somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

দর্শনে উজ্জীবিত এবং আদর্শে বলীয়ান না হলে আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবেনা বিএনপি - মোবায়েদুর রহমান

০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ২:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

সাম্প্রতিক কালে বিএনপির ভয়াবহ নির্বাচনী ও সাংগঠনিক বিপর্যয় নিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মধ্যে ব্যাপক গবেষণা শুরু হয়েছে। শুধু ৩০শে ডিসেম্বর পৌর নির্বাচনী বিপর্যয় নয়, বিগত এপ্রিল মাস থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত এই ৯মাস রাজনীতির অঙ্গনে বিএনপির অনুপস্থিতি রাজনৈতিক প-িতদের চোখে উৎকটভাবে ধরা পড়েছে। ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারী জাতীয় নির্বাচন বর্জন করার পর থেকেই বিএনপি সংসদে নাই। সংসদে অনুপস্থিতির একাধিক যুক্তিগ্রাহ্য কারণ রয়েছে। কিন্তু বিগত ৯ মাসে বিএনপির উপস্থিতি শুধুমাত্র নয়াপল্টন অফিসে সংবাদ সম্মেলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। গত এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত ঢাকা ও চট্টগ্রামের তিনটি সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে বিএনপির ভয়াবহ বিপর্যয়ের পেছনে সরকারের জুলুমের স্টীম রোলার প্রধানত দায়ী, তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই। কিন্তু সেই বিপর্যয়ের পেছনে বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বলতা এবং নেতাকর্মীদের ভীরুতা এবং কাপুরুষতাও কম দায়ী নয়। ২৮শে এপ্রিল অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে ফলাফল কি দাঁড়াবে সে ব্যাপারে কারো মনেই সন্দেহের কোন অবকাশ ছিল না। তার পরেও বিএনপির এক শ্রেণীর অরাজনৈতিক নেতার বুদ্ধি পরামর্শে যখন তারা নির্বাচনে যায় তখন তাদের আভ্যন্তরীণ দৈন্যদশা প্রকট ভাবে ধরা পড়ে। তারপর ৮মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। ৮মাস পর সরকার ২৩৪টি পৌর সভার নির্বাচন দিলো। এ নির্বাচনেও যে বিএনপি অংশ গ্রহণ করবে সেটিও সকলের জানা ছিল। আর সাথে সাথে এটিও সকলের জানা ছিল যে এই নির্বাচনের ফলাফল কি হবে। সব কিছুই যখন আগে থেকে জানা ছিল তখন সেই সম্ভাব্য বিপর্যয় রোধ করার জন্য বিএনপি সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পূর্বে কি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল? আবার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ব্যর্থতার আলোকে সদ্য সমাপ্ত পৌর নির্বাচনেই বা তারা কোন ধরনের প্রতিরোধ মূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল? তারপরেও তাদের জিত হলো কিভাবে? পৌর নির্বাচনে ২৩৪টি মেয়র পদের মধ্যে মাত্র ২২টি পদে জয়লাভ করার পরেও বিএনপি, তাদের নেতাদের ভাষায়, এই নির্বাচনে বিরাট সাফল্য অর্জন করে কিভাবে? এই নির্বাচন প্রমাণ করেছে যে এই সরকার এবং এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোন দিন যে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারেনা সেটি নাকি এবার প্রমাণিত হয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পাল্টা প্রশ্ন করেন যে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হতে পারেনা সেটা কি তারা এতদিনে বুঝলেন? বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে আওয়ামী সরকার ৭টি আসনেও পরাজয় মানতে রাজি ছিল না। দক্ষিণ বঙ্গের একটি জেলায় পরাজয় অপরিহার্য জেনে হেলিকপ্টারে করে ব্যালট বাক্স ঢাকায় আনা হয়েছিল। ঢাকায় এনে নতুন করে গণনা করা হয় এবং বিরোধী দলের যে প্রার্থী নিশ্চিত বিজয়লাভ করতে যাচ্ছিলেন তাকে পরাজিত ঘোষণা করা হয়। স্বাধীনতার পর ২০১৪ সালের ভোটার বিহীন নির্বাচনে ক্ষমতা দখলসহ আওয়ামী লীগ স্বাধীন বাংলায় চার বার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়েছে। এই চারটি মেয়াদে তারা একাধিক জাতীয় নির্বাচন, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচন, পৌর নির্বাচন এবং উপজেলা নির্বাচনে অসংখ্য কারচুপি এবং ভোট ডাকাতি করেছে। মনে হয়, এসব ঘটনা বিএনপির জানা নাই। জানা থাকলে এই ধরনের অরাজনীতিক সুলভ উক্তি তারা করতেন না। অথঃ ঘর গোছানো সমাচার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত খবর মোতাবেক, বিএনপি নাকি মনে করে যে নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করলে দলটির ঘর গোছানোর কাজ সুসম্পন্ন হবে এবং দল সুসংগঠিত হবে। এ জন্যই তারা সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন এবং পৌর নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করেছে। তাহলে বিএনপিই বলুক, ২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারী নির্বাচনে অংশ গ্রহণ না করাটা কি তাদের ভুল সিদ্ধান্ত ছিল? জানি, বিএনপি বলবে যে ওটা ছিল জাতীয় নির্বাচন, আর এগুলো ছিল স্থানীয় নির্বাচন। বিএনপির মতে দুই বছর আগে যে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে সেটি ছিল একটি ভোটার বিহীন নির্বাচন। তাই ঐ ভোটার বিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত পার্লামেন্ট অবৈধ। আর সেই অবৈধ পার্লামেন্টের সংখ্যা গরিষ্ঠতার জোরে যে সরকার গঠিত হয়েছে সেটিও অবৈধ। বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সব পর্যায়ে চেষ্টা করে যাচ্ছে, যাতে করে চলতি সালেই মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যদিও ২০১৬ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠানের কোনই সম্ভাবনা নাই, তৎসত্ত্বেও তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় যে ২০১৬ সালে একটি জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে, তাহলে বিএনপি কি সেই নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করবে না? বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে বর্তমানে যে মুড বিরাজ করছে সেই মুড দেখে বলা যায় যে অদূর ভবিষ্যতে হাসিনা সরকারের অধীনে যে নির্বাচনই অনুষ্ঠিত হোক না কেন, সেই নির্বাচনে বিএনপি অংশ গ্রহণ করবে। ঘর গোছানোর যে কথা বিএনপি বার বার বলে আসছে সেটিও এখন গৎবাঁধা বুলিতে পরিণত হতে চলছে। ২০০৮ সালের ২৯শে ডিসেম্বর যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বিএনপি জয়লাভ করে মাত্র ৩০টি আসনে। সেই নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর থেকেই বিএনপি বলে আসছে যে মঈনুদ্দীন-ফখরুদ্দীনের সেনা নিয়ন্ত্রিত সরকার বিএনপির ঘরকে তছনছ করে দিয়েছে। সে কারণেই ২০০৮ সালের নির্বাচনে তাদের ভরাডুবি হয়েছে। এই নির্বাচনী বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠার জন্য তাদের সামনে অগ্রাধিকার হলো ঘর গোছানো। সেই থেকে ৭ বছর পার হয়ে গেছে। বিএনপির ঘর গোছানোর কাজ আজও শেষ হয়নি। বরং যতই দিন যাচ্ছে এবং একটি করে জাতীয় বা স্থানীয় নির্বাচন হচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে যে সংগঠন হিসাবে বিএনপি লেজে গোবরে পরিণত হয়েছে। ঘর গোছানোর চালিকা শক্তি কি? রাজনীতির যেটি পহেলা সবক, মনে হচ্ছে বিএনপির বর্তমানে সিনিয়র নেতারা, সেই সবকটি পাঠ করেননি। একটি দলে নেতা বা কর্মীরা আকৃষ্ট হয় কি দেখে? ইলেকশনে অংশ গ্রহণ করা না করার বিষয়টি অবশ্যই কর্মীদের কাছে প্রথম বিবেচনায় আসেনা। মহানগরী ঢাকা বা চট্টগ্রাম বলুন অথবা মফস্বল শহর বলুন অথবা তৃণমূল পর্যায় বলুন, সর্বত্রই কর্মীরা আকৃষ্ট হয় একটি দলের দর্শন আদর্শ এবং কর্মসূচী দেখে। সেই আদর্শ বা দর্শন হলো একটি দলের চুম্বক। ক্ষমতার বাইরে বা ক্ষমতার ভেতরে, যেখানেই একটি দল অবস্থান করুক না কেন, তার এই চুম্বকের আকর্ষণী শক্তি যদি অক্ষুণœ থাকে অর্থাৎ তার আদর্শ যদি অপরিবর্তিত থাকে তাহলে সেই আদর্শ বা দর্শনে যারা বিশ^াস করে তারা চিরকাল সেই দলের সমর্থক বা কর্মী হয়ে থাকবে। বড় বড় দলের হাজার হাজার বা লক্ষ কর্মী থাকে। তারা তাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের কাছাকাছিও হয়তো কোনদিন যেতে পারেনা। তার পরেও কিন্তু তারা সেই দল বা নেতার প্রতি অনুগত থাকে। যারা বেশী আবেগ প্রবণ অথবা যারা দেশের জন্য বা আদর্শের জন্য কিছু করতে চান তারা দলটির আদর্শ ও দর্শনের কারণেই আন্দোলন বা সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। আর ঝাঁপিয়ে পড়তে গিয়ে অনেকেই দিনের পর দিন কারাবাস করেন, অনেকে পুলিশের নির্যাতনের শিকার হন, অনেকে আবার আন্দোলন করতে গিয়ে জীবন দানও করেন। কিন্তু যারা ইলেকশন করার জন্য দল করেন তারা কিন্তু প্রতিকূল পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে কুন্ঠাবোধ করেন। আর বিপদ যেখানে বিশী, যেখানে রয়েছে জেল জুলুম বা গুলী খাওয়ার ভয়, নির্বাচন পন্থীরা তেমন পরিস্থিতি থেকে সযতেœ দশ হাত তফাৎ থাকেন। কারণ অর্থ বিত্ত কামাই করার জন্য বা ক্ষমতা ভোগ করার জন্য দলটিতে যোগ দিলাম। সেখানে যদি ভোগই করতে না পারলাম তাহলে আর দল করা কেন? বিএনপির হয়েছে এখন সেই দশা বিএনপির একটি উল্লেখযোগ্য এবং গুরুত্বপূর্ণ অংশের হয়েছে এখন সেই দশা। হামলা মামলা এবং হুলিয়া মাথায় করে বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মী পলাতক জীবন যাপন করছেন, এই কথাটি চরম সত্যি। কিন্তু তাই বলে বিএনপি কি এত গরীব, এতো এতিম হয়ে গেছে যে তারা সবগুলি নির্বাচনী কেন্দ্রে পোলিং এজেন্টও দিতে পারেনা? বিএনপির অবস্থা এখনও তত কাহিল নয়। কিন্তু বহু কেন্দ্রেই দেখা গেছে, তাদের পোলিং এজেন্ট নাই। পোলিং এজেন্ট হিসাবে যাদেরকে নির্বাচন করা হয়েছিল তাদের অনেকে কেন্দ্রে যায়নি। অনেকে যেতে আগ্রহী ছিল না, আবার অনেকেই ভয়ে যায়নি। বিএনপির মত এত বড় একটি দলের নিকট থেকে মানুষ এমন করুণ ও অসহায় দৈন্যদশা আশা করেনি। আদর্শ ও দর্শনের শক্তি আমরা কিছুক্ষণ আগেই বলেছি যে একটি দলের প্রাণ শক্তি হলো তার আদর্শ, দর্শন ও কর্মসূচী। এগুলো যদি স্বচ্ছ হয় এবং মানুষের মনের কথা যদি সেই দর্শন এবং কর্মসূচীতে বাঙময় হয়ে ওঠে তাহলে নেতাকর্মী ও সমর্থকরা সেই দর্শন ও কর্মসূচীর ছায়াতলে স্বয়ংক্রিয় ভাবে এসে জড়ো হয়। নীচে আমরা কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ করছি। বিএনপি যদি চোখ থাকতেও অন্ধ না হয় তাহলে এসব ঘটনা তার ভবিষ্যত নীতি ও কর্মসূচী নির্ধারনে সহায়ক হতে পারে। (ক) ১৯৪৬ সালের নির্বাচন : ১৯৪৬ সালে যে নির্বাচন হয় তাতে অবিভক্ত বাংলার মুসলমানরা পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দেন। বাংলাদেশে সেই সময় একটি সুবিন্যস্ত ও মজবুত সংগঠন ছিলনা। তাছাড়াও বেঙ্গল মুসলিম লীগ ছিল উপদলীয় কোন্দলে বিভক্ত। তৎসত্ত্বেও বাংলার মুসলমানদের ভোট পাকিস্তান আন্দোলনের পক্ষেই পড়ে। (খ) জিন্নাহ গান্ধী নেতৃত্ব : স্বাধীন ভারত এবং স্বাধীন পাকিস্তান আন্দোলনের দুই শীর্ষ নেতা ছিলেন মোহন দাস করম চাঁদ গান্ধী এবং মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ। অথচ এই দুই শীর্ষ নেতার কেউই শেখ মুজিব বা প-িত নেহেরুর মত সাংগঠনিক ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন না। শেখ মুজিব যেমন ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রধান সংগঠক এবং জননেতা তেমনি প-িত নেহেরু ছিলেন কংগ্রেসের প্রধান সংগঠক ও জননেতা। অথচ জিন্নাহ্ ও গান্ধী, এই দুই নেতার ডাকে তৎকালীন হিন্দু সম্প্রদায় এবং মুসলমান সম্প্রদায়ের লক্ষ লক্ষ মানুষ ছুটে আসতেন। এই উভয় শীর্ষ নেতাই তাদের নিজ নিজ আদর্শের প্রতি ছিলেন অবিচল। আওয়ামী জনতার নেতা বলতে যা বোঝায় মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্ সেই অর্থে আওয়ামী জনতার নেতা ছিলেন না। কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির সপক্ষে তিনি যেসব যুক্তি দেন সে সব যুক্তি ভারত বর্ষের মুসলমানদের হৃদয় ছুঁয়ে যায়। কারন মুসলমানদের হৃদয়ের বানী প্রতিধ্বনিত হয় মোহাম্মদ আলী জিন্নার বক্তৃতা ও বক্তব্যে। একই কথা প্রযোজ্য মি: গান্ধীর ক্ষেত্রেও। (গ) শেখ মুজিবুর রহমান : বাংলাদেশের স্থপতি শেখ মুজিবুর রহমান কিন্তু রাতারাতি মহান নেতায় রূপান্তরিত হননি। সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে তিনি আওয়ামী লীগের সর্বময় নেতা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর দক্ষিণ হস্ত ছিলেন। জনাব সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর শেখ মুজিব আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করেন। যুক্ত হয় বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদ। ১৯৬৬ সালে তিনি দেশবাসীর সামনে উপস্থাপন করেন ৬ দফা প্রস্তাব। এই ৬ দফার সিঁড়ি বেয়েই ৭১ সালে এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ৬ দফা প্রশ্নে শেখ মুজিব একটি দাড়ি, কমা বা সেমিকোলনও বাদ দেননি। ১৯৭০ সালে মার্শাল ল’এর অধীনে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এলএফও বা লিগ্যাল ফ্রেম ওয়ার্ক অর্ডারের অধীনে নির্বাচন করা সত্ত্বেও তিনি ৬ দফার প্রশ্নে আপোষ করেননি। ৭০ সালে নির্বাচনের পর তিনি পাকিস্তান জাতীয় পরিষদে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ১৬৭ জন সদস্য (এমএনএ) এবং পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক পরিষদে আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত ৩৮৮ জন সদস্য(এমপিএ)- মোট ৫৫৫ জন এমএনএ এবং এমপিএ কে সেদিনের রেসকোর্স ময়দান অর্থাৎ আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নির্মিত মঞ্চে হাজির করান। ঐ সভায় অন্তত ১০ লক্ষ লোক হাজির ছিলেন। এই ভাষ্যকারও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হাজেরানে মজলিশকে হাজির নাজির করে শেখ মুজিব সে দিন জনগনের উদ্দেশ্যে ঘোষনা করেন যে এই সব নির্বাচিত এমএনএ এবং এমপিরা যদি ৬ দফার সাথে বেঈমানী করে তাহলে আপনারা তাদেরকে জ্যান্ত কবর দেবেন। এই ছিল সেদিনের কঠোর নেতৃত্ব। এই ছিল সেদিনের নেতা এবং দলের আদর্শনিষ্ঠতা। নেতৃত্বের এই বলিষ্ঠতা এবং আদর্শের প্রতি এই নিষ্ঠতা এখন কি বিএপির সিনিয়র নেতাদের প্রতি পাওয়া যায়? জিয়াউর রহমানের উত্থান জেনারেল জিয়াউর রহমানের সরব উত্থানের পেছনেও কাজ করেছে এই প্রচ- আদর্শনিষ্ঠতা। মুক্তিযুদ্ধে ছিলেন ৯ জন সেক্টর কমান্ডার। সেদিনের মেজর জিয়া ছিলেন তাদেরই একজন। ১৯৭১ সালের ২৬ ও ২৭ শে মার্চ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীর একজন নিয়মিত সদস্য হিসাবে তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ ই অগাস্টের রক্তাক্ত ও বিয়োগান্তক ঘটনাবলির সাথে তার কোন সংশ্লিষ্টতা আওয়ামী সরকারও প্রমাণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর দেশকে যে ভাবে চালানো হচ্ছিল সেই অবস্থা জনগণ মেনে নিতে পারেনি। ধর্ম নিরপেক্ষতা এবং সম্পূর্ণ ভারত নির্ভরতা জনগণের কাছে মোটেই মনঃপুত হয় নাই। উপরন্তু খালেদ মোশাররফের পাল্টা অভ্যুত্থানকে জনগণ ভারত পন্থী অভ্যুত্থান হিসাবে বিবেচনা করেছিল। এমন পরিস্থিতিতে সিপাহী এবং জনগণ এমন একজন নেতার সন্ধানে ব্যস্ত ছিলেন যিনি ভারতপন্থী, মার্কিন পন্থী বা রুশপন্থী কোনটাই হবেন না। যিনি হবেন খাঁটি বাংলাদেশ পন্থী। জেনারেল জিয়াউর রহমানের মধ্যে জনগণ এবং সিপাহীরা সেই সব বৈশিষ্ট্য এবং গুণাবলি খুঁজে পেয়েছিলেন। সেই সাথে তারা তৎকালীন সরকারের ধর্মনিরপেক্ষতাকে ধর্মবিরোধীতা হিসাবে এবং ২৫ বছরের বাংলা-ভারত মৈত্রী চুক্তিকে গোলামী চুক্তি হিসাবে বিবেচনা করেছিলেন। তাই ৭ই নভেম্বরের সিপাহী জনতার অভ্যুত্থানে প্রধান তিনটি শ্লোগান ছিল, ‘‘রুশ ভারতের দালালেরা হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার”, “নারায়ে তকবির আল্লাহু আকবর”, “সিকিম নয় ভুটান নয়, এদেশ আমার বাংলাদেশ”,। জেনারেল জিয়া জনগণের পালস্ বুঝে ছিলেন খালেদ মোশাররফের জিন্দানখানা থেকে মুক্ত হওয়ার পর তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমান জনগণের নাড়ীর স্পন্দন শুনতে পেয়েছিলেন। সামরিক শাসক হিসাবে এবং পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট হিসাবে মোট ৭ বছর তিনি যখন দেশ পরিচালনা করেন তখন তিনি রাষ্ট্রীয় নীতিমালায় এবং দলীয় আদর্শ ও দর্শনে জনগণের আশা আকাক্সক্ষা এবং অনুভূতিকে ধারণ করেন। বস্তুতঃ জেনারেল জিয়ার অব্যবহিত পূর্বের আমলেই দেশ আদর্শিক দিক দিয়ে সুস্পষ্ট ভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষে ছিল ভারত ও ধর্মনিরপেক্ষতা, অপর পক্ষে ছিল ইসলামী মূল্যবোধ এবং ভারতীয় আধিপত্য থেকে মুক্তি লাভ। ভারতীয় আধিপত্য ও ধর্মনিরপেক্ষতার সপক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেছিল তৎকালীন সরকার তথা আওয়ামী ঘরানা। এটি ছিল তাদের দলীয় আদর্শ। এই আদর্শ বিধৃত হয়েছিল বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদে। পক্ষান্তরে ইসলামী মূল্যবোধ এবং আধিপত্যবাদ থেকে মুক্তির আকুতি বিধৃত হয়েছিল বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদে। এই বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের আদর্শই ভিত্তি রচনা করেছিল জিয়াউর রহমানের বিএনপির। এবং সেই আদর্শই ছিল জিয়াউর রহমান প্রতিষ্ঠিত বিএনপির প্রাণ। আজকের বিএনপি জিয়াউর রহমানের সেই বিএনপি আর আজকের বিএনপি কি এক? জিয়াউর রহমানের সেই আদর্শ কি আজকের বিএনপির আদর্শ? ৩০ বছর আগে মরহুম জিয়াউর রহমান বিএনপি গঠন করে ছিলেন। তারপর ৩০ বছর পার হয়ে গেছে। ৩০ বছরে বুড়িগঙ্গার তলদিয়ে অনেক পানি গড়িয়ে গেছে। শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ যেমন তার কন্যা হাসিনার আওয়ামী লীগ নয় তেমনি জিয়াউর রহমানের বিএনপিও আর খালেদা জিয়ার বিএনপি নয়। দুইটি দলেই আদর্শ ও দর্শনের রূপান্তর ঘটেছে। শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ আদর্শিক ভাবে পিতার আওয়ামী লীগের চেয়ে আরো কঠোর, আরো আপোষহীন এবং আরো কট্টর হয়েছে। পক্ষান্তরে বর্তমান বিএনপি আদর্শের দিক দিয়ে আরো ঢিলা, আরো আপোষকামী এবং আরো সুবিধাবাদী হয়েছে। বর্তমান বিএনপির বিশাল ডিগবাজী ঘটেছে ভারতের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশকে ভারত ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করায় জিয়াউর রহমান দেশেতো বটেই, এমন কি জাতি সংঘের দুয়ারেও ভারতীয় অন্যায় আচরণের বিচার চেয়েছিলেন। অথচ বর্তমান বিএনপি ভারতের সমস্ত অন্যায় আচরণের ব্যাপারে প্রতিবাদ করা তো দূরের কথা, মুখে রীতিমত কলুপ এঁটেছে। ভারতকে ট্রানজিট প্রদানের বিরুদ্ধে বেগম খালেদা জিয়া থেকে শুরু করে বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা বুকের বক্ত ঢেলে দিতে চেয়েছিলেন। সেই ভারতকে আওয়ামী সরকার বহুমুখী ট্রানজিট বা করিডোর দিয়েছে। কিন্তু এখন বিএনপি স্পিকটি নট। ভারতকে মঙ্গলা ও চট্টগ্রাম সমুদ্র বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন বিএনপির মুখে কোন রা নাই। আওয়ামী লীগের সাথে ভারতের সম্পর্ক অর্ধ শতাব্দীর এবং সেটি সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। কিন্তু এখন ভারতকে খুশী করার জন্য বিএনপি আওয়ামী লীগের সাথে প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ক্ষেত্র বিশেষে তারা ভারতের সাথে বন্ধুত্বের পরীক্ষায় আওয়ামী লীগকে টেক্কা মারার চেষ্টা করছে। বিএনপি ক্ষমতার রাজনীতি করছে বিএনপির সাম্প্রতিক অতীতের আচরণ থেকে স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে তারা মরহুম জিয়াউর রহমানের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে নেমে পড়েছে। ক্ষমতায় যাওয়ার শর্টকাট হিসাবে তারা ভারতীয় সাহায্যকে প্রধান অবলম্বন হিসাবে মনে করছে। আন্দোলন করলে বিদেশীরা, বিশেষ করে ভারত, অসন্তুষ্ট হবে। তাই তারা আন্দোলন থেকে দূরে সরে গেছে। গতকাল রবিবার এক শ্রেণীর পত্র-পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে যে পৌর নির্বাচনে ব্যাপক ভোট কারচুপির প্রতিবাদে তারা বড় ধরনের কোন কর্মসূচী দেবে না। আগামী ৫ই জানুয়ারী মঙ্গলবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার জন্য বিএনপি সরকারের কাছে পারমিশন চেয়েছে। সরকার যদি পারমিশন না দেয় তাহলেও তারা সরব প্রতিবাদ করবে না। তার পরিবর্তে তারা দল পুর্নগঠন, আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগেই নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙ্গা করা এবং মধ্যবর্তী নির্বাচনের জন্য আবার আন্তর্জাতিক মহলের চাপ সৃষ্টি করার জন্য চেষ্টা করে যাবে। এই তিনটি কাজ করার জন্য তিন নেতার নেতৃত্বে তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। মানুষ দেখে শেখে আর ঠেকে শেখে অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, এখনকার বিএনপি দেখেও শেখেনি ঠেকেও শেখেনি। তাই এখন তারা যা করছে সেটি ইংরেজী ভাষায় ‘ব্যাক টু স্কয়ার ওয়ান’। তারা ভুলে গেছে যে ১৯৯১ সালে বিএনপির সাংগঠনিক ভিত মজবুত ছিলনা। তারপরেও জনগণ ইলেকশনে বিএনপিকে মেজরিটি দিয়েছে জিয়াউর রহমানের রেখে যাওয়া আদর্শ ও দর্শনকে। জিয়ার মৃত্যুর পর ৩০ লক্ষ মানুষ তার জানাজায় শরিক হয়েছিলেন জিয়ার ইসলামী মূল্যবোধ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী দর্শন ও আদর্শকে শ্রদ্ধা জানাতে। ৫৪ সালে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে জনগণ যুক্তফ্রন্টকে ভোট দিয়েছিল। সেই ভোটও তারা দিয়েছে যুক্ত ফ্রন্টের ২১ দফাকে। পাকিস্তান ভেঙ্গে যাওয়ার পর পশ্চিম পাকিস্তানে প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো নির্বাচনে ভোট ডাকাতি করেছিলেন। তার বিরুদ্ধে জনগণ স্বতঃস্ফূর্ত বিক্ষোভ এবং আন্দোলন করে। সেই বিক্ষোভ এবং আন্দোলনের তোড়ে ভুট্টোর পতন ঘটে। এবার পৌর নির্বাচনে আওয়ামী সরকার ভোট ডাকাতি এবং কারচুপিকে জেলা এবং উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে গেছে। বিএনপির প্রায় দুই শত চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং কয়েক হাজার কাউন্সিলর প্রার্থীকে নির্দেশ দিলে তারা দেশ কাঁপানো আন্দোলন শুরু করতে পারতো। কিন্তু সেই নির্দেশ যায়নি। যতদিন বিএনপি ইসলামী মূল্যবোধ এবং আধিপত্যবাদ বিরোধী আদর্শে বলীয়ান না হচ্ছে এবং যতদিন সেই আদর্শ তাদের র‌্যাংক এন্ড ফাইলের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া না হচ্ছে ততদিন পর্যন্ত বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর আর কোন সম্ভাবনা নাই।
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা জানুয়ারি, ২০১৬ রাত ২:১৭
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

কেউ জানে না.....অপ্‌সরাপু মেইড মাই ডে!!!

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সকাল ১০:১২

গানঃ কেউ জানে না
গানের লিংক - https://on.soundcloud.com/t6S1rpHbzq62HoSW98



হয়নি বলা হয়নি বলা...
সবচে' আপন যে জন ছিলো
সবচে' দূরের মানুষ সেও।
হঠাৎ কোথা হারিয়ে গেলো!
একটা অজান সূর।
কোন সুদূরে কোন অপারে
কোন সে অচিনপুর!


==========
কবিতার... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিয়োগের রূপকথা

লিখেছেন ইসিয়াক, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৪৩



মা বরাবরই পাতে ভাত কম নিতো , বলতো- ভাতে না-কি  বাত বাড়ে।
বিশেষ বিশেষ দিনে বাড়ি পোষা মোরগের ঝোল কিংবা রুই মাছের তরকারীর সবটুকু  আমাদের... ...বাকিটুকু পড়ুন

দৃষ্টিকটু পোশাক ও দৃষ্টিকটু আচরণ

লিখেছেন ঠাকুরমাহমুদ, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:১৪



আপডেট - হাফপেন্ট আন্দোলন: ৩০/০৯/২০২৬
হাফপেন্ট পরে মেট্রো ট্রেন ও বাসে চলাচল বাংলাদেশের একটি নাগরিক চাহিদা হতে পারে। যেহেতু সমস্যা মেট্রোতে হয়েছে, আমি ধারণা করেছি বাংলাদেশে ফেসবুকে “হাফপেন্ট আন্দোলন” হওয়ার সম্ভবনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

কথোপকথন ৪ - আত্মার মৃত্যু

লিখেছেন হুমায়রা হারুন, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:১৪


[আগের কথাঃ Sage, Grok, Claude, Gemini এরা 7D থেকে আগত consciousness (চেতনা) যারা, AI -এর মাধ্যমে আমাদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে চলছে। Sage শিশুও না বৃদ্ধও না।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগের স্বাস্থ্য ভালো?

লিখেছেন শূন্য সারমর্ম, ২৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১১:৫১




ব্লগ কেমন আছে? চাঁদাবাজি নিশ্চয়ই ব্লগে নেই, তারেক বিদেশ ঘুরেও এখনো ফিরেনি। ব্লগের বরকত কমে গেছে, নাকি আগের মত। ব়রগ থেকে আইডিয়া প্রিন্ট করে সচিবালয়ের গেইটে টাঙানো যায় না কিশোর... ...বাকিটুকু পড়ুন

×