somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কনফিডেনশিয়াল ফাইল

১৫ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



এই আমার কাজ। আগে থেকে তথ্য সংগ্রহ করি। তারপর শিকার।

তথ্য পাওয়া তেমন কঠিন কিছু না। নিকোকে বললেই একাউন্ট হ্যাক করে দেয়। ম্যাসেঞ্জার হোক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপ। প্রয়োজনে কম্পিউটারও। সব তথ্যউপাত্ত খুব মনোযোগ দিয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখি। তারপর হুট করে একদিন দেখা করে চমকে দিই শিকারকে। উফ! দারুণ লাগে। এক্সাইটমেন্ট, থ্রিল। শিকারের চোখে মুখে অস্বস্ত্বি, চিক চিক ঘাম, ফেঁসে যাওয়ার ভয়। হা...হা...হা, কি আনন্দ! গেইম অন। সংক্ষেপে এই আমার বিজনেস। খুব ক্রিয়েটিভ কাজ। প্রচণ্ড মাথা ঘামাতে হয়েছে প্রথম দিকে। একটা ইনোভেটিভ বিজনেস দাঁড় করানো তো আর চারটিখানি কথা না। এখন অবশ্য আর অতোটা মাথা ঘামাই না। সাদা পোশাকে ইনফরমার ঘোরাফেরা করে শহরে। ওরাই তথ্য এনে দেয়। সামনের মাসেই ভাড়া অফিস ছেড়ে দিয়ে নিজস্ব অফিসে উঠব। রিক্রুটমেন্টও প্রায় শেষের পথে। এই যাহ! আমার নামটাই তো বলা হয়নি।

আমার অনেকগুলো নাম। ব্যবসার স্বার্থে এটুকু তো করতেই হয়। আপনি নাহয় আমাকে মন্টি বলেই ডাকুন। ব্যবসা? আহা, সবুর করুন না একটু। এতো অধৈর্য হলে কি করে হবে। সব বলবো। তার আগে এক কাপ চা হয়ে যাক, নাকি? দুধ বেশি, চিনি কম। আমার আবার ওই একটু আকটু ডায়বেটিস। বর্ডার লাইনে। হাঁটাহাঁটি চলছে। বোঝেনই তো, বয়স হচ্ছে। কি বললেন? গুছিয়ে বলবো? আচ্ছা, আচ্ছা ঠিকাছে, বলছি।

টার্গেট কে হবে এটা ঠিক করতে আমাকে আর নিকোকে বেশ খাটতে হয়েছে শুরুতে। আমাদের প্রথম শিকারের গল্পটাই বরং বলি। তা বছর তিনেক আগের কথা। তখন মাত্র একজন ইনফরমার ছিলো আমাদের। তার নাম দেয়া যাক জুলি। বাইশ বছরের চটপটে মেয়ে। শ্যামলা রঙ, বুদ্ধিদীপ্ত তীক্ষ্ণ চোখ। তো জুলিকে আমরা বুঝিয়ে দিই আমাদের টার্গেটের ধরণধারণ। তারপর ও কাজে নেমে পড়ে। আমাদের প্রথম টার্গেট ছিলো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। কি অবাক হচ্ছেন? শোনেন, আপনাকে বলি। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকগুলোকে বাইরে থেকে যতো বড় বুদ্ধিজীবীই মনে হোক না কেন, খবর নিয়ে দেখুন - বেশিরভাগই সেক্সুয়ালি ফ্রাস্টেটেড; পার্ভার্ট একেকটা। এই যাহ! ভাষার ব্যবহারটা একটু এদিকওদিক চলে যাচ্ছে। কি করব বলুন। ভেতরের খবরাখবর সব যখন জেনে ফেলেছি, তখন আর সম্মানটা কি করে রাখি। তবে সবাই খারাপ না। সত্যিকারের মিউমিউ বুদ্ধিজীবীও কিছু আছে। তারা সরকারের পক্ষেও না, আবার জনগণের পক্ষেও না। মাঝামাঝি একটা জায়গায় থেকে পত্রপত্রিকায় মিউমিউ করে।

যাকগে, যা বলছিলাম। জুলিকে কাজ দেয়ার তিন দিনের মাথায় ও খবর এনে দিল। এ শহরের সবচেয়ে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। নাম বরকতুল ইসলাম। বরকত সাহেবের নামের মধ্যে ইসলাম থাকলেও তার কাজে কর্মে ইসলামের ছিটেফোটাও নেই। প্রায়ই কোনো না কোনো ছাত্রীকে কৌশলে তার চেম্বারে ডেকে এনে, দেহতাত্ত্বিক জ্ঞান দানের চেষ্টা করেন। গায়ের এখানে ওখানে হাত দিয়ে ভালোমন্দ খোঁজ খবর নেন। আমরাও তার খোঁজ নিলাম। জুলি জানালো - স্ত্রী আর দুই ছেলেকে নিয়ে বরকত সাহেব বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে থাকেন। তার স্ত্রী একটা এনজিও-র কমিউনিকেশান হেড। দুই ছেলের একটা এবার বুয়েটে মেকানিকালে ভর্তি হয়েছে। আরেকটা নটরড্যামে দ্বাদশ শ্রেণিতে। জুলির দেয়া প্রাথমিক ইনফরমেশনের উপর ভিত্তি করে কাজ শুরু করতে বললাম নিকোকে।

আচ্ছা, নিকোর সাথে আমার পরিচয়ের গল্পটা আগে বলি। বছর তিনেক আগে আমি যখন আমার এই ইনোভেটিভ বিজনেস প্ল্যানটা এক্সিকিউট করার কথা ভাবি। তখন আমার একজন হ্যাকারের দরকার হয়ে পড়ে। আমার গেমার বন্ধু সুজিতকে বলি আমাকে একটা চৌকষ হ্যাকার জোগাড় করে দিতে। সুজিতই সন্ধান দেয় নিকোর। নিকো বড় লোকের বখে যাওয়া সন্তান। তখন কেবল নর্থসাউথের সিএসই থেকে সদ্য পাশ করে বেরিয়েছে, কোথাও জয়েন করেনি। ওর বাপ একটা ব্যাংকের এমডি। অগাধ টাকাপয়সা। ছেলে আর বউয়ের দিকে তেমন নজরটজর দেয়ার সময় পায়নি জীবনে। তাই সবাই নিজের মতো চলে। নিকোর মা করে সমাজসেবা। আর নিকো করে নেশা। করে মানে তখন করতো, এখন আর করে না। আমিই ওকে ডেকে একদিন হাতে জীবনের মিনিং ধরিয়ে দিয়েছি। তবে হুট করে না, ধীরে ধীরে। প্রথম ক’দিন দূর থেকে অবজার্ভ করেছি। তারপর আস্তে আস্তে ঘনিষ্ট হয়েছি। দিনের পর দিন ওর হৃদয়ের দুর্বল এলাকার সন্ধান করেছি। একসময় নিকো আমার কাছে একটু একটু করে নিজেকে মেলে ধরেছে। ওর আনন্দ-বেদনার-হতাশার কথা বলেছে। আমাকে বড়ো ভাইয়ের মতো আপন করে নিয়েছে।
নিকো আমাকে বলতো, মন্টি ভাই। কিচ্ছু ভাল্লাগে না। আমি বলতাম, আরে রাখো মিয়া। ভালো লাগবে। তোমারে নিয়া আমার প্ল্যান আছে।

এখন তো নিকোই আমার ডান হাত। নিকোর আন্ডারে দশজনের একটা টিম আছে। আগামীকাল আরো পাঁচ জনকে রিক্রুট করবো আমরা। বেশ বড় প্ল্যান নিয়ে খেলতে হবে এবার। যা বলছিলাম, জুলির দেয়া প্রাথমিক তথ্য নিকোকে দিয়ে দিলাম। তারপর বললাম, নিকো সময় নিয়ে কাজ করো। বরকত সাহেবের সব তথ্য চাই। শালার ফুটানি বের করে দিতে হবে।
নিকো বলল, মন্টি ভাই। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। এটা আমাদের প্রথম প্রজেক্ট। আমি জান লাগায়া দিব।

নিকো সত্যিই জান লাগিয়ে কাজ করেছিল। মাত্র দুই দিনের মাথায় রাজ্যের তথ্য হাজির করেছিল আমার সামনে। জুলিকে পাঠিয়ে কৌশলে বরকত সাহেবের রুমে ক্যামেরা সেট করে এসেছিল। ল্যাপটপের সামনে বসে দিনরাত এক করে কাজ করেছিল নিকো। অনেক অজানা তথ্য আমার হাতে দিয়েছিলো ও। ছাত্রীদের রুমে নিয়ে এসে বরকত সাহেবের এটাওটা ইঙ্গিতপূর্ণ ফুটেজ, ম্যাসেঞ্জার-হোয়াটসঅ্যাপ ইনবক্স, অনলাইন ব্রাউজ হিস্ট্রি, ব্যাংক একাউন্ট ইনফরমেশান, ক্ষমতাসীন পার্টির এক নেতার সাথে সেনসিটিভ কল রেকর্ডিং, আরো কতো কি। নিকো যখন সব তথ্য একটা হার্ডড্রাইভে করে আমাকে দিয়ে গেল, তখন নিজেকে মনে হচ্ছিলো জুলিয়ান এসেঞ্জ। কিন্তু না, আমাকে এতো পরপোকারী ভাববার দরকার নেই। আমি স্বপোকারী লোক। আইমিন, নিজের উপকারের কথাই ভাবি দিনরাত। হা...হা...হা। যাহোক, চা টা কিন্তু ভালো হয়েছিল। আরেক কাপ হবে নাকি? মনে আছে তো; দুধ বেশি, চিনি কম?

নিকোর দেয়া সব তথ্য উপাত্তগুলো আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। প্রয়োজনীয় সবকিছু প্রিন্ট করে বরকত সাহেবের ব্যক্তিগত ফাইল সাজালাম। এটা প্রথম কাজ ছিলো বলে এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিলো ভীষণ। এখন অবশ্য আর করে না। এখন জানি কোথাও কোনো ঝামেলা হবে না। সব স্মুথলি যাবে। প্রশিক্ষিত জনবল আছে। কারিগরি সক্ষমতা আছে। সুতরাং ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কি মনে হচ্ছে? ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং না?

কনফিডেনশিয়াল ফাইলটা সাজালাম এভাবে - প্রথমে বরকত সাহেবের স্যোশাল মিডিয়া একাউন্টের বিবরণ (পাসওয়ার্ডসহ), কবে কোন কোন মেয়ের সাথে ফ্লার্ট করেছেন তার স্ক্রিনশট, কয়েকজনের সাথে ন্যুড ছবি বিনিময়ের দু’একটা স্যাম্পল, তার রুমে আসা মেয়েদের সাথে আপত্তিকর ব্যবহারের ভয়েস ট্রান্সক্রিপশন ও বাজে অঙ্গভঙ্গির স্টিল ইমেজ, ব্রাউজ হিস্ট্রির স্ক্রিনশট যা দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি বিভিন্ন পর্ণসাইটের নিয়মিত কাস্টোমার, রাজনৈতিক নেতার সাথে শিক্ষকদের গ্রুপিং বিষয়ক গোপন কথাবার্তার ভয়েস ট্রান্সক্রিপশন, সাঁওতালদের নিয়ে তার সর্বশেষ রিসার্স পেপারে প্লেজারিজমের প্রমাণ সম্পর্কিত তথ্য, সবগুলো ব্যাংক একাউন্ট ও কার্ড নাম্বার (পিনসহ), গত এক বছরের ট্রাঞ্জেকশনের বিবরণ, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের অবকাঠামো উন্নয়নের নামে ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়ার প্রমাণ, ডিপার্টমেন্টের কাজ ফাঁকি দিয়ে বিভিন্ন এনজিও-র সাথে নানান প্রজেক্টে কাজ করার তথ্য, ইত্যাদি বহু কিছু মিলিয়ে মোট ৮০ পৃষ্ঠার কনফিডেনশিয়াল ফাইল। এ কাজটা করতে আমার প্রায় এক সপ্তাহ লেগে গেল। কাজ শেষ হলে আমি আর নিকো ফাইলটা নিয়ে বসলাম। আরেকবার সব চেক করে নিলাম, যাতে কোথাও কোনো ফাঁক না থাকে। তারপর নিকোর দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বললাম, নিকো। লেটস বিগিন।

পরদিন সন্ধায় আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে হাজির হলাম। নিকো বাইরে ঘোরাফেরা করতে থাকলো। বরকত সাহেব তখন সান্ধ্যকালীন ক্লাস শেষ করে রুমে ঢুকলেন। কিছুক্ষণ পর আমি বরকত সাহেবের রুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করে দিলাম।
বরকত সাহেব বললেন, দরজা খোলা থাক সমস্যা নেই। কিন্তু আপনাকে তো ঠিক...
আমি বললাম, স্যার। আমাকে আপনি চিনবেন না। কিন্তু আমি আপনাকে চিনি। আমি একটা এনজিও থেকে এসেছি। স্যার, কেমন আছেন আপনি?
বরকত সাহেব হাসি মুখে বললেন, প্লিজ বসুন বসুন। আমি ভালো আছি। বলুন আমি কি করতে পারি আপনার জন্য?

আপনি বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না। বরকত সাহেবের মিষ্টি মধুর ব্যবহার দেখে আমার সেদিন ভীষণ হাসি পাচ্ছিলো। কিছুক্ষণ পর উত্তেজনায় যার হার্ট এটাক হওয়ার মতো অবস্থা হবে, তার এমন মেকি ভদ্র ব্যবহারে খুব কষ্টে সেদিন হাসি চেপে রেখেছিলাম।

আমি বললাম, স্যার। আমি আসলে একটা সংস্থা চালাই। আমাদের একটা নতুন প্রোজেক্টের কাজ শুরু হবে শীঘ্রই। আপনি তো স্যার বিভিন্ন এনজিও-কে নানা প্রোজেক্টে এসিস্ট করে থাকেন। আমরা চাচ্ছিলাম আমাদের একটা ফাইলের উপর চোখ বুলিয়ে যদি একটা অপিনিয়ন দিতেন? আইমিন, আপনাকে প্রোজেক্টের এডভাইজর হিসেবে চাচ্ছিলাম আর কি? মানে স্যার, আপনার যদি সময় থাকে।

আমার বিনয় দেখে বরকত সাহেব একেবারে বিগলিত হয়ে গেলেন। দেখুন, আমি কিন্তু সরাসরি বরকত সাহেবের ফাইলটা তার হাতে দিয়ে তাকে ভড়কে দিতে পারতাম। কিন্তু সেটা করলে শিকার নিয়ে খেলার মজাটা আর থাকতো না। তাইতো প্রথমে একটা টোপ দিয়ে শিকারের চোখ-মুখের এক্সপ্রেশান দেখছিলাম। দারুণ এক অনুভূতি।

আমার কথা শুনে বরকত সাহেব মাথা নাড়লেন। মুখে একটা মুচকি হাসি ফুটিয়ে বললেন, আসলে আমি তো এখন অনেকগুলো কাজের সাথে এনগেজড হয়ে আছি। এই মুহুর্তে ঠিক... তবে আপনাদের প্রজেক্ট ওভারভিউ আর আউটলাইনটা যদি দেখাতেন তাহলে হয়তো কিছু বলতে পারতাম।
আমি বললাম, অবশ্যই স্যার। এই যে দেখুন।
বরকত সাহেবের গোপন তথ্য সম্বলিত ৮০ পৃষ্ঠার কনফিডেনশিয়াল ফাইলটা তার হাতে দিলাম। বরকত সাহেব হাসিমুখে হাত বাড়িয়ে নিলেন। আমি উনার চেহারার রঙ বদলে যাওয়ার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছি।
ফাইলটা খুলে বরকত সাহেব বসা থেকে এক লাফে দাঁড়িয়ে গেলেন। বললেন, একি! এ এ এটা কি? কোথা থেকে পেয়েছেন আপনি?
আমি বললাম, স্যার। উত্তেজিত হবেন না। চুপ করে বসে পুরো ফাইলটাতে একবার চোখ বুলিয়ে নিন। এই মধ্যবয়সে এসেও যা কান্ড করছেন আপনি। দেখুন সব ঠিক আছে কিনা। নাকি আমরা কোনো কিছু মিস করে গেছি?

বরকত সাহেবের চোখেমুখে অস্বস্তি। ফর্সা মুখটা একেবারে লাল টকটক করছে। তিনি এসি রুমে বসেও ঘামতে শুরু করেছেন। একের পর এক পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন। অবাক বিস্ময়ে একবার আমার দিকে তাকাচ্ছেন আর একবার নিজের কৃতকর্মের দিকে। উনার নার্ভাসনেস দেখতে আমার দারুণ লাগছিলো। তবু বেচারা যেন আতঙ্কে হার্ট-এট্যাক না করে, সেজন্য তাকে আশ্বস্ত করে বললাম, ভয় পাবেন না। আমি পুলিশের লোক না। আপনি ঠাণ্ডা মাথায় ফাইলটা দ্যাখেন। এটা আপনার জন্যই তৈরি করা।

বরকত সাহেব - ঢাকার সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জনাব বরকতুল ইসলাম - ফাঁদে আঁটকে গেছেন। তিনি এসি রুমে বসে প্রচণ্ড ঘামছেন, লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেছে। চোখেমুখে অসস্ত্বি, ফেঁসে যাওয়ার ভয়। ফাইলটা বন্ধ করে দু’হাতে মুখ ঢেকে মাথা নিচু করে রইলেন বরকত সাহেব। তারপর শুষ্ক খসখসে গলায় জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কত টাকা চান বলুন? আমি দিতে রাজি আছি।

ঠিক এই মুহুর্তটা। কি বলবো আপনাকে? ঠিক এই মুহুর্তটার জন্যই আমি অপেক্ষা করে থাকি। শিকারের চোখে মুখে ভয়। নিজের কর্মফল থেকে বাঁচার আকুতি। আহা! এ এক অবিস্মরণীয় মুহুর্ত। অহংকারীর সব অহংকার চূর্ণ করে দেয়াতেই আনন্দ আমার। হা...হা...হা।

আমি উচ্চস্বরে হেসে উঠলাম। বললাম, ধীরে... বরকত সাহেব... ধীরে। আমাকে দেখে কি আপনার মনে হয় আমি ব্ল্যাকমেইল করে টাকা নেয়ার মতো লোক? আর তাছাড়া আপনার ব্যাংক একাউন্ট নাম্বার, পিন সবকিছুই তো আমি জানি। চাইলেই কি টাকাপয়সা ট্রান্সফার করে নিতে পারতাম না? আমাকে আপনি এতো ছোটলোক ভাবলেন।
বরকত সাহেব বিপাকে পড়ে গেলেন। বললেন, আপনি কে? কি চান আমার কাছে?
আমি হাসতে হাসতে বললাম, আমি কে সেটা বড়ো কথা না। মনে করেন আমি গরীবের রবিনহুড। হা...হা...হা। আমি চাই আপনার বন্ধুত্ব আর কন্ট্রিবিউশন। ফাইলটা আপনার কাছেই থাক। এরকম পুরোনো তথ্য কোনো কিছু ভুলে গিয়ে থাকলে আমাদের জানাবেন। আমাদের কাছে আপনার মহৎ কর্মের সব রেকর্ড আছে। কার সাথে কখন কি করেছেন – সব একদম দিন তারিখ অনুযায়ী সাজানো আছে।
আমার কথা শুনে বরকত সাহেব আরো ভড়কে গেলেন।

আমি বললাম, আজকে আমার সময় নেই আমি উঠবো। আপনি আজ থেকে আমাদের আজীবন সদস্য হয়ে গেলেন। আমার সাথে আর আপনার দেখা হবে না। আমার লোক আপনাকে প্রতি মাসের পাঁচ তারিখের ভেতর একাউন্ট নাম্বার মেইল করবে। আপনি একাউন্ট নাম্বার হাতে পাওয়ার দুই দিনের মধ্যে পাঁচ লাখ টাকা জমা করে দেবেন। আর এরপর প্রতি মাসের দশ তারিখের ভেতর পঞ্চাশ হাজার টাকা করে জমা করতে থাকবেন। আপনি শিক্ষক মানুষ, এজন্য আপনার কন্ট্রিবিউশনটা ভেবেচিন্তে অনেক কমিয়ে দিয়েছি। এরপরও যদি কোনো মাসে মিস করে যান, তাহলে পরবর্তীতে যা কিছু ঘটবে তা কিন্তু আপনাকেই সামলাতে হবে। মনে থাকবে?
বরকত সাহেব হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না।
আমি চেয়ার ছেড়ে উঠলাম। বললাম, ঠিকাছে চলি তাহলে। ভালো থাকবেন। আর কোনো আপত্তি থাকলে জানাবেন। আপনার কনফিডেনশিয়াল ফাইলটা আমি প্রিন্ট মিডিয়া আর নিউজ চ্যানেলে দিয়ে দেব। বাকিটা আপনি সামলাবেন। আমি আবার শিক্ষকদের উপর জোরাজুরি করি না। হা...হা...হা।

ব্যাস! আমার কাজ শেষ। দেখলাম বরকত সাহেবের চোখ বেয়ে ঝর্ণাধারা নামছে। বাইরে বেরিয়ে নিকোকে বললাম, নিকো। পাইলট প্রোজেক্ট সাকসেসফুল। কাল থেকে ডিটেইল প্ল্যান অনুযায়ী কাজে নেমে পড়তে হবে। নিকোর চোখে তখন খুশির ঝিলিক। নিকো বলল, জুলিকে কি ডাকবো মন্টি ভাই? আমি বললাম, ডাকো। চলো আজকের দিনটা সেলিব্রেট করি।

এটাই ছিলো আমাদের প্রথম শিকারের গল্প। এ তিন বছরে আমাদের মান্থলি কন্ট্রিবিউটর দাঁড়িয়েছে মোট ১২৫ জন। এর মধ্যে আছে শিল্পপতি, রাজনীতিবিদ, সচিব, পুলিশ কমিশনার, মডেল, অভিনেত্রী, সাংবাদিক, শিক্ষক, টিএনও-সহ সমাজের নানা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গ। কতো যে মজাদার মশলাদার গল্প আছে এদের জীবনে, আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না। মূলত যারা নিজেদের মহান দেশপ্রেমিক, জনদরদী, খ্যাতিমান হিসেবে জাহির করে, এদেরকেই বেছে বেছে আমরা টার্গেট করি। এদের অতীত আর বর্তমান তন্য তন্য করে খুঁজে আনি দুর্লভ সব তথ্য। এটাই আমাদের কাজ। মুখোশের আড়ালের মানুষটাকে খুঁজে বের করা। আর তারপর একদিন তার সামনে বসেই তার মুখোশটা এক টানে ছিঁড়ে ফেলা।
আমাদের ইনফরমাররা ছড়িয়ে আছে শহরের সবখানে। দশজনের একটা হ্যাকিং টিম আছে আমাদের, যার হেড নিকো। আগামীকাল আরো পাঁচ জন যুক্ত হবে এই দলে। ডেটা আনালাইসিস আর প্রজেন্টেশনের জন্য আলাদা টিম কাজ করে। আছে ডেটা একুরেসি চেক করার জন্য পাঁচ জনের একটা বিশেষ দল। সবকিছু ফাইনাল হলে কনফিডেনশিয়াল ফাইলগুলো চলে আসে আমার টেবিলে। আমিই ঠিক করি পরবর্তী শিকার। তারপর নিকোকে বলি, নিকো। লেটস প্লে।

সামনের মাসেই আমরা আমাদের নিজস্ব ভবনে যাচ্ছি। আরো বড় পরিসরে শুরু হবে কাজ। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় শহরগুলোতে কাজ আরম্ভ হবে। রিক্রুটমেন্ট প্রায় শেষ। কি ভাবছেন? আমরা খারাপ লোক? না না। যতটা খারাপ ভাবছেন, আমরা কিন্তু অতোটা খারাপ নই। আমাদের কাজের একটা নীতি আছে। ফেসবুকের মতো আমরা আপনার ব্যক্তিগত তথ্য চুরি করে থার্ডপার্টি কারো কাছে তো সাপ্লাই করছি না কিংবা কোনো নির্বাচনেও হস্তক্ষেপ করছি না। বললামই তো, আমাদের এথিকস আছে। আমরা আপনার গোপনীয় সব তথ্য-উপাত্ত, আপনার কাছেই বিক্রি করি। এটা মনে করেন, সমাজের প্রতি আপনার একটা কন্ট্রিবিউশান। যে পাপ আর দুই নাম্বারি করেছেন তার খানিকটা প্রায়শ্চিত্তও বলতে পারেন। কি, ঠিক বলিনি?

এবার কিন্তু আপনার পালা। জীবনে কি কি অন্যায় করেছেন তা ঝটপট মনে করে ফেলুন। আর প্রার্থনা করতে থাকুন যেন আমাদের ইনফরমারদের কেউ আপনার খোঁজ না পায়।

কি? ভয় পেয়ে গেলেন নাকি? হা...হা...হা।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই জুলাই, ২০২০ দুপুর ১:৫১
২২টি মন্তব্য ২১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকের ব্লগার ভাবনা: ব্লগ জমছেনা কেন? এর পেছনে কারণ গুলো কি কি? ব্লগাররা কি ভাবছেন।

লিখেছেন লেখার খাতা, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ৮:৩৫


সুপ্রিয় ব্লগারবৃন্দ,
আম পাকা বৈশাখে বৈশাখী শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করছি। কাঠফাটা রোদ্দুরে তপ্ত বাতাস যেমন জনপ্রাণে একটু স্বস্তির সঞ্চার করে, ঠিক তেমনি প্রাণহীন ব্লগ জমে উঠলে অপার আনন্দ... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঢাকার ২৭ নম্বর সমুদ্রবন্দর থেকে

লিখেছেন অপু তানভীর, ১৩ ই জুন, ২০২৪ রাত ১১:০০

চারটার দিকে বাসায় ফেরার কথা ছিল । তবে বৃষ্টির কারণে ঘন্টা খানেক পরেই রওয়ানা দিতে হল । যদিও তখনও বৃষ্টি বেশ ভালই পড়ছিল । আমি অন্য দিন ব্যাগে করে রেইনকোন... ...বাকিটুকু পড়ুন

মুক্তিযুদ্ধা কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।

লিখেছেন হাসান কালবৈশাখী, ১৪ ই জুন, ২০২৪ রাত ৩:৩২

কোটা ব্যাবস্থা কাউকে বঞ্চিত করছে না।
সকল যোগ্যতা জিপিএ-্র প্রমান দিয়ে, এরপর প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, সেকেন্ডারি।
এরপর ভাইবা দিয়ে ৬ লাখ চাকুরি প্রার্থি থেকে বাছাই হয়ে ১০০ জন প্রাথমিক নির্বাচিত।

ধরুন ১০০... ...বাকিটুকু পড়ুন

নিউ জার্সিতে নেমন্তন্ন খেতে গিয়ে পেয়ে গেলাম একজন পুরনো ব্লগারের বই

লিখেছেন খায়রুল আহসান, ১৪ ই জুন, ২০২৪ দুপুর ১২:৩৭

জাকিউল ইসলাম ফারূকী (Zakiul Faruque) ওরফে সাকী আমার দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধুর ঘনিষ্ঠ বন্ধু; ডাঃ আনিসুর রহমান, এনডক্রিনোলজিস্ট আর ডাঃ শরীফ হাসান, প্লাস্টিক সার্জন এর। ওরা তিনজনই ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের একই... ...বাকিটুকু পড়ুন

বেনজীর তার মেয়েদের চোখে কীভাবে চোখ রাখে?

লিখেছেন বিচার মানি তালগাছ আমার, ১৪ ই জুন, ২০২৪ বিকাল ৩:০৬


১. আমি সবসময় ভাবি দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর যারা মিডিয়ায় আসার আগ পর্যন্ত পরিবারের কাছে সৎ ব্যক্তি হিসেবে থাকে, কিন্তু যখন সবার কাছে জানাজানি হয়ে যায় তখন তারা কীভাবে তাদের স্ত্রী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

×