বঙ্গবন্ধু যদি বলতেন - চোখ বন্ধ কর
পুরো বাংলাদেশ (তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান) ব্ল্যাকআউট।
বঙ্গবন্ধু যদি বলতেন - জেগে ওঠো
পুরো বাংলাদেশ শত হিল্লোলে জেগে উঠতো।
কেমন ছিল সেই বদ্বীপঅঞ্চলের সাধারন মানুষের রূপ রঙ আর ভাবনা?
আর এই বদ্বীপ অঞ্চলে সেই হ্যামিলনের বংশীবাদক কেনই বা শেখ মুজিবর রহমান?
বাংলাদেশের অভূ্যদয় এবং এর তৎপরবতর্ী কালের আর্থ সামাজিক রাজনৈতিক পটভূমি আর শেখ মুজিবর রহমান এতটাই অচ্ছেদ্য যে সে সময় কে বুঝতে তার গতিপ্রকৃতিকে শেখ মুজিবর রহমানের চরিত্রের বিশ্লেষনটিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রসঙ্গটিকে বিভিন্নভাবে দেখবার আগে আমাদের ফিরে যেতে হবে আরেকটু পেছনে -
1940-41 এর দিকে (স্মৃতি থেকে লেখায় সালের 2-1 বছর গরমিল হতে পারে, কিছু তথ্যের একটু অদল বদলও হতে পারে কিন্তু মূল প্রবাহের বাইরে আশা করি যাবে না) প্রাদেশিক নির্বাচনে জমি নির্ভর বাঙ্গালী কৃষক সমাজ -জমিদারদের (জমিদারদের মধ্যে হিন্দুদের সংখ্যা বেশি ছিল) উৎপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এ অঞ্চলের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ
শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের কৃষক প্রজা পার্টির প্রতি সমর্থন দেয়। নির্বাচনে মুসলীম লীগ তৃতীয় স্থান পায়। কিন্তু একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হককে কংগ্রেস অথবা মুসলীম লীগের সমর্থনের প্রয়োজন হয়। কিন অসামপ্রদায়িক শেরে বাংলার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও কংগ্রেসী সংকীর্ণতায় আচ্ছন্নতার কারনে শরৎ বসু কৃষকপ্রজা পার্টিকে সমর্থন না দিলে মুসলিম লীগকে সাথে নিয়ে হক সোহরোয়ার্দি মন্ত্রিসভা গঠন করেন। এই ঘটনার মধ্য দিয়েই মুসলিম লীগ এই প্রথমবারের মতো পূর্ববঙ্গে রাজনৈতিক শেকড় স্থাপন করতে সমর্থ হয়েছিল।
এর মধ্যেই 1911'র বঙ্গভঙ্গ ঘোষনা এদেশের শিক্ষিত মুসলমানদের আলাদা জাতিসত্তা চিন্তনে সলতে দিয়েছিল আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালকে কেন্দ্র করে আধূনিক নতুন বাঙ্গালী মধ্যবিত্তের চেতনা নির্মানের প্রথম নিউক্লিয়াস তৈরীর কাজ অনেকদুর এগিয়ে গেছে।
1947 এ পরাধীন ভারতবর্ষ সামপ্রায়িক দাঙ্গার দুঃসহ অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে স্বাধীন পাকিস্তান ও স্বাধীন ভারত নামে দুটি দেশ হয়ে জন্ম লাভ করলো।
সোরওয়ার্দি আর শেরে বাংলার রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা এবং জীবনযাপনের ব্যবধান অনেকটা শেকড়ের ভিন্নতার মতো। শেরে বাংলার আপাদমস্তক বাংগালী প্রগতিশীল চিন্তার বিপরীতে সোরওয়ার্দির মধ্যে ছিল খানিকটা বনেদীপনা আর মুসলিম ঘেষা দর্শনচিন্তার প্রভাব। পাকিস্তানী ঢামাডোলে আর সাস্থ্যগত কারনে শেরে বাংলা ধীরে ধীরে প্রভাবশূন্য হয়ে পড়েন।
শেখ মুজিবর রহমান ছিলেন রাজনৈতিকভাবে সোরওয়ার্দির অনুসারী। চিন্তা এবং সংস্কৃতিতে মুসলিম জাতিসত্তার উপাদানের উপস্থিতি স্বাধীন বাংলাদেশেও অনেক সিদ্ধান্ত নিতে প্রভাবিত করেছে। ও আই সি তে বাংলাদেশের যোগদানের সিদ্ধান্ত তারএই চিন্তার খানিকটা উপস্থিতি আছে বলে মনে হয়। যদিও এর বিনিময়ে পাকিস্তানের বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের একটি কূটনৈতিক কৌশলের কথা প্রচলিত আছে।
কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পাকিস্কান ওই সময়ে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় নি।
পশ্চিম পাকিস্তানীদের ধর্মের নামে এ অঞ্চলকে ঔপনিবেশ কায়দায় শোষনের ফলে এদেশে যে ধমর্ীয় এবং তুলনামূলক অগ্রসর সমাজতাত্তিক চিন্তার স্ফূরন লক্ষ্য করা যাচ্ছিল তা মূলত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে উঠছিল।
মুসলিম লীগের বাঙালী অংশের শেকড় ধরে বেড়ে ওঠা শেখ মুজিবর রহমান এর চিন্তা চেতনায় বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রীক নতুন চিন্তার গতিপ্রকৃতির সাথে অতটা সম্পৃক্ত ছিলেন না। জাতীয় নেতাদের সাথে রাজনীতির পাশাপাশি শেখ মুজিবর রহমান চতুর্থশ্রেনীর কর্মচারীদের দাবীদাওয়া নিয়ে এক আন্দোলনে সম্পৃক্তার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিস্কৃত হন।
কিন্তু তখনকার বাস্তবতা অনুধাবনে অন্যান্য জাতীয় নেতাদের তুলনায় শেখ মুজিবর রহমান ছাত্রদের অধিকতর কাছাকাছি ছিলেন বলে ইতিহাসের আগামী প্রবাহকে ধরতে পেরেছিলেন সহজে। যদিও মওলানা ভাষানীর সাথে নতুন গড়ে ওঠা চিন্তার মিলটা অধিক ছিল কিন্তু ভাষানী নতুন শক্তিশালী আধা সামন্তীয় জোতদার ও স্বচ্ছল কৃষকের চাইতে নিগৃহীত মানুষের কাছাকাছি ছিলেন। বরঞ্চ তাকে ধনী কৃষক আর জোতদারদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলতে গিয়ে বার বার এক স্থান থেকে পালিয়ে আরেক অঞ্চলে ছুটে যেতে হয়েছে। এদিক থেকে শেখ মুজিব সহজেই ঐ সময়ের নিরিখে ঐ শক্তিশালী আধা সামন্ত কৃষককুলের নয়নের মনি হয়ে দাড়ান।্ আমাদের এই সময়ে যেমন রাজনৈতিক ইতিহাসে জনসাধারন/ সাধারন মানুষ বলতে শহুরে মধ্যবিত্ত শ্রেনী বোঝায় ঐ সময়ে (1950-71) জনসাধারন
কিংবা সাধারন মানুষেরা কেমন ছিলেন ....
সাধারনভাবে মুসলমান, সামপ্রদায়িক দাঙ্গার স্মৃতিতে কিছুটা সামপ্রদায়িক, যদিও পাঞ্জাবী আগ্রাসনে সেটা ক্রমশ ক্ষয়ে আসছে,
হিন্দু জমিদারদের অবর্তমানে মুসলমান জোতদারর, ধনী ও স্বচ্ছল কৃষকরা তখনই ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছেন -
উদ্বৃত্ত ফষলের ভাগিদার এই শ্রেনীর একটি অংশ নতুন পেশায় ( ছোটখাটো চাকরী ও অন্যান্য শহুরে পেশা) অংশগ্রহনের সূযোগ নিতে গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড় জমিয়েছে।
এই শ্রেনীর বাইরে একবারে শ্রমিক ভূমিমজুর শ্রেনী আলাদাভাবে ভূমিকা রাখার কোনো জায়গায় ছিলো না। এরা জনসাধারনের বাইরে প্রান্তিক অবস্থার ভেতরে ছিল যাদের অবস্থানও নির্ভর করে মধ্য এবং বড় চাষীদের সাথে সরাসরিভাবে নির্ভরশীলতার সম্পর্কের উপর। ফলে এদের কোন জনবল এর একটা হিসেব ছাড়া মতামত গঠনে কোন ভূমিকা ছিলো না।
এই মধ্য ও ধনী কষকেরা চিন্তা চেতনায় আধা সামন্ত, গোড়া, স্বাপি্নক, খানিকটা দাম্ভিক, আপোষকামী, ভাবপ্রধান, এবং একগুয়ে এবং কিছুটা সামপ্রদায়িক।
শেখ মুজিবর রহমানের চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীদের আন্দোলনে সম্পৃক্ততার ক্ষেত্রে শ্রমিক কর্মচারীদের আন্দোলনে চেতনাগত আদর্শিক অংশগ্রহনের চেয়ে স্বশ্রেনীর সাথে একাত্বতা বেশী কাজ করেছিল।
অন্যদিকে জনআবেগবিচ্ছিন্ন চিন্তাশীল নেতৃবর্গ একধরনের রাজনৈতিক গতিধারার ইঙ্গিত নিধর্ারন করা ছাড়া জনসাধারনের সামনে আসতে পারেন নি।
আমাদের এই অঞ্চলভূমির সমস্ত ভালো এবং মন্দগুন ধারন করে তিনি ক্রমশ হয়ে উঠছিলেন জনগনের নেতা ....
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।







