ছোট্ট টনুটুনি পাখি। চঞ্চল আর অস্থির। সারাদিন এখানে টুকটাক করে লাফাত, উড়ে বেড়াত বনে বাদারে। ভারি স্ফূর্তি ছিল মনে।
একদিন টুনটুনির উপর এক পাখি শিকারির নজর পড়ল। ছটফটে পাখিটা নিয়ে তার খেলতে ইচ্ছা হলো। সে দু'হাতের তালুতে ভাল লাগার শষ্যদানা ছড়িয়ে দিয়ে পাখিটির দিকে হাত বাড়িয়ে দিল। নির্বোধ পাখি কী আর তার মনের খবর জানত। সে উড়তে গিয়ে নিশ্চিত বিশ্বাসে পাখি-শিকারির তালুবন্দি হলো। শিকারি এত সহজে পাখিটিকে মুঠো বন্দি করে তো মহাখুশি। নিজের জাদুকরি কৃতিত্বে নিজেই মুগ্ধ্ সে পাখিটিকে দু'হাতে বুকে জড়িয়ে ধরল, চুমো খেল ঠোঁটে।
বেশী কিছুদিন পর তার অন্য রকম অনুভুতি হল। এত সহজে টুনটুনিদের কাছে পাওয়া যায়, এহ্ তো তবে কোনো পাখিই নয়। তার সঙ্গীরা বলল_এ আাবর কেমন সখ! শেষ পর্যন্ত টুনি পাগল। আরে পাখিই যদি পুষতে হয় তবে ময়না টিয়ে হীরামন ধরে আনো, টুনটুনি কেন পুষবে। শিকারির সখ মিটল শীঘ্রই, খেলতেও আর ইচ্ছা হলো না। পাখিটির ডানা ধরে ছুঁড়ে ফেলল কাঁটঝোপে। দূর হ বাজে পাখি। এরপর সে হীরামন পাখির সন্ধানে বের হল। ওদিকে কাঁটাবনে পড়ে টুনটুনির তো মৃতবৎ অবস্থা। তার পা ভাঙল, পাখা ছিড়ল কাঁটার ঘায়ে রক্তাক্ত হল সারা অঙ্গ। সে কোনো রকমে ঝোপ থেকে ওঠে নদীর ধারে গেল, নিজেকে পরিষ্কার করতে।
নদী ধমকে বলল- 'খবরদার টুনি তোর নোংরা শরীর নিয়ে আমাকে স্পর্শ করবি না, তোর গায়ের রক্তে আমি লাল হয়ে যাব যে,। লজ্জিত পাখি তখন নতমুখে তার স্বজাতির কাছে উড়ে গেল। কিন্তু অন্য টুনটুনিরা তাকে পাত্তাই দিল না। বলল-বেশ হয়েছে, বোকা কোথাকার! তুমি স্বাধীন পাখি, ফুরফুর করে উড়ে বেড়াবে, তুমি তালুবন্ধি, হতে গেলে কেন? ছিঃ তুমি নিজেই অপমানিত হওনি, তুমি আমাদের মান-সম্মান ধুলোয় লুটিয়েছ। যাও তুমি, তোমার সঙ্গে আমরা মিশবা না। টুনটুনিরা তাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিল।
ব্যাথার উপর ব্যাথা, দুঃখের উপর দুঃখ। এত ব্যাথা আর দুঃখের কষ্ট সে রাখে কোথায়। তার বুক উপচিয়ে কষ্টরা গড়িয়ে পড়তে চায়। কিন্ত পারে না। কষ্টেরা বিছার মতো ওর বুকটাই কামড়ে ধরে। সে ভাবল, কষ্টগুলো বিলাতে পারলে হয়তো কিছুটা শান্তি আসবে তার বিপ্তি হৃদয়ে। সে কষ্ট ফেরি করতে বের হলো। চারদিকে ঘুরে ঘুরে সে বলতে লাগল_ 'কষ্ট নিবে কষ্ট? একদম খাঁটি কষ্ট, একটুও ভেজাল নেই। নাও-নাও-গো তোমরা আমার একটু কষ্টের ভাগ'।
টুনটুনির কষ্টের কথা শুনে অনেকে অনেক মন্তব্য করল। সাগর বলল_ 'নিজের বিশাল বুকে যে কষ্ট জমে আছে, তাই বইতে পারিনা, তোর কষ্ট নেব কোথায়? টুনটুনি তু্ই দূরে সরে যা, শান্তি পাবি। পাতা নাড়িয়ে বৃ বলল_ কষ্ট বিলি করে কি আর মনে শান্তি আসবে? আগুনে পুড়ে তোর হৃদপিন্ড যে ভাজা ভাজা হয়ে গেছে। টুনটুনি তুই বরং মরে যা, এতো দুঃখ নিয়ে বেঁচে থেকে কী করবি?
কেবল চাঁদ-ই যা একটু সহনুভূতি দেখাল। সে বলল_'মা গো, কি নিষ্ঠুর পাখিঅলা। ওটা ব্যাটা ছেলে তো ...তোমাকে ওর ভালো লাগছিল না, সেটা তোমাকে বললো তো তুমি চলে আসতে'। চাঁদের কথায় টুনটুনির চোখে পানি এসে গেল। 'ওসব কথা থাক। খমোখা ওকে দোষ দিয়ে কী লাভ, আমি যদি ভালবাসার খুদ দেখে লোভী না হতাম, ওর করতলে না বসতাম তাহলে কী ওর সাধ্য ছিল আমাকে ছুড়ে মারা। চাঁদ গো, তুমি আমার কষ্ট নাও। সবটা না হলেও একটু।'
চাঁদ বলল_ কষ্ট কখনো কাউকে এমনি করে দেয়া যায় না। আমৃতু্য তোমাকে এই কষ্ট বয়ে বেড়াতে হবে।
টুনটুনি তখন আকাশের কাছে গেল। আকাশ বলল, 'আমি তো এমনিই নীল হয়ে আছি। তোর কষ্ট রাখার জায়গা কোথায়। যার জন্যে তোর এত কষ্ট তাকেই তুই ফিরিয়ে দিয়ে আয় সব কষ্ট।'
তাকে কোথায় পাবে টুনটুনি?
দুঃখী টুনটুনি তখন শূন্যে ঘুরতে লাগল। কষ্টে তার গোটা শরীর নীল হয়ে গেল। এক এক করে ঝড়ে পড়ল সমস্ত পালক। বুকের রক্তে লাল হলো আকাশ। চোখের জলে ভিজে গেল পৃথিবীর সব ক'টি মাঠের ঘাস।
ধীরে ধীরে টুনটুনির সমস্ত শক্তি নিঃশেষ হয়ে গেল। চোখের জল আর বুকের রক্তও শেষ হলো। অতপর টুনটুনি তারা খসার মতো শূন্য থেকে নিচে গড়িয়ে পড়তে লাগল। পড়তে পড়তে হঠাৎ সে শুনতে পেল কে যেন বলছে_'আরে এই যে দেখছি যে টুনুটনিটা, সে একদিন আমার করতলে এসে বসেছিল। আমি ওক দুদিনের জন্য পছন্দ করেছিলাম, আদরও করেছিলাম।'
টুনটুনিটা ঝুপ করে কলমী বিলে পড়তেই শিকারি করতালি দিয়ে বলল,_'বাঃ চমৎকার, টুনটুনির নৃত্য দেখতে তো ভালোই লাগে।'
শিকারির হাতে তখন ধরা ছিল একটা সোনার খাঁচা। খাঁচায় একটা হীরামন পাখি।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



