আমার আজকের কাহিনী কুমিল্লানিবাসী ইউরোপ প্রবাসী বকরকে নিয়ে। বকরের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা হলো সে নিজের নামের পুরো টা অনেকবছর জানত না। বকরের নাম ছিল (এ. টি. এম) শামসুজ্জামান মার্কা। ইউনিভার্সিটিতে জনৈক স্যারের হঠাৎ মনে হলো বকরের নামের পুরো শানে নুযুলটা তার জানা দরকার। ব্যাপারটা জিজ্ঞাসা করতেই বকর মিয়া খেল রাম ধরা!!! ক্লাস ভর্তি পোলাপানের সামনে সে বলতেই পারলো না নামের শানে নুযুলটা। ফলাফলটা আন্দাজ করতে পাঠকদের নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে না।
বকর ছিল খুবই প্রাণোচ্ছল এবং সংস্কৃতিমনা ব্যক্তি। সংগীতে তার ছিল অসাধারণ দক্ষতা। কোন এক অজানা কারনে তার সংগীত প্রতিভার বিকাশ ঘটেনি। তবে আমি বকরকে তবলা, হারমোনিয়াম, হাওয়াইয়ান গীটার, স্প্যানিশ গীটার বাজাতে দেখেছি। হাওয়াইয়ান গীটারে বকরের দক্ষতা ছিল দেখার মত। একবার আমার বাসায় "গ্রাম ছাড়া ঐ রাঙামাটির পথ" গানটি বাজানোর পর তার কাছে শ্রোতাসকলের প্রশ্ন ছিল "ভাই কোন গানটা বাজালেন এইটা ধরতে পারি নাই।" এরপর আমি বকরকে আর আমার বাসার হওয়াইয়ান গীটারটি ধরতে দেখি নাই। স্প্যানিশ গীটারেও বকর ছিল তুখোড়। সে ইউনিভার্সিটির 4 বছর "2441139" অক্লান্তভাবে বাজিয়েছে। ইনফ্যাক্ট ঐ একটা গান-ই বকর পারত বলে আমার ধারণা।
যাইহোক সংস্কৃতিমনা বকরের প্রিয় ছিল ইংরেজি গান আর প্রিয় ব্যান্ড ছিল অ্যাকুয়া। ওর রুমে সারাদিন বাজত অ্যাকুয়ার "ডক্টর জোনস" বা "বারবি গার্ল" । এরই মধ্যে আমাদের আন্ডারকভার গোয়েন্দাবিভাগ আবিষ্কার করে বসল যে বকরের টেবিলের প্রথম ড্রয়ারে একখানা ডায়েরি আছে সেই ডায়েরির সিংহভাগ কথা তার গুপ্ত প্রেমিকা কে নিয়ে লেখা। গুপ্ত প্রেমিকা আর কেউ নয়, অ্যাকুয়ার লিড ভোকাল ল্যানে নিওস্টর্ম । কথিত আছে সেই ডায়েরির প্রথম শব্দ গুলো ছিল "প্রিয় ল্যানে......(সঙ্গতকারনে বাকিটুকু প্রকাশ করা হলো না)........" সম্ভবত বাসায় এই ডায়েরি রেখে আসা নিরাপদ নয় বলেই বকর ডায়েরিটা সাথে রাখত। কিন্তু গোয়েন্দাবিভাগের নিষ্ঠাবান কর্মীদের প্রচেষ্টার ফলে বকরের গোপনীয়তার শেষ রক্ষা আর হয়নি। এই ঘটনার পর বকরের রুমমেটরা ওকে ডক্টর জোনস বলে ডাকত। সে কারনে বকরও খুব গর্ববোধ করা শুরু করল।
বকরের এই গর্ব বেশিদিন সহায়ী হলো না।ঘটনা হলো সেমিস্টার ফাইনাল পরীক্ষা চলছিল। বকর দীর্ঘদিন বাসায় যায় নি পরীক্ষা উপলক্ষ্যে। যার দরুণ তার বাবা-মা ছিলেন খুবই চিন্তিত। বকরের বাবা থাকতে না পেরে এক বিকালে বকরের মুখদর্শন করতে হলে চলে আসলেন। বকরের বাবা রুমে নক না করে ঢুকে যে দৃশ্য দেখলেন তার জন্য তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। পড়তে পড়তে ক্লান্ত বকর ঐ বিশেষ মুহুর্তে "বারবি গার্ল" গানের সাথে নৃত্যরত ছিল। বকরের বাবা বকরের এহেন কর্মকান্ডে প্রচন্ড বিরক্ত হলেন এবং তিনি ভাবলেন বকর পরীক্ষাকে অজুহাত হিসাবে দাঁড় করিয়ে হলে থেকে পশ্চিমা অপসংস্কৃতির অপচর্চা করছে। এই ঘটনার পর বকরের অ্যাকুয়াপ্রীতিতে সাময়িক ভাটা পড়ল।
বকরের আরেকটি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য হলো কৃচ্ছতাসাধন। এই কর্মে বকরের জুড়ি মেলা ভার। হ্যালভেশিয়াতে খাওয়ার কথা উঠলে ওর এক কথা টাকা অপচয়ের কোন মানে নেই। তারচেয়ে মোড়ের দোকানে রং চা আর বিস্কুট খেলেই হয়। একবার এক বাসের কন্ডাক্টর ভাড়া 1 টাকা বেশি চাওয়ায় বকর যে ঝাড়ি তাকে দিয়েছিল তাতে আমার মনে হয় না বেচারা কন্ডাক্টর আর কোনদিন কারও কাছে আট আনা বেশি চাইবে। এই ঘটনার পর জনসাধারনের 1 টাকা সমান হয়ে গেল বকরের 22 টাকা। জানি না বেচারা ইউরোপে কিভাবে বেঁচে আছে। 1 ইউরো এমনিতেই 95 বাংলাদেশী টাকার সমান। তার সাথে আরও 22 গুন করলে যে পাহাড় প্রমাণ টাকা হয়, তা দিয়ে কিছু কেনা বকরের পক্ষে সমভব নয়।
তবে বকরের দুই হাতে খরচ করার নমুনা একটাই আছে। বাণিজ্যমেলায় বকর গিয়েছিল সুন্দরী ললনা দর্শনে। দর্শন শেষে খাওয়া-দাওয়ার প্রস্তাব উঠতেই বকরের এক কথা বাণিজ্যমেলায় রসনা তৃপ্তি করার প্রশ্নই উঠে না। কারন আকাশ ছোঁয়া দাম। সিদ্ধান্ত হলো বাইরে গিয়ে খাওয়া হবে। বের হবার সময় লাইনের শেষে ছিল বকর। দূর্ভাগ্যক্রমে সে যখন গেট পার হয়ে গেল, তখন দেখতে পেল তার প্রেয়সী জেমী পরিবারসহ বাণিজ্যমেলায় ঢুকছে।জেমীকে দেখেই বকর উলটো ঘুরে বাণিজ্যমেলায় পুনরায় ঢুকার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু বিধিবাম!!! গার্ড ব্যাটা বকরের থেকে ঘাগু হওয়ায়, বকরকে হার মানতে হলো। জীবনে প্রথমবারের মত বকর দ্্বিতীয়বার টিকেট কেটে বাণিজ্যমেলা পূনদর্শন করল।
মাঝে কিছুদিন বকর হুজুর হয়েছিল। দেখা হলেই বলত "চলেন ভাই নামাযটা পড়ে আসি। এই দুনিয়া তো কিছু না..আখিরাতের পরের জীবনই আসল....................।" এই পরির্তনের পর আমি বকরের উপর প্রচন্ড বিরক্ত ছিলাম। নিজের কম্পিউটারের সব গান সে ডিলিট করে দিল। তার বক্তব্য গান নাকি শয়তানের আওয়াজ। শুধু তাই নয়, আমাদেরকে সে গান ডিলিট করতে উদ্্বদ্ধু করতে লাগল। আবার যখন শাকিরার কোমর নাচানো ভিডিও গান দেখতাম তখন সে কানের কাছে "আস্তাগফেরুল্লাহ....আসেন ভাই দ্্বীনের পথে আসেন" বলে উত্যক্ত করা শুরু করল। আমি ও আমার রুমমেটরা প্রথমে পাত্তা না দিলেও শেষে অতিষ্ঠ হয়ে বকরকে বয়কট করলাম। আলটিমেটাম দেয়া হলো সে যেন আমাদের রুমের ত্রি সীমানায় না আসে। শেষ পর্যন্ত মুলোমুলি করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়, আঁতলামি না করলে সে রুমে ঢুকতে পারবে।কিন্তু আঁতলামি করলে পশ্চাদ্দেশে লাথি খাওয়ার দায়িত্ব বকরকেই নিতে হবে। ঝাড়ি খেয়ে আঁতলামি কমালেও বকরের সামপ্রদায়িক উগ্রতা দিন কে দিন বেড়ে যেতে লাগল। থুতনিতে লাগল ছাগলা দাঁড়ি। একেবারে এ্যারাবিয়ান নাইটের জিঙগালুর জুঙ্গার মত।কথায় কথায় অজু করা শুরু করল। মুখে কখনও কখনও বলত "আমরা সবাই তালেবান, বাংলা হবে আফগান"। জিন্স পরত স্যান্ডেলের (রুপসা হাওয়াই চপ্পল) সাথে। কিন্তু জিন্স গুটানো থাকত গোঁড়ালি পর্যন্ত। বকরের এরূপ কর্মকান্ডে আমার অভিভাবকগণ খুবই বিচলিত হয়ে পড়লেন। তাদের ধারণা হলো যে বকরের সাথে থেকে আমিও হুজুর হয়ে যাব এবং বকর এন্ড কোম্পানি আমাকে হুজুরদের তালিকায় অন্তর্ভূক্ত করে ফেলবে। যাই হোক বাস্তবে তা আর ঘটে নি।
পুনশ্চঃ বকর এখন এমিনেমের গান শুেন আর ইউটিউবে ফ্রি মিউজিক ভিডিও দেখে। দাঁড়িটা তার মুখে সহায়িত্ব পেলেও আঁতলামি আগের মত আর করে না। ইউরোপের যে দেশে বকরের অবসহান, সেখানে বাংলাদেশী মেয়েরা যাওয়ার পূর্বে বকরের সাথে যোগাযোগ করে। মেয়েদের অভিভাবকরা বকরের হুজুর মুখোশ দেখে তাদের কন্যাদের বিনাবাধায় বকরের সাথে যোগাযোগে উদ্্বুদ্ধ করেন। আর লম্পট বকর এই সুযোগে ফ্রি বাঙ্গালী নারীসঙ্গ ইউরোপের মাটিতে উপভোগ করে।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জানুয়ারি, ২০০৭ রাত ১২:৩২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


