
অফিসের এক কলিগ শেষ বিকেলে একটা মিউ মিউ বিড়াল ছানা নিয়ে হাজির হলো। কলিগটি মাস ছয়েক হলো বিয়ে করেছে। জিজ্ঞেস করব না করব না করেও শেষ পর্যন্ত জিজ্ঞেস করেই ফেললাম--বিড়াল মারা এখনও বাকি আছে কিনা। সে সহাস্যে নিশ্চিত করল, অন্তত ওই বিড়ালটি আর জীবিত নেই।
বিড়ালছানার চেহারা তত সুদর্শন বলা যাবে না। হাড় জিরজিরে শরীর, উস্কখুষ্ক লোম আর পথের ধুলায় আসল রং হারানো চেহারা। পথ শিশুর সমস্ত বৈশিষ্ট বিদ্যমান এই পথ বিড়ালছানার মধ্যে। কিন্তু একজন প্রকৃত ট্যালেন্ট হান্টারের মতো এরই মাঝে প্রকৃত প্রতিভা খুজে পেল আমার কলিগ। পরম মমতায় দুহাতে জড়িয়ে বুকের কাছে করে ওকে অফিসে নিয়ে আসলো। সৌন্দর্য আসলেই বস্তুর চেয়ে মানুষের চোখেই বেশী।
তবে এও সত্য, একটু তেল-সাবান আর দানা-পানি পেলে এর চেহারা ফিরতে সময় লাগবে না। রিয়েলিটি শো'তে দেখা যায় এই রূপান্তর। অডিশন পর্বে যাদের দিকে তাকানো যায় না, ক্যামেরায় যাদের ধরতে শ্যুটিংএর লাইট খরচ বেড়ে যায়, শো যত ফাইনালের দিকে গড়ায় সেই তাদের দিকেই একবার তাকালে আর চোখ ফেরানো যায় না।
বেড়াল ছানা হয়তো ব্যাংকার হবার স্বপ্ন নিয়ে মতিঝিল এলাকায় এসেছিল। কিন্তু আমার কলিগের চোখে পড়ায় এক নিমিষেই তার জীবনের গতিপথ পাল্টে গেল। কলিগের বাইকে চড়ে সে চিরতরে চলে গেল তার জন্মভূমি ছেড়ে। মতিঝিলের উদ্বাস্তু বেড়ালছানা থেকে মুহুর্তেই সে হয়ে গেল মিরপুরের এক গর্বিত ফ্ল্যাট মালিকের পরিবারের সদস্য।
পরের দিন অফিসে 'বেড়ালের বাবা'কে জিজ্ঞেস করেছিলাম তার ’সন্তানের’ প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা। বাসায় নিয়েই তাকে বিদেশী শ্যাম্পু দিয়ে গোসল করানো হয়েছে, আলাদা টাওয়েল দিয়ে গা মুছিয়ে দিয়ে হেয়ার ড্রায়ার দিয়ে গা শুকিয়ে দেয়া হলো। অতপর ডিনারে দেশী মুরগীর মাংস-ভাত, রাতে ঘুমাতে যাবার আগে এক বাটি দুধ। সুখের জীবন আ আ, সুখের জীবন।
এক বড়ভাই মাঝে মাঝেই বলে--লুঙ্গির গিট খুলতে তাও কিছু সময় লাগে কিন্তু ভাগ্য খুলতে সময় লাগে না। ব্রাড পিট-এ্যাঞ্জেলিনারা আফ্রিকা থেকে সন্তান দত্তক নিয়ে আসে, তারপর সেই সন্তানেরা হয়ে যায় আমেরিকান। তাদের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, বিনোদন ও জীবন প্রত্যাশা সব মিলিয়েই তারা হয়ে যায় প্রথম বিশ্বের অংশ।
মুক্তিযুদ্ধের পরপরই আমাদের অনেক যুদ্ধশিশুকে দত্তক নিয়ে গেল ইউরোপ-আমেরিকান দম্পতিরা। স্বাধীনতা দিবস-বিজয় দিবসের অনেক অনুষ্ঠানে অনেক সময় তাদের দু’একজনের খোঁজ করা হয়। উপলক্ষ্য পেয়ে তারাও হারানো দেশ নিয়ে আবেগে আপ্লুত হন, হারানো মা'কে নিয়ে অশ্র“ ঝরান। কোন এক একাকী সময় হয়তো কোন উপলক্ষ্য ছাড়াও তাদের মনটা হু হু করে ওঠে বাংলাদেশী সেই কৃষ্ণ, শীর্ণ, অসহায় মায়ের কথা ভেবে। কিন্তু শেষে পর্যন্ত বাস্তবতা হচ্ছে, সেই নতুন দেশই তাদের দেশ, সেই নতুন ভাষাই তাদের ভাষা, সেই নতুন দম্পতিই তাদের পিতা-মাতা, সেই উন্নত জীবনই তাদের জীবন। এবং সুযোগ দেয়া হলে তাদের বর্তমানের ওই উন্নত জীবনের সাথে যুদ্ধশিশুর বাংলাদেশী জীবন তারা কোনদিনই পাল্টাতে চাইবেন না।
দিন শেষে সেই কথাই সত্য--জন্ম হোক যথা তথা, ’ভাগ্য’ হোক ভালো।
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৩:১২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


