছে। এই পাখি পথযাত্রায় নানা বিপর্যয় ঘটে, যেমন: চলার পথে প্রচণ্ড বায়ুঝড়, শিকারিদের উৎ-পাতা জালে ধরা পড়ে অনেক, তারপর রয়েছে মরুভূমি, সাগর-মহাসাগর পাড়ি দেয়ার ভয়ানক বিপদ। এইসব কারণে মৃতু্য ঘটে প্রচুর। এই বছর এরা আরো একটি ভয়ানক বিপদের মুখামুখি হয়েছে_ তা হল ভয়ানক এক জীবানু এভিয়ান ইনলফুয়েঞ্জা ভাইরাস। জনপ্রিয় নাম হল বার্ড ফু।
পোল্ট্রি হতে উৎপত্তি, হাই-প্যাথোজেনিসিটি এভিয়ান ইনফুয়েঞ্জা (এইচপিএআই) ভাইরাস এইচ5এন1 বিভিন্ন এলাকায় পাখিমৃতু্যর কারণ। যখন এইসব পাখি দণি ও পশ্চিমে অভিযাত্রা শুরু করে, ধারণা করা হয় চলার পথে এরা ভাইরাস বহন করে এবং ছড়ায়। এখন পর্যন্ত প্রাপ্ত আলামতে এর কোন প্রমাণ মেলেনি, কিছু দূর্বল সংশয় ও অনুমান অবশ্য ল্য করা গেছে। গণমাধ্যম ও বিভিন্ন কর্তা-ব্যক্তিদের প্রতিবেদন জনমনে অতিথি পাখি বিষয়ে ভীতি, সংশয়ী ভাবনা, বিরূপ প্রবৃত্তি তৈরি করেছে। আমরা জানি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি বার্ড ফু দ্বারা আক্রান্ত হতে পারে, এটা আমরা জানি কেননা এই সব প্রজাতি অসুস্থ ও মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। কোথাও কোথাও মৃত পাখিতে ভাইরাসও পাওয়া গেছে। সমপ্রতি ভোলায় থেকে ফিরে আসা পাখি-শুমারি দলের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন এলাকায় মৃত পাখি দেখতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু আমরা এটা কেন ভেবে দেখি না আক্রান্ত অবস্থায় কী করে অতিথি পাখি হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিতে পারল! অধিকন্তু আমরা অতিথি পাখি ও স্থানীয় পাখির রোগ-প্রাদুর্ভাবের রীতির েেত্র কিছু অনুমান বানিয়েছি। সব লণ উপস্থাপন করে যে বার্ড ফু উভয় প্রজাতির জন্যই অতি প্রাণঘাতী, এবং দ্রুত এদের মৃতু্য ঘটায়; আক্রান্ত অতিথি পাখি বেশিদূর উড়ে যেতে পারে না; অতএব আক্রান্ত পাখির ভাইরাস যদি বার্ড ফু হয়ে থাকে তবে তা অবশ্যই স্থানীয়ভাবে সংক্রমিত, মৃতস্থানের আশেপাশে এর অস্তিত্ব। দণি-পূর্ব চীন থেকে উত্তর-পশ্চিম চীন পর্যন্ত এবং রাশিয়ার দণিাঞ্চলে ছড়িয়ে পড়া বার্ড ফু'র প্রকৃতি ও সময়ের সাথে অতিথি পাখি বা বুনো পাখির অভিবাসনের প্রকৃতি ও সময়ের মাপসই ছিল না। এই সব সা্যপ্রমাণাদি উপস্থাপন করে যে অতিথি পাখি সম্পূর্ণরূপে ভুক্তভোগী, বার্ড ফু'র সংক্রামক নয়।
প্রাপ্য আরও তথ্য (এই পর্যন্ত যদিও অপ্রতুল) থেকে বার্ড ফু'র প্রাবল্য হতে জীবিত অতিথি পাখি বিষয়ক এই বক্তব্যের সমর্থন পাওয়া যায়। গত দুই বছরে দণি-পূর্ব এশিয়ায় 1,00,000 বেশী সুস্থ পাখি পর্যবেণ ও পরীা করা হয়েছে। 1997 থেকে 2004 পর্যন্ত হংকংয়ের মেয় পো নেচার রিজার্ভ-এ প্রায় 16,000 বুনো পাখি (বেশীর ভাগ অভিবাসী) পরীা করা হয়, কোন পরীাই পজেটিভ ফল পাওয়া যায়নি। আগষ্ট 2005 এ মঙ্গোলিয়ার এরহেল হ্রদে 850টি পাখি পরীা করে পজেটিভ পাওয়া যায়নি। ইউরেশিয়ায় ঠিক 13টি আপাত সুস্থ অতিথি পাখিতে ভাইরাস পরীায় 'পজেটিভ' ফল পাওয়া যায়; তবে সন্দেহ ওঠে যে এরা কিভাবে সুস্থ ছিল, কিংবা এরা কি সত্যিই বার্ড ফু বহন করেছিল? জাতিসংঘ'র খাদ্য ও কৃষি সংস্থা(ফাও)-এর ওয়েব সাইটে আগষ্ট 2005-এর বক্তব্য: এখন পর্যন্ত বস্তুনিষ্ঠভাবে ব্যাপকভাবে পরীতি আক্রান্ত দেশগুলোতে সাধারণ অভিবাসি পাখিতে বার্ড ফু'র পজিটিভ ফল পাওয়া যায় নাই। সমপ্রতি আক্রান্তহীন এলাকা নিউজিল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া ও কানাডায় কয়েক হাজার পাখি পরীা করে এভিয়ান ভাইরাসের নেগেটিভ ফল পাওয়া গেছে। পৃথিবীব্যাপি এরকম আরও অনেক পরীা করা হয়েছে কিস্তু সাধারণ মানুষকে তা যথাযথভাবে অবহিত করা হয়নি। এই প্রেেিত বার্ড ফু'র নিয়ন্ত্রনের সব ধরণের উদ্যেগ, ফলাফল, পজিটিভ কিংবা নেগেটিভ জনগনের গোচরীভূত করা এবং গবেষকদের জন্য সহজলভ্য করা দরকার।
কিন্তু যদি অতিথি পাখি এভিয়ান ভাইরাস বা বার্ড ফু না ছড়ায়, তবে ব্যাপারটি কি? কমপ েতিনটি বাহন পথ ধারণা করা যেতে পারে: 1. অপরিীত পোল্ট্রি এবং পোল্ট্রি সামগ্রীর স্থানান্তর, 2. বুনো পাখির বাণিজ্য, 3. কৃষিতে আক্রান্ত পোল্ট্রির বর্জ সার হিসাবে ব্যবহার, মৎস খামারে খাদ্য হিসাবে ব্যবহার। দণি-পূর্ব এশিয়ায় প্রাদুর্ভাবের েেত্র বড় কারণ ছিল পোল্ট্রি ও পোল্ট্রি সামগ্রীর স্থানান্তর। এছাড়া পোল্ট্রি খামারের জীবানুগ্রস্ত উপাদান যেমন গোবর বা মাটি, যানবাহন অথবা পরিহিত জুতা। জীবিতপ্রাণি বাজারও একটি অন্যতম কারণ। ফাও এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চিহ্নিত করে যে জীবিতপ্রাণি বাজার এভিয়ান ভাইরাস ছড়ানোর েেত্র বিশেষ ভূমিকা রাখে, এদের পর্যবেণ (জুলাই 2005 সালে প্রকাশিত): 1992 সালে, ধারণা করা হয় যে যুক্তরাষ্ট্রে জীবিতপ্রাণি বাজার ছিল 'ইনফুয়েঞ্জা মহামারীর অন্তরালের সংযুক্ত পরস্পরা'। তারা 1997 সালে হংকংয়ের মুরগি খামারে এইচ5এন1 সংক্রমন উৎস খুঁজে পায়, তখন জীবিতপোল্ট্রি বাজারে প্রায় 20% মুরগী আক্রান্ত অবস্থায় ছিল। একই অবস্থা বিরাজ করে ভিয়েতনাম, যেখানে 2004 সালে মুরগী খামারে প্রাদুর্ভাব ঘটার চার বছর আগে বার্ড ফু ছড়ায় হাঁসে, হ্যানয়ের জীবিতপাখি বাজার থেকে। সবখানেই রয়েছে শিকারি পাখির (খাঁচাবন্দী পাখি) একটি বেআইনি বাজার, এর ফলে আক্রান্ত পাখি বহুদূর পর্যন্ত ভাইরাস বহন করে নিয়ে যায়। 2004 সালে একজোড়া পাহাড়ি হুক-ঈগল হ্যান্ড-লাগেজের মাধ্যমে চোরাচালানি হয়ে থাইল্যান্ড থেকে বেলজিয়ামে পেঁৗছে, এতে রোগ পাওয়া যায়। সমপ্রতি তাইওয়ানের শুল্ক বিভাগ মূলভূমি চীন থেকে চোরাচালানকৃত দুই চালান আক্রান্ত পাখি উদ্ধার করে। জীবিতপ্রাণী বাজার খুব সম্ভবত ধরা-পাখি সংক্রমনের বড় উৎস, যেখানে পালিত ও বুনো পাখি একই সাথে রাখা হয়, এর ফলে পরস্পর-দূষণে বার্ড ফু'র উচ্চ-শংকা থাকে। নির্ভরযোগ্য গবেষণায় দেখা গেছে কৃষিতে পোল্ট্রি সারের (মুরগী, হাস ও অন্যান্য পোল্ট্রি বর্জ) ব্যাপাক ব্যবহার এবং অপরিীত অবস্থায় মৎস ও পশুখাদ্যরূপে ব্যবহার রোগ প্রাদুর্ভাবের কারণ। ভাইরাস আক্রান্ত পাখি ভাইরাস উপাদান নিঃসরন করে, যা পুকুরে মৎসখাদ্য হিসাবে ব্যবহার করলে তা সংক্রমনের নতুন উৎস হয়। ভিয়েতনামের হো চি মিন শহরে এই ধরনের পোল্ট্রি বর্জ ব্যবহার চলে আসছিল, এতে করে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে। সেখানে নদীতে সাঁতার কাটতে যেয়ে এক বালক মারা যায়, যেখানে মুরগীর মৃতদেহ ফেলা হত। ফাও এবং হু পরামর্শ দেয় যে: মুরগীর পরিত্যক্ত বর্জ যথাযথ পরীা সম্পন্ন করে সার ও গৃহপালিত প্রাণির খাদ্য হিসাবে ব্যবহার করা উচিত।
সুতরাং জৈব-নিরাপত্তার খাতিরে দরকারি প্রতিরোধে মনোযোগি হতে হবে_ পোল্ট্রি'র যথাযথ পরীা ও পর্যবেন করতে হবে, পোল্ট্রি, পোল্ট্রি সামগ্রি ও খাঁচাবন্দি পাখি বিক্রি ও স্থানান্তরের েেত্র নিয়ন্ত্রন রাখতে হবে, কৃষিতে পোল্ট্রি সার ব্যবহারের পূর্বে পরীা নিশ্চিত করতে হবে, দেশীয় ও আনর্্তঃজাতিকভাবে বেআইনি পোল্ট্রি, পোল্ট্রি সামগ্রি ও বুনোপাখি বাণিজ্য নিয়ন্ত্রনে পদপে নিতে হবে। টিকায়নও কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা হতে পারে_ টীকায় প্রচুর পরিমান এন্টিজেন থাকতে হবে। দূর্বল টীকা রোগের লণ দমিয়ে রাখতে পারে, কিন্তু রোগের বহুধাকরণ, বিস্তরণ ও উৎসারণ ঠিকই থেকে যায়।
যদিও বার্ড ফু মানুষের জন্য মারাত্মক রোগের কারণ_ এই ভাইরাসের নাগাল পাওয়া কঠিন এবং অধিকন্তু ব্যক্তি থেকে ব্যক্তিতে এই রোগ ছড়ায় না। এরকম ধারণা আছে যে এই রোগ সহজেই মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। গত একশত বছরের ইতিহাসে চারবার মহামারিরূপে ইনফুয়েঞ্জা ছড়িয়ে পড়ে, এতে পৃথিবীময় প্রচুর লোক মারা যায়। ভাবা হয় যে, এই মারাত্বক ভাইরাসের আবির্ভাব ঘটে যখন বার্ড ফু এবং হিউম্যান ইনফুয়েঞ্জা ভাইরাস একসাথে আসে, সম্ভবত শুকর হতে, এবং বার বার তাদের জিনের বহুধাকরণের মাধ্যমে। এইচ5এন1 ভাইরাসের অবিরাম প্রাদুর্ভাব এর পুনরায় সংঘটনের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই পর্যন্ত এমন কোন প্রমান পাওয়া যায়নি যে অতিথি পাখি বা বুনো পাখি এই ভাইরাস সংক্রমন করে। পোল্ট্রি সাথে যারা ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত তাদের মধ্যেই এই সংক্রমণ দেখা যায়। পালিত পোল্ট্রি ও পাখির মধ্যে ছড়ানো এই রোগের প্রাদুর্ভাবের তুলনায় মানুষের মধ্যে খুবই স্বল্প। অতএব পাখি পর্যবেণ সম্পূর্ণ নিরাপদ, তবে কিছু সতর্কমূলক সচেতনতা দরকার। তাহল: অতিথি পাখির মৃতদেহের স্পর্শ এড়িয়ে চলতে হবে, পাখির বর্জ পরিস্কার করার পর সাবান ও পানি দিয়ে হাত ধুয়ে নিতে হবে। আর মনে রাখতে হবে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে, এতো সময় ব্যয় করে অতিথি পাখির প েবার্ড ফু'র বাহক হওয়া সম্ভব নয়, যদি পাখি আক্রান্ত হয়েই থাকে তবে তা স্থানীয় পরিণাম, অতিথি পাখি এখানে ভুক্তভোগি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।
