পরদিন খুব ভোরে ঘুম থেকে উঠতে হল। আগে থেকেই দুইটা গাড়ি ঠিক করা ছিল, এয়ারপোর্টে যাবার জন্যে। গাড়িতে উঠার পর আবারও এক অদ্ভুত বিষন্নতা ভর করল। চারদিকে বৃষ্টিভেজা রাস্তা, হলুদ রঙের রাস্তার আলো, ‘আর কখনো ভোর হবে না’ এরকম একটা শেষরাত। এয়ারপোর্টে ঢোকার পর আমরা চেক ইন করলাম। স্পাইস জেটে, গন্তব্য: মুম্বাই। ঐখানে দেখা গেল টিকিটে আমার নাম এসেছে “___ রারিহা”। এটা নিয়ে আমাকে কিছুক্ষণ পঁচানো হল। শিপলুর হুইলচেয়ার লাগেজ হিসাবে দেয়ার পর ওকে একটা লাল রং এর হুইলচেয়ার দেয়া হল, যেটা সে দুই চোখে দেখতে পারছিল না। তারপর আমরা অবশেষে প্লেনে উঠলাম। প্লেনে এক নতুন অভিজ্ঞতা। আমি তো আছি শুধু খাওয়ার তালে। আশিস ভাই একবার বললেই হল যে, “কী খাবা?”। প্লেনে এয়ার হোস্টেস বলছিল প্লেন পানিতে পড়লে কিভাবে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করতে হবে। এটা শুনে আমার মাথায় প্রথম যে প্রশ্নটা আসল, সেটাই জামিকে করে ফেললাম: “পানিতে পড়লে কী হবে তা তো বুঝলাম, পানিতে না পড়লে?”। পরমুহুর্তেই বুঝলাম প্রশ্ন অবান্তর! প্লেন অবশেষে পানিতে ( এবং স্থলে! ) না পড়েই মুম্বাই এয়ারপোর্টে নামল। প্লেন থেকে যতটুকু দেখেছি, মুম্বাইকে অনেক সুন্দর একটা শহর বলে মনে হয়েছে। উঁচু উঁচু বিল্ডিং, পাশে সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে। মুম্বাই এয়ারপোর্টটা আমার কাছে খুব ভাল লেগেছিল। ওখানে চিকেন জংলি বার্গার
খেলাম। একটা সিডিও কিনে ফেললাম প্রেম জশুয়ার ফিউশান মিউজিকের।
এরপর গন্তব্য কচি। কচিতে যখন নামলাম তখন সন্ধ্যা হয় হয় করছে। কচিতে এসে মনে হল আসলেই অনেক দূরে কোথাও এসে পড়লাম। কচি এয়ারপোর্টটা অনেক সুন্দর। এদিকে আমরা লাগেজ নিয়ে কিছুটা চিন্তিত। তবে সব লাগেজ ঠিক মত আসল। বাকি জার্নিটুকু আর আমাদের দায়িত্ব ছিল না। অমৃতাপুরি বিশ্ববিদ্যালয় ( ওখানে বলে বিশ্ববিদ্যাপীঠম ) থেকে রঞ্জিত নামের একটা ছেলে আমাদেরকে নিতে আসল। কচি এয়ারপোর্টে খেলাম “পাত্রী” নামে একটা নতুন খাবার। আমাদের মাইক্রোবাস ছাড়ল অমৃতাপুরির উদ্দেশ্যে। পথে অদ্ভুত সব মালয়ালাম গান
বাজছিল। কোন এক অজ্ঞাত কারণে এই অদ্ভুত ভাষার গানগুলো আমাদের ৪ জনেরই ভাল লেগে গেল। রোবট ম্যুভির “আরিমা আরিমা” বাজছিল। পুরো সময়ই অদ্ভূত কোন কারণে আমাদের মাইক্রোবাসের ড্রাইভার এক এর পর এক ফোন কল করতে আর ধরতে লাগল। রাস্তা ছিল বাড়াবাড়ি রকমের সোজা এবং সমতল। প্রায় রাত এগারোটার দিকে আমরা অবশেষে অমৃতাপুরিতে পৌঁছালাম। খুব ওয়েলকামিং ছিল ওখানকার সবাই।
আমার থাকার জায়গা হল একটা আশ্রমে। আমাকে একটা অনেক উঁচু ব্রিজ পার হতে হল। হঠাৎ করে বাকিদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম, অচেনা কিছু মেয়ের সাথে আশ্রমে যাচ্ছিলাম। একটু অদ্ভুত লাগছিল। কিন্তু খারাপ লাগছিল না। ওখানকার দুইজন ফ্যাকাল্টিও ছিলেন ( যাদেরকে আমি অনেকক্ষণ স্টুডেন্ট ভেবেছিলাম! )। আমাকে একটা রুম দেয়া হল। হঠাৎ করে খুব মজা লাগতে থাকল রুমে। অসম্ভব ক্লান্ত ছিলাম। একদম অচেনা অজানা একটা পরিবেশ যেখানে কাউকে চিনি না। খুব একা লাগছিল, আবার অন্যরকম একধরনের স্বাধীনতা বোধ হচ্ছিল। দোতলা দুইটা বিছানা ছিল, আমি 4C1 করে একটা একতলার খাট পছন্দ করে ঘুমিয়ে গেলাম। আমাদের কারো কাছে কোন যোগাযোগ করার মতো সিম ছিল না ( কারন ইউনিনর এর কেরামতি কেরালাতে এসেই শেষ হয়ে গেল! ), তাই সকালে আমাকে ব্রিজ এর পাশে থাকতে বলা হয়েছিল। সকালে উঠে দেখলাম অপূর্ব এক দৃশ্য। আমার রুম এর এক দিকে নদী, তার উপর ব্রিজ। অদ্ভুত সুন্দর বাতাস আসছিল। মনে হচ্ছিল এরকম সুন্দর একটা জায়গায় থেকে পড়াশোনা করতে পারলে আমি না জানি কত ভাল ভাবে পড়তাম। শুভ্র সুন্দর একটা সকালে ফুরফুরে একটা মন নিয়ে আমি বের হলাম আশ্রম থেকে। যদিও কয়েকবার রাস্তা হারিয়ে ফেলছিলাম, তাও অবশেষে পৌছালাম ব্রিজ এর অপর প্রান্তে। ওখানে কিছুক্ষণ একটা বেঞ্চের উপরে
বসে ছিলাম। ওখানকার পরিবেশ বাংলাদেশ থেকে পুরাই আলাদা। সব মেয়েরা সাইকেল চালিয়ে স্কুল/কলেজে যাচ্ছিল। দেখে খুব ভাল লাগছিল। আমি সব থেকে অবাক হলাম মহিলাদের খুব স্বাভাবিক ভাবে বাইক চালাতে দেখে। যেটা বাংলাদেশে একটা ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। সবাইকে খুব আন্তরিক আর উৎসাহী মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল খুব ফুর্তি করে সবাই স্কুল/কলেজ/অফিসে যাচ্ছিল।
আমরা ওখানকার একটা ক্যান্টিনে ব্রেকফাস্ট করলাম। আবারও অবাক হবার পালা, ওখানে সবাইকে নিজের প্লেট নিজেকেই ধুতে হবে। আমিও বাধ্য মেয়ের মতো নিজের প্লেট গ্লাস ধুয়ে ফেললাম। এরপর গেলাম রেজিস্ট্রেশন করতে। রেজিস্ট্রেশনের পর ওখানকার ল্যাবে বসলাম, অনেকদিন পর হাই স্পিড ইন্টারনেট পেয়ে আমার খুশির অন্ত ছিল না। অমৃতাপুরি বিশ্ববিদ্যালয়টা নতুন। এখনো অনেক বিল্ডিং আন্ডার কনস্ট্রাকশন। কিন্তু ওদের সুযোগ সুবিধা পর্যাপ্ত ছিল। সব থেকে মুগ্ধ করছিল ওদের সবার আন্তরিকতা। দর্শনা, আচু ( যার আসল নাম আমার আর এখন মনে নাই ) এবং আরো কিছু মেয়ে এত আন্তরিক ভাবে কথা বলছিল যেন আমি একদম মিশে যেতে পারি ওখানকার সবার সাথে, সবকিছুর সাথে। দুপুর থেকে শুরু হল ওদের ওখানে খাওয়া। সব ভেজ ( ভেজিটেরিয়ান )। কিন্তু শুধু ভেজিটেবল দিয়ে যে এত রকম খাবার হতে পারে ওখানে না দেখে আমি বিশ্বাস করতাম না। ব্যুফে ছিল, কাজেই ইচ্ছা মতো খাও! এখানে আবারও ওদের ম্যানেজমেন্ট আমাকে মুগ্ধ করল। এত মানুষ এক সাথে কাজ করছে, কোথাও কোন হৈ চৈ নাই, ঝামেলা নাই। সবাই জানে তাকে কখন কী করতে হবে। বিকেলে আবার আশ্রমে ফিরে এলাম। যতদূর আমার মনে পড়ে, আশ্রমটা ছিল ১২ তলা। আমার মনে হল, এত সুন্দর একটা নদী পাশে, একটু উপরে যেয়ে দেখে আসি কেমন দেখায়। ৬ তলার উপরে উঠার পরে আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম! আগে যে নদী দেখে আমি এত মুগ্ধ হচ্ছিলাম, সেটাকে কিছুই মনে হল না। কারণ অন্য দিকে যতদূর চোখ যায় সুবিশাল সমুদ্র! মেঘের ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো পড়ছিল সমুদ্রের কিছু অংশে, কিছু অংশে ছায়া। আমি অভিভূত হয়ে গেলাম। এটা ভেবে হিংসাও হতে থাকল যে এই রুমে যে মেয়েটা থাকে, তার কাছে একদিকে নদী আর অন্য দিকে সমুদ্র হল বিছানার মাথার কাছের জানালার একটা নিত্যদিনের দৃশ্য ( যেখানে আমি পাশের বাসার বারান্দাটা দেখতে পাই আমার জানালা দিয়ে )। অমৃতাপুরির আশ্রম, বিশ্ববিদ্যালয় সব কিছু “মাতা অমৃতা” ( আম্মা ) নামে একজন মানবসেবীর অবদান। বহু দেশী বিদেশী মানুষ এই আশ্রমে থাকে। তবে আমার আশ্রমে ছাত্রী এবং বৃদ্ধ বৃদ্ধারা থাকতেন। এরকম একটা জায়গায় কিছুদিন থাকতে পারব ভেবে মনটা ভাল হয়ে গেল। পরদিন মক কনটেস্ট আর তার পরদিন যে কনটেস্ট এটা মাথাতেই থাকছিল না। বিকেলে এসে দেখলাম আমার দুই জন রুমমেট এসে গেছে, একজনের নাম ছিল আলেক্যা। ওরা গুজরাটের কোন একটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এসেছে। ওরাও ভীষণ আন্তরিক ছিল, আমাকে প্রতিদন সকালে ঘুম থেকে তুলে দিত! শুধু একটাই সমস্যা ছিল, ওরা নিজেদের মাঝে কী বলত আমি তার এক বর্ণও বুঝতাম না। কারণ মালায়ালাম ভাষার সাথে হিন্দি এর কোন মিল আছে বলে আমার মনে হয় নি। ওরা খুব অদ্ভুত ভাবে ইংরেজি বলত। সেই ইংরেজিতে আমি অভ্যস্ত হয়ে গেলাম এবং ঐভাবেই কথা বলতে থাকলাম পরবর্তী কয়েকদিন। যার ফলাফল হিসাবে আশিস ভাইয়ের মাঝেও এই রোগ দেখা দিল, আর সে ঘুমের মাঝে “হোমম সুইট্ট হোমম” বলতে থাকল!
এর পরদিন ছিল মক কনটেস্ট। ওখানে সকাল বিকাল দুই বেলা মক হল। একই প্রবলেম এর উপরে। ঐদিন বিকালে আমরা একটা বিচে গেলাম। ছোট্ট সুন্দর একটা বিচ। ব্যাঙ্গালোরের কোচ আর আশিস ভাইয়ের খুব ভাব হয়ে গিয়েছিল। উনি আশিস ভাইকে দেখলেই কথা বলতেন। শেষ পর্যন্ত উনি আমাকে “নাইভ লিটল গার্ল” বলে আখ্যায়িত করেছিলেন! জামি তার বন্ধুদের সাথে ঘুরতে গেল ওই দিন বিকালে, যেটার কারণে আমরা ওকে “বিশ্বাসঘাতক” বলতে থাকলাম। শিপলু যথারীতি পনিরের অভিশাপান্ত করতে থাকল আর আমরা মনের সুখে পনিরের নানা পদের খাবার খেতে থাকলাম ৩ বেলা। ফুদানের কোচের সাথে দেখা হল আমাদের। উনি আমাদেরকে চাবির রিং স্যুভেনির হিসাবে উপহার দিলেন। সব থেকে কঠিন ছিল উনার সাথে কম্যুনিকেট করা। উনার ইংরেজি মোটামুটি দুর্বোধ্য, তারপরও দুই একটা শব্দ বুঝে আমরা কোন ভাবে কাজ চালিয়ে নিচ্ছিলাম। উনার মুখে বাংলাদেশের “মেডামে শেখে হাশিনা” আর “মেডামে ক্যালেদা জিয়া” এর নাম শুনে আমরা খুবই মজা পেলাম।
এর পরদিন ছিল কনটেস্ট। যেটাতে আমরা ৬ষ্ঠ হলাম। ৫ টা প্রবলেম সলভ করে। প্রথম হল ফুদান বিশ্ববিদ্যালয়। একটা মগ আর ৫ টা বেলুন নিয়ে আমরা মন খারাপ করে বের হলাম কনটেস্ট থেকে। ঐদিন রাতে ছিল মুন্নার ট্রিপ। রাত ১০ টায়
আমরা মুন্নারের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। জার্নিটা খুব ক্লান্তিকর ছিল। খুব ভোরবেলায় আমরা মুন্নারে পৌঁছালাম। মুন্নার একটা পাহাড়ের উপরে। প্রচন্ড শীত লাগতে থাকল। একটু পর সূর্য উঠল, শীত আস্তে আস্তে কমতে থাকল। শুরু হল মুন্নার দেখা। অপূর্ব সুন্দর একটা জায়গা ছিল মুন্নার। চারদিকে পাহাড়, মাঝখানে একটা হ্রদ। পাহাড়ের উপরে মেঘ ভেসে বেড়াচ্ছিল। সবকিছু এত বেশী প্রাকৃতিক ছিল যেন কোন মানুষের হাতের ছোঁয়া লাগে নি কখনো। পাহাড়ের উপর মেঘের ছায়া পড়ছিল, দেখে মনে হচ্ছিল মেঘটা অনেক দূরে কিন্তু আসলে পাহাড়টাও অনেক দূরে ছিল। মুন্নারে আমরা কিছু হোম মেইড চকলেট কিনলাম, আরো কিছু টুকিটাকি জিনিস। মুন্নারে কুন্ডলাড্যাম নামে একটা জায়গায় গেলাম। সব শেষে মেঘে ঢাকা একটা পাহাড়ের পাশের পাহাড়ে গেলাম।
সমুদ্রতলের প্রায় ২০০০ মিটার উপরে ছিলাম আমরা। এরপর আমরা আর একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলাম। বিকালের নাস্তার ব্যবস্থা ওখানেই করা হয়েছিল। ওখানে অনুপ নামে একজন কলকাতার ছেলের সাথে পরিচয় হল, ডাইরেক্ট আই তে কাজ করে, যে জামি কে আমাদের কোচ ভেবে “হেলো স্যার” বলে ফেলেছিল!
মুন্নার ট্রিপের পর আমরা ফিরে এলাম অমৃতাপুরি। ঐদিন দুপুরে আমরা কায়ানকুলাম রেইলস্টেশনে পৌঁছালাম। পরের দিন সকালে দিল্লী, এরপর আবার প্লেনে কলকাতা ফেরৎ। স্বপ্নের মতো কেটেছিল ৭ টা দিন। সব থেকে বড় কথা হল ওখানে সবাই এত সুন্দর করে সব কিছু করতো যে যখনই কাউকে কোন সমস্যার কথা বলা হত, একই উত্তর পাওয়া যেত: “It can be arranged!”। ওদের এই আথিতেয়তার কারণেই বার বার আমি যেতে চাইব ওখানে। লেখার শেষে আমি জামি, শিপলু আর আশিস ভাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই সবকিছুর জন্যে। এখন পর্যন্ত আমার জন্যে এই কনটেস্ট ট্যুর টা সব থেকে সুন্দর ট্যুর হয়ে আছে যেখানে ছোট্ট কোন একটা ঘটনাও আমি মনে করতে পারব না যেটা আমার খারাপ লেগেছে!

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



