
টুং করে একটা নোটিফিকেশান আসলো।
ফাৎনার নড়াচড়া দেখে বুঝলাম, বড়শিতে একটা 'ব্রাউন ফিস' ধরা পড়েছে। এখন টেনে তোলার আগে খানিকটা খেলতে হবে। মৎস্য শিকারীরা জানে, এই কাজটা খুবই রোমাঞ্চকর আর আনন্দদায়ক।
আমার বিষয়টা একটু খোলাসা করি। আমার নাম সালাউদ্দিন খসরু। পরিচিত দূর্মুখেরা আমাকে আড়ালে-আবডালে 'শালা খসরু' বলে ডাকে। চরিত্রগতভাবে আমি কিঞ্চিৎ পিছলা স্বভাবের, সেইজন্যই মাইন্ড খাই না। আর আমার যা পেশা, তাতে এইসব ছোটখাটো বিষয়ে মাইন্ড খাওয়া আমার সাজে না। তাছাড়া এই শালা শব্দটার মধ্যে একটা আত্মীয়তার গন্ধ আছে। এই লাইনে ক্লায়েন্টদের সাথে দ্রুত আত্মীয়তা জমানোটাই আসল কেরামতি। খুব বড় তালেবর না হলে এই কেরামতি দেখাতে গিয়ে ব্যাড়াছ্যাড়া করে ফেলার ইতিহাস আমাদের লাইনে একেবারে মন্দ না। কাজেই সাবধান থাকা লাগে প্রতি পদে, সবকিছুতেই প্রতিক্রিয়া দেখানো কোন কাজের কথা না।
মফস্বলের একটা কলেজের স্নাতক ডিগ্রী নিয়ে কিছুদিন ছোটোখাটো চাকুরী করার পর দেখলাম পোষাচ্ছে না, তাই পেশা বদল করেছি। আমি নিজেকে এখন একজন অভিনয়শিল্পী হিসাবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। আমার কাজ হলো 'সুন্দরী মেয়ে' সেজে অভিনয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন ক্লায়েন্টকে ফাসানো। 'ফাসানো' শব্দটা অবশ্য খানিকটা আপত্তিকর, তবে কিছু মানুষ আছে যারা সুন্দরী মেয়ে দেখলেই চিৎপটাং হয়ে যায়, তাদের জন্য শব্দটা ঠিকই আছে।
ছেলে হয়ে সুন্দরী মেয়ের ভং ধরার একমাত্র মাধ্যম ফেসবুক আর হোয়াটস এ্যাপ। অপ্সরার মতো ছবি দিয়ে একটা ফেইক আইডি খুলেছি; যেই দেখবে তারই চোখ ট্যারা হতে বাধ্য। তাতে বিশ্বাসযোগ্য মাত্রার তথ্য-ছবি যোগ করা হয়েছে। আর হোয়াটস এ্যাপের বিষয়টা খোলাসা না করি.........বিজনেস সিক্রেট বলে একটা কথা তো আছে, তাই না!!!! শুধু বলি, আমি আসলে টিম ওয়ার্কে বিশ্বাসী। এ'টুকু জেনে রাখেন, আমার হয়ে কিন্নরকন্ঠী ভয়েস দেওয়ার জন্য ব্যাক-আপে যে আপা আছে, তাকে প্রতিটা সফল ফিশিং প্রজেক্টের পর 'স্ট্যান্ডার্ড ১০% কমিশন' দিতে হয়। আমার ফেসবুক প্রোফাইলের ইন্ট্রোতে লেখা, ''আমার এই দুখী জীবনের জন্য লুকিং ফর এ বিশ্বাসী জীবন সঙ্গী''.........ব্যাস, এটুকুই। ''বেশি কথা সমস্যা ডেকে আনে'' এটা আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি। এমন একটা দুখী সুন্দরীকে সুখী করতে লালায়িত রোমিওর জন্য এর চাইতে অধিক বাক্য ব্যয়ের কোন প্রয়োজন আছে বলে আমার মনে হয় না।
আমার নতুন ''ব্রাউন ফিস'' কে কিভাবে ডাঙ্গায় তুললাম তা বিস্তারিত না বলি......সে অনেক কথা। তবে এটুকু বলতে পারি যে, তাকে আমি পুরাপুরি কব্জা করে ফেলেছি। তাই কিছু কথোপকথন তুলে ধরি, আপনারা তার সম্পর্কে একটা ধারনা পাবেন।
ব্রাউন ফিসঃ সোনাপাখিটা কি করছো এখন?
আমিঃ কি আর করবো, উদাস হয়ে তোমার কথাই ভাবছিলাম। কবে যে আমরা দু'জন মিলে একটা সোনার বাংলা........থুক্কু..........সোনার সংসার গড়ে তুলবো (করুণ দীর্ঘশ্বাস!!!)। আচ্ছা, তুমি তো শুধু বললা যে, তোমার কনসালটেন্সি ব্যবসা। বিস্তারিত না বললে আমার জান সম্পর্কে জানবো কিভাবে?
ব্রাউন ফিসঃ ও এই কথা!!! আসলে আমার কনসালটেন্সি ফার্মের দুইটা শাখা। একটা ফাইনান্স আরেকটা রিয়াল এস্টেট সংক্রান্ত।
আমিঃ আমি আসলে বেশি পড়ালেখা করি নাই। একটু বুঝায়ে দাও না!!! আহ্লাদী ভাব ধরলাম।
ব্রাউন ফিসঃ আমাদের ফাইনান্স শাখার প্রধান কাজ হলো ক্লায়েন্টদের হয়ে বাজারের লিকুইডিটি মেইনটেইন করা। বাজারে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত ক্যাশ ফ্লো থাকলে ইকোনমিতে ইনফ্লেশন বাড়ে। আমরা গিয়া জাস্ট সেই ক্যাশটা কালেকশন করে মার্কেট ব্যালেন্স করি। এই যেমন ধরো, কেউ বাড়ি তুলতেছে; আমি গিয়া তার ফাইন্যান্সিয়াল রিস্ক এসেসমেন্ট করে একটা নির্দিষ্ট অ্যামাউন্ট নিয়া আসি। একে ফাইনান্সের ভাষায় ‘সিকিউরিটি প্রিমিয়াম’ বলতে পারো।
আর রিয়াল এস্টেটের বিষয়টা খুবই সোজাসাপ্টা। এটা আসলে একধরনের অতিলৌকিক ইনস্ট্যান্ট পজিশন শিফটিং। মানে ধরো, কারো কোন একটা জমি বা বাড়ি পছন্দ হয়েছে, আমরা সেটা পাইয়ে দেয়ার ব্যবস্থা করি। এক রাতেই এক পক্ষের জমি বা বাড়ি আরেক পক্ষের মালিকানায় চলে যায়। এমন ঝামেলামুক্ত পজিশন শিফটিংয়ে সব পক্ষই খুশি থাকে। এক্কেবারে উইন উইন সিচ্যুয়েশান!!!
আমিঃ তা তোমাদের অফিস কোথায়? আর মালিকই বা কে?
ব্রাউন ফিসঃ আজকাল কি আর অফিস লাগে? বিদেশে দেখো না কতো ব্যাঙ্ক আছে যাদের তেমন কোন কোন অফিসই নাই!! এখন তো অনলাইনের জয়জয়কার!!! আর মালিক আবার কে হবে...........আমিই। তবে আমাদের এক ভাইয়া আছেন। উনি লন্ডন থেকে এই ব্যাপারে উচ্চতর প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। উনি আমাদের চিফ এডভাইজার। খুবই অমায়িক আর সাদাসিধা একজন মানুষ। সেটা প্রমাণ করার জন্য সব সময়ে উনি সাদা শার্ট পড়েন আর সিধা হয়ে হাটেন!!! উনি এতোই সাদাসিধা যে, প্রচুর টাকা-পয়সা থাকার পরও উনি মিজানের হোটেলে ১০০ টাকায় লাঞ্চ সারেন। আরেকজন এডভাইজার আছেন, উনারও বিদেশী ডিগ্রী আছে। তবে ভারতের। খুবই জ্ঞানী লোক, সর্ব বিষয়ে পারদর্শী। ভাইয়া সাইনবোর্ড, আসল কাম উনিই করেন।
আমি মন্তব্য পড়ি আর মনে মনে হাসি। হালায় একটা চান্দাবাজ আর দখলবাজ। ওর প্রোফাইল দেখে আর খোজখবর নিয়ে জানতে আর কিছু বাকি নাই আমার। যুবদলের একটা মাঝারি মাপের নেতা সে। বিএনপির লোকজন চান্দাবাজি আর দখলবাজিকে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছে। এরা অতীতের তাম্রযুগে গর্তে থাকলেও বর্তমানের স্বর্ণযুগে ভালো মালপানি কামাচ্ছে আর দেদারসে খরচ করছে। দুঃখের বিষয় হলো, এই লেবুটাকে ছাড়ার সময় হয়ে এসেছে; বেশিদিন আর কচলানো যাবে না। আজকাল হালার পো হালায় দেখা করার জন্য খুবই চাপাচাপি করে!!!!
যাকগে, এই মাত্র খবর পেলাম, পটুয়াখালিতে একদল সাধারন মহিষ আমরণ অনশন শুরু করেছে। তাদের একটাই বক্তব্য, জাতীয়তাবাদী মহিষ দলের ছাত্র সংগঠনের কতিপয় নেতা তাদেরকে চরে গিয়ে ঘাস খেতে বাধা দিচ্ছে। তাদের মুখপাত্র বলেছে, প্রাকৃতিক ভূমিতে প্রাকৃতিকভাবে জন্মানো ঘাস খাওয়া তাদের জন্মগত অধিকার। এই অধিকার তাদের ডিএনএতে খোদাই করা আছে। এখন ভোদাই ছাত্রনেতারা দাবী করছে, প্রতিবার ঘাস খেতে গেলে তাদের ২০০ টাকা করে চান্দা দিতে হবে। তাদের যেহেতু কোন আয় রোজগার নাই, কাজেই এই টাকা দেয়াও তাদের পক্ষে সম্ভব না। ফলে মাননীয় (???) প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাদের দাবী, তাদের নামে যেন অনতিবিলম্বে সনাক্তকরণ চিপযুক্ত ''ঘাস কার্ড'' ইস্যু করা হয়।
এই ব্যাপারে একজন ছাত্রনেতার বক্তব্য, এরা সাধারন মহিষ না, এরা গুপ্ত। কেমন গুপ্ত জিজ্ঞেস করতেই সেই ছাত্রনেতা ক্ষেপে গিয়ে তার নতুন গজিয়ে ওঠা শিং দিয়ে গুতিয়ে কয়েকজনকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়েছে। বিষয়টা নিয়ে এলাকায় বিশাল তোলপাড় হচ্ছে।
এই খবর পাওয়ার পরেই আমার নতুন একটা প্রজেক্টের আইডিয়া মাথায় আসলো। আজকাল পশু অধিকার নিয়া কাজ করা বিরাট লাভজনক। পটুয়াখালীর ওই অনশনরত মহিষগুলোর আন্দোলনই এখন আমার নয়া ভরসা। দেখি, পটুয়াখালীর মহিষদের নিয়া কোন ক্রাউডফান্ডিংয়ের ধান্ধা করা যায় কিনা!!! মানুষের পেছনে সময় নষ্ট না করে এবার মহিষদের অধিকার আদায়ের আন্তর্জাতিক ব্যানার বানিয়ে ফান্ড কালেকশনে নামতে হবে। সর্বশেষ ব্রাউন ফিসকে ছাড়ার পরে আমাকে অতি-অবশ্যই মহিষের অধিকার নিয়ে ডিল করতে হবে...........হে হে হে!!!!
যাই হোক, মহিষের প্রজেক্টে নামার আগে এই 'ব্রাউন ফিশ' লেবুটাকে শেষবারের মতো কচলানোর চেষ্টা করা যাক। আমি বিছানায় শুয়ে গালে হাত দিয়ে ভাবলাম, এবার এক ধাক্কায় বড় অ্যামাউন্ট মারতে হবে। কিবোর্ডে আঙুল চালিয়ে লিখলাম, "জানু, আমার আম্মু হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে গিয়েছে। আজকেই সিসিইউতে ভর্তি করতে হবে। জরুরি এক লাখ টাকা লাগবে। তুমি বিকাশ বা নগদে পাঠাতে পারবা? শীঘ্রই যখন দেখা করতে আসবো, তখন সুদে-আসলে সব শোধ করে দেব!!! প্লি-ই-জ, না কোরো না!!!!"
ছবিঃ Click This Link

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

