somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

রাজীব নুর
আমার নাম- রাজীব নূর খান। ভালো লাগে পড়তে- লিখতে আর বুদ্ধিমান লোকদের সাথে আড্ডা দিতে। কোনো কুসংস্কারে আমার বিশ্বাস নেই। নিজের দেশটাকে অত্যাধিক ভালোবাসি। সৎ ও পরিশ্রমী মানুষদের শ্রদ্ধা করি।

চেগা মিয়া

০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



সকাল ৭ টা। আশ্বির্নের মাঝামাঝি।
হাজী শারাফত আলীর ছেলে মন খারাপ করে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছেন। রাতে তার ভালো ঘুম হয়নি। তার ভাই বোনদের কথা মনে পড়লেই তিনি আকাশের দিকে তাকান। ছোটবেলা থেকেই তিনি জানেন- তার বাবা-মা, ভাই বোন ওই আকাশেই থাকেন। তার পরিবারের সবাই তাকে আদর করে- চেগা মিয়া বলে ডাকতেন। বাবা-মা মরে যাবার পর চেগা মিয়া চাচা ইবরাহিম এর কাছে চলে যান। চেগা মিয়া অসহযোগ আন্দোলন করে প্রায় এক বছর জেল খাটলেন। ১৯২৫ সালে তিনি জয়পুরহাটের পাঁচবিবি উপজেলার জমিদার শামসুদ্দিন মহম্মদ চৌধুরীর মেয়ে আলেমা খাতুনকে বিবাহ করেন। স্ত্রীর সাথে চেগা মিয়ার দিনের পর দিন দেখা হয়, কথা হয় না। আসলে যারা মানুষকে ভালোবাসেন তারা নিজের ঘর সংসারের কথা খুব একটা মনে পড়ে না। দেশের মানুষের কল্যাণের জন্য তারা নিজেদের উৎসর্গ করে দেন। চেগা মিয়া দুঃখী মানুষ। কিন্তু তিনি নিজের দুঃখ লুকিয়ে রাখতে জানতেন।

চেগা মিয়া তার স্ত্রীকে খুব ভালোবাসতেন।
তিনি যেখানেই যেতেন- একদল মানুষ তাকে সব সময় ঘিরে থাকত। ঘিরে থাকা মানুষ গুলো চেগা মিয়াকে অসম্ভব ভালোবাসেন। সবাই ভালোবেসে চেগা মিয়াকে ডাকত- লাল মাওলানা নামে। অনেকে লাল মাওলানার কাছ থেকে পানিপড়া নিতে আসতো। চেগা মিয়া অর্থাৎ লাল মাওলানা এক আকাশ আগ্রহ নিয়ে কিছুক্ষন বিড়বিড় করে পানিতে ফু দিতেন। সেই পানি পড়া খেয়ে নাকি অনেকেই উপকার পেতেন। দূরদুরান্ত থেকে গ্রামের সহজ সরল মানুষ তার কাছে পানি পড়া নিতে আসেন। তার সাদা দাড়ি, মাথায় টুপি আর সূফি চেহারার কারনে- খুব সহজেই তিনি মানুষের মনে স্থান পেতেন। চেগা মিয়া লুঙ্গি আর পাঞ্জাবি পড়ে ঘুরে বেড়ান। মাথায় থাকতো বেতের টুপি। চেগা মিয়া চীন যাওয়ার পর তার চিন্তা ভাবনা সম্পূর্ন বদলে যায়।

একদিন এক স্কুল শিক্ষক তার কাছে এসে বললেন-
আপনি একজন অদ্ভুত মানুষ! এই সমাজে আপনার মতো মানুষ আমাদের খুব বেশি দরকার। মাওলানা শিক্ষককে বললেন, পৃথিবীর মজলুম মানুষ সবাই এক, তারা যেখানেই বাস করুক। শিক্ষক তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, আমি মনে করি একজন মুজিব আর একজন ভাসানীর মাঝে বড় পার্থক্য রয়েছে, আপনার রাজনৈতিক গ্রুমিংটা হয়েছে অনেকটাই একক ভাবে, আসামের জঙ্গলে। একারণে একদিকে আপনি চীনের লাল মাওলানা, অন্যদিকে আপনি মুরিদদের পানি পড়াও দিচ্ছেন, এমন জটিলভাবে চলেছে আপনার রাজনৈতিক দর্শন। লাল মাওলাকে সকলে ভালোবাসতো, বিশ্বাস করতো। মানুষ এতটুকু নিশ্চিত ছিলো- এই লোক দ্বারা জাতির কোনো ক্ষতি হবে না। তিনি পথ দেখাবেন মঙ্গলময় মহা সত্যের।

১৯২৯ সালে আসামের ধুবড়ী জেলার ব্রহ্মপুত্র নদের ভাসান চরে-
লাল মাওলানা কৃষক সম্মেলন আয়োজন করেন। বিশাল আয়োজন। সারা দেশ থেকে দলে দলে লোক আসছে। এই সম্মেলন থেকেই তার নাম রাখা হয় 'মাওলানা ভাসানী'। কিন্তু বাঙ্গালীদের কাছে তিনি 'মজলুম জননেতা' নামে বেশি পরিচিত। মজলুম নেতার পুরো নাম আবদুল হামিদ খান ভাসানী। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস এর ভাষণ শুনে ভাসানী রাজনীতিতে অণুপ্রাণিত হন। 'বাঙ্গাল খেদাও' আন্দোলনে বাঙ্গালীদের সাহায্য করার জন্য তিনি বারপেটা, গৌহাটিসহ আসামের বিভিন্ন জায়গা ঘুরে বেড়ান এবং গ্রেফতার হোন। গ্রেফতার হওয়ার পর অনেক শিক্ষিত বাঙ্গালীকে বলতে শোনা গেছে- ভাসানী রাজনীতি বহুলাংশেই উদ্ভ্রান্ত ও বিভ্রান্তিমুলক। কিছু দুষ্টলোক সব জাগায়ই থাকে। তাদের কাজই হচ্ছে সংঘাত তৈরি করা। বাঙ্গালীদের অপমান করে এক প্রকার গলা ধাক্কা দিয়ে আসাম থেকে বের করে দিচ্ছে- এই ব্যাপারটা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী কিছুতেই মেনে নিতে পারছিলেন না, তাই তিনি মাও সে তুং থেকে শুরু করে আমেরিকার প্রসিডেন্ট সহ অনেক কাছে চিঠি লিখে সহযোগিতা চাইলেন। দুঃখজনক ব্যাপার হলো কেউই তখন সাহায্যের জন্য এগিয়ে এলেন না।

আসামের কারাগারে ভাসানী সাহেবকে দেখতে যান ওমর আলী।
সাথে নিয়েছেন- কিছু ফল। কিন্তু ওমর আলীকে ভাসানীর সাথে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। ওমর আলী করুন গলায় ডিউটি অফিসারকে বললেন, আমার স্ত্রী সরলা বিবির দুই ভরি গহনা আপনি নিয়ে যান- তবু ভাসানীর সাথে একবার দেখা করতে দেন। ডিউটি অফিসার নারায়ন চন্দ্র দুই ভরি গহনা রেখে দিয়ে ওমর আলীকে গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিলেন। আর বললেন, ভাগো হিয়াসে। তোম বাঙ্গালী হো। ওমর আলী হচ্ছেন আমার নানা। যিনি সারা জীবন সহজ সরল জীবনযাপন করেছেন। ওমর আলী ব্যবসার কাজে বছরের ছয় মাস আসাম থাকেন। বাকি ছয় মাস থাকেন বিক্রমপুর। সিরাজদিখান।

ওমর আলী তখনও জানতেন না-
বাঙ্গালী মুসলমানেরা চিরদিনের জন্য আসাম ছেড়ে চলে যাবেন এই শর্তে ১৯৪৭ সালের শেষের দিকে মাওলানা ভাসানীকে মুক্তি দেয়া হবে। ওমর আলীর মনে করেন ভাসানী সাহেব একজন শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী। বিতর্কের উর্ধে একজন মানুষ। যিনি দেশের স্বার্থে কাজ করবেন। তাই তাকে প্রতিটা বাঙ্গালী এক আকাশ ভালোবাসা নিয়ে মনে রাখবে চিরজীবন। ক্ষমতাবিমুখ রাজনীতির এক মহান পুরুষ ছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। তার সমতুল্য আর কে আছে? ওমর আলী চোখের পানি মুছে মনে মনে এক মহান সত্য ভাবলেন- মওলানা ভাসানীকে বাদ দিয়ে ইতিহাস রচনা সম্ভব নয়।

ওমর আলী আগামীকাল সকালে স্ত্রীকে নিয়ে আসাম ছেড়ে চলে যাবেন।
স্ত্রীর গর্ভে তার প্রথম সন্তান। আসাম ছেড়ে চলে যেতে দুঃখে তার কলিজা ছিড়ে যাচ্ছে। এখানে তিনি এবং তার স্ত্রী সরলা ভালোই ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছিলেন। দেশের হর্তা-কর্তারা নির্বোধ হলে দুঃখের আর শেষ থাকে না। আজ ওমর আলীর ভাসানীর একটা কথা খুব বেশি মনে পড়ছে- আসাম আমার, পশ্চিমবঙ্গ আমার, ত্রিপুরাও আমার। এগুলো ভারতের কবল থেকে ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত আমাদের স্বাধীনতা ও মানচিত্র পূর্ণতা পাবে না।
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৪:০০
৮টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কবিতা প্রেমিকদের কলমে সময়ের বিবেক : বিশ্ব কবি রবিন্দ্র নাথ ঠাকুরের গ্রাফিতেতে কালী লেপন প্রসঙ্গ

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৩৪


যে কবির গানে ভোরের আকাশ জেগে ওঠে প্রতিদিন
যাঁর সুরে আজও অশ্রু ঝরে হাসে হৃদয় রঙিন
সেই রবীন্দ্রনাথের ছবির বুকে কালি মাখায় যারা
তারা কি জানে তাঁরই গানে বাঙালির প্রাণের... ...বাকিটুকু পড়ুন

রাসূল (সা.), আহলে বাইত ও সাহাবায়ে কেরামের (রা.) অনুচিত কাজের সমালোচনা ও সমর্থন করা যাবে না

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৪১




সূরাঃ ৮ আনফাল, ৬৭ থেকে ৬৯ নং আয়াতের অনুবাদ-
৬৭।দেশে ব্যাপকভাবে শত্রুকে পরাভূত না করা পর্যন্ত বন্দী রাখা কোন নবির উচিত নয়। তোমরা পার্থিব সম্পদ কামনা কর। আল্লাহ চান... ...বাকিটুকু পড়ুন

সমাধি

লিখেছেন রাজীব নুর, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৮:৩৯



ফুরিয়ে গেলেও ফিরে আসা যায় বটে
শুধু মানুষ ফুরিয়ে গেলেই ফেরে না মানুষ।
খুব কাছাকাছি আকাশ;
জানালা খুলে একদিন ছুঁয়ে টের পেলাম-
হায় কৃত্রিম আকাশ!
তাই তো কখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

রঠার মুসলিম বিদ্বেষ

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ১০:১৮



রবিন্দ্রনাথ ঠাকুর সংক্ষেপে রঠা এর ছোট গল্প "রীতিমত নভেল" এ রঠা মুসলমান শব্দের সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করেছেন ‘যবন’। যবন অর্থ অসভ্য, ম্লেচ্ছ, অপবিত্র, বর্বর জাতি, যেকোনো বিদেশি ইত্যাদি ইত্যাদি।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সন্ত্রাসী অধ্যাপক ড.ইউনূস!

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ১৪ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৬


গত সোমবার নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় অধ্যাপক ইউনূসকে হেনস্তা করার ঘটনার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে৷ এতে দেখা যায়, অধ্যাপক ইউনূসের দিকে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×