কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?
দ্বিতীয় পর্ব: মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিভাজন এবং অসম প্রতিযোগিতা
একটি শিশুর শিক্ষাজীবন শুরু হয় প্রাথমিক স্তর থেকে। কিন্তু মাধ্যমিক পর্যায়ে পৌঁছানোর পর থেকেই শুরু হয় এক নতুন বিভাজন। একই দেশের একই বয়সী শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে প্রবেশ করে, যেখানে তাদের জ্ঞান, দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ সুযোগ একে অপরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা হয়ে যায়
ক্লাস ৬ থেকে ১০ পর্যন্ত মাধ্যমিক এবং একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত উচ্চ মাধ্যমিক। এই সময়টিই একজন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। কিন্তু এই স্তরেই তৈরি হচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈষম্য।
মাধ্যমিক শিক্ষায় কতগুলো আলাদা পথ?
বাংলাদেশে মাধ্যমিক পর্যায়ে একজন শিক্ষার্থী কোন পথে যাবে তার উপর নির্ভর করে তার ভবিষ্যতের সুযোগ।
বর্তমানে রয়েছে:
সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়
বাংলা মাধ্যম
ইংরেজি ভার্সন
ইংরেজি মিডিয়াম
ও লেভেল এবং এ লেভেল
বিদেশি কারিকুলাম ভিত্তিক স্কুল
মাদ্রাসা শিক্ষা (দাখিল)
কারিগরি ও ভোকেশনাল শিক্ষা
উন্মুক্ত শিক্ষা ব্যবস্থা
প্রশ্ন হচ্ছে—
একই বয়সী একটি শিশু যখন একই দেশের নাগরিক, তখন তার শিক্ষার ভিত্তি কেন এত ভিন্ন হবে?
একজন শিক্ষার্থী বাংলা মাধ্যমে যে বিষয় ও পদ্ধতিতে শিখছে, আরেকজন ইংরেজি মিডিয়ামে যে দক্ষতা অর্জন করছে—দুজনের মধ্যে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে মাধ্যমিক স্তরেই।
সমস্যা কোথায়?
১. শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব
একজন বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থী মাধ্যমিক শেষ করে উচ্চ মাধ্যমিকে উঠতে গেলে যে ধরনের বিষয়, দক্ষতা এবং প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়, অনেক সময় তার সাথে আগের শিক্ষার সামঞ্জস্য থাকে না।
ফলে দেখা যায়—
মাধ্যমিকে ভালো ফলাফল করা অনেক শিক্ষার্থী উচ্চ মাধ্যমিকে গিয়ে নতুন পরিবেশ, নতুন পদ্ধতি এবং নতুন পাঠ্যক্রমের সাথে তাল মিলাতে পারে না।
কারণ তারা শুধু পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে, বাস্তব জ্ঞান এবং প্রয়োগমূলক দক্ষতার জন্য নয়।
২. একই দেশের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসম প্রতিযোগিতা
একজন ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষার্থী ছোটবেলা থেকেই:
ইংরেজিতে কথা বলা
প্রেজেন্টেশন
গবেষণামূলক চিন্তা
বিশ্লেষণ ক্ষমতা
প্রযুক্তি ব্যবহার
এসবের সাথে পরিচিত হয়।
অন্যদিকে অনেক বাংলা মাধ্যম শিক্ষার্থী:
মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা
পরীক্ষামুখী প্রস্তুতি
গ্রামার নির্ভর ভাষা শিক্ষা
বাস্তব প্রয়োগের অভাব
এর মধ্যে আটকে থাকে।
ফলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি, চাকরি এবং আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শুরুতেই একটি বড় ব্যবধান তৈরি হয়।
৩. ভাষা শিক্ষায় ভুল পদ্ধতি
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার একটি হলো ইংরেজি ভাষায় যোগাযোগ দক্ষতা।
আমরা অনেক বছর ধরে ইংরেজি শিখছি, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী সাবলীলভাবে কথা বলতে পারে না।
এর একটি বড় কারণ হলো—
আমরা ভাষাকে ব্যবহার করার পরিবর্তে শুধুমাত্র নিয়ম মুখস্থ করার দিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি।
একটি শিশু যখন মাতৃভাষা শেখে, তখন কি সে আগে গ্রামার শেখে?
সে প্রথমে শুনে, বুঝে, কথা বলে, তারপর ধীরে ধীরে ভাষার নিয়ম আয়ত্ত করে।
কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে:
Tense
Pronoun
Voice
Narration
এসব নিয়ম আগে শেখানো হয়, কিন্তু বাস্তব কথোপকথনের সুযোগ কম থাকে।
ফলে শিক্ষার্থী মনে করে—
"ভুল হলে সমস্যা হবে"
এই ভয় তাকে কথা বলা থেকে দূরে রাখে।
৪. উচ্চ মাধ্যমিকে যাওয়ার পথে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া
মাধ্যমিক পরীক্ষায় বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এসে সেই সংখ্যা কমে যায়।
এর পেছনে রয়েছে:
আর্থিক সমস্যা
মানসম্মত প্রতিষ্ঠানে সুযোগের অভাব
শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে না পারা
পরিবার থেকে পড়াশোনা বন্ধ করে দেওয়ার চাপ
কর্মজীবনে প্রবেশের প্রয়োজন
অর্থাৎ মাধ্যমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিকের পথেই অনেক শিক্ষার্থী পিছিয়ে পড়ে।
এখানে প্রশ্ন আসে—
একটি দেশের ভবিষ্যৎ জনশক্তির একটি বড় অংশ যদি মাধ্যমিকের পরেই দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে সেই দেশের দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে কীভাবে?
৫. কারিগরি শিক্ষার অবমূল্যায়ন
বাংলাদেশে ভোকেশনাল, পলিটেকনিক এবং কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো—
এই ধারাকে এখনো অনেক পরিবার দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষা হিসেবে দেখে।
অথচ বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে:
টেকনিশিয়ান
ইঞ্জিনিয়ারিং সহকারী
দক্ষ কারিগর
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ
তাদের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
আমাদের দেশে শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় একজন কারিগরি শিক্ষার্থীও অনেক সময় মূলধারার শিক্ষার্থীর সাথে সমান সুযোগ পায় না।
তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রশ্নগুলো কী?
একজন শিক্ষার্থী কি শুধুমাত্র পরীক্ষার নম্বরের জন্য শিক্ষা নিচ্ছে?
নাকি সে বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত হচ্ছে?
একজন শিক্ষার্থী কি:
সমস্যা সমাধান করতে পারছে?
নিজের চিন্তা প্রকাশ করতে পারছে?
প্রযুক্তি ব্যবহার করতে পারছে?
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতিযোগিতা করতে পারছে?
নাকি শুধু বইয়ের অধ্যায় শেষ করছে?
শেষ কথা
শিক্ষা শুধু সার্টিফিকেট অর্জনের মাধ্যম নয়।
শিক্ষা হলো একটি জাতির ভবিষ্যৎ তৈরি করার কারখানা।
যদি একই বয়সের শিশুদের জন্য শুরু থেকেই আলাদা আলাদা মান, আলাদা সুযোগ এবং আলাদা দক্ষতা তৈরি হয়, তাহলে ভবিষ্যতে সমাজে বিভাজন তৈরি হবেই।
একটি দেশের উন্নয়ন নির্ভর করে তার মানবসম্পদের উপর।
তাই প্রয়োজন এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থা—
যেখানে মাধ্যম, প্রতিষ্ঠান বা পরিবারের আর্থিক অবস্থার কারণে নয়, বরং প্রত্যেক শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা অনুযায়ী এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে।
(চলবে...)

সর্বশেষ এডিট : ২৯ শে জুলাই, ২০২৬ রাত ২:০৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


