আগামী ৩ মার্চ বাংলাদেশ সফরে আসছেন ভারতের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি। তার আগেই ভারতকে করিডোর দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে বলে জানা গেছে। ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২ মার্চ ভারতে অনুষ্ঠিতব্য সচিব পর্যায়ের বৈঠকে উপকূলীয় জাহাজের ট্রায়াল রানের সিদ্ধান্ত হওয়া প্রায় নিশ্চিত। এর ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় সমুদ্রসীমায় ভারতীয় বিভিন্ন ক্যাটাগরির জাহাজ অবাধে চলাচল করতে পারবে। বাংলাদেশের বন্দর ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্যসামগ্রী ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এ ক্ষেত্রে অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে আপত্তি উঠলেও সরকার তা গ্রাহ্য করছে না। বাড়তি ফি ছাড়াই চুক্তি করে ভারতকে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়া হচ্ছে।
এ চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের চট্টগ্রাম, মংলা, খুলনা ও নারায়ণগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে ভারতীয় পণ্য আসাম-মেঘালয়সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে সরাসরি যাওয়ার সুযোগ পাবে। অবশ্য একইভাবে বাংলাদেশের জাহাজও ভারতের বিশাখাপত্তম, কাকিনারা, পারাদ্বীপ ও হলদিয়া বন্দর ব্যবহার করবে। এতে করে পণ্য পরিবহনে উভয় দেশ লাভবান হলেও অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বাংলাদেশকে ক্ষতিও স্বীকার করতে হবে। এজন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের আপত্তি সত্ত্বেও শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা আর ভারত সরকারের অনুরোধ রক্ষায় হাসিনা সরকার ঢেঁকি গিলতে সম্মত হয়েছে বলে জানা গেছে। এর আগেও মাশুল ছাড়াই ভারতকে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা দেয়া হয়েছিল। যার সুযোগে তিতাস নদীসহ ১৮ নদী-খালে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা রাস্তা দিয়ে ত্রিপুরার পালাটানা বিদ্যুেকন্দ্রের যন্ত্রপাতি বহন করা হয়েছিল। এতে করে ওই রুটের মূল পরিবহন অবকাঠামো ভেঙে তছনছ হওয়ার খবর কারও অজানা নয়। নৌ প্রটোকলভুক্ত শেরপুর-ফেঞ্চুগঞ্জ, জকিগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ-বাহাদুরাবাদ-চিলমারী- দৈখাওয়া নৌরুটের রক্ষণাবেক্ষণে ১০ কোটি টাকা দেয়ার প্রতিশ্রুতিও রাখেনি ভারত। অন্যদিকে ভারতের নৌপথে বাংলাদেশের জাহাজ চলাচলে নাব্য সঙ্কট, নাবিকদের ভারতের মাটিতে নামতে না দেয়াসহ কোনো সমস্যারই সমাধান হয়নি। তারপরও ভারতের অনুরোধে মানবিক বিবেচনার কথা বলে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১০ হাজার টন খাদ্যপণ্য পরিবহনের সুযোগ দেয়ার কথাও জানা গেছে। যদিও অবকাঠামোগত উন্নয়ন ছাড়া এ ধরনের পদক্ষেপ নেয়ার বিরোধিতা সরকারের ভেতর থেকেই উঠেছে। দু’দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সমস্যাগুলোর সমাধান ছাড়া ভারতের সঙ্গে নৌচলাচল চুক্তি করারও বিরোধিতা করা হয়েছে। বিদ্যমান আইন পরিবর্তন, বন্দর-সড়ক-রেলপথসহ অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শুল্কহার নির্ধারণ ও বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। শুধু রাজনৈতিক বিবেচনা আর অনুরোধ গুরুত্ব পেলে এক্ষেত্রেও জাতীয় স্বার্থ বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে নিজেদের বাণিজ্যিক অবস্থানও ক্ষুণ্ন হবে বলে সংশ্লিষ্টরা গভীর আশঙ্কা ব্যক্ত করেছেন। হতে যাওয়া চুক্তির অধীনে ভারতীয় সামুদ্রিক জাহাজ থেকে চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে খালাস হওয়া পণ্যসামগ্রী সড়কপথে আসাম-মেঘালয়সহ অন্যান্য রাজ্যে যাবে। ফলে সেখানে ভারতীয় পণ্যের বাণিজ্য বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশের সুযোগ সঙ্কুচিত হবে। এসব বিষয়ে প্রবল আপত্তির মুখে এর আগে সিদ্ধান্ত গ্রহণ বাধাগ্রস্ত হলেও এবার মোক্ষম সুযোগ কাজে লাগাতে যাচ্ছে সরকার।
শাহবাগের ‘জাগরণে’ সবাইকে ব্যস্ত রেখে ভারতের সঙ্গে উপকূলীয় নৌচলাচল চুক্তি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশের লাভ-ক্ষতির বিষয়টা ধামাচাপা থেকে যাবে। ভারত প্রতিশ্রুত ১০ কোটি টাকা না দিলেও এর মধ্যেই এখানে ব্যবহৃত নৌরুট স্বাভাবিক রাখতে ক্যাপিটাল ড্রেজিংয়ে ৮০০ কোটি টাকার প্রকল্প হাতে নিয়েছে সরকার। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরও এ রুটের রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর ৮০ থেকে ১০০ কোটি টাকার ব্যয়ভার বহন করতে হবে আমাদেরই। এভাবে ভারতকে করিডোর দেয়ার পেছনে সরকারের অন্য কোনো স্বার্থ জড়িত আছে কিনা সেটাই এখন ভেবে দেখার বিষয়।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


