somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

গ্যাসবেলুন ( ছোট গল্প)

০২ রা জুন, ২০১৫ ভোর ৫:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


-বাবা মা কি আজকেও আসবে না?
প্রশ্ন শোনে মেয়ের দিকে ফিরে তাকাল অনিমেষ।সে তার ৫ বছরের মেয়ে তিথি কে নিয়ে বসে আছে পার্কের বেঞ্চে।প্রতি মাসের শেষ শুক্রবার তিথিকে নিয়ে সে এখানে আসে।নিতুর সাথে যখন তার ছাড়াছাড়ি হয় তখন এমনটাই কথা হয়েছিল। মাসের শেষ শুক্রবার সে এসে মেয়েকে দেখে যাবে এখানে। প্রথম বছরকানিক এসেও ছিল কিন্তু বিগত ছয় মাস সে আসছে না।
-কি হল বাবা, মা কি আজকেও আসবে না?
-তোমার মা মনে হয় আজকেও কাজে আটকা পরে গেছে।
-মার এত কাজ কেন বাবা?
-বড়দের অনেক কাজ থাকে,তুমি বড় হও দেখবে তোমার ও কাজ থাকবে।
অনিমেষের খুব অস্বস্তি লাগছে।মেয়েটাকে মিথ্যা বলা হচ্ছে।গত ছয় মাস যাবত নিতুর সাথে তার কোন যোগাযোগই হয় নাই। এইসব কথা এখনই তিথিকে বলা সম্ভব না তাই বাধ্য হয়েই তাকে মিথ্যাটা বলতে হচ্ছে। মিথ্যাটা বলতে গিয়ে সে বুঝতে পারছে, বাবা হয়ে মেয়ের কাছে মিথ্যা বলাটা পৃথিবীর কঠিনতম কাজের একটি।
-বাবা মা আমাদের সাথে থাকে না কেন?
-মাগো একসাথে থাকতে হলে ভালবাসা লাগে।
-বাবা ভালবাসা কি?
-আমি জানি না মা।
-মা এখন যেখানে থাকে সেখানে কি ভালবাসা আছে বাবা?
-অবশ্যই আছে, আছে বলেই তো তোমার মা ওইখানে থাকে।
-বাবা তুমি কি অনেক অনেক ভালবাসা আমাদের বাসায় আনতে পারবে না? মা এখন যেখানে আছে সেখান থেকেও অনেক অনেক বেশি ভালবাসা।তখন আমি মাকে বলতে পারব মা তুমি কেন চলে গেলে দেখ আমাদের বাসায় কত্ত ভালবাসা, ফিরে আস মা।

অনিমেষ কিছু বলে না। কাওকে বেধে রাখার জন্য শুধু ভালবাসা সত্য হলেই হয় না শক্তও হতে হয়। তবে ভালবাসা যদি কিনতে পাওয়া যেত তবে বোধ হয় ভালই হত।খাবারের দোকান গুলোতে যেমন রকমারি খাবার পাওয়া যায়, ভালবাসার দোকানেও পাওয়া যাবে রকমারি ভালবাসা। দোকানে ঢুকেই সে বলতো-
-মেয়ের জন্য মায়ের ভালবাসা আছে ভাই আপনার এখানে।
-থাকব না মানে, আমার এইখানে মানুষের প্রতি জিন্নতের ভালবাসা ও পাওয়া যায়। দাম একটু বেশি।
-ভাল ভাল, আমাকে মেয়ের জন্য মায়ের ভালবাসা দেন।
-ভাই এইগুলা নিয়া কি করবেন।পুরাতন আইটেম,এখন আর চলে না। আপনি বরং মানুষের প্রতি জিন্নতের ভালবাসা আইটেম টা নিয়া যান। একদম নতুন ।
-না ভাই এইটা আমার লাগবে না।
-আরে ভাই ভাল কথা শোনেন, আইটেম টা নিয়া যান। মানুষের ভালবাসা তো অনেক দেখলেন কিছু দিন একটু দেখেন জিন্নতের ভালবাসা কেমন লাগে।
-ভাল কথা শোনতে ইচ্ছা করছে না ভাই।
-তাও কথা, আপনি যদি ভাল কথা শোনার লোক হতেন তবে কি আর ভালবাসা খরিদ করতে আসতেন।
-জী, এখন আপনি আমার জিনিসটা দেন আমি চলে যাই।
-ওইটা নাই, পুরাতন আইটেম। মার্কেট আউট।
বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা হয়ে আসছে বলে। এই সময়টাকে গোধূলি বলে। গোধূলির সময় সূর্য পৃথিবীতে আলো দেয় না, সূর্য ডুবে যাওয়ার পর পরই শুরু হয় গোধূলির সময়। পৃথিবীর উড়তে থাকা সব ধুলোবালি, অণু পরমাণু শেষ হয়ে যাওয়া সূর্যের আলোটাকে ধরে রাখতে চায় তখন। ধরে রাখার চেষ্টাটা মন্দ হয় না। এই সময়টায় সূর্যের ফেলে যাওয়া মায়ায় পৃথিবীটা বড় অপরূপ দেখা যায়। খোলা ছাদের কার্নিশ ধরে বা সবুজ মাঠের প্রান্তরে দাড়িয়ে কয়জনই বা পৃথিবীর এই রুপ দেখেছে। অনিমেষের বড্ড আফসোস হয়।তবে সে তার মেয়েকে অবশ্যই এই সব মায়াময় মুহূর্ত গুলো থেকে বঞ্চিত করবে না। তার মেয়েটা যে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মায়া থেকে বঞ্চিত।

-বাবা আমি কি আইসক্রিম খেতে পারি?
-অবশ্যই খেতে পার।
অনিমেষ দুই জনের জন্য দুইটা কোন আইসক্রিম কিনে।একগাদা রঙ টং দিয়ে এরা জিনিসটা ভালই বানায়। দেখতে এত সুন্দর যে খেতে মন চায় না। সে তিথির হাতে আইসক্রিম তুলে দিতে দিতে বলে-
-বুঝলে মা তিথি তোমার মা না থাকাতে এক দিকে ভালই হয়েছে। এইযে এখন আমরা আইসক্রিম খাচ্ছি তোমার মা থাকলে কিন্তু খেতে দিত না।
- কেন খেতে দিত না বাবা?
-এটা হচ্ছে মায়েদের শাসন। সব মায়েরাই তার সন্তানদের শাসন করতে পছন্দ করে। কাজটা তারা মায়া থেকে করে, কোন শাসনই মায়ার বাহিরে না, মায়া থেকেই শাসনের জন্ম।
-বাবা আমি যেদিন মা হব সেদিন কি আমিও শাসন করতে পারব?
-অবশ্যই পারবে।
-বাবা আমি কবে মা হতে পারব?
- একজন মানুষের ভেতরে যতটুকু মায়া থাকলে মা হওয়া যায় তোমার ভেতরে যখন ততটুকু মায়া তৈরি হবে তখন তুমি মা হতে পারবে।
-বাবা মায়া কি?
-মায়া বড় বিষম বস্তু গো মা।।
তিথি বাবার কথা কিছুই বুঝে না ফেল ফেল করে থাকিয়ে থাকে। অনিমেষের বড় অবাক লাগে, বাচ্চা একটা মেয়ে কে কিসব কঠিন কঠিন কথা বলছে সে। মাথাটা বোধহয় পুরাই গেছে।কিন্তু কি করবে তার যে বলতে বড্ড ভাল লাগে।

দূরে এককোনে দাড়িয়ে একজন রংবেরঙের গ্যাসবেলুন বিক্রি করছে। অনিমেষ মেয়ের হাত ধরে সে দিকে এগিয়ে যায়। মেয়ের হাতে কয়েকটি রঙিন গ্যাস বেলুন কিনে দেয়। আনন্দে তিথির চোখমুখ ঝলমল করে উঠে। প্রতিটা মানুষের ভেতর রঙধনুর সাত রঙ থাকে,যতদিন সেই রঙ থাকে ততদিন মানুষের জীবনও রঙিন থাকে। কোন এক মহিন্দ্রক্ষনে মানুষ সেই রঙ গুলো তুলে দেয় তার সবচেয়ে প্রিয় মানুষটির হাতে। অনিমেষও তার রঙ গুলো তুলে দিয়েছিল মানুষটির কাছে, মানুষটা চলে গেছে সাথে করে সব রঙও নিয়ে গেছে।
তিথির একটি হাত শক্ত করে ধরে আছে তার বাবার তর্জনী অন্য হাতে রঙিন গ্যাস বেলুন।পৃথিবীর গায়ের লেগে থাকা সূর্যের মায়া ফুরিয়ে আসছে, ফুরিয়েই তবে যাবে, মায়া যে অতি বিষম বস্তু, কেবলই ফুরিয়ে যায়।পরতে পরতে অন্ধকার নামছে চারদিকে। তিথি লাফ দিয়ে হাতের বেলুন গুলো ছেড়ে দেয় আকাশের দিকে। পাই পাই করে রঙিন বেলুন গুলো উড়ে যায় নীল রঙের আকাশটাকে ছুবে বলে।কিন্তু সকল মায়া যে ফুরিয়েছে, আকাশটা যে ক্রমেই অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে আর বেলুন গুলোও রঙ হারিয়ে ফ্যাঁকাসে হয়ে যাচ্ছে।

তিথি তার বাবার হাত ধরে হাঁটছে, কোথায় যেন একটা অপূর্ণতার দীর্ঘশ্বাস। বাচ্চা মেয়েটির এক হাত থাকবে তার বাবার হাতে অন্য হাতটি থাকবে তার মায়ের হাতে, দুজনকে দুইপাশে রেখে সে হেঁটে যাবে নির্ভয়ে তবেই না পূর্ণতা পাবে দৃশ্যটি। কত সুন্দর দৃশ্যই অপূর্ণ থেকে যায় কেবলই ভালবাসার অভাবে। তারপরও কেন একজন মানুষের ভালবাসা অন্য আরেকজনের আকাশে ফ্যাঁকাসে গ্যাস বেলুন হয়ে যায়?

০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

গুগল এ.আই. - প্রফেশনাল সার্টিফিকেট পেয়ে গেলাম

লিখেছেন ইফতেখার ভূইয়া, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৬:৩৫


বিগত কয়েক বছর ধরেই অনলাইনে কোর্সেরাতে টুকটাক কোর্স করছি, মাঝে মধ্যেই সার্টিফিকেট পাচ্ছি। তবে প্রফেশনাল সার্টিফিকেট কোর্স কখনো করা হয় নি। বলে রাখা ভালো কোর্সেরা ফ্রি নয়, এখানে আপনাকে পে... ...বাকিটুকু পড়ুন

মদিনার মিষ্টান্ন, শ্রী ঘোষের দধি: সম্প্রীতির যে রেখা চোখে পড়ে না

লিখেছেন মুনতাসির, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৮



২০২১ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক দীর্ঘ সাক্ষাৎকারে প্রয়াত লেখক, গবেষক ও বাম রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমরকে দেশের সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল। ষাটের দশকে যিনি ‘সাম্প্রদায়িকতা’ নামে আস্ত একটা বই... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বেগম রোকেয়া, একজন মাদাম কুরী এবং একজন আএলিটা

লিখেছেন নাজনীন১, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:১০



মঙ্গল গ্রহের রাণী আএলিটা।



রাশিয়ান বিজ্ঞান কল্পকাহিনীর একটি চরিত্র। ১৯২৪ সালের সাদা কালো ম্যুভিটি বানানো হয়েছে,সায়েন্সফিকশন উপন্যাসটি লিখেছিলেন এলেক্সে নিকোলেভিস টলস্টয়, ১৯২৩।


বাংলাদেশে এক সময়ে বিজ্ঞানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিন্নাহ পর্ব-২

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৫ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৩:২৯



এবার জিন্নাহর পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত বিতর্কিত বক্তব্যে আসা যাক। জিন্নাহ জন্মসূত্রে গুজরাটি ছিলেন এবং কেবল ইংরেজি ও গুজরাটি ভাষা জানতেন। তিনি উর্দু বলতে পারতেন না। সেক্যুলারিস্ট জিন্নাহ যেহেতু ব্যক্তিজীবনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইসলামের জ্ঞানদীপ : যুক্তির আরব্য-ফারসী নবযাত্রা প্রজ্ঞার জয়ধ্বনি বিজ্ঞান ও যুক্তির মহাকাব্য -৩য় পর্ব

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ০৬ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:১৭
×