somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

' মৃত্যুর পরে ' [জীবনঘনিষ্ঠ কিছু অব্যর্থ উচ্চারণ]

১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ দুপুর ২:৫১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কিছু কিছু কবিতার আবেদন চিরন্তন।
অহেতুক দুর্বোধ্যতাবিহীন সহজ ও জীবনঘনিষ্ঠ সেসব কবিতার কাছে সমর্পিত হতে মানা নেই। মানা নেই চিরন্তন সেসব পঙক্তিতে হৃদয় সঁপে দিয়ে খানিকক্ষণ উদাস হয়ে থাকাতে। তেমনই একটি কবিতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'মৃত্যুর পরে'। আমার ভীষণ ভীষণ পছন্দের একটি কবিতা।

যাহোক আর কথা না বাড়িয়ে কবিতায় চলে যাওয়া যাক। শুরুতেই রবীন্দ্রনাথ বলছেন,

আজিকে হয়েছে শান্তি, __ জীবনের ভুলভ্রান্তি
সব গেছে চুকে ।
রাত্রিদিন ধুকধুক, __ তরঙ্গিত দুঃখ সুখ
থামিয়াছে বুকে।
যত-কিছু ভালোমন্দ, __ যত-কিছু দ্বিধাদ্বন্দ্ব
কিছু আর নাই !
বলো শান্তি, বলো শান্তি, __ দেহ সাথে সব ক্লান্তি,
হয়ে যাক ছাই ।।

আজ তার জীবনের হয়েছে অবসান। কার? ধরুন আমার, আপনার, কিংবা অন্যকারো। দিবারাত্রির শতকোটি অমূল্য মুহূর্ত যে একদিন তার তরঙ্গিত দুঃখ-সুখে আন্দোলিত করেছিল, আজ তার জীবন প্রদীপ নিঃস্পন্দ নিশ্চল। আয়ুহীন হয়েছে সে। জীবন তার ভালোমন্দ, দ্বিধা-দ্বন্দ্ব, আর ক্লান্তি সাথে নিয়ে পাড়ি জমিয়েছে অন্য কোথাও। প্রাণহীন দেহটা শুধু চিতার আগুনে পুড়ে যাবার অপেক্ষায় । কবি তাই শবদর্শনার্থীদের আহ্বান করে বলছেন–

গুঞ্জরি করুণ তান, __ ধীরে ধীরে করো গান
বসিয়া শিয়রে।
যদি কোথা থাকে লেশ ___ জীবন স্বপ্নের শেষ
তাও যাক মরে।
তুলিয়া অঞ্চলখানি __ মুখ-‘পরে দাও টানি,
ঢেকে দাও দেহ –
করুণ মরণ যেথা __ ঢাকিয়াছে সব ব্যথা
সকল সন্দেহ।।

প্রাণহীন নিথর এ মুখটাকে কাপড়ে ঢেকে দাও। কারণ এখানে আজ জীবনের সকল ব্যথা মরণের পর্দায় ঢাকা পড়ে গেছে। আজ পাশে বসে করুণ মর্সিয়ায় সিক্ত করে তাকে বিদায় দাও। তোমাদের বিদায়ের গানে - যদি কোথাও কোনো সাধ থেকে থাকে জীবনের তরে – তাও মরে যাক। কেননা ‘মৃত্যুতে সকল দেনা শোধ ক’রে দিতে’ই তো জীবনের এতো আয়োজন।

তবু একটি জীবনের অবসানে এ বিশ্ব চরাচরে কিছুই পরিবর্তিত হয় না। রঙ্গমঞ্চ উন্মুক্ত থাকবে আগের মতোই, শুধু সেই পরিচিত অভিনেতা তার অভিনয়ের যবনিকা টেনে দিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও। আর তাই কবি বলছেন –

বিশ্বের আলোক যত __ দিগ্বিদিকে অবিরত
যাইতেছে বয়ে,
শুধু ওই আঁখি-‘পরে __ নামে তাহা স্নেহভরে
অন্ধকার হয়ে।
জগতের তন্ত্রীরাজি __ দিনে উচ্চে উঠে বাজি,
রাতে চুপে চুপে
সে শব্দ তাহার ‘পরে __ চুম্বনের মতো পড়ে
নীরবতারূপে।

জগতের যত আলো, যত আশা - সব আজ শুধু অন্ধকার হয়ে মৃত ব্যক্তিটির নির্মিলিত আঁখির ওপরে আছড়ে পড়ছে। দিবারাত্রির শত কোলাহল আর নীরবতা সব যেন শেষ চুম্বনের মতো প্রাণহীন দেহের উপরে বিদায়ের নীরব বার্তা বয়ে নিয়ে এসেছে। প্রাণহীন দেহের কি মূল্য ! মিথ্যে সে দেহের উপরে পুষ্পাঞ্জলি অর্পন। মিথ্যে সকল স্তুতি পাঠ। ফুলহাতে শোকে মুহ্যমান লোকদের উদ্দেশ্যে তাই কবির উচ্চারণ,

মিছে আনিয়াছ আজি __ বসন্তকুসুমরাজি
দিতে উপহার,
নীরবে আকুল চোখে __ ফেলিতেছ বৃথা শোকে
নয়নাশ্রুধার ।
ছিলে যারা রোষভরে __ বৃথা এতদিন পরে
করিছ মার্জনা ।
অসীম নিস্তব্ধ দেশে __ চিররাত্রি পেয়েছে সে
অনন্ত সান্ত্বনা ।।

মিথ্যে তোমাদের ক্রন্দন, মিথ্যে তোমাদের শোকাশ্রু। আর যারা এতদিন ছিলে অভিমান নিয়ে, ছিলে রাগ, ঘৃণা, আর ক্রোধ পুষে রেখে, তাদের আজকের এই আকস্মাৎ ক্ষমা করে দেয়াটাও মিথ্যে, অর্থহীন। কারণ যার উদ্দেশ্যে এই ক্রন্দন, যার উদ্দেশ্যে এই ক্ষমা – সে তো ‘অসীম নিস্তব্ধ দেশে’ পেয়েছে ‘অনন্ত সান্ত্বনা’। যার হৃদয়ে হৃদস্পন্দন নেই, যে জীবজগত ছেড়ে হয়েছে অনন্তগামী, তার কাছে শোক কিংবা ক্ষমা সকলই অর্থহীন। তার আত্মার সন্ধান কে জানে আর ! সে কি আছে, নাকি হারিয়েছে অনন্তে – তা এক অনন্ত বিস্ময়।

গিয়েছে কি আছে বসে, __ জগিল কি ঘুমালো সে
কে দিবে উত্তর ?
পৃথিবীর শ্রান্তি তারে __ ত্যাজিল কি একেবারে –
জীবনের জ্বর ?
এখনি কি দুঃখসুখে __ কর্মপথ-অভিমুখে
চলেছে আবার ?
অস্তিত্বের চক্রতলে __ একবার বাঁধা প’লে
পায় কি নিস্তার ?

সে কি আবার জন্মান্তরে ফিরে এসেছে এরই মধ্যে অন্য কোনো গৃহে? নাকি সে একেবারে হারিয়েছে – এসেছিল যে অজ্ঞাত স্থান হতে - সেখানে? পৃথিবীর শ্রান্তি কি তাকে একেবারে ত্যাগ করে গেল? গেল কি সব মায়া কাটিয়ে !

যে পরিচিত পৃথিবীর মাটি-বায়ু-জলে এতদিন পরম মমতায় বাঁধা পড়ে ছিল, কর্মে-কর্তব্যে যে ছিল সদাপ্রাণবান – সে কি একেবারে চলে গেল ! নাকি জন্মান্তরে ফিরবে আবার অস্তিত্বের চক্রে; – কে জানে! তাই তার শিয়রে বসে বৃথা শোক করা। অহেতুক এই অশ্রু বিসর্জন।

বসিয়া আপন দ্বারে __ ভালো মন্দ বলো তারে
যাহা ইচ্ছা তাই।
অনন্ত জনম-মাঝে __ গেছে সে অনন্ত কাজে,
সে আর সে নাই ।
আর পরিচিত মুখে __ তোমাদের দুঃখ সুখে
আসিবে না ফিরে –
তবে তার কথা থাক, __ যে গেছে সে চলে যাক
বিস্মৃতির তীরে ।।

যে গেছে সে চলে যাক; কেননা ‘যাহা যায়, তাহা যায়’। যে আর কখনো ফিরবে না, তার কথা ভেবে ভেবে অহেতুক কেন বাক্যব্যয়! সে বিস্মৃতিতে তলিয়ে যাক, হারিয়ে যাক সময়ের বাঁকে; যেমনটা সবাইকে যেতে হয়।


কিন্তু এরপরই কবিতার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকটি আমাদের চোখের সামনে চলে আসে। কবি একটি অনিবার্য প্রশ্ন রেখে যান, একটি জিজ্ঞাসা, একটি আক্ষেপ। যদি কর্ম-অকর্ম, ভুল-ভ্রান্তি, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, ভালো-মন্দ নির্বিশেষে হারিয়ে যাওয়াই হয় জীবনের সর্বশেষ সত্য, - তাহলে কেন এই পৃথিবীতে এসে শতকর্মে বাঁধা পড়া? কেন এই ক্ষুদ্র দেহটিকে ঘিরে এতো আয়োজন? এ জীবনের কি এমন মানে ? কবি নিজেও তার উত্তর জানেন না। আর জানেন না বলেই জানার ইচ্ছা হৃদয়ে লালন করে বলেন,

জানি না কিসের তরে __ যে যাহার কাজ করে
সংসারে আসিয়া,
ভালো মন্দ শেষ করি __ যায় জীর্ণ জন্মতরী
কোথায় ভাসিয়া।
দিয়ে যায় যত যাহা __ রাখ তাহা ফেল তাহা
যা ইচ্ছা তোমার ।
সে তো নহে বেচাকেনা, __ ফিরিবে না, ফেরাবে না
জন্ম-উপহার।

কেন এই আনাগোনা __ কেন মিছে দেখাশোনা
দু দিনের তরে,
কেন বুক-ভরা আশা, __ কেন এত ভালোবাসা
অন্তরে অন্তরে,
আয়ু যার এতটুক __ এত দুঃখ এত সুখ
কেন তার মাঝে,
আকস্মাৎ এ সংসারে __ কে বাঁধিয়া দিল তারে
শতলক্ষ কাজে –

একবার জন্মে গেলে আর তা ফেরানোর কোনো উপায় নেই একমাত্র মৃত্যু ছাড়া। তখন কেবল মৃত্যুর মধ্য দিয়েই জন্মতরী ভেসে যায়, হারিয়ে যায়। কিন্তু কোথায় যায় – তা অজানা। জন্ম-মৃত্যুর এই ব্যবধানেই মানুষের আনাগোনা, কতো স্বপ্ন, কতো আশা, হৃদয়ে-হৃদয়ে কতো ভালোবাসা। কিন্তু শেষমেশ যদি এই ক্ষুদ্র জীবনের স্বল্প পরিধিতে, শতলক্ষ কাজ শেষে, অনিবার্য গন্তব্যই হয় মৃত্যুতে হারিয়ে যাওয়া; তবে এই ক্ষুদ্র জীবনের মূল্যই বা কি ! তবে কি,

হেথায় যে অসম্পূর্ণ __ সহস্র আঘাতে চূর্ণ
বিদীর্ণ বিকৃত
কোথাও কি একবার __ সম্পূর্ণতা আছে তার
জীবিত কি মৃত,
জীবনে যা প্রতিদিন __ ছিল মিথ্যা অর্থহীন
ছিন্ন ছড়াছড়ি
মৃত্যু কি ভরিয়া সাজি __ তারে গাঁথিয়াছে আজি
অর্থপূর্ণ করি –

হেথা যারে মনে হয় __ শুধু বিফলতাময়
অনিত্য চঞ্চল
সেথায় কি চুপে চুপে __ অপূর্ব নূতনরূপে
হয় সে সফল,
চিরকাল এই-সব __ রহস্য আছে নীরব
রুদ্ধ-ওষ্ঠাধর –
জন্মান্তের নবপ্রাতে __ সে হয়তো আপনাতে
পেয়েছে উত্তর ।।

তবে কি জীবনের সম্পূর্ণতা ‘হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে!’। তবে কি সে রহস্য চিরকাল এমনি নীরব থেকে যাবে! জন্মান্তের নতুন মৃত্যুর মধ্য দিয়েই কি তবে সে মহা-রহস্য উন্মোচিত হয়? হয়তো।

জীবনের প্রতি মুহূর্তে যে মৃত্যুকে ভুলে থেকে আমরা কেবলই বেঁচে থাকি। সেই মৃত্যুতেই কি তবে জীবনের মালা গাঁথা পরিপূর্ণতা লাভ করে। তখন সে কী লাভ করে, কি দেখে সে ?

সে হয়তো দেখিয়াছে __ প’ড়ে যাহা ছিল পাছে
আজি তাহা আগে,
ছোটো যাহা চিরদিন __ ছিল অন্ধকারে লীন
বড়ো হয়ে জাগে।
যেথায় ঘৃণার সাথে __ মানুষ আপন হাতে
লেপিয়াছে কালি
নূতন নিয়মে সেথা __ জ্যোতির্ময় উজ্জ্বলতা
কে দিয়াছে জ্বালি।।

মৃত্যুতে কি তবে জীবনের নূতনতর কোনো মানে তৈরি হয়, যা আরো বেশী অর্থবহ। সেখানে কি তবে সকল আপ্রাপ্তি প্রাপ্তিতে বদলে যায়, ঘৃণা বদলে কি সেখানে ভালবাসার নূতন আলোক তৈরি হয়? কে জানে ! হয়তো হয়, হয়তো না। তবু মৃত্যুতে পার্থিব জীবনের জরা-জীর্ণতা খসে পড়ে। আবরণহীন সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর মতো কলঙ্কমুক্ত হয় মানুষ। কবি তাই বলেন -
কত শিক্ষা পৃথিবীর __ খ’সে পড়ে জীর্ণচীর
জীবনের সনে,
সংসারের লজ্জাভয় __ নিমেষেতে দগ্ধ হয়
চিতাহুতাশনে।
সকল-অভ্যাস-ছাড়া __ সর্ব-আবরণ-হারা
সদ্যশিশুসম
নগ্নমূর্তি মরণের __ নিষ্কলঙ্ক চরণের
সম্মুখে প্রণম ।।

জীবনের সকল অর্জনের তকমা মুছে যায় চিতার আগুনে। সব আবরণ, সাফল্য-ব্যর্থতা, সকল অভ্যাস সবকিছু মৃত্যুর আগমনে হারিয়ে যায়। সংসারের সকল লজ্জা, ভীতি, কলঙ্ক দগ্ধ হয়।

কবি তাই বলেন, যে গেছে সে গেছে। আর মিছে কেন তাকে জীবিতদের বিচারের পাল্লায় ওজন করা। মিছে কেন তাকে মানবিক সংকীর্ণতায় বেঁধে রাখা।

আপন মনের মতো __ সংকীর্ণ বিচার যত
রেখে দাও আজ;
ভুলে যাও কিছুক্ষণ __ প্রত্যহের আয়োজন,
সংসারের কাজ।
আজি ক্ষণেকের তরে __ বসি বাতায়ন-‘পরে
বাহিরেতে চাহো;
আসীম আকাশ হতে __ বহিয়া আসুক স্রোতে
বৃহৎ প্রবাহ।

উঠিছে ঝিল্লির গান, __ তরুর মর্মরতান,
নদীকলস্বর;
প্রহরের আনাগোনা __ যেন রাত্রে যায় শোনা
আকাশের ‘পর।
উঠিতেছে চরাচরে __ অনাদি অনন্ত স্বরে
সঙ্গীত উদার;
সে নিত্য-গানের সনে __ মিশাইয়া লহো মনে
জীবন তাহার।।

তার চেয়ে আজ কিছুক্ষণ সংসারের কাজ থেকে তুমি ছুটি নাও। সবকিছু ভুলে যে চলে গেছে তাকে সমস্ত প্রকৃতিতে – ঝিল্লির গানে, তরুর মর্মর তানে, আকাশে, বাতাসে – অনুভব করো। অসীম আকাশ থেকে আজ তোমার মনে নেমে আসুক এক অনন্ত প্রবাহ। অমিয় ধারা। চলে যাওয়া মানুষটিকে অনুভব করো সমস্ত বিশ্বে, সর্বদৃশ্যে।

ব্যাপিয়া সমস্ত বিশ্বে __ দেখো তারে সর্বদৃশ্যে
বৃহৎ করিয়া;
জীবনের ধূলি ধুয়ে __ দেখো তারে দূরে থুয়ে
সম্মুখে ধরিয়া।
পলে পলে দণ্ডে দণ্ডে __ ভাগ করি খণ্ডে খণ্ডে
মাপিয়ো না তারে;
থাক তব ক্ষুদ্র মাপ __ ক্ষুদ্র পূণ্য ক্ষুদ্র পাপ
সংসারের পারে।।

আজ বাদে কাল যারে __ ভুলে যাবে একেবারে
পরের মতন,
তারে লয়ে আজি কেন __ বিচার বিরোধ হেন—
এত আলাপন !
যে বিশ্ব কোলের ‘পরে __ চিরদিবসের তরে
তুলে নিল তারে;
তার মুখে শব্দ নাহি— __ প্রশান্ত সে আছে চাহি
ঢাকি আপনারে।।

যে গেছে তার দোষত্রুটি নির্ণয়ে আর কাজ নেই। জগতে নিষ্পাপ কে আছে ! তাই আজ বাদে কাল যাকে সময়ের ব্যবধানে পরের মত একদম ভুলে যাবে, তাকে নিয়ে আজ তর্ক সমাপন হোক। যে নতুন জগত তাকে ঠাঁই দিয়েছে আপন ক্রোড়ে, সে অনন্ত জগতটাও তো একেবারে নিশ্চুপ। তারও তো কোনো জিজ্ঞাসা নেই। অনন্ত-নীরব সে। তাকে প্রশ্ন করে তো কোনো উত্তর মিলবে না কখনো। কিন্তু তবুও,

বৃথা তারে প্রশ্ন করি, __ বৃথা তার পায়ে ধরি,
বৃথা মরি কেঁদে –
খুঁজে ফিরি অশ্রুজলে __ কোন অঞ্চলের তলে
নিয়েছে সে বেঁধে।
ছুটিয়া মৃত্যুর পিছে __ ফিরে নিতে চাহি মিছে।
সে কি আমাদের?
পলকে বিচ্ছেদে হায় __ তখনি তো বুঝা যায়
সে যে অনন্তের।।

বিচ্ছেদ হলে তবেই তো বোঝা যায় কেউ চিরকাল স্থায়ী নয় এই নশ্বর পৃথিবীতে। মৃত্যুর কোল থেকে কাউকে তো কোনদিনও ফিরিয়ে আনা যায় না।

চক্ষের আড়ালে তাই __ কত ভয় সংখ্যা নাই,
সহস্র ভাবনা।
মুহূর্ত মিলন হলে __ টেনে নিই বুকে কোলে,
অতৃপ্ত কামনা।
পার্শ্বে ব’সে ধরি মুঠি __ শব্দমাত্রে কেঁপে উঠি
চাহি চারি ভিতে –
অনন্তের ধনটিরে __ আপনার বুক চিরে
চাহি লুকাইতে।

মানুষ কি তবে শুধুই ‘অনন্তের ধন’ ? অনন্ত হতে এসে অনন্তেই ফিরে যায়? আর তাই তো ‘হারাই হারাই সদা হয় ভয়, হারাইয়া ফেলি চকিতে’। সে জন্যেই বুঝি প্রিয়জনকে বুকে কোলে করে সহস্র ভয় থেকে আমরা নিরাপদে রাখতে চাই। কিন্তু মৃত্যু থেকে কে নিরাপদ? হাহ, কি নির্বোধ আকাঙ্ক্ষা!

হায় রে নির্বোধ নর, __ কোথা তোর আছে ঘর,
কোথা তোর স্থান !
শুধু তোর ওইটুক __ অতিশয় ক্ষুদ্র বুক
ভয়ে কম্পমান।
উর্ধ্বে ওই দেখ চেয়ে __ সমস্ত আকাশ ছেয়ে
অনন্তের দেশ –
সে যখন এক ধারে __ লুকায়ে রাখিবে তারে
পাবি কি উদ্দেশ?

ধরে রাখতে পারবে না জেনেও ধরে রাখার চেষ্টায় অবিরাম সচেষ্ট নির্বোধ এই মানুষেরা। ছোট্ট দুরুদুরু বুকে প্রিয়জনকে সে কাছে ধরে রাখতে চায় সবসময়। অথচ উপরে বিশাল আকাশের অনন্তের দেশে যখন কেউ লুকিয়ে পড়ে, তার কি আর কোনো উদ্দেশ পাওয়া যায়? সেখানে যে অজস্র গ্রহ, নক্ষত্র, ছায়াপথ। কোথা শুরু, কোথা শেষ – কে জানে!

ঐ হেরো সীমাহারা __ গগনেতে গ্রহ তারা –
অসংখ্য জগৎ
ওরই মাঝে পরিভ্রান্ত __ হয়তো সে একা পান্থ
খুঁজিতেছে পথ।
ওই দূর-দূরান্তরে __ অজ্ঞাত ভুবন-‘পরে
কভু কোনোখানে
আর কি গো দেখা হবে, __ আর কি সে কথা কবে
কেহ নাহি জানে।।

হয়তো সেই অনন্ত আকাশের কোথাও না কোথাও সে চলে গেছে। যার সাথে কোনোদিনও আর দেখা হবে না, কথা হবে না। সেই দূর-দূরান্তর থেকে সেও হয়তো পৃথিবীর পথ খুঁজে খুঁজে দিশেহারা। তবু থাক, তার কথা থাক।

যা হবার তাই হোক, __ ঘুচে যাক সর্ব শোক
সর্ব মরীচিকা।
নিবে যাক চিরদিন __ পরিশ্রান্ত পরিক্ষীণ
মর্তজন্মশিখা।
সব তর্ক হোক শেষ— __ সব রাগ, সব দ্বেষ,
সকল বালাই।
বলো শান্তি, বলো শান্তি, __ দেহ-সাথে সব ক্লান্তি
পুড়ে হোক ছাই।।


জীবনের জন্মশিখা নির্বাপিত হোক চিরতরে। সকল তর্ক, রাগ, দ্বেষ, ঘৃণা, সবকিছু মুছে দিয়ে হারিয়ে যাক সে। ঘুচে যাক জীবনের সাতরঙা সাধ। চিতার রক্তিম আগুনে ‘দেহ-সাথে সব ক্লান্তি পুড়ে হোক ছাই’। কিছু শান্তি হোক। শান্তি।


তাই বলছিলাম, রবীন্দ্রনাথের ‘মৃত্যুর পরে’ শুধু একটি কবিতা মাত্র নয়। এটি একটি জীবন দর্শন। একটি উপলব্ধি। সারাজীবন ধরে পাঠ করা যায় এমন একটি সুপরিসর কবিতা। জীবনঘনিষ্ঠ কিছু অব্যর্থ উচ্চারণ।
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সন্ধ্যা ৭:৫০
২৪টি মন্তব্য ২৪টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

দেশভাগ এবং ধর্ম- অধর্ম

লিখেছেন রাজীব নুর, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:২৪



শীতের শেষে সমস্ত গাছের পাতা ঝরে পড়ে।
তখন পাতা ছাড়া গাছ একদম রুগ্ন মনে হয়। শুকনো পাতা দিয়ে মাটির পথ ঢেকে যায়। সেই পথ দিয়ে কোনো পথিক হেটে গেলে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জিরো থেকে হিরো (মহাজগৎ সংক্রান্ত) - পর্ব-১

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ২০ শে অক্টোবর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:৫০




কোন কিছুর অস্তিত্ববিহীন অসীম শূন্যে উদ্ভব ঘটেছে সকল বস্তু ও শক্তি উপাদানের। তাতে কোন স্থান না থাকায় উক্ত বস্তু ও শক্তি উপাদান সমূহ একে অপরের স্থান হয়েছে। সুতরাং... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের শক্তি, ভাষার মাধুর্য....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১:৫২

এমিরেটস, কাতার এয়ার লাইন্স ফ্লাইট অ্যাটেনডেন্ট রিক্রুটমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে গ্রুপ ডিসকাশন। গ্রুপ ডিসকাশনের সারমর্ম হচ্ছে—৬-৮ জন কয়েকটি গ্রুপে একটি নির্দিষ্ট টপিক নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করবে। নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

বলুন - "হ্যালো আল্লাহ্‌, আমি এখনো বেঁচে আছি!"

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ ভোর ৫:৫৫

আপনার কাছে মনে হচ্ছে, আল্লাহ্‌ আপনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
তিনি আপনার দোয়া কবুল করছেন না।
আপনার কাছের মানুষকে দূরে সরিয়ে দিয়েছেন।
আপনার কোন চাকরী নাই। রিজিক ছোট হয়ে এসেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

উচ্চবংশীয় ছাগল!

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৯:০৯



এককালে কেবল ঘড়িতেই বাজতো টিক টিক- টিক টিক;
বারবেলায় এসে দেখছি টিক টিক বলে কিছু নেই আর ঠিক ঠিক!
বরং 'টিকটক'- এ আকণ্ঠ বুদ হয়ে আছে আবালবৃদ্ধবনিতা!
মানুষের লম্ফঝম্প... ...বাকিটুকু পড়ুন

×