ক্লাস এইটে পড়ার সময় এক ক্লাস জুনিয়র সায়কার প্রেমে পড়ে গেলাম। আমার সঙ্গী ছিল তমাল। সায়কার জিগরী দোস্ত এশা ছিল তমালের পছন্দ। তাই সায়কা-এশা যেখানে, আমি-তমাল সেখানে। দুই রোমিও র অত্যাচারে অতিষ্ট সায়কা-এশা নালিশ করল ক্লাস টিচারের কাছে। কো-এডে এধরনের গর্হিত কাজ খুবই মারাত্নক অপরাধ হিসাবে বিবেচিত। তাই ব্যাপারটা চলে গেল ভাইস প্রিন্সিপালের কাছে। তমাল ও আমার ডাক পড়ল ভিপির রুমে।তমাল ঢুকেই কান্নাকাটি শুরু করল। তার এক কথা "স্যার আমি আপনার পোলার মত, আপনি আমার বাপের মত। আমাকে মাইরেন না।" তমালকে আমরা খুব সাহসী মনে করতাম। ক্লাস সেভেনে পড়ার সময় সে নাকি পতিতা পল্লীতে গিয়েছিল। এসব যে ভাঁওতাবাজি ছিল তা ওর কান্নাকাটি দেখে বুঝে গেলাম। যাই হোক ওর কান্নাকাটি দেখে বা স্যারের মুড ভালো ছিল, বিধায় আমাদের উপর রুল জারি হলো বাবা-মাকে নিয়ে আসতে হবে।
তমাল এই সিদ্ধান্তে খুবই খুশি হলো। ওর বাবা ছিলেন ইউরোপ প্রবাসী। আর ওর মা খুবই সদাসিধে মহিলা। কিন্তু আমি মহাফ্যাসাদে পড়ে গেলাম। এই লাভ স্টোরি পিতৃদেবের কানে গেলে আমার বাসায় ফেরার কোন পথ থাকবে না। তাই বাসায় না জানানোর ডিসিশন নিলাম। এ ঘটনার 3/4 দিন পর পিয়ন এসে বলে গেল পরের দিন দ্্বিতীয় ঘন্টার পর ভিপি স্যারের সাথে যেন দেখা করি। পরদিন আখিরাতের দিন ধরে নিয়ে পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে স্কুলে এলাম। প্রস্তুতি মানে স্কুল প্যান্টের নিচে হাফ প্যান্ট। বাসায় জিজ্ঞাসা করাতে অজুহাত দিলাম যে টিফিন পিরিয়ডে এ সেকশন-বি সেকশন ফুটবল ম্যাচ আছে তাই হাফ প্যান্ট দরকার।
এরপর যখন হাজির হলাম ভিপি স্যারের রুমে, দেখি আমার জুলিয়েট সায়কা বেগম ও এশা বেগম হাজির। আমাকে দেখেই তারা সত্যের উপর লাল-নীল রং চড়িয়ে যা তা বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। মেয়েমানুষের চোখের পানি কলের পানির চেয়েও তাড়াতাড়ি বের হয়, আর সেই জলে নাকি পুরুষ মানুষের রাগ ধুয়ে-মুছে যায়। স্যারের হৃদয় দ্্রবীভূত হতে সময় লাগল না। কিন্তু রাগ যে স্যারের কমেনি সেটা বেশ ভালো বুঝতে পারলাম। স্যার ওদের ক্লাসে পাঠিয়ে দিলেন। আমি মনে মনে সান্তনা দিলাম এই ভেবে যে প্রেমের জন্য মানুষ জীবন দিয়ে দিয়েছে, আর আমার তো মাত্র কয়েকটা বেত্রাঘাত সহ্য করতে হবে। তবে স্যার বেত হাতে তুলে নিতেই আমার ভিতরের প্রেমিক সত্ত্বাটা জানালা দিয়ে পালিয়ে গেল।
এরপরের ঘটনা বলে আর বিব্রত হতে চাই না। স্যার চেষ্টার কোন ত্রুটি করেন নি আমাকে কুপথ থেকে ফেরত আনতে। সপাসপ পশ্চাৎদ্দেশে বেত্রাঘাত করেছিলেন। আর আমিও প্ল্যানমাফিক গগণবিদারী চিৎকার করে স্কুল মাথায় তুলেছিলাম। তবে বলাইবাহুল্য স্কুলের প্যান্ট, হাফ প্যান্ট ও আন্ডারওয়্যার ভেদ করে বেতের বাড়ি চামড়া পর্যন্ত পৌঁছে নি। এরপর হাফপ্যান্ট নীতি খুব জনপ্রিয়তা পায়। তবে স্যারের সেটা বুঝে উঠতে সময় লাগেনি। শুনেছি স্যার নাকি হাফ প্যান্ট-ফুল প্যান্ট খুলিয়ে তারপর বেত চালাতেন। কিন্তু আমার পিতৃদেবের বদলী হয়ে যাওয়ায় সে স্বাদ আর গ্রহণ করা হয় নি।
আর সায়কা বেগমকে ওই দিনই আমার জীবনের প্রেমের খাতার খরচের পাতায় লিপিবদ্ধ করি । তবে মনের পাতা থেকে মুছতে পারি নি। পারব কিভাবে? প্রথম ভালোলাগার স্মৃতি জীবনের খরচের খাতায় হয়তো তুলে রাখা যায়, জোর করে হয়তো ক্ষণিকের জন্য ভুলে থাকা যায়, কিন্তু মন থেকে মুছে ফেলা যায় না। আজও তাই ভাবি মনে মনে, "আহা!! বড়ই মিষ্টি ছিল মেয়েটি।"
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


