
দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাঁদের ভূমিকা একদিকে যুগান্তকারী, অন্যদিকে গভীরভাবে বিতর্কিত। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই বিরল ব্যক্তিত্বদের একজন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপ্রক্রিয়ায় তিনি ছিলেন একেবারে কেন্দ্রীয় চরিত্র। অথচ কয়েক বছরের মধ্যেই সেই রাষ্ট্র থেকেই তিনি চরমভাবে প্রত্যাখ্যাত হন। এই বৈপরীত্যই যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে ইতিহাসের এক অনিবার্য, কিন্তু অস্বস্তিকর চরিত্রে পরিণত করেছে।
পরিচয় ও রাজনৈতিক উত্থানঃ
যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের জন্ম ১৯০৪ সালে, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার এক নমঃশূদ্র পরিবারে। ব্রিটিশ ভারতের বর্ণভিত্তিক সমাজব্যবস্থায় নমঃশূদ্র সম্প্রদায় ছিল দীর্ঘদিন ধরে সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে বঞ্চিত। এই বঞ্চনাই মন্ডলের রাজনীতির মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে। তিনি খুব দ্রুত বুঝেছিলেন, কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন জাতীয় আন্দোলন উচ্চবর্ণ হিন্দুদের আধিপত্যে পরিচালিত হচ্ছে এবং দলিতদের বাস্তব মুক্তির প্রশ্ন সেখানে প্রান্তিক। এই উপলব্ধি থেকেই তিনি দলিত রাজনীতিতে সক্রিয় হন এবং ধীরে ধীরে মুসলিম লীগ নেতৃত্বাধীন রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়েন।
মুসলিম লীগের সঙ্গে ঐতিহাসিক জোটঃ
১৯৪০-এর দশকে মুসলিম লীগ যখন পাকিস্তান ধারণাকে রাজনৈতিক দাবিতে পরিণত করে, তখন যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল ছিলেন পূর্ববঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অ-মুসলিম নেতা, যিনি এই দাবিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করেছিলেন। তার যুক্তি ছিল স্পষ্ট ও বাস্তববাদী। হিন্দু সমাজে দলিতরা কখনোই সমান অধিকার পাবে না। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ একটি রাষ্ট্রে তারা অন্তত উচ্চবর্ণ হিন্দুদের নিপীড়ন থেকে মুক্তি পাবে এবং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করবে। এই বিশ্বাস থেকেই তিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে কৌশলগত জোটে যান। মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ তাকে শুধু গ্রহণই করেননি, বরং পাকিস্তান আন্দোলনের একটি “নৈতিক বৈধতা” হিসেবে ব্যবহার করেন। একজন শিডিউল কাস্ট নেতা যখন পাকিস্তানের পক্ষে কথা বলেন, তখন তা মুসলিম লীগের জন্য অত্যন্ত শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র হয়ে ওঠে।
পাকিস্তানের জন্ম ও মন্ডলের ঐতিহাসিক ভূমিকাঃ
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হলে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল হন পাকিস্তানের প্রথম আইনমন্ত্রী এবং শ্রমমন্ত্রী। তিনি ছিলেন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় একমাত্র হিন্দু সদস্য। এই নিয়োগ ছিল প্রতীকী ও কৌশলগত। পাকিস্তান নিজেকে একটি সংখ্যালঘু সহনশীল, ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছিল। যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল সেই প্রচেষ্টার প্রবক্তা । তিনি পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন সংক্রান্ত আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা রাখেন এবং বারবার সংখ্যালঘু অধিকার নিশ্চিত করার কথা বলেন। বিশেষ করে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু ও দলিত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার ছিল তার প্রধান উদ্বেগ।
স্বপ্নভঙ্গ ও নির্মম বাস্তবতাঃ
কিন্তু খুব দ্রুতই মন্ডলের স্বপ্ন ভেঙে যেতে শুরু করে। পাকিস্তান রাষ্ট্র আদতে একটি ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের দিকেই এগোতে থাকে। প্রশাসন, পুলিশ ও রাজনীতিতে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠতার আধিপত্য ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। পূর্ব পাকিস্তানে সংখ্যালঘু হিন্দুদের ওপর দাঙ্গা, জমি দখল, ধর্মীয় নিপীড়ন শুরু হয়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক বিষয় ছিল। এই সহিংসতায় দলিত হিন্দুরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। মন্ত্রী হিসেবে মন্ডল বারবার কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে অভিযোগ জানান। কিন্তু তার কথায় কার্যত কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। তিনি বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর কাছে তিনি এখন কেবল একটি অপ্রয়োজনীয় প্রতীক।
১৯৫০ সালে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল পাকিস্তানের মন্ত্রিসভা থেকে পদত্যাগ করেন এবং ভারতে চলে আসেন। পদত্যাগপত্রের সঙ্গে সংযুক্ত তার দীর্ঘ চিঠিটি আজ ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল। সেই চিঠিতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় লেখেনঃ পাকিস্তান রাষ্ট্র সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ। ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হয়ে ওঠায় নাগরিক সমতা ধ্বংস হয়েছে, দলিত ও হিন্দুদের ওপর নির্যাতন রাষ্ট্রীয় প্রশ্রয়ে চলছে। এই চিঠি কার্যত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদর্শনের বিরুদ্ধে এক কঠোর অভিযুক্তপত্র।
ভারত কর্তৃক প্রত্যাখ্যান ও নিঃসঙ্গ জীবন যাপনঃ
ভারতে ফিরে এসেও যোগেন্দ্রনাথ মন্ডল আশ্রয় পাননি স্বস্তির। কংগ্রেস তাকে কখনোই বিশ্বাস করেনি। পাকিস্তান সৃষ্টিতে তার ভূমিকার কারণে তিনি ভারতীয় রাজনীতিতে প্রায় একঘরে হয়ে পড়েন। তিনি রাজনীতির মূল স্রোত থেকে ছিটকে পড়েন এবং শেষ জীবন কাটান নিঃসঙ্গতা ও হতাশার মধ্যে। ১৯৬৮ সালে তার মৃত্যু হয়, প্রায় বিস্মৃত অবস্থায়।
যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলকে কেউ বলেন হিন্দু বিশ্বাসঘাতক, কেউ বলেন পাকিস্তানের সহ-স্থপতি। কিন্তু এই দুই সরল ট্যাগের কোনোটিই তাকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করে না। তিনি ছিলেন এক নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধি, যিনি উচ্চবর্ণ হিন্দু আধিপত্যের বিরুদ্ধে বিকল্প ক্ষমতার আশ্রয় খুঁজেছিলেন। তিনি ভেবেছিলেন ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্র দলিতদের মুক্তি দিতে পারে। তার জীবন আমাদের শেখায়, সংখ্যালঘু মুক্তির প্রশ্নে কৌশলগত জোট যত শক্তিশালীই হোক, ন্যায় ও কাঠামোগত সমতা ছাড়া তা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।
পাকিস্তানের জন্মে যোগেন্দ্রনাথ মন্ডলের ভূমিকা অস্বীকার করা যায় না। আবার পাকিস্তানের ব্যর্থতার নৈতিক সাক্ষী হিসেবেও তাকে ইতিহাসে স্মরণ করতে হয়। তিনি একই সঙ্গে নির্মাতা এবং ভুক্তভোগী। এই দ্বৈত পরিচয়ই তাকে দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসের এক গভীর ট্র্যাজিক চরিত্রে পরিণত করেছে।
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ বিকাল ৩:৫৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



