somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিঃসঙ্গ মহাত্মা ও এক রক্ষী

১৩ ই অক্টোবর, ২০১৬ দুপুর ১২:৩৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



কটিতে চলেছে প্রায় তিনশো বছরের পরাধীনতার শৃঙ্খল । রাত প্রহালেই উদিত হবেস্বাধীন ভারতের নতুন সূর্য । রাজধানী দিল্লি সহ প্রহর গুনছে পরম আকাঙ্ক্ষিত লগ্নের । পিছিয়ে নেই শহর কলকাতাও । কিন্তু যন্ত্রণায় ছটফট করছেন এই রুপান্তরের প্রধান নায়ক । প্রশ্ন করছেন নিজেকে , হাজার হাজার তাজা প্রানের বিনিময়ে যে স্বাধীনতা এলো ,যে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি ` জাতির জনক ` সেই লক্ষ্য কি পূরণ হলো? তাঁর নিজের কাছে এর উত্তর 'না' ।

খণ্ডিত এই স্বাধীনতআ তো তিনি চাননি মহাত্মা । অথচ পরিস্থিতির এই বাধ্যবাধকতায় তাঁকেও মেনে নিতে হলো দেশভাগ । যন্ত্রনায় রক্তক্ষরণ হচ্ছে তাঁর হৃদয়ে । তাই তিনি দিল্লির মূল অনুষ্ঠানে নেই । স্বাধীনতা উদযাপনের আনন্দ উৎসব থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকী বিনিদ্র রজনী যাপন করছেন কলকাতায় বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিলে । নিঃসঙ্গ নায়ক পায়চারি করছেন অন্ধকার ঘরে । তাঁর সেই যন্ত্রনআর সাক্ষী ছিলেন একজনই । তিনি মহাত্মার দেহরক্ষী এক বাঙালি পুলিশ অফিসার , নাম হেমন্ত সেনগুপ্ত ।

১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্টের রাত । হায়দারি মঞ্জিল অন্ধকার গান্ধীর ঘর । সারাদিন কিছুই মুখে তোলেননি শীর্ণকায় বৃদ্ধ । চিত্তশুদ্ধির জন্য অনশনব্রতী তিনি ।এই ঘরের পাশ থেকে উঁকি দিয়ে তাঁকে দেখলেন হেমন্তবাবু । বাপুর মনের এই যন্ত্রণার স্বরূপ অনেকটাই হয়তো জানা হেমন্তবাবুর । কলকাতার পথে পথে হিন্দু-মুসলমানের ঐক্য আর আত্মহারা আনন্দ অবশ্য বাপু নিজেও রাতের অন্ধকারে গোপনে দেখে এসেছেন । দেহরক্ষী হওয়ার সুবাদে এ সবেরই সাক্ষী হেমন্ত সেনগুপ্ত । বাপুজী শান্তি পাচ্ছেন না । অন্যের অনেকের আনন্দে আজ আর সামিল হতে পারছেন না । স্বাধীনতার প্রহরেও অনশনরত তিনি । শোনা যাচ্ছে , নেহরু নাকি বলেই দিয়েছেন , সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে গেছে । আর করার কিছু নেই । ১৩ আগস্ট থেকে টানা ২৬ দিন বাপুর সঙ্গে ছায়ার মত লেগে ছিলেন হেমন্তবাবু । সেই ১৯৪৭-এর ১৩ আগস্ট , সেদিন বাপু এলেন বেলেঘাটার হায়দারি মঞ্জিলে ।

কেমন ছিল সেই বাড়ি ? ' দ্য মিরাকল অফ ক্যালকাটা ' গ্রন্থে মনুবেন গান্ধী লিখেছেন,' বাড়িটি একেবারে মলিন , ধূলোয় ধূসর । কোন সুযোগ-সুবিধা নেই । চারদিক খোলা , ফলে বহিরাগতরা চাইলেই ভিতরে প্রবেশ করতে পারে । দরজা জানলা ভাঙা । বাড়িটির মাত্র একটা শৌচালয় । ইঞ্চিতে ইঞ্চিতে পুর ধূলোর চাদর ।

১৯৪৬-এর দাঙ্গার ক্ষত তখনও শুকয়নি । স্বাধীনতার এক বছর আগে , ১৬ আগস্ট থেকে কয়েক দিনের দাঙ্গায় অজস্র মানুষের মৃত্যু হয়েছিল এই কলকাতায় । ঘরছাড়া হয়েছিল লক্ষাধিক মানুষ । তখন কংগ্রেস ও মুসলিম লিগের দড়ি টানাটানি চরমে । তার একবছর পর স্বাধীনতা ও দেশভাগ আসন্ন , তখন ফের কলকাতায় সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ।এই পরিস্থিতিতে বেলেঘাটার সেই ধূলোমলিন বাড়িতে এসেছিলেন মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধী । ১৩ আগস্ট ,১৯৪৭ । বাড়ির নাম হায়দারি মঞ্জিল । বাড়ির মালিকের নাম বৃদ্ধা বেগম আম্মা । ঠিকানা ১৫০ বি বেলেঘাটা মেন রোড । কাছেই আলোছায়া সিনেমা হল ।


বেলেঘাটায় তখন টানটান উত্তেজনা । গান্ধীজিকে ঘিরে নিরাপত্তা বলয় তৈরী করেছিল ক্যালকাটা পুলিশ । দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল অ্যাসিস্ট্যান কমিশনার হেমন্ত সেনগুপ্তকে । তাঁর উপরে পাঁচদিনের ভার ছিল । হায়দারি মঞ্জিল তখন মুখে মুখে হয়ে উঠেছিল গান্ধী ক্যাম্প ।বলা ভাল , স্বাধীন ভারতে তিনিই গান্ধী জির প্রথম দেহরক্ষী ।

গান্ধীজি শীর্ণকায়া , আস্তে আস্তে কথা বলেন । তবু তাঁর প্রতিটি শব্দ কত তেজোদ্দীপ্ত । চোখে এক অসামান্য দীপ্তি । প্রবীন চণ্ডী মনের পাতা উল্টে যান । বালক চণ্ডীর হাত ধরেন । উঠে আসে এমন টুকরো ছবি । জানলায় মাথা গুজে থাকতভিড়ে ঠাসা মানুষ । গান্ধীজি খাটো ধূতি পরে বসতেন । ঘরের দেওয়াল পিঠ দিয়ে । তাঁকে ঘিরে পরিষদরা ।মনুবেন ও আভা গান্ধী থাকতেন সর্বক্ষণ । থাকতেন বাপুর সচিব নির্মল বসু ।রোজ তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন মেটা । সামনের সারিতে এসে বসে পড়ল বালক চণ্ডী । গান্ধী জি তখন তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন ? না ,নিজে কখনও বলেননি । তবে অনেকবারই ছোট্ট ছেলেটির দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসেছেন । সে হাসি চণ্ডী সেনগুপ্তের ঘরে এক ভার্চুয়াল ফ্রেম বন্দি , ১০০ নম্বর বালিগঞ্জ গার্ডেনে যে স্মৃতিকথা পরিক্রমণ আহ্নিক গতির মতোই অনিবার্য ।

চণ্ডীবাবু গান্ধী জির সামনে গিয়ে বসে থাকতেন । বাপুর ছায়াসঙ্গী হেমন্ত সেনগুপ্তের পুত্রকে সবাই চিনে গিয়েছিলেন । বাপু কথা না বললেও নির্মল বসু ছোট্ট ছেলেটির সাথে কথা বলছেন টুকটাক ; কতকজন আদরও করছেন । তাঁদের সবার নামও জানা নেই চণ্ডীর । গান্ধীজির প্রতিমূহুতএর সঙ্গী ছিলেন হেমন্ত সেনগুপ্ত ।

খুবই নিয়মানুবর্তী ছিলেন বাপু । শেষ রাতে তিনি বিছানা ছাড়তেন আর সূর্যের আলো ফোটার আগে প্রার্থনা সেরে নিতেন বাড়ির ভিতরেই । তারপর পায়চারি । ফিরে এসে কিছুসময় ঘুমোতেন তিনি ।
উঠে ম্যাসাজ- স্নান ও প্রাতরাশ । এরপর তিনি হায়দারি মঞ্জিলের বাঁ-দিকের ঘরটায় গিয়ে বসতেন ।কত লোক আসতেন তাঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য । সুরাবর্দি থেকে রাজা গোপালচারি , সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ থেকে কৃপালনী- কত বিখ্যাত নাম সেই তালিকায় ।

কলকাতায় তখন অশান্তির আঁচ ।

মূললেখিকা:-পায়েল সামন্ত


অন্যঋচ উৎসব সংখ্যা
সর্বশেষ এডিট : ১৩ ই অক্টোবর, ২০১৬ দুপুর ১২:৩৮
১টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মঞ্জুর চৌধুরীর ছোট গল্প "নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি"

লিখেছেন মঞ্জুর চৌধুরী, ২৬ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১০:১৩

নভেম্বরের শেষ বৃষ্টি
মঞ্জুর চৌধুরী

নীরা কথাটা বিশ্বাস করতে পারছে না। তাঁর স্বামী আরমানের আরেক মেয়ের সাথে সম্পর্ক ছিল? এই আরমান কিনা সবসময়ে আবৃত্তি করতো "এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ, আমি কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গাদপি গরীয়সী

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১২:০৭



আমাদের সেই পুরনো ভিটেটার অস্তিত্ব  এখন আর নেই। তবে বুকের গহীনে ভিটেমাটির মায়াটুকু  ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। কত স্মৃতি, কত গান, কত গল্প-কোলাহল,  মান- অভিমান ! চাইলেই... ...বাকিটুকু পড়ুন

মারণঘাতক অটো রিক্সা

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ রাত ১:১৬



মারণঘাতক অটো রিক্সা এই ভিডিউটি দেখুন। এটি রাজধানী ঢাকা সহ সমগ্র দেশের প্রতিদিনের চিত্র। কি পরিমাণ মানুষ হত্যার সাথে জড়িত এই মারণঘাতক নামক অটো রিক্সা তার সঠিক পরিসংখ্যান জানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভারত কেন মক্কা চুক্তি নিয়ে শ্বাসকষ্টে ভুগছে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে চলতি মাসে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি যা মক্কা চুক্তি নামে পরিচিত। সবেমাত্র এতে বাংলাদেশকে যুক্ত করার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। যা এখনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

ময়নাদ্বীপের মাঝি

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ২৭ শে আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:২৭


(পদ্মানদীর মাঝী উপন্যাসের মূল চরিত্র ও প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত উত্তরকথা)

পদ্মা আর মেঘনার যেখানে বিয়ে হয়েছে, সেখান থেকে আরও গভীরে, বঙ্গোপসাগরের নোনা মোহনায় জেগে থাকা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×