স্বয়ং ইলিশের রাজধানীতে জন্মেছিলাম বলিয়াই কিনা জানি না ইলিশ মাছের প্রতি আমার পক্ষান্তরে আমার পাকস্থলীর এক দুর্নিবার আকর্শন ছোটবেলা থেকেই টের পাইয়া আসিতেছি। একদা(!) নিজ শহরের ইলিশ ঘাটে প্রতিদিন টন টন ইলিশ মাছের রুপালী পাহাড় দেখিয়া আত্মতৃপ্তি লইতাম আর ঘরে ফিরিয়া সদ্য ভাজা ইলিশ মাছ মুড়ির মত চর্বন করিতাম। দেশ ছাড়ার সময় মানুষ অনেক কিছুই সঙ্গে লইয়া যায় আর আমি ঝান্ডুদা স্টাইলে কেজি তিনেক ইলিশ ভাজা লইয়া আসিয়াছিলাম। এয়ারপোর্টের ইমিগ্রেশনে ভ্রুকুঞ্চিত কাস্টমস কর্মকর্তার নিকট হইতে তাহা উদ্ধার করিয়া আনিবার সেই মহাকাব্য অন্য আরেকদিন বর্ণনা করিতে হইবে।
প্রবাসে আসিবার পর যখনি কোন বাঙালি খাবারের দাওয়াত দিত অথবা জোরপূর্বক কারো নিকট থেকে দাওয়াত আদায় করিতাম এক ফাঁকে মৃদু হাসিয়া বলিয়া দিতাম, ভাই ইলিশ মাছটা থাকিবে তো? ক্রমশই আমার দাওয়াত গ্রহণের পূর্বশর্ত হিশেবে খাদ্য তালিকায় ইলিশ মাছের উপস্থিতি বাঞ্ছনীয় হইয়া দাঁড়াইল। ইলিশ খাইবার বাসনা মনে জাগিলেই ছলে বলে কৌশলে দাওয়াত আদায় করা শুরু করিলাম।
যাই হোক, এইভাবে আর কতকাল অপরের মাছ ভক্ষণ করা যায় তা ভাবিয়া নিজে ইলিশ রাঁধিব বলিয়া বেশ কয়েকবার সাহসী উদ্যোগ লইয়াছিলাম। কিন্তু আমার পূর্ববর্তী রান্নার ইতিহাস স্মরণ করিয়া সন্মানের সহিত তাহা হইতে বারবার নিজেকে নিবৃত করিয়াছি। অবশেষে প্রচণ্ড সাহসে বুক বাঁধিয়া প্রথমবারের মত স্থানীয় বাঙালি দোকানে ইলিশ মাছ খরিদ করিতে গেলাম। দোকানি এক গাল হাসিয়া আমারে কহিল, ‘ভাইজান দেশি ইলিশ মাছ কোথাও পাইবেন না, সাপ্লাই নাই। তার চাইতে একদম তাজা বার্মিজ ইলিশ দেই, একদম পিছ করিয়া কাটিয়া ধুইয়া প্যাকেট করিয়া আসিয়াছে,খাইয়া আনন্দ পাইবেন’।
বেশ মনঃক্ষুণ্ণ হইলেও নিহত মামা হইতে আহত মামা উত্তম জাতীয় কথা ভাবিয়া আরাকানি ইলিশের প্যাকেট বগলদাবা করিয়া নৃত্যরত অবস্থায় বাটিতে গমন করিলাম। মহা এন্তেজাম করিয়া রাঁধিতে যাইয়া তাজা বরফখন্ডের ন্যায় ইলিশখন্ড আরো একবার ধুইবার লক্ষে পানিতে ভিজাইয়াই বুকের ডানপাশে মৃদু আঘাত অনুভব করি। উহারা বেশ কায়দা করিয়া ইলিশ কাটিলেও তাহা হইতে ১০ সেন্টের মুদ্রার ন্যায় বড় বড় আঁশ পৃথক করেনাই। ল্যাদাকালে ইলিশের আঁশ ছাড়াইবার মূল্যবান তিক্ত অভিজ্ঞতা ঝুলিতে থাকিলেও এই খন্ড খন্ড মাছ হইতে কোন তরিকায় আঁশ আলাদা করিব তাহা চিন্তা করিয়া দোকানীকে গালমন্দ করিব কিনা ভাবিতে ভাবিতে বার্মিজরা আঁশসহ ইলিশ মাছ খায় এই সিদ্ধান্তে উপনিত হইয়া মনকে শান্ত করিলাম। ভাজা ইলিশের উপাদেয় গন্ধ স্মরণ করিয়া অসীম ধৈর্যের সহিত এক ঘন্টাকাল সময় ব্যয় করিয়া ইলিশ হইতে মুদ্রা আলাদাকরণ পূর্বক বেশ করিয়া হলুদ লবন মাখিয়া ভাজি করিতে উদ্যত হই। গরম তেলে মাছ ছাড়িতে যইয়া তেলের ছিটা খাইয়া দমিয়া না গেলেও মুহূর্তেই প্যানের ভিতর মাছের খণ্ড বিখন্ড চেহারা দেখিয়া দমিতে হইলো। মাছ যতই উল্টাইতে যাই উহা ততই খন্ড বিখন্ড হইয়া মিলে মিশে একাকার হইয়া যায়। উঁহু আমি দমিবার পাত্র নই, বেশ কায়দা করিয়া পদার্থবিজ্ঞানের কপিকল এবং আরও কিছু সূত্র প্রয়োগে একসময় ভাঁজা শেষ করিলাম যদিও ততক্ষনে উহাকে আর ইলিশ বলিয়া চিনিবার উপায় থাকিল না। এমনকি সেই তাজা ইলিশ মাছ হইতে শুঁকিতে শুঁকিতে নাক ব্যাথা করিয়া ফেলিয়াও ইলিশের বিন্দুমাত্র গন্ধ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হইলাম।
থাক আরাকানি ইলিশে গন্ধ থাকে না, এইবার খাওয়ার পালা। বিশ্বজয় করিবার মতন ভাব লইয়া মুড়ি সদৃশ কুচো ইলিশ ভাত সহিত মুখে পুরিয়া ফুরফুরে মেজাজে চাবাইতে গিয়াই মুখের ভেতর বঙ্গোপসাগরের অস্তিত্ব টের পাইলাম। অতিরিক্ত লবনের আধিক্যে নাকমুখ বিকৃত হইয়া গেলো। অতিদ্রুত পানি সহযোগে গিলিয়া ফেলিলাম। বার্মিজ ইলিশে লবন বেশি থাকে এই মহান সিদ্ধান্তে উপনীত আমি শোকগ্রস্ত হওয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করিতে পারিলাম না। ক্ষুধা নিবারণের লক্ষে নতুন উদ্যমে কোয়ান্টাম মেথড হইতে ধার করা প্রো-একটিভ দৃষ্টিভঙ্গিতে বেশ সুস্বাদু হইয়াছে ভাবিয়া পুনরায় উহা মুখে পুরিলাম। হাসিমুখে বেশ সময় লইয়া চর্বন করিতে যাইয়া টের পাইলাম শুধুমাত্র লবন নয়, অতিরিক্ত ভাজার কারণে উহা পুড়িয়া নারকেলের ছোবড়ার ন্যায় স্বাদপ্রাপ্ত হইয়াছে। কিছুক্ষন হাসি হাসি মুখ করিয়া বসিয়া থাকিলাম অতঃপর ইহজীবনে ইলিশ খাইতে চাহিবার মতন অসৎ সাহস দেখাইবোনা বলিয়া প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হইয়া নিজেকে শান্ত করিলাম।
কিন্তু কিছুসময় অতিবাহিত হইতেই পাকস্থলীতে গুড়গুড় শব্দের বিদ্রোহের সংগীত ধ্বনিত হইলো।
অবশেষে স্বদেশপ্রেমের আরো একটা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনের লক্ষে স্বদেশী পণ্য প্রাণ মুড়ি এবং রুচি ঝাল চানাচুরের প্যাকেট খুলিয়া খিচুড়ি বানাইয়া মহান গৌরবের সহিত চর্বণ করিয়া তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলিলাম।
জয়তু ইলিশ মাছ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




