
যেই পথ দিয়ে যামিনীরা মাঠের পারে এসেছিল, যামিনী সেই পথে গ্রামে প্রবেশ করলো; যেই বাড়ীতে তারা লুকিয়েছিল , সেখানে ফিরে গেলো ; তার উত্তর পাশের কয়েক বাড়ীতে সে মানুষ দেখেছে গত কয়েকদিন; শফি গ্রামটি ঘুরায়ে দেখায়েছিল, যাতে গ্রামে মিলিটারী ঢুকলে পালাতে পারে। সে পাশের বাড়ীর উঠানে গিয়ে বললো,
- বাড়ীতে যারা আছেন, আমাকে সাহায্য করেন, আমরা শরণার্থী, আমার মায়ের গায়ে গুলি লেগেছে।
কোন সাড়া শব্দ নেই; সে জানে, গুলির শব্দে সবাই জেগে গেছে; ভয়ে দরজা খুলছে না; যামিনী সময় নস্ট না করে বাড়ী থেকে বের হয়ে এলো; পাশের বাড়ীতে প্রবেশ করতে গিয়ে দেখে, উঠানে একজন লোক দাঁড়িয়ে আছেন। যামিনীকে বললো,
-তুমি কে?
-আমরা শরণার্থী, আমার মায়ের গায়ে গুলি লেগেছে, আমাকে সাহায্য করেন।
-আস।
লোকটি উঠানের দক্ষিণ প্রান্তের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে বললো,
-ফেরদৌস, দরজা খোল।
হারিকান হাতে ত্রিশ বত্রিশ বছরের মহিলা দরজা খুলে দিলেন; দুইজন ঘরে ঢুকলো; মহিলা বললেন,
- কাকা, কি অবস্হা?
-এরা পার হওয়ার চেস্টা করছিল, ওর মায়ের গায়ে গুলি লেগেছে; সাহায্য করার দরকার।
মহিলা যামিনীকে বললো, তোমার মা কোথায় এখন?
-আমি মাকে মাঠের মাঝখানের, পুকুরের পাড়ে রেখে এসেছি।
লোকটিকে লক্ষ্য করে মহিলা বললেন, কাকা, হামিদ ও লোকমানকে ডাকেন; বলেন, বড় ভাইয়ের ধানের কল থেকে ভ্যান নিয়ে আসতে।
ফেরদৌসী স্বামীসহ করাচীতে ছিল; স্বামী পিআইএ'তে চাকুরী করে; ভোটের পর, সরকার গঠন নিয়ে সমস্যা দেখা দেয়াত, সম্ভাব্য সমস্যার কথা ভেবে স্বামী তাকে ও মেয়েকে দেশে পাঠিয়ে দিয়েছে; সে এখন বাপের বাড়ীতে; পাশেই শ্বশুর বাড়ী; ভাসুরকে বড় ভাই ডাকে। কাকার পুরো নাম আবুল বশর, নিজ চাচা।
লোকটি বেরিয়ে গেলেন। মহিলা এক গ্লাস পানি এনে দিলো যামিনীকে।
-তোমার নাম কি? তোমার সাথে আর কারা ছিল?
-আমার নাম শহীদুল্লাহ; আমার বাবা, মা ও গাইড ছিলো; বাবা ও গাইড, দুইজনেই গুলিতে মারা গেছেন।
মহিলা ভেতরের ঘর থেকে একটি লুংগি ও জামা নিয়ে আসলেন; বললেন,
তুমি কাপড় বদলায়ে নাও তাড়াতাড়ি; তোমাকে ওদের সাথে যেতে হবে। তোমার আসল নাম কি?
-যামিনী।
মহিলা যামিনীকে বুকে টেনে নিলেন; বললেন, আমার মেয়ে তোমার সমান; তিনি মেয়েকে ভেতর থেকে নিয়ে এলেন; মেয়েটি যামিনীকে হাতে ধরে চৌকিতে বসায়ে দিলো।
দশ মিনিটের মাঝে বশর কাকা ঘরে প্রবেশ করলেন।
মহিলা বললেন, কাকা ছেলেটি ওদের সাথে যাবে, ওর মাকে আনার পর, হামিদদের ঘরে লুকায়ে রাখতে হবে, আপনি ব্যবস্হা করেন। ডাক্তারকে আনতে কাকে পাঠাবেন?
-আমি ব্যবস্হা করবো; ছেলে তুমি আস।
পুবের আকাশ ফরসা হওয়ার আগে যামিনী, হামিদ ও লোকমান মিলে যানকীর মাকে গ্রামের পশ্চিম পাশের একটি বাড়ীতে নিয়ে এলো; বশর কাকা আসলেন, ২টি পরিস্কার শাড়ী ও কম্বল দিলো যামিনীর হাতে; বললো,
তোমার মাকে গরম পানি দিয়ে পরিস্কার কর; হামিদের মা পানি গরম করে দেবে; আমি কম্পাউন্ডারের জন্য পাঠায়েছি; ডাক্তারকে পাওয়া যায়নি; ভয়ে নিজ বাড়ীতে ঘুমায়নি; পশ্চিমের গ্রামে আছে, লোক পাঠায়েছি।
-যামিনী বললো, কাকা আপনারা অনেক কস্ট করছেন।
-চিন্তিত হয়ো না, আমরা আছি।
যামিনীর চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে; সে বললো,
-শফি ও বাবার জন্য কিছু করা যাবে?
গ্রামবাসী মিলে মৃতদের সৎকার করে আসছে আজ কয়দিন; ব্যবস্হা হবে।
বেলা উঠার আগে আগে কম্পাউন্ডার বদিউল আলম আসলেন; ব্যথা কমানোর জন্য ও ইনফেকশন ঠেকাতে ইনজেকশন দিলেন; পায়ে ব্যান্ডেজ করে দিলেন।
বশর কাকা বললেন, ফেরদৌস তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিলো।
-কাকা, এখন গ্রামে হাঁটা আমার জন্য বিপদজনক; আমি রাতে আসবো ইনজেকশন দিতে, তখন ফেরদৌসের সাথে কথা হবে; এই মহিলার ডান পায়ের হাঁটুর নীচে কেটে ফেলতে হবে; শ্রী-নগর পাঠান কোন প্রকারে। মহিলাকে গরম চা ও কিছু গরম খাবার দেন। ব্যাথার ট্যাবলেট রেখে যাচ্ছি, ৬ ঘন্টা পরপর দেবেন। আপনারা হুশিয়ারে থাকেন, কথা যেন বাহিরে না যায়; তখন সবার প্রাণ যাবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

