somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

চোখের জলে ঈদ উদযাপন

২৩ শে আগস্ট, ২০১২ দুপুর ১:৪৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদের দিন আনন্দ আর উত্সবে মুখরিত থাকে আমাদের চারপাশ। এ দিন পরস্পর কোলাকুলি ও কুশলাদি বিনিময়ের পাশাপাশি থাকে মুখরোচক সব খাবারের আয়োজন। প্রতিবারের মত এবারো সারা দেশে এ চিত্র লক্ষ্য করা গেছে। কিন্তু বয়স্ক পুনর্বাসন কেন্দ্রে (বৃদ্ধাশ্রম) ঈদের চিত্র ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। সারাদিন স্বজনদের অপেক্ষায় ছিলেন বৃদ্ধাশ্রমবাসীরা। সরাসরি দেখতে না পারলেও অন্তত একবার ফোনের আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু সবই মিছা। শেষ পর্যন্ত চোখের জলে সান্ত্বনা মিলে তাদের। আপনজনদের এমন আচরণে শুধু চোখের জলে ভিজে ঈদ উদযাপন করেন তারা। বেড়াতে যাওয়ার পরিবর্তে সারাদিন কক্ষের বারান্দায় পায়চারি করে সময় কাটান। যদি সন্তান-স্বজনরা একবার আসে। যতই মান অভিমান করুক না কেন নাড়ি ছেঁড়া ধন সন্তানদের পিতামাতা ভুলতে পারেন না কখনোই। সন্তানদের একবার দেখার জন্য ব্যাকুল থাকেন সবসময়। কিন্তু সেই সন্তানরা একবারও বৃদ্ধ পিতামাতার খোঁজ নেয় না।

ঈদের দিন সরেজমিনে এই প্রতিবেদক গাজীপুর সদর উপজেলার হোতাপাড়া বিশিয়া কুড়িবাড়ি মমিপুর বৃদ্ধাশ্রমে গেলে সেখানকার অধিবাসীরা চোখের জলে তাদের মনের কথা জানান। কেউ বলেন, এই প্রথম সন্তান কিংবা আপনজন ছাড়া ঈদ করছেন। কেউ ৫ থেকে ১০ বছর পর্যন্ত এ বৃদ্ধাশ্রমে রয়েছেন। এমনিতে তো খোঁজ নেয় না, ঈদের দিনও সন্তানরা খোঁজ নেয়নি। জীবনের শেষ সময়ে এসে এটাই কপালে লেখা ছিল বলে অনেকে হাউ মাউ করে কাঁদতে থাকেন। অনেকে মেঝেতে শুয়ে শুয়ে হায়রে সন্তান তোদেরকে কেন এত লেখাপড়া শেখালাম, এত ধন সম্পদ কেন তোদেরকে দিলাম এসব বলে গড়াগড়ি করে বুক চাপড়ে কাঁদতে দেখা যায়।

বেশ কয়েকজন বৃদ্ধ জানান, এ বৃদ্ধাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা খতীব আব্দুল জাহিদ মুকুল সন্তানের মত তাদেরকে থাকা খাওয়া ও চিকিত্সার ব্যবস্থা করেছেন। নিজের সন্তানের চেয়েও তিনি বৃদ্ধদের বেশি সেবা যত্ন করছেন। এ বৃদ্ধাশ্রমের বাইরে তাদের মত আপনজন হারা অনেক বৃদ্ধ লোক রেল স্টেশন, বাস স্টেশনসহ যত্রতত্র পড়ে অযত্ন-অবহেলায় চরম দুর্বিষহ দিন কাটাচ্ছেন। তাদের জন্য অনুরূপ বৃদ্ধাশ্রম সরকারিভাবে প্রতিষ্ঠা করা উচিত কিংবা খতীব আব্দুল জাহিদ মুকুলের মত বৃদ্ধদের প্রতি শ্রদ্ধাশীল যে কেউ বৃদ্ধাশ্রম চালু করতে পারেন। নিজ খরচে অনুরূপ বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসতে শিল্পপতি ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন কয়েকজন বয়স্ক লোক। বিদেশে বৃদ্ধাশ্রম অনেক আগে থেকেই চালু রয়েছে। সময়ের প্রয়োজনে আমাদের দেশেও এর প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। বয়স্কদের সেবায় বড় অ্যাপার্টমেন্টে সুন্দর ও মনোরম পরিবেশে বৃদ্ধাশ্রম প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। এক সময় পরিবারে বৃদ্ধদের সেবা যত্ন করা ছিল প্রধান কাজ। আধুনিক যুগের আধুনিক সন্তানরা বৃদ্ধ পিতামাতার প্রতি অমানবিক আচরণ করে তাদের রেখে বিদেশে চলে যায়। কেউ কেউ বাবা-মাকে বের করে দিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করে। এ অবস্থায় বৃদ্ধ পিতামাতার জন্য বৃদ্ধাশ্রম ছাড়া আর কোন নিরাপদ জায়গা নেই।

পুরান ঢাকার ধনাঢ্য পরিবারের বৃদ্ধা হালিমা খাতুন (৮০) তিন বছর এ বৃদ্ধাশ্রমে আছেন। সন্তান দ্বারা বিতাড়িত এ বৃদ্ধার খোঁজ কেউ নেয় না। সন্তান কিংবা আপনজনের কথা জিজ্ঞাসা করলে শুধু চোখের পানি ফেলেন। বরিশালের বৃদ্ধা রাবেয়া বেগম (৭৫) কয়েক বছর পূর্বে সন্তান ও আপনজন দ্বারা সংসার থেকে বিতাড়িত হয়ে ঢাকায় এসে এক বাসায় কাজ নেন। বয়সের কারণে গৃহকর্তার মন যুগিয়ে কাজ করতে না পারায় সেখান থেকেও তিনি বিতাড়িত হন। অবশেষে এক বছর ধরে ঠাঁই হয়েছে এ বৃদ্ধাশ্রমে। কেউ আসেনি তার খোঁজে। ফাতেমা বেগমের (৭৮) স্বামী মোহাম্মদ হাবিব পুলিশ সদস্য ছিলেন। ২০ বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ায় আপনজনের লাঞ্ছনার শিকার হন তিনি। অবশেষে ঠাঁই হয় এ বৃদ্ধাশ্রমে। ঈদ কাটে বৃদ্ধাশ্রমের বৃদ্ধাদের সঙ্গে। আপনজনের চেয়ে ভালভাবেই ঈদ কাটে বলে তিনি জানান। নারায়ণগঞ্জ সোনারগাঁও উপজেলার জবেদা খাতুন (৮৪) আট বছর এ বৃদ্ধাশ্রমে। আপনজন ও সন্তানদের চেয়ে ঐ বৃদ্ধাশ্রমে সবার সঙ্গে ভালভাবে ঈদের দিন কাটিয়েছেন। নারায়ণগঞ্জ দেওভোগ এলাকার নাসিমা বেগম (৮০), বগুড়ার মনোয়ারা বেগম (৬৫), বেগম হোসনে আরা (৭৫), নিনা আহমেদ (৬৫) সন্তান আর আপনজন ছাড়া ঈদে অনুরূপ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।

নারায়ণগঞ্জের ধনাঢ্য ব্যক্তি আলী হোসেন (৮৫)। তার শিল্প কারখানায় যৌবনে তিনি অনেক শ্রমিক খাটিয়েছেন। বৃদ্ধ বয়সে সন্তান ও আপনজনদের হাতে ব্যবসা ছেড়ে দেয়ার পর অন্তিম সময় তাকে সংসার থেকে বিতাড়িত করা হয়। বাসায় সন্তান স্ত্রীদের নিয়ে জাঁকজমকভাবে ঈদের দিন কাটিয়েছিলেন। সেই পুরানো কথা মনে করে বৃদ্ধাশ্রমে বসে চোখের পানি ফেলেন তিনি। এখানকার আরেক অধিবাসী শিল্পপতি মোহাম্মদ মানিক মিয়া। জীবনের শেষ সময়ে এসে ব্যবসা ও সংসারের হাল সন্তান ও আপনজনের হাতে ছেড়ে দেন। বছর ঘুরতে না ঘুরতে তাকে বের করে দেয়া হয় সংসার থেকে। শেষ পর্যন্ত বৃদ্ধাশ্রম হয় তার শেষ ঠিকানা। তার খোঁজও কেউ নেয় না। খুলনার সিরাজ (৮২), বরিশাল সদরের আব্দুল মান্নান (৮৫) রংপুরের আব্দুল মোতালেব (৯০), কুমিল্লার হাজী মকবুল আহম্মেদ (৯০), রংপুর পীরগাছার স্কুল শিক্ষক নূরুল হক (৬৫) একই কথা জানান।

এই ঈদে খতীব আব্দুল জাহিদ মুকুল বৃদ্ধাশ্রমের অধিবাসীদের মাঝে নতুন কাপড় ও বিশেষ খাবার পরিবেশন করেছেন। আপনজনের মতো সেবা দিয়ে তিনি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের রেখেছেন এ আশ্রমে। এ কারণে অনেকে আপনজনের কথা ভুলে গেছেন বলে জানান। জুমাতুল বিদার নামাজ পড়ে এসে আব্দুল রশীদ (৬৫) নামে এক বৃদ্ধ মারা যান। তার এক জামাই এসে লাশটি গ্রহণ করেছেন। রোজার সময় চান বিবি (৭০) ও উষা রাণী (৭৫) মারা যান। তাদের দাফন বৃদ্ধাশ্রমের কবরস্থানে হয়েছে। বর্তমানে এই বৃদ্ধাশ্রমে ২১২ জন বৃদ্ধ-বৃদ্ধা রয়েছেন। তাদের মধ্যে পুরুষ ১০২ জন ও মহিলা ১১০ জন। সব ধর্মের বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের জন্য এ বৃদ্ধাশ্রম। দেশের যে কোন প্রান্তে স্বজনহারা কিংবা অসহায় বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের পুনর্বাসনের জন্য সুপার শরীফ ০১৭১৪০৯৬৩২৫ কিংবা হোস্টেল সুপার বেলী’র ০১৭১৪০৯৬৩১১ মোবাইল নম্বরে ফোন করতে অনুরোধ করা হয়েছে। আর কোন সহূদয়বান ব্যক্তি যদি বৃদ্ধদের পুনর্বাসন কেন্দে পৌঁছে দেন তাহলে তাদের যাতায়াত ভাড়া দেয়া হবে বলেও প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। (Collected)
৮টি মন্তব্য ৮টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Dual Currency Card Needed for Meta Monetization. Urgent National Interest.

লিখেছেন এস.এম. আজাদ রহমান, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৭:৪৬

ছবি

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছি প্রায় চল্লিশ মিনিট। এক জায়গায় এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলে সাধারণত দুই ধরনের সন্দেহ হয়- এক, লোকটা কিছু করতে এসেছে। দুই, লোকটার করার কিছু নেই। আমি কোনোটাই... ...বাকিটুকু পড়ুন

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:১৩

’দেশ বিক্রির অভিযোগ, কাঠগড়ায় ইউনূস–জামাত–বিএনপি–এনসিপি”
==========================================
চুক্তি মানেই তো স্বার্থের ভারসাম্য। কিন্তু সেই ভারসাম্য যখন দেশের স্বার্থকে উপেক্ষা করে, তখন সেটি আর চুক্তি থাকে না প্রশ্নবিদ্ধ সমঝোতায় পরিণত হয়। ইউনূসের শেষ সময়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

গুপ্তদের সকল অপকর্মের তদন্ত হোক....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ২৮ শে এপ্রিল, ২০২৬ দুপুর ২:৪৮


সময় যত যাচ্ছে, ততই বেরিয়ে আসছে অস্বস্তিকর সত্য!
সময় গড়িয়ে যাচ্ছে- আর অতীতের অনেক ঘটনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।

বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ, সাক্ষ্য ও তথ্য সামনে আসছে-
যেখানে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী... ...বাকিটুকু পড়ুন

শিক্ষকের মর্যাদা

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ রাত ১:২৩


কবিতাটার কথা কি মনে আছে? বাদশাহ আলমগীর একদা প্রভাতে গিয়ে দেখলেন, শাহজাদা এক পাত্র হাতে নিয়ে শিক্ষকের চরণে পানি ঢালছে, আর শিক্ষক নিজ হাতে নিজের পায়ের ধূলি মুছে সাফ... ...বাকিটুকু পড়ুন

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।

লিখেছেন রাবব১৯৭১, ২৯ শে এপ্রিল, ২০২৬ সকাল ৮:০৯

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শেখ হাসিনার অবদান।
শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে গত এক দশকে ব্যাপক উন্নয়নমূলক প্রকল্প বাস্তবায়িত হয়েছে, যা দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এর মধ্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×