
ঢাকার মিরপুরে পরিচয় গোপন করে লুকিয়ে থাকা আওয়ামী লীগের এক পোড়খাওয়া নেতা টাইম ম্যাগাজিনের তারেক রহমান কে নিয়ে লেখা বাংলা অনুবাদ পড়ছিলেন । প্রচ্ছদে তারেক রহমানের ছবি, নিচে লেখা "Can Tarique Rahman Heal Bangladesh?"। বৃদ্ধ নেতা একচিলতে তিতা হাসি হেসে তার পাশে বসা তরুণ পলাতক কর্মীকে বললেন, "দেখলি তো? যে লোকটাকে একসময় আমেরিকানরা দুর্নীতির প্রতীক বলেছিল, আজ সেই লোকটাই তাদের কাছে পলিসি বিশেষজ্ঞ। এটাকে বলে বাস্তববাদী রাজনীতি । এখানে নীতি বলে কিছু নেই, আছে শুধু কারে দিয়ে কার স্বার্থ উদ্ধার হবে।"
তিনি চায়ে চুমুক দিয়ে আবার বললেন, "শোন, আজ যে তারেককে নিয়ে ভালো ভালো কথা বলছে , কাল যদি শেখ হাসিনার ছেলে জয় কোনো জাদুর কাঠি নিয়ে হাজির হয় এবং দেখে যে তারেক তাদের কথা শুনছে না, তবে এই একই ম্যাগাজিন লিখবে: হাসিনাই ভালো ছিলেন। তখন জুলাই মাসের শেখ হাসিনার পতন বা রেজিম চেঞ্জকে তারা বলবে একটা ট্র্যাজিক মিস্টেক। বলবে, শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম ও খুনের ঘটনা বেড়ে গিয়েছিলো কিন্তু দেশে একটা স্থিতিশীলতা ছিল। মেট্রো রেল হয়েছিল, জিডিপি বাড়ছিল। আর এখনকার দুর্নীতি আর বিশৃঙ্খলা দেখে তখন মনে হবে সেই স্বৈরাচারী শাসনই বোধহয় ভালো ছিল। আসলে এরা কেউই বদলায় না রে, শুধু আমাদের দেখার চশমাটা বদলে দেওয়া হয়।"
ঠিক একই সময়ে মতিঝিলে জামায়াতের অফিসে বসে এক প্রবীণ নেতা ওয়াশিংটন পোস্টের রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মার্কিন কূটনীতিকরা তাদের সাথে বন্ধুত্ব করতে চায়, কিন্তু শর্ত হলো শরীয়া আইন করা যাবে না। নেতা তারুণ্যে টগবগ করা এক কর্মীকে বুঝিয়ে বলছিলেন, "এটা আমাদের নৈতিক জয় না বাবা, এটা ওদের বাধ্যবাধকতা। তারা দেখছে তারেককে দিয়ে পুরোপুরি কাজ হচ্ছে না, আওয়ামী লীগ এখন অচল, তাই আমরাই এখন তাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। রাজনীতিতে নীতি বলে কিছু নেই, আছে শুধু তুমি কতটা দরকারী। যদি কাল আমরা ক্ষমতায় যাই, দেখবি এই পশ্চিমা মিডিয়াই আমাদের মডারেট ডেমোক্রেটিক ইসলামিস্ট বলে সার্টিফিকেট দেবে। আমাদের অতীতের সব অন্ধকার তখন হয়ে যাবে ঐতিহাসিক ভুল যা থেকে আমরা শিক্ষা নিয়েছি। আসলে আন্তর্জাতিক রাজনীতি হলো একটা গোলকধাঁধা, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী শয়তানও ফেরেশতা হয়ে যায়।"
নয়াদিল্লির সাউথ ব্লকের এক বদ্ধ ঘরে বসে ভারতীয় কর্মকর্তারাও একই হিসাব কষছিলেন। তারা জানেন তারেক রহমান ঐতিহাসিকভাবে তাদের বিরোধী, কিন্তু এখনকার বাস্তবতায় তাকে ছাড়া উপায় নেই। এক সিনিয়র অফিসার তো বলেই দিলেন, "হাসিনা আমাদের বন্ধু ছিলেন কারণ তিনি আমাদের স্বার্থ দেখতেন। তারেকও যদি আমাদের স্বার্থ দেখে, তবে আমরা তাকেই সমর্থন দেব। আর যদি দশ বছর পর তারেক ব্যর্থ হয় আর সজীব ওয়াজেদ জয় আবার রাজনীতিতে ফিরে আসতে চায়, আমরা তাকেও কোলে তুলে নেব। ক্ষমতা টেকানোর জন্য নৈতিকতা বিসর্জন দেওয়াই হলো আসল খেলা।"
কল্পনা করা যাক ২০৩৫ সালের কথা। তারেক রহমান ক্ষমতায় এসে মুখ থুবড়ে পড়েছেন, অর্থনীতি ধসে গেছে আর বিএনপির কর্মীরা লুটপাটে ব্যস্ত। তখন হঠাৎ দৃশ্যপটে সজীব ওয়াজেদ জয়ের উদয় হবে। টাইম ম্যাগাজিন তখন প্রচ্ছদ করবে—"Can Joy Wazed Save Bangladesh?"। সেখানে খুব সুন্দর করে লেখা হবে যে, শেখ হাসিনার আমলে হয়তো কিছু মানুষ গুম হয়েছিল বা মারা গিয়েছিল, কিন্তু সেই শাসন আমল ছিল স্থিতিশীল। জয়কে দেখানো হবে একজন আধুনিক, টেক-স্যাভি এবং সংস্কারকামী নেতা হিসেবে যে তার মায়ের ভুলগুলো শুধরে নিতে এসেছে।
যে বিশৃঙ্খলা এখন তারেক রহমানের আমলে চলছে, তার চেয়ে হাসিনার সেই কঠোর স্বৈরশাসন অনেক ভালো ছিল বলে একটা ন্যারেটিভ তৈরি করা হবে। তখন জুলাই মাসের সেই রেজিম চেঞ্জ বা পতনকে দেখা হবে একটা অপরিপক্ব সিদ্ধান্ত হিসেবে। বলা হবে, উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ঠেকাতে শেখ হাসিনাই ছিলেন সবচেয়ে কার্যকর। এবং শেষমেশ সেই অমোঘ বাক্যটি আবার ফিরে আসবে: There Is No Alternative।
এই যে চক্রাকার খেলা, এখানে সাধারণ মানুষের কোনো স্থান নেই। সহিংসতায় যারা মারা গেল , যারা গুম হলো, তারা দিনশেষে কেবল একটা পরিসংখ্যান হয়েই থেকে যাবে। আন্তর্জাতিক মিডিয়া আর বড় শক্তিগুলো নিজেদের সুবিধামতো নায়ক আর খলনায়ক বদলাবে। আজ যে দুর্নীতির রাজপুত্র, কাল সে ত্রাতা। আজ যে খুনি স্বৈরাচার, কাল সে স্থিতিশীলতার প্রতীক। এই খেলায় কারো রক্তে কারো কিছু যায় আসে না। দিনশেষে সবাই শুধু নিজের গদি আর স্বার্থটুকু দেখে। আজকের নায়ক কালকের খলনায়ক হবে, আর আজকের খলনায়ক হবে পরশুদিনের ধোয়া তুলসী পাতা। এই চক্র চলতেই থাকবে যতক্ষণ না মানুষ বুঝতে পারবে যে বিকল্প নেই বলে আসলে কিছু নেই, এটা কেবল গদি দখলের একটা সুনিপুণ কৌশল।
Photo credit : New Age
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে জানুয়ারি, ২০২৬ রাত ২:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



