
২০১৭ সাল, ট্টাম্প ক্ষমতায় আসার কিছুদিন পর থেকে আমি বেশ লম্বা সময় চোখের সমস্যায় ভুগেছি; সেই শীতে আমি বারবার জ্বরেও ভুগছিলাম; সেই সময়ের একদিনের একটি ছোট ঘটনা:
কয়েকদিন জ্বর, ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো না; যখন ৫ দিনেও জ্বর থামলো না, ভয় পেলাম, ডাক্তারের কাছে যেতেই হবে। সাদা আমেরিকান, বা ইহুদী ডাক্তারদের এপয়েন্টমেন্ট সাথে সাথে পাওয়া যায় না, বাংগালী বা ভারতীয় ডাক্তারের কাছে যাওয়ার ইচ্ছে নেই; এক ফিলিপাইনের ডাক্তারের এপয়েমেন্ট পেলাম, কাছেই মাইল দু'য়েক হবে। জ্বরে শরীর কিছুটা দুর্বল, ভাবলাম হেঁটেই যাই, হাঁটা হবে, লোকজনের সাথে দেখাও হবে। স্পেনিশ এলাকা হয়ে হাঁটছি, মাইলখানেকের মাঝে মানুষতো দুরের কথা কুত্তার দেখাও পেলাম না; ট্রাম্পের ভয়ে মনে হয়, কেহ রাস্তায় বের হয় না। একটু ক্লান্তিও লাগছিল, বাস নিলে ভালো হবে; কোন রাস্তা দিয়ে বাস যায় কে জানে! এক স্পেনিশ মেয়ে হনহন করে আমার পাশ দিয়ে একই দিকে হেঁটে যাচ্ছে, বললাম,
-হ্যালো, কেমন আছ! এখানে কোন রাস্তা দিয়ে বাস চলাচল করে?
-ভালো আছি, আমি ইংরেজী জানি না।
- তুমি তো ইংরেজী উত্তর দিচ্ছ, আশেপাশে বাস আছে নাকি?
-ইংরেজী জানি না বললাম না! তুমি কি ইংরেজী কম বুঝ? এই বলে সে দ্রুত চলে যাচ্ছিল। আমি বললাম,
-তুমি এভাবে পালিয়ে যাচ্ছ কেন, মানুষ টানুষ খুন করেছ নাকি, নাকি কিছু চুরি টুরি করেছ?
-তুমি কি এই সকালবেলায় সমস্যায় জড়াতে চাচ্ছ? মেয়ে মোটামুটি ক্ষেপেছে, এবং তার চোয়ালের হাড্ডি মাড্ডি শক্ত হয়ে উঠেছে।
-সামনে পুলিশের গাড়ী আছে, ওগুলো ট্রাম্প সাপোর্টার, ওরা হিসপানিকদের ভালোবাসে না, হুশিয়ারে যাইও।
-চিন্তিত হয়ো না, আমার স্বামী পুলিশে চাকুরী করে; বরং তোমার একটু হুশিয়ার হওয়ার দরকার আছে!
-স্বামী পুলিশে? কত নম্বর স্বামী, নম্বরটা মনে আছে তো?
সে রাস্তা ক্রস করে অন্য পাশে চলে গেলো।
ডাক্তার মনোযোগ দিয়ে দেখলো, শেষে একটু চিন্তিত হয়ে গেলো; ডাক্তারকে চিন্তিত দেখলে ভালো না লাগার কারণ আছে। ডাক্তার বললো নীচে গিয়ে রক্ত দিতে; আমি বললাম,
-তাড়াহুড়ো কেন?
-মনে হচ্ছে, একটা সমস্যা আছে; আজকেই রিপোর্টটা পেলে ভালো হবে।
-মরে টরে যাচ্ছি নাতো?
-হয়তো আজকে মরতেছ না, তবে টেস্টটা জরুরী।
মনটা খারাপ হয়ে গেলো। রক্ত দিলাম। হাঁটার ইচ্ছে ছিলো না আর; ল্যাবের লোকটার থেকে জেনে নিলাম, সামান্য কয়েক ব্লকের পর ট্রেন আছে। ৩/৪ ব্লক ব্লক হাঁটলাম, ট্রেনের নাম গন্ধও নেই; আরেকজনকে প্রশ্ন করে জানলাম আরও ৩ ব্লক সামনে; মন খাট্টা হয়ে গেলো। রাস্তাঘাট ফাঁকা; এক দোকানের সামনে এক সাদা মেয়ে সেলফোন টিপছিলো; কোন হ্যালো মেলো ব্যতিতই তাকে প্রশ্ন করলাম,
-ট্রেন কোথায়?
মেয়েটা এদিক ওদিক তাকিয়ে দিলো দৌড়; দৌড়ে রাস্তার কোণায় গিয়ে পেছনে ফিরে আমাকে দেখলো। পাশে একটা সাদা ছেলে ছিলো, সেও হতবাক। সে আমার দিকে তাকিয়ে বললো,
-তোমার হাত কোথায়?
আমার ডান হাতটা বুক বরাবর ওভারকোটের ভেতরে ঢুকানো ছিল; জ্বরে ঠান্ডা লাগছিলো, একটা বোতাম খুলে হাতটাকে কোটের ভেতর রেখে একটু গরম করছিলাম। ছেলেটা বললো,
-মেয়েটা মনে করেছে, তোমার হাতে অস্ত্র থাকতে পারে। ছেলেটির অনুমান সঠিক, মনে হলো।
ছেলেটি ট্রেন দেখায়ে দিলো; আমি ১ ব্লক বেশী এসে গেছি, পেছনে যেতে হবে।
ট্রেন ফাঁকা, সকালে কাজের লোকেরা কাজে চলে গেছে, এখন বেকার ফেকাররা ঘুরতে বের হচ্ছে। পুরো ট্রেনে ক্যানের পঁচা টুনা মাছের গন্ধ; আমি জোরে চিৎকার করে বললাম,
-বিড়ালের খাদ্য কে খাচ্ছে?
একটা সাদা মেয়ে মনে হলো বেশ মজা পেয়েছে, সে আংগুল দিয়ে ট্রেনের বগির অন্য প্রান্তের দিকে দেখালো। অবশ্যই, এক চীনা মিয়া সস্তা টুনাকে ২ রুটির মাঝখানে রেখে, তথাকথিত স্যান্ডউইচ খাচ্ছে, পুরো ট্রেনে গন্ধ। চীনা মিয়াকে লক্ষ্য করে বললাম,
-কি ব্যাপার, টুনা কেমন লাগছে?
সে খুশী, মাথা নেড়ে আবার এক কামড় নিলো। এক আফ্রিকান আমেরিকান মেয়ে আমার এই হাবভাব পছন্দ করেনি; সে শক্ত গলায় বললো,
-মিস্টার, ট্রেনটা কি তুমি কিনেছ? ভালো না লাগলে নেমে যাও!
বুঝলাম, বেশী করা হয়ে গেছে, আজকের জন্য যথেষ্ট; সামনের স্টেশনে নেমে অন্য কামরায় চলে গেলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুলাই, ২০২১ রাত ৯:৪২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




