আমাদের সময়, ৬ষ্ট শ্রেণী থেকে শুরু করে, ১০ম ক্লাশ অবধি, বাংলা পরীক্ষায় ১০ নম্বরের একটি প্রশ্ন থাকতো, "ব্যাখ্যা লিখ"; হয়তো এখনো আছে। আমি একই শিক্ষকের কাছে ৬ষ্ট শ্রেণী থেকে শুরু করে ১০ম শ্রেণী অবধি বাংলা পড়েছি; তিনি খুবই হাসিখুশী মানুষ ছিলেন; বাংলা পরীক্ষার কাগজ ফেরত দেয়ার দিন, ব্যাখ্যা নিয়ে হাসির হাট বসতো ক্লাশে, গড়ে কমপক্ষে ১০/১২ জন ব্যাখ্যা অংশে এমন আজগুবি কিছু লিখতো, তা পুরো ক্লাশের জন্য উপভোগ্য হয়ে উঠতো; স্যার ওদের খাতাগুলো শেষ পর্যায়ে দিতেন, পুরো ক্লাশ আনন্দে মেতে উঠতো!
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিলো ৬ষ্ট শ্রেণীর প্রথম সাময়িক পরীক্ষা থেকে: আমাদের মাঝে হারাধন চক্রবর্তী নামে একজন ছাত্র ছিল; সে পড়ালেখায় তেমন সুবিধা করতে পারেনি কোনদিন। বাংলা পরীক্ষায়, কবি কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদারের একটা কবিতার ২ লাইন তুলে ব্যাখ্যা লিখতে বলা হয়েছিল, কবিতার ১ম দু'লাইন ছিলো:
"যে জন দিবসে মনের হরষে জ্বালায় মোমের বাতি,
আশু গৃহে তার দখিবে না আর নিশীথে প্রদীপ ভাতি"
যারা আজগুবি ব্যাখ্যা লিখেছিলো, তাদের মাঝে হারাধনেরটা ছিলো ভয়ংকর আজগুবি; সে লিখেছিলো: এক গ্রামে এক দরিদ্র বুড়ি বাস করতেন, দুনিয়াতে তাঁর আর কেহ ছিলো না; তিনি একটা ভাংগা কুড়েঘরে থাকতেন, পয়সার অভাবে কেরোসিন তেল কিনতে পারতেন না; তাই তিনি মোমবাতি জ্বালাতেন ঘরে। এক শীতের রাতে তিনি মোমবাতি না নিবিয়ে ঘুমায়ে পড়েন; মোমবাতি থেকে প্রথমে কাঁথায় ও পরে ঘরে আগুন লেগে যায়। যাক, গ্রামবাসী আগুন নিভিয়ে ফেলে, বুড়িও প্রাণে রক্ষা পান।
স্যার হারাধনকে কাগজটা ফেরত দেন ও তার ব্যাখ্যা জোরে জোরে পড়ে শোনাতে বলেন; ব্যাখ্যা শুনে পুরো ক্লাশ হাসিতে ফেটে পড়ে, অনেক আনন্দ হয়, অনেক কমেন্ট হয়; স্যার নিজেও হাসেন অনেকক্ষণ; হারাধন নিজেও হাসিতে যোগ দেয়; বিশেষ করে মেয়েরা হারাধনকে তার গল্পটি বারবার পড়তে অনুরোধ করে; হারাধনও উয়য়সাহিত হয়ে বেশ কয়েকবার পড়ে শোনায়!
হারাধনের সুনাম পুরো স্কুলে ছড়িয়ে পড়ে, উপরের ক্লাশের অনেকেই তাকে দেখতে এসেছিলো। এই কাহিনী শুনে অংকের ক্লাশে শিক্ষক হারাধনকে নির্বোধ ডাকে, এতে আমাদের পুরো ক্লাশ মনোকষ্ট পেয়েছিলো। সবচেয়ে খারাপ ঘটনা ঘটলো পরেরদিন ইংরেজী ক্লাশে, ক্লাশে প্রবেশ করেই আমাদের প্রধান শিক্ষক এটা নিয়ে অনেক্ষণ হাসাহাসি করলেন, একটু পর, হারাধনকে বেতের একাট ঘা দেন; পুরো ক্লাশ স্তব্ধ! হারাধন আমার পাশে বসেছিলো, আমার চোখে পানি এসে গেলো!
মেয়েদের মাঝ থেকে বীণা মজুমদার উঠে বললো, "স্যার আপনি এটা ঠিক করেননি"। স্যার রেগে গিয়ে বীনাকে দাঁড় করায়ে রাখলো। পুরো ক্লাশ নিস্তব্ধ, স্যার বেরিয়ে গেলেন; সবাই চুপচাপ, বীণা এসে হারাধনের গায়ে হাত বুলায়ে দিলো। কিছুক্ষণ পরে, আমাদের বাংলার স্যার এসে বাংলা পড়ানো শুরু করলেন।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মার্চ, ২০১৯ রাত ৮:৩৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।





