somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জ্বীনের বাদশাহ

০৯ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমি তখন ষষ্ট শ্রেণীতে; ধান কাটা হয়ে গেছে; ছুটির দিন, পড়ন্ত বেলা, আমি উঠানে বসে পিঠা খাচ্ছিলাম; বাড়ীর আংগিনা থেকে সুন্দর গলায় গজল ভেসে আসছে; মাদ্রাসার লোকজন চাঁদা নেয়ার জন্য এসেছেন। আমি একটি টুকরীতে ধান নিয়ে কাছারীর সামনে এলাম; গজল গাচ্ছে মাদ্রাসার এক ছাত্র, আমার বয়সী হবে, অনেক লম্বা, দরিদ্র কাপড়চোপড়; আমাকে দেখে সে থামলো। অদুরে তার কয়েকজন সাথী ধানের টুকরীসহ বসে আছে।

-তোমার গলা অনেক ভালো, গানটান গাও? আমি প্রশ্ন করলাম।
-না, গান গাওয়া নিষিদ্ধ! গজল ভালো লেগেছে তোমার?
-মাদ্রাসা ছেড়ে স্কুলে চলে আস, তখন গান গাইতে পারবে।
-আমার বাবা নেই; স্কুলের বেতন দেয়ার ক্ষমতা নেই।

আমাদের বাড়ী থেকে ৪ মাইল দক্ষিণে এদের মাদ্রাসা। আমি ক্লাশ সেভেন, এইটে পড়ার সময় ছেলেটার সাথে বাজারে টাজারে দেখা হয়েছে অনেকবার; মাদ্রাসা শেষ করা হয়নি, পেটের দায়ে কৃষি মুজুর হয়ে গেছে। পরের বছরগুলোতে তাকে আর দেখিনি, তার কথা ভুলে গেছি।

তখন চাকুরী করি; একদিন খুব ভোরে কাছারীর সামনে দাঁড়িয়ে আছি, দেখি সামনের রাস্তা দিয়ে অনেক লম্বা একজন যুবক বেশ গতিতে হেঁটে যাচ্ছে, গায়ে শুভ্র সাদা আলখাল্লা ও সাদা লুংগি, হাতে অস্বাভাবিক লম্বা লাঠি। আমি তাকিয়ে আছি, সে কোনদিকে না তাকিয়ে উত্তর দিকে চলে গেলো। নাস্তার সময় ছোটভাই থেকে জানলাম, ইনি 'জ্বীনের বাদশাহ' নামে পরিচিত, ছোটভাই আসল নামও জানে না; আমাদের বাড়ী থেকে ৫/৬ মাইল দক্ষিণে বাড়ী, ছোটকালে খুবই দরিদ্র ছিলো, ১৫/১৬ বছর বয়সে কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলো, জ্বীনেরা নিয়ে গিয়েছিলো; ১১/১২ বছর পর ফিরে এসেছে; অনেক টাকার মালিক; বাড়ীর সামনে মসজিদ করেছে, বৃহশ্পতিবার রাতে উনার মসজিদে উনার কিছু অনুসারী একত্রিত হয়, জিকির ইত্যাদি করে, খাওয়া দাওয়া হয়, দোয়া খায়ের হয়; জ্বীন নাকি টাকা পয়সা দিয়ে যায়।

পুরো সপ্তাহ গ্রামের পর গ্রাম হেঁটে বেড়ায়; কারো সাথে কথা বলে না, মানুষের সাথে বসেও না, একাকী চলে। উত্তর দিকে যায় এক লোকের কবর জেয়ারত করতে, সেটা ৬/৭ মাইল হবে। ঘন্টা দু'য়েক পরে এই রাস্তা হয়ে ফিরে যাবে। আমি নাস্তা করে, আনুমানিক দেড় ঘন্টা পর সামনের রাস্তা ধরে ধীর গতিতে হেঁটে তার জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম। ঠিকই দুই ঘন্টা পর, সে উত্তর দিক থেকে আসছে হন হন করে। আমার পাশ দিয়ে যাচ্ছে, দৃষ্টি সামনে, আমার চোখের দিকে তাকায়নি। আমি চিনলাম, অনেক বছর আগের দেখা মাদ্রাসার সেই ছেলেটি। আমি বললাম,
-হ্যালো!
সে দাঁড়িয়ে সালাম দিলো।
আমি নিজের নাম বলে হাড় বাড়িয়ে হ্যান্ডসেক করলাম।
সে হেসে বললো,
-আমি তোমাকে চিনতে পেরেছি। তুমি আমাকে স্কুলে পড়তে বলেছিলে; আমি স্কুলে যেতে পারিনি, মাদ্রাসাও শেষ করতে পারিনি। তুমি কি কর?
-চাকুরী।

অনেকক্ষণ কথা হলো। তার লাঠিটি দেখার মতো, ৬/৭ সের ওজন হবে, মসৃন। আমি বললাম,
-এট বড় লাঠি কেন?
- এতে আমার ব্যায়াম হয়।

তার বাড়ীতে যাবার জন্য অনুরোধ করলো। তার নাম জানলাম।
-তোমাকে জ্বীনের বাদশাহ নামে জানে লোকজন।
-লোকজনের কথা বলিও না, আমাদের লোকজন যা মুখে আসে তাই বলে, ওরা ভেবেচিন্তে কিছু বলে না। আমার সামান্য আয় আছে, আমার আয় নিয়ে আমি কিছু বলি না, ওরা মনে করে যে, জ্বীনেরা আমাকে টাকা দেয়; তুমি নিশ্চয় আমাদের অশিক্ষিত মানুষদের বেকুবী বুঝ।

সে খুব করে বললো, আমি যেন তার বাড়ী যাই, গেলে খুবই খুশী হবে। সে বিদায় নিয়ে চলে গেলো। আমি বাড়ী ফিরে এলাম, বাড়ীর অনেকই কাছারীর সামনে দাঁড়িয়ে দেখছিলো যে, আমি ওর সাথে কথা বলছি। ছোটভাই বললো,
-এই লোক তো রাস্তায় কারো সাথে কথা বলে না, আপনার সাথে কি নিয়ে আলাপ করলো?
-সাধারণ আলাপ, আমি স্কুলে থাকতে ওর সাথে আমার পরিচয় ছিলো।
-তার টাকা পয়সা নিয়ে আলাপ করেছে?
-সে নিজের থেকে আলাপ করেছে, তার সামান্য আয়ের পথ আছে, সে বললো!
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই ফেব্রুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:২৩
৩৫টি মন্তব্য ৩৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

শেখ হাসিনা আসবে, বাংলাদেশ হাসবে

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৩



মেট্রোরেল পুরো বাংলাদেশের জন্য শান্তির বিষয়।
শুধু মেট্রোরেল না পদ্মাসেতুও। দারুণ এক কাজ হয়েছে। আগে মতিঝিল থেকে মিরপুর বা উত্তরা যেতে খবর হয়ে যেতো। তিন ঘন্টার বেশি সময় লাগতো। এখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারণে অকারণে ছবি

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ২৮ শে জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫৬

আমি ছবি তুলি। পরে সেগুলো দেখি। বেশ ভালো লাগে। ফোনের স্টোরেজ এ আজ দেখলাম মোট ছবি ৬৮৯৩ টি। ব্লগে কখনোই ছবি দিয়ে লেখা হয়নি। আজ মাইদুল ভাইয়ের লেখা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কারখানা তো রাজনীতি করে না !

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ২:৪১


৫ই আগস্ট ২০২৪ তারিখটা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অনেকদিন মনে থাকবে। কিন্তু ইতিহাসের বড় বাঁকগুলোর মতো এই পরিবর্তনেরও একটা দাম ছিল, যেটার হিসাব আমরা এখনও পুরোপুরি মেলাতে পারিনি। ক্ষমতার পতনের... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট গল্পঃ বাবার প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন সামিয়া, ২৯ শে জুন, ২০২৬ রাত ৩:০৩



একটা মাস হয়ে গেল।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিসিইউর সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে সময়ের হিসাব হারিয়ে ফেলেছে রিপা। দেয়ালে ঝোলানো ঘড়ির কাঁটা ঘুরছে, নার্সরা ডিউটি বদলাচ্ছে, ডাক্তাররা আসছেন, যাচ্ছেন। শুধু একটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আনন্দ ও শোকে কবিতা সংকলন - অক্টোবর ২০২৫

লিখেছেন বিজন রয়, ২৯ শে জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:২৫



আনন্দ বিশ্বকাপ ফুটবল!
শোক ভেনেজুয়েলা ভূমিকম্প!!


এই আনন্দ ও শোকে কবিতা সংকলন পোস্ট অক্টোবর ২০২৫! অনেক দেরি হয়ে গেল! হ্যাঁ অক্টোবর ২০২৫ এর সব কবিতা সংরক্ষিত ছিল, কিন্ত সময়ের অভাবে সময়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×