স্যামুয়েল মলি্লক
অনেক চেষ্টাই তো করলি। কিছুই তো হলো না। এখানে থাকলে তো এ জীবনে আর নাতির মুখ দেখাবি না। দেখার সৌভাগ্যও হবে না। এখন দ্যাখ, বৌকে ঢাকা নিয়ে গিয়ে কিছু বিহিত করতে পারিস কিনা। কথাটি বলে মঈনের মা একটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেললেন। গত কয়েক বছর ধরেই তিনি হতাশার এক দীঘল সাগরে সাঁতরে বেড়াচ্ছেন।
মা গৃহিনী, বাবা স্কুল দপ্তরি। ডিগ্রি পাশধারী মঈন বাবার কষ্টে জমানো অর্থে ঝালকাঠির বাজারে দিয়েছে ছোট্ট মুদি দোকান। বৌ একই গাঁয়ের কিষাণীর মেয়ে জহুরা। পড়ালেখা সপ্তম শ্রেণি। এরপর ক্ষান্ত, এগোয়নি আর। এ ব্যাপারে কারো তাগাদাও ছিল না। হয়তো সুন্দরী জহুরার বিয়ে মঈনের সাথে ঠিক হয়েই ছিল বলে। জহুরা নিজেও গুনতো বিয়ের প্রহর। চৌদ্দ বছর বয়সেই তার যৌবনের ষোলকলা প্রস্ফুটিত হলো। পনের বছর বয়সেই তাকে বসতে হলো বিয়ের পিঁড়িতে।
মঈন ও জহুরা ভেসে বেড়াত মেঘের ভেলায়। রঙিন প্রজাপতি ছুটোছুটি করছে এঘর-ওঘর। জহুরার সোহাগ আর দোকানের কর্মব্যস্ততা এ দুয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল মঈনের জীবন। ভোরের রৌদ্র আছড়ে পড়ত জহুরার রেশমী শরীরে। রাতের জোছনা বিছিয়ে দিত অনাবিল সুখের চাদর। কিন্তু যখন মঈনের মা জহুরার দেহে কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করলেন না তখন থেকেই অন্ধকার কুণ্ডলী পাকতে শুরু করল। গভীর রাত্রিতে শোনা যেত নদী ভাঙ্গনের শব্দ। পুষ্পকলি চাপা পড়ল লাঞ্ছনার পস্তর দানবের নিচে।
অগত্যা মঈন নত হলো। ঝালকাঠি থেকে বাক্স-পেটরাসহ সরাসরি ঢাকা। সূর্যের তীক্ষ্ন আলোকে সবুজ পাতা আবার নেচে ওঠে কিনা। যাদুর কোন জীয়নকাঠির ছোঁয়ায় আবার কবুতর ডানা মেলে কিনা। ভাড়া নিল মিরপুর মাজার রোডে সেমি পাকা একটি ঘর। কাজ পেল বাস টার্মিনালের এক কনফেকশনারিতে। মানুষ পরিবেশের দাসত্ব করে। মঈন ও জহুরাও মাজার রোডের যান্ত্রিক পরিবেশের সাথে নিজেদের দ্রুত খাপ খাইয়ে নিল।
তোর বৌ যদি এবার বাচ্চা না দিতে পারে, তোকে আবার বিয়ে দেব। মেয়ে ঠিক করাই আছে। মায়ের সাফ সাফ কথাটাই চক্কর দিচ্ছে মঈনের মাথায়। সে ভাবছে, চিকিৎসা মানেই ডাক্তারের শরণাপন্ন হওয়া। ডাক্তার মানেই পরীক্ষার দীর্ঘ ফর্দ। আর পরীক্ষা মানেই এক বস্তা টাকা। এই অভিজ্ঞতা তার ইতিমধ্যেই হয়েছে। ঝালকাঠির ডাক্তাররা তাকে ফতুর বানিয়ে ছেড়েছে। ঢাকায় কোন্ ডাক্তার দেখাবে তারও কোন দিশা পাচ্ছে না সে। লক্ষ্যবিহীন বাঙালী জাতির মতো সেও দিকবিদিক চড়কির ন্যায় ঘুরছে।
কনফেকশনারি থেকে তাড়াতাড়িই ঘরে ফিরল মঈন। এখনো সূর্য চোখ বোঁজেনি। দোকান থেকে ফিরতে ফিরতে প্রায়শঃই রাত দশটা সাড়ে দশটা বেজে যায়। জহুরা চৌকির এক কোণায় বসা। এক ভাবনার অতল গভীরে আত্মলীন। পিঠ ছাওয়া এক ঢাল কালো কেশ। 'জহুরা' বলে ডাক দিতেই চমকে পিছনে তাকাল সে। তুমি তো দেখি চিন্তার সাগরের ডুবুরী হয়ে যাচ্ছ। বাদ দাও তো মায়ের কথা। কালই তোমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছি। মিরপুর এক নম্বরে বসেন তিনি। শুনেছি বেশ ভালো ডাক্তার। জহুরা বলল 'নার্গিস আপার প্রস্তাবটা ভেবে দেখলে হয় না?'
পাশের ঘরেই থাকে নার্গিস। স্বামী ইসমাইল গ্যারেজে কাজ করত। এখন ট্রাক ড্রাইভার। নার্গিস বলেছে, জহুরার মতো তারও সমস্যা ছিল। পরবতর্ীতে মতিবাবার দাওয়াই খেয়ে সে তিন বাচ্চার জননী।'
ভাইজান, অনেক চেষ্টা করেছেন। অনেক খরচা করেছেন। আপাকে মতিবাবার কাছে লইয়া যান। ওনার খুব হাতযশ। 'আল্লাহ চাইলে ফুটফুটে বাচ্চা হইব' নার্গিস কথা বলতে বলতে মঈনের সামনে এসে বসল।
জহুরা বলল চল না, আপা যখন এত করে বলছে! মতি বাবার কাছ গিয়েই দেখি না। তাছাড়া পয়সা কড়িও নাকি কিছুই নেয় না। নার্গিস বলল 'হ ভাইজান, একবার গিয়া আপারে দেখান।' 'আচ্ছা দেখি' বলে মঈন উঠে দাঁড়াল। নার্গিস চলে গেলে মঈন বলল 'দু'দিনেই চেনা-জানাহীন একজনকে বিশ্বস্ত আপা বানিয়ে ফেলেছো! এদিকে আমি ডাক্তারের কাছে নাম লিখিয়ে এসেছি, কাল সন্ধ্যায় তোমাকে নিয়ে যাব।' 'উনি তো আর চলে যাচ্ছেন না। ফল না পেলে ওনাকে দেখানো যাবে। উনি তো কাছেই বসেন। সমস্যা তো নেই।' জহুরা মঈনকে বোঝাতে লাগল।
দুই
এই প্রথম জহুরা মঈনের সাথে বের হলো। ঢাকায় এসে একসাথে বের হওয়া হয়নি। জহুরা তার পিঠ ছাওয়া কালো চুল খোপা করল। অনেকদিন পর তার মনের সৈকতে সমুদ্রের ঢেউ খেলছে। বুকের আঙিনায় সূর্য নোঙর ফেলেছে। সুখপাখি ইশারায় ডাকছে অহর্নিশি। লাল-সবুজ সালোয়ার কামিজে সাজিয়েছে নিজেকে। মঈন জহুরাকে নিয়ে বাসে চড়ে সোজা চলে এলো গুলিস্তান। আবার বাসে করে বাবুবাজার। হেঁটে পার হলো মৈত্রী সেতু। ওপারে টেম্পো স্ট্যান্ড। হলুদ শর্ষে ক্ষেতের মাঝ দিয়ে চলে গেছে কালো রাজপথ। জহুরার মনে হলো ডানা মেলে উড়ে বেড়াই। নিঃশ্বাস নেই বুক ভরে। এক সময়তো শালিকের মতো উড়েই বেড়াত ডানা মেলে। খাড়াকান্দি বাজারে টেম্পো থেকে নেমে পড়ল দুজন। একটি ছোট ছেলেকে ডাক দিল মঈন। মতিবাবার কথা জিজ্ঞেস করতেই দেখিয়ে দিল দূরের দাঁড়ানো রিকশাগুলো। 'ঐ রিকশাগুলো যায় মতিবাবার দরগায়। এখান থেকে ঠিক তিন মাইল দূরে।' রিকশায় যেতে দুজনের বেশ ভালো লাগছে। বিয়ের পর এভাবে অনেক ঘুরেছে তারা। অনেকদিন পর গ্রামীণ পরিবেশ পেয়ে তাদের হৃদয় মন চঞ্চল হয়ে উঠল। দোলা খেতে লাগল এক অদভুত ভালো লাগায়।
নাহ্ তিন মাইল নয়, মঈনের মনে হলো প্রায় পাঁচ মাইল চলে এসেছে। জমিদার বাড়ির মতো বড় একটি বাড়ির সামনে রিকশা থামল। দুপাশে হলদে সর্ষে ক্ষেত। সাইনবোর্ড নেই কোথাও। তবে বাউন্ডারি দেয়ালে উপাসনালয়ের এনামেল পেইন্টিং। দরগা শরীফের মতো বড় গেট। মঈন ও জহুরা নেমে পড়ল রিকশা থেকে। ভাড়া মিটিয়ে দিল। বাউন্ডারি দেয়ালের কোনায় বটগাছ। বটগাছের নিচে আরো পাঁচ-ছয়টি রিকশা দাঁড়ানো। দোকান রয়েছে কয়েকটি। গেটের সামনে দাঁড়াতেই প্রহরী সালাম জানাল। বলল ভিতরে আসুন। ঐ যে দরজা বরাবর চলে যান। ভিতরে লোক আছে। জুতো খুলে ভিতরে ঢুকবেন। সব কাজই করবেন আদবের সাথে।'
মঈন বিশ-পঁচিশ জোড়া স্যান্ডেল-জুতা দেখতে পেল। ভিতরটা খুবই পরিচ্ছন্ন। পবিত্রতার ছাপ সর্বত্র। আতরের সুঘ্রাণ বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে। নীল কার্পেট বিছানো প্রশস্ত রুম। অনেক দর্শনাথর্ী কার্পেটে বসে আছেন। এতো লোকের ভীড় সত্বেও বেশ নিরবতা ও ডিসিপ্লিন লক্ষ্য করল মঈন। অভ্যর্থনা টেবিলে বৃদ্ধ এক লোক। লম্বা সাদা পাঞ্জাবি ও সবুজ পাগড়ি পরিহিত। 'আস্সালামু আলাইকুম' জানিয়ে বিনয়ের সাথে বললেন 'বসুন, কোথা থেকে এসেছেন।' মঈন বলল _
'জি্ব ঢাকার মিরপুর থেকে।'
'রোগীর নামটা বলুন।'
'জহুরা'
'প্রধান সমস্যাটা কি?'
'নিঃসন্তান-সন্তান হচ্ছে না।'
'বিয়ে হয়েছে কয় বছর আগে?'
'জি্ব চার বছর আগে।'
'রোগীনির বয়স কত?'
'জি্ব উনিশ।'
'আপনি কি করেন?'
'একটি কনফেকশনারি চালাই।'
'বেশ। অনুগ্রহ করে ওনাকে সামনে বসিয়ে দিন। আর আপনাকে আমি একটি ফর্দ দিচ্ছি। জিনিসগুলো গেটের সামনের দোকানগুলোতেই পাবেন। কিনে আনুন।'
মঈন জহুরাকে একটি খালি জায়গায় বসিয়ে দিয়ে ফর্দ হাতে গেটের বাইরে এলো। গেট বরাবর দোকান। সাধুবাবা জেনারেল স্টোরে গেল। বিশেষ ধরনের স্টোর। দোকানভর্তি মিনারেল ওয়াটার, কলা, ডিম, তসবি, আতর, টুপি, শাঁখা, সিঁদুর, চালের পুঁটলি, আগরবাতি, গোলাপজল ইত্যাদি। মঈন ফর্দ অনুযায়ী একটি বড় বোতল মিনারেল ওয়াটার, দুই প্যাকেট আগরবাতি, এক বোতল গোলাপজল, এক জোড়া সাগরকলা ও এক হালি সিদ্ধ ডিম কিনল। রীতিমতো ছোটখাট একটা বাজার বলে তার মনে হলো।
সাক্ষাৎপ্রাথর্ীরা এক এক করে মতিবাবার কামরায় ঢুকছে। মতিবাবা একটি রিভলভিং চেয়ারে বসে সাক্ষাৎ দিচ্ছেন। তার সামনে সুদৃশ্য মেহগনি টেবিল। মতিবাবার লম্বাটে চেহারা। ঋজু শরীরের গড়ন। খাড়া নাক। প্রশস্ত কপাল। মাথায় কারো পাগড়ি। শরীরে কারুকাজ করা জোব্বা। কাঁচা-পাকা দাড়ি সুন্দরভাবে ছাঁটা। মনোযোগ দিয়ে সমস্যা শুনছেন। রোগী বা রোগীনির সাথে আনা পথ্যে ফুঁ দিচ্ছেন। সর্বশেষে ডাক পড়ল মঈনের। ভক্তি ভরে দুজনই মতিবাবার সামনে মাথা নিচু করে দাঁড়াল। মতিবাবা 'হুঁ' করে শব্দ করতেই মঈন সালাম জানাল। 'ওয়াআলাইকুমুস সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু' বলে তিনি সামনের চেয়ার দুটোতে বসতে বললেন। মঈন দেখল, অত্যন্ত সাজানো গোছানো কামরা। ফুলদানিতে ভোরের গোলাপ এখনো সুবাস ছড়াচ্ছে। দেয়ালে সাঁটা মহামণিষীদের মহান বাণী। নজরকাড়া শো-কেস। কাবা ও মদীনা শরীফের পাথর ভাস্কর্য, ব্রোঞ্জের বুদ্ধমূর্তি, ছোট্ট কালিমূর্তি আর ক্রুশবিদ্ধ যীশুর ছবি বাঁধাইকরা স্বর্ণালী ফ্রেম। মতিবাবা মঈনের দিকে দৃষ্টি দিলেন। সুতীক্ষ্ন দৃষ্টি তার। বললেন _
'অনেক চিকিৎসা করা হয়েছে নিশ্চয়?'
'জি্ব-বাবা, এলোপ্যাথি, হোমিও, ইউনানী সবই।'
'বাবা সব কিছু চিকিৎসা শাস্ত্রে নেই। আল্লাহ চান তো সমাধান হবে। না চাইলে হবে না।'
'কী ফুলের মতো মেয়ে তুমি। কী নাম যেন তোমার মা?'
'জহুরা।'
'বেশ সুন্দর নাম তোমার। দুঃখ হচ্ছে এই বয়সেই তোমাকে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। শাশুড়ীর লাঞ্ছনাও সইতে হচ্ছে তাই না, মা?'
'জি্ব বাবা।'
'আমি তো নগণ্য এক খাদেম। আল্লাহ চাইলে তুমি মা হতে পারবে। আমি চেষ্টা করবো। বাকি সব আল্লাহর ইচ্ছা। তবে আমি আশাবাদী, তোমাকে খালি হাতে ফিরতে হবে না। আজ পর্যন্ত সকলেরই মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে।'
মঈন বলল 'আপনার কথা অনেক শুনেছি। তাইতো এত দূর থেকে আপনার কাছে আসা।'
মতিবাবা বললেন, 'তোমাদের এখন অল্প বয়স। সাধ-আহ্লাদের সময়। আমি চাই মহানন্দে আগামী দিনগুলো তোমাদের কাটুক। ব্যর্থতাকে কখনো ব্যর্থতা মনে করবে না। দার্শনিক কনফুসিয়াস বলেছেন 'ব্যর্থতার মাঝেই সুপ্ত আছে সাফল্যের বীজ।' এই সুপ্ততাকে জাগিয়ে তুলতে হবে। বীজের সফল অঙ্কুরোদগমের দায়িত্ব তো আমাদেরই। হতাশ হলে চলবে না। প্রয়োজন সঠিক তত্ত্বাবধান। আমাদের চেতন মনের পাশাপাশি থাকে অবচেতন মন। এই অবচেতন মনের জানালাই আমি খুলে দিই। তালিকা অনুযায়ী পথ্যগুলো কি কিনেছো?' 'জি্ব বাবা' বলে মঈন পথ্য ভরা ব্যাগটি মতিবাবার সামনে রাখল। 'আজকের দাওয়াই ও পরবতর্ীতে পরামর্শ মাফিক চললে আমার দৃঢ় বিশ্বাস অচিরেই তোমরা নতুন অতিথির সুসংবাদ পাবে।' মঈন ও জহুরা সকল আড়ষ্টতা কাটিয়ে উঠল। তাদের মন অলৌকিক বাতাসে সর্ষে ফুলের মতোই দুলে উঠল।
'মঈন, বাবা, তুমি ভিজিটর রুমে গিয়ে বসো। আমার লেখা নসিহতের বই দেখতে থাক। এক ঘণ্টার মতো সময়ের প্রয়োজন হবে জহুরার অবচেতন মনকে জাগিয়ে তুলতে। ভয়ের কিছু নেই। আল্লাহ ভরসা। মা, তুমি ডানদিকের কক্ষে গিয়ে বসো।'
মঈন ভিজিটর রুমে 'মতিবাবার নসিহত' নামক বই পড়ছে। আর কোন সাক্ষাৎপ্রাথর্ী নেই। মতিবাবাকে পুরোদস্তুর আলেম লোক হিসেবে তার মনে হলো। জহুরা ভিতরের আরেকটি কামরায় চেয়ারে বসে অপেক্ষা করছে। এ কামরাটিও সাজানো গোছানো। হালকা নীল আলোয় উদ্ভাসিত। জানালায় ভারী পর্দা। তিনদিকে ডেকোরেটিভ গ্লাসের ওয়াল কেবিনেট। এক পাশে ম্যাকানিক্যাল প্যাশেন্ট বেড। সাথে ছোট মেডিসিন কাপবোর্ড। জহুরার বেশ ভালো লাগছে। শাশুড়ির লাঞ্ছনা-গঞ্জনার একটা ইতি হবে আশা করি।
নার্গিস আপা যা বিবরণ দিয়েছে তার চেয়েও অমায়িক লেগেছে মতিবাবাকে। ইতিমধ্যে হাতে দু'তিনটি বই নিয়ে মতিবাবা ঢুকলেন। 'মা জহুরা, কয়েকটি স্তর-প্রক্রিয়ার মাধমে অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছতে হবে। তোমার মাথা থেকে পুরনো সকল চিন্তে বাদ দাও। মনে কর, তোমার কোন সমস্যা নেই। অন্য দশটি মেয়ের মতোই তুমি একটি স্বাভাবিক মেয়ে। তোমার বিয়ে হয়েছে। পরিকল্পনা করেছ, চার বছর পর সন্তান নিবে। তোমার পেটে আসবে আদরের ধন। আমি বই থেকে কর্মপদ্ধতি উচ্চারণ করব। তুমি ধাপগুলো অনুসরণ করবে। যেভাবে কল্পনা করতে বলব সেভাবেই তুমি কল্পনার হ্রদে ডুব দেবে। নড়া-চড়া করবে না। কথা বলবে না। অন্য কোন চিন্তায় মগ্ন হবে না। তোমার চিন্তা নিবিষ্ট থাকবে তোমার সন্তান সম্ভাবনার প্রতি, তোমার ভবিষ্যত সন্তানের প্রতি। ধ্যানমগ্নতায় বিঘ্ন ঘটে এমন কিছু করবে না।' 'বুঝতে পেরেছ মা?' 'জি্ব-বাবা' জহুরা উচ্চারণ করল। 'বিসমিল্লাহ বলে সরবতটা খেয়ে বেডটিতে শুয়ে পড়। গায়ের পোশাক ঢিলে করে নাও। তোমার কাপড়ে কোথাও শক্ত বাঁধন থাকলে তা খুলে নিও। ততক্ষণে আমি বইয়ের নির্দিষ্ট অধ্যায় বের করি।'
জহুরা দেখল মতিবাবা বইয়ের পৃষ্ঠা উল্টাচ্ছেন। সাইড কেবিনেটের ওপর ঢেকে রাখা সরবতটা সে খেয়ে নিল। সালোয়ারের বাঁধন ঢিলে করল। বেডে শুয়ে পড়ল। কামিজ ও ওড়না ঠিক করে নিল। মতিবাবা বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে চোখ তুলে বললেন 'সরবত খেয়েছ মা?' জহুরা বলল 'জি্ব-বাবা'। 'শরীর টান টান কর। হাত দুটো দু'পাশে রাখ। হাতের তালু থাকবে উপরের দিকে। দু'পায়ের মাঝখানে রাখ এক হাত ফাঁক।' জহুরা মতিবাবার নির্দেশ মতোই কাজ করছে। মতিবাবা নিজে জহুরার হাত দুটো আরো সোজা করে দিলেন। ভাঁজ হওয়া এক উরু অপর উরুর সমান্তরাল করলেন। অতপর দু'পা ধরে ধীরে ধীরে এক হাত পরিমাণ ফাঁক করলেন। ফ্যানের বাতাসে উড়ছে জহুরার লাল কামিজ। নৌকার পালের মতো তার ওড়নাও ফুলে উঠছে। 'মা জহুরা, এবার দুচোখ ধীরে ধীরে বন্ধ কর। পাঁচ/ছয় বার বুক ভরে দম নাও, আবার ছেড়ে দাও।' জহুরার বুক ও পেটে কয়েকবার সমুদ্রের ঢেউ খেলে গেল। 'এবার কল্পনার সমুদ্রে ডুব দাও। মনোযোগ কেন্দ্রীভূত কর তোমার যৌবনা শরীরে। তুমি ঘাড়ে গরম নিঃশ্বাস অনুভব করছ। তোমার বুক মথিত হচ্ছে। মনোযোগ দাও পেটের নিম্নভাগে। তোমার বমি বমি লাগছে। পেট ওলট-পালট করছে। তলপেটে তীব্র ব্যথা অনুভব করছ। তোমার জরায়ূ ছিঁড়ে বের হচ্ছে একটি সন্তান। কাঙ্ক্ষিত সন্তান। দুরন্ত এক সন্তান।' জহুরার মাথা ঝিম ঝিম করছে। দু'চোখের পাতা আঠার মতো আটকে গেছে। চোখের সামনে নেমেছে অাঁধার পর্দা।
'জহুরা এখন একশ থেকে শূন্য পর্যন্ত নিচের দিকে গুণতে থাকে। একশ নিরানব্বই _ আটানব্বই _ সাতানব্বই।'
অর্দ্ধচেতন জহুরা অনুভব করছে তার দেহের ওপর হাঁটছে সরীসৃপ জীব। সরীসৃপ জীব হেঁটে চলছে তার মুখের ওপর দিয়ে, গলার ওপর দিয়ে। স্পর্শ করছে তার বুক, পেট, উরু হয়ে নিম্নদেশ। বুক নিষ্পেষিত হচ্ছে। রঙিন আলোর চড়কা ঘুরছে। উল্টে যাচ্ছে কামরা। দলিত হচ্ছে নিতম্ব। শরীরে ঢুকছে কালো সাপ। পৃথিবী ধীরে ধীরে গ্রাস করছে আলোকিত চাঁদ।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর জহুরার চেতনতা ফিরে আসে। মাথাটা ভারী হয়ে আছে। সে কি এতক্ষণ দুঃস্বপ্ন দেখেছে? আশেপাশের সবকিছুইতো স্বাভাবিক আছে। যদিও তলপেটে কিছুটা ব্যথা অনুভব করছে সে। তার মাথায় একটা চিন্তাই ঘুরপাক খাচ্ছে। সে কি জন্ম দিতে পারবে একটি শিশুর? তার চুলের বেনিতে কি আবার বসবে বসন্তের প্রজাপতি? পিঠে কি পড়বে আবার শাশুড়ির স্নেহাদ্র হাতের পরশ? ভাবতে ভাবতেই অজান্তে তার দুচোখ বেয়ে দুফোটা অশ্রু ঝরে পড়ল।
'এই যে মা। কোন সমস্যা হয়নি তো? আশা করি কামিয়াব হবে। দুঃশ্চিন্তা করবে না। সর্বদা আল্লাহর উপর ভরসা রাখবে। মঈনের কাছে পরবতর্ী পরামর্শগুলো লিখে দেয়া হয়েছে। পথ্যগুলো সময়মতো গ্রহণ করবে। পরামর্শমাফিক চলবে মা। অসুবিধে হলে আবার আসবে।' 'জি্ব-বাবা, দোয়া রাখবেন। স্লামালিকুম।'
তিন
নয় মাসের মধ্যেই জহুরার কোলে এলো ফুটফুটে রাজপুত্র। নাম রাখা হলো মিলন। হারিয়ে যাওয়া পাখি আবার ফিরে এলো। আকাশের শীতল পানিতে হেসে উঠল চৈতালী ভঙ্গুর মৃত্তিকা। মিলনের চার বৎসর বয়সে মঈনের ভাগ্যের স্টিয়ারিংও ঘুরিয়ে গেল। সে এখন বড় এক দোকানের মালিক। স্টেশনারি প্লাস কনফেকশনারির দোকান। ঝালকাঠি সদর থানা ঘেঁষেই নেয়া পজিশন। তবে হঠাৎ পত্রিকার পাতায় গ্রেফতার বিষয়ক চাঞ্চল্যকর একটি খবর ও সংশ্লিষ্ট দুটো চিত্র তাকে আবার ভাবিয়ে তুলেছে। শশ্রুহীন মতিবাবার চেহারার সাথে অদভুত মিল মিলনের। মিলনকে মনে হয় মতিবাবার ছোটকালের মডেল। তার মনে এখন একটাই প্রশ্ন জাগরূক। 'মিলন কি আদৌ মঈন ও জহুরার মিলনের ফসল?'
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ফেব্রুয়ারি, ২০০৬ বিকাল ৪:৩৫

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


