somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

নতুন নকিব
নিজেকে লেখক বলে পরিচয় দিতে সংকোচ হয়; লেখালেখি ইবাদতসদৃশ সাধনা বলেই লিখি। নিজেকে জানা, বিশ্বকে অনুধাবন করা এবং সর্বোপরি মহান স্রষ্টার পরিচয় অন্বেষণই আমার নীরব যাত্রার পাথেয়। দূরে সরিয়ে দেওয়া নয়-সৃষ্টিকূলকে ভালোবাসায় আগলে রাখার শিক্ষাই ইসলামের মূল বাণী।

টেস্ট টিউব বেবি (IVF) ও সারোগেসি; ইসলাম কী বলে?

৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:১৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
টেস্ট টিউব বেবি (IVF) ও সারোগেসি; ইসলাম কী বলে?

ছবি সংগৃহীত।

ভূমিকা

সন্তান মানুষের জীবনের অন্যতম গভীর আকাঙ্ক্ষা। পরিবার, উত্তরাধিকার, সামাজিক ধারাবাহিকতা ও মানসিক পূর্ণতার সঙ্গে সন্তান প্রত্যাশা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইসলাম এই মানবিক আকাঙ্ক্ষাকে স্বীকৃতি দিয়েছে, তবে একই সঙ্গে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে সন্তান দেওয়া বা না দেওয়া সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা ও হিকমতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿لِلّٰهِ مُلْكُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۚ يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ ۚ يَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ إِنَاثًا وَيَهَبُ لِمَنْ يَشَاءُ الذُّكُورَ ۝ أَوْ يُزَوِّجُهُمْ ذُكْرَانًا وَإِنَاثًا ۖ وَيَجْعَلُ مَنْ يَشَاءُ عَقِيمًا ۚ إِنَّهُ عَلِيمٌ قَدِيرٌ﴾

অর্থাৎ: আসমানসমূহ ও জমিনের সার্বভৌমত্ব আল্লাহরই। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। যাকে ইচ্ছা কন্যা সন্তান দেন, যাকে ইচ্ছা পুত্র সন্তান দেন, অথবা উভয়ই দেন। আর যাকে ইচ্ছা বন্ধ্যা করে দেন। নিশ্চয়ই তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বক্ষমতাবান। -সূরা আশ-শূরা: ৪৯–৫০
আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অভূতপূর্ব অগ্রগতির ফলে আজ বন্ধ্যাত্ব বা প্রজনন সমস্যার সমাধানেও অগ্রগতি সাধিত হয়েছে। টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি বা ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন (IVF) এবং সারোগেসি এই অগ্রগতির সবচেয়ে আলোচিত দুটি দিক। তবে এই প্রযুক্তিগুলো কেবল চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক নয়; এর সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত রয়েছে নৈতিকতা, আইন, সমাজ, অর্থনীতি এবং ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গি। বিশেষত ইসলামী শরিয়তে বংশ সংরক্ষণ, বৈধতা ও পারিবারিক কাঠামোর প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এই নিবন্ধে টেস্ট টিউব বেবি ও সারোগেসি বিষয় দুটি ধাপে ধাপে বিশদভাবে আলোচনা করা হয়েছে। প্রথমে বৈজ্ঞানিক ও চিকিৎসাবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা, এরপর আন্তর্জাতিক সামাজিক ও আইনি বাস্তবতা, তারপর ইসলামী শরিয়তের মূলনীতি, কুরআনুল কারিম ও সহিহ হাদিসের আলোকে ফিকহি বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হয়েছে।

বন্ধ্যাত্ব: একটি বৈশ্বিক বাস্তবতা

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৫ শতাংশ দম্পতি কোনো না কোনো সময় বন্ধ্যাত্ব সমস্যায় ভোগেন। বন্ধ্যাত্ব কেবল নারীর সমস্যা নয়; প্রায় সমান হারে পুরুষ ও নারী উভয়ই এর জন্য দায়ী হতে পারেন। উন্নত চিকিৎসাবিজ্ঞানের আগে এই সমস্যাকে সামাজিক লজ্জা, নারীর অভিশাপ বা নিয়তির পরিহাস হিসেবে দেখা হতো। আধুনিক বিজ্ঞান এই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে।

টেস্ট টিউব বেবি পদ্ধতি (IVF): বিস্তারিত বৈজ্ঞানিক আলোচনা

IVF কী এবং কী নয়

টেস্ট টিউব বেবি হলো ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশনের প্রচলিত নাম। এখানে ‘ইন ভিট্রো’ অর্থ দেহের বাইরে। এটি কোনো কৃত্রিম সন্তান সৃষ্টি নয়, বরং স্বাভাবিক প্রজনন প্রক্রিয়াকেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সহায়তায় নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে সম্পন্ন করা।

IVF-এর ধাপসমূহ (বিস্তৃত)

প্রথম ধাপে ওভারিয়ান স্টিমুলেশনের মাধ্যমে একাধিক ডিম্বাণু উৎপাদনে সহায়তা করা হয়। দ্বিতীয় ধাপে ডিম্বাণু সংগ্রহ করা হয়। তৃতীয় ধাপে ল্যাবরেটরিতে স্বামীর শুক্রাণুর সঙ্গে ডিম্বাণু মিলিয়ে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। চতুর্থ ধাপে ভ্রূণ পর্যবেক্ষণ ও নির্বাচনের পর সেটি স্ত্রীর গর্ভাশয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়।

এই প্রক্রিয়ায় সন্তানটি জেনেটিক্যালি স্বামী ও স্ত্রীরই হয় এবং গর্ভধারণও স্ত্রী নিজেই করেন।

IVF-এর সাফল্য ও সীমাবদ্ধতা

IVF শতভাগ সফল নয়। বয়স, স্বাস্থ্য, হরমোনগত ভারসাম্য ও চিকিৎসার মানের ওপর সাফল্যের হার নির্ভর করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত ভ্রূণ সংরক্ষণ, ভ্রূণ ধ্বংস ও বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে নৈতিক প্রশ্ন রয়েছে।

সারোগেসি: ধারণা, ইতিহাস ও আধুনিক বাস্তবতা

সারোগেসি বলতে বোঝায় এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে একজন নারী অন্য ব্যক্তি বা দম্পতির সন্তানের গর্ভধারণ করেন ও প্রসব করেন। এটি প্রাচীন সমাজেও সীমিত আকারে বিদ্যমান ছিল, তবে আধুনিক সারোগেসি মূলত IVF প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।

সারোগেসির প্রকারভেদ

ট্র্যাডিশনাল সারোগেসিতে সারোগেট নারীর নিজস্ব ডিম্বাণু ব্যবহৃত হয়। জেসটেশনাল সারোগেসিতে স্বামী-স্ত্রীর ডিম্বাণু ও শুক্রাণু থেকে IVF-এর মাধ্যমে ভ্রূণ তৈরি করে সারোগেটের গর্ভে স্থাপন করা হয়। দ্বিতীয়টি বর্তমানে বেশি ব্যবহৃত হলেও নৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক এখানেও বিদ্যমান।

IVF ও সারোগেসির মৌলিক পার্থক্য

IVF একটি চিকিৎসা প্রযুক্তি, সারোগেসি একটি সামাজিক ও আইনি ব্যবস্থা। IVF-এ তৃতীয় পক্ষের গর্ভ জড়িত নয়, সারোগেসিতে তৃতীয় পক্ষ অপরিহার্য। এই পার্থক্য ইসলামী মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয়।

ইসলামে বংশ সংরক্ষণ: একটি মৌলিক উদ্দেশ্য

ইসলামী শরিয়তের পাঁচটি মৌলিক উদ্দেশ্যের একটি হলো বংশ সংরক্ষণ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

﴿ادْعُوهُمْ لِآبَائِهِمْ هُوَ أَقْسَطُ عِندَ اللَّهِ﴾

অর্থাৎ: তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাকো, এটাই আল্লাহর কাছে অধিক ন্যায়সংগত। -সূরা আল-আহযাব: ৫

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

«مَنِ ادَّعَى إِلَى غَيْرِ أَبِيهِ فَهُوَ حَرَامٌ عَلَيْهِ الْجَنَّةُ»

অর্থাৎ: “যে ব্যক্তি নিজের পিতার পরিবর্তে অন্য কাউকে পিতা দাবি করে, তার জন্য জান্নাত হারাম।” -সহিহ বুখারি: হাদিস নং 6022, সহিহ মুসলিম: হাদিস নং 1451

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে টেস্ট টিউব বেবি (IVF)

যদি IVF বৈধ স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, কোনো তৃতীয় পক্ষ যুক্ত না হয় এবং নসবের বিশুদ্ধতা রক্ষা পায়, তাহলে আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমিসহ অধিকাংশ সমসাময়িক আলেম একে শর্তসাপেক্ষে বৈধ বলেছেন।

ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে সারোগেসি

কুরআনের ঘোষণা অনুযায়ী:

﴿إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ﴾

অর্থাৎ: তাদের মাতা তো কেবল তারাই যারা তাদেরকে জন্ম দিয়েছে। -সূরা আল-মুজাদালাহ: ২
এই আয়াত অনুযায়ী গর্ভধারিণী নারীই সন্তানের প্রকৃত মা। ফলে সারোগেসি মাতৃত্ব বিভাজন সৃষ্টি করে, যা নসব সংরক্ষণের পরিপন্থী। এই কারণে আন্তর্জাতিক ফিকহ একাডেমি সব ধরনের সারোগেসিকে অবৈধ ঘোষণা করেছে।

আন্তর্জাতিক বিতর্ক ও আইনি বাস্তবতা

অনেক দেশে সারোগেসি নিষিদ্ধ বা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত। কারণ এটি নারীর শোষণ, শিশু বাণিজ্য ও মানবিক মর্যাদার প্রশ্ন উত্থাপন করে।

নৈতিক ও সামাজিক বিশ্লেষণ

IVF ও সারোগেসি আধুনিক মানুষের সীমাহীন ক্ষমতার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ইসলাম বিজ্ঞানকে অস্বীকার করে না, তবে তাকে নৈতিকতার অধীন করে।

উপসংহার

টেস্ট টিউব বেবি ও সারোগেসি আধুনিক বিজ্ঞানের দুই বাস্তবতা। IVF শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হলেও সারোগেসি ইসলামী শরিয়তের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সচেতনতা, দায়িত্ববোধ ও আল্লাহভীতি ছাড়া এই প্রযুক্তির ব্যবহার মানবতার জন্য বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

রেফারেন্স

১. আল-কুরআনুল কারিম
২. সহিহ বুখারি
৩. সহিহ মুসলিম
৪. আন্তর্জাতিক ইসলামী ফিকহ একাডেমি (OIC) এর সিদ্ধান্তসমূহ
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ১২:২২
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

সক্কাল বেলা একটা জোক্সস শোনাই

লিখেছেন ধূসর সন্ধ্যা, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ৯:০৬


বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনার আমলে যতটা নিকৃষ্ট ভাবে ভোট চুরি হয়েছে আর কারো আমলে হয় নি। এমন কি এরশাদের আমলেও না। ...বাকিটুকু পড়ুন

গো ফুলের নিয়ামত

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ সকাল ১১:৪৩


এখন নাকি বিবেক বুদ্ধির জন্ম হচ্ছে-
ঘুরপাক বুড়োরা মৃত্যুর কুলে দুল খাচ্ছে;
রঙিন খাট পালঙ্কে- মাটিতে পা হাঁটছে না
শূন্য আকাশে পাখি উড়ু উড়ু গো ফুলের গন্ধ
উঠান বুঠানে বিবেক বুদ্ধির বাগান... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছোট পোস্ট!

লিখেছেন নূর আলম হিরণ, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯


জুলাই সনদে স্বাক্ষরের দিন ড. ইউনুস বলেছেন, “এই সনদে স্বাক্ষর করলে আমরা বর্বরতা থেকে সভ্যতায় উন্নীত হবো।”
আর গতকাল উনি বলতেছেন বাঙালি হচ্ছে বিশ্বের মাঝে সবচেয়ে জালিয়াত জাতি! তো জুলাই সনদে... ...বাকিটুকু পড়ুন

শের

লিখেছেন এ.টি.এম.মোস্তফা কামাল, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ দুপুর ২:৪৯

তিন শ' এক//
আমার সাহস দেখে, জানি. তুমি খুব রেগে যাবে।
ঘরহীন, সর্বহারা ভালোবাসা জানায় কিভাবে ?

তিন শ' দুই//
চোখের মালিক ঘোর নিঃশ্বতার আঁধারে ডুবেছে;
তবুও বেকুব চোখ সুন্দরের নেশায় ডুবেছে!
...বাকিটুকু পড়ুন

=দাও হেদায়েত ও আল্লাহ=

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ২৯ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ৯:৪৫


পাপ মার্জনা করো মাবুদ,
দয়া করো আমায়,
না যেন আর মোহ আমায়
মধ্যিপথে থামায়!

শুদ্ধতা দাও মনের মাঝে
ডাকি মাবুদ তোমায়
দিবানিশি আছি পড়ে
ধরার সুখের কোমায়!

হিংসা মনের দূর করে দাও
কমাও মনের অহম ,
ঈর্ষা হতে বাঁচাও আমায়
করো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×