somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আগা নষ্টালজিক গোড়া নষ্টালজিক [তিন]

০২ রা ডিসেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:২১
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

:::মোস্তফা:::



তখন আমি পড়ি নারায়নগঞ্জ এর বিখ্যাত প্রিপারেটরী স্কুলের ক্লাস টু তে। সবে মাত্র স্কুলে একা আসা যাওয়া করা শুরু করেছি। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার সময়ে প্রতিদিনই নিত্যনতুন এডভেঞ্চার হত। আজকে এই গলিতে এক্সপিডিশন তো কালকে মেইন রোড ঘুরে উলটা দিক দিয়ে বাসা খুঁজে পাওয়ার আনন্দ। একদিন ক্লাসের দুষ্ট ছেলে হিসেবে পরিচিতি পাওয়া আমার বন্ধু ইমন কানে ফিসফিস করে বলল, “দোস্ত এক আমার সাথে এক জায়গায় যাবি?” সেইদিন থেকেই মোস্তফার সাথে আমার পরিচয়।

স্কুলের পর ইমন আমাকে নিয়ে আসলো খাজা সুপার মার্কেটের নীচ তলার কালো মোটা পর্দা দিয়ে ঘেরা অন্ধকার ছোট্ট একটা খুপরির মত ঘরে। প্রথম দিকে একটু ভয় ভয় আর অস্বস্তি লাগলেও কোন এক নিষিদ্ধ উত্তেজনার টানে আমিও পর্দার আড়ালের এই নিষিদ্ধ পল্লীতে ঢুকে গেলাম।
কালো রঙের গোল জয়স্টিক আর লাল-হলুদ সুইচ গুলায় হাত পাঁকাতে খুব বেশী দিন লাগল না। স্কুল ছুটি হলেই দুজন দৌড়ে চলে আসতাম। হান্না আর মোস্তফার জন্য নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেত। পরে ঠিক করলাম একদিন আমি হান্না নিয়ে খেলব (মেটাফরিক্যালি) আরেকদিন ইমন খেলবে-অল মিচুয়াল।

এরপর তো এক নেশার মত হয়ে গেল। মোস্তফা, হান্না, জেক আর মোটকা মেস আমার আপনজন হয়ে গেল। জয়স্টিক টা ধরলেই নিজেকে সুপার হিরো মনে হত। গায়ে চলে আসত অসুরের মত শক্তি। খেলতে খেলতে উত্তেজনায় একসময় সেই ডায়নোসরদের জগতেই চলে যেতাম। ইমন মার মার, পাঞ্চ মার, আরও জোরে মার, এদিক এদিক, কিক মার কিক মার, গ্রেনেড নে, লাফ দে লাফ দে, আপারকাট মার মার চিৎকার করতে করতে গলার রগ ফুলে উঠত। তবুও চিৎকার থামত না, জয়স্টিক বন বন করে ঘুরানো আর সেই সাথে তালে তালে বোর্ডের উপর বাড়ি। পৃথিবীর উপর সব আক্রোশ সেই কনসোল গুলোর উপর দিয়েই মিটিয়ে নিতাম বোধ হয়।

প্রতিদিন টিফিন কেনার টাকা গুলো মনির এর খুপরি দোকানে চলে যেত। দুই টাকায় এক কয়েন আর পাঁচ টাকার তিন কয়েন। প্রথম বস কে মারার পর কি যে খুশি হয়েছিলাম বলে বুঝাতে পারব না। বস মারার পর হান্না’র সেই মন কেড়ে নেয়া ডায়লগ- “হোয়াট আ উইম্প” শুনে যেভাবে শিহরিত হতাম, ঈদের চাঁদ দেখলেও এত খুশি লাগত না মনে হয়। সবচেয়ে বিরক্তিকর ছিল কসাই বস। আর স্লাইসার তো ছিল ভয়ংকর। কসাই কে মারার উপায় খুঁজতে গিয়ে কত টাকা যে খরচ করেছি সেটার হিসাব বের করলে আজকে মনে আবার নেপাল চলে যেতে পারতাম। কিন্তু সেই সময় নেপাল এর শ্বেত শুভ্র পাহাড় এর রোমান্টিকতা থেকে মোস্তফার কিক এর থ্রিল বেশী প্রয়োজনীয় ছিল। বাস্তবে মারামারি করার সময় তো এখনও তাদের কিক আর পাঞ্চ এর মুভ গুলাই অন্ধের মত ব্যবহার করি।

খুপে মোস্তফা খেলব আর ধরা খাব না সেটা কি হয়?? একদিন পাগলের মত খেলছি, মনে মনেই দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করে ফেলেছি- যেভাবেই হোক আজকে শেষ করবোই। দিন দুনিয়া সব কিছু ভুলে গেছি তখন, কোন ফাঁকে যে সূর্য ডুবে গেছে খেয়ালই করি নাই। হঠাৎ কে যেন আমাকে টান দিয়ে ঘুড়িয়ে কান পট্টিতে একটা কষিয়ে থাপ্পর মারল। থাপ্পর খেয়ে বোধ বুদ্ধি সব চলে গেল, তাকিয়ে দেখি ছোট চাচা যমের মত আমার দিকে তাকিয়ে আছে। রাগে তার ফর্সা মুখ লাল হয়ে আছে আর থরথর করে কাঁপছে। এতটাই ভয় পেয়েছিলাম যে মুখ দিয়ে কান্নার আওয়াজ ও বের হচ্ছিল না, চোখ দিয়ে টপটপ করে শুধু পানি পরছিল। এরপর হিরহির করে টানতে টানতে আমাকে বাসায় নিয়ে গেল। সেখানে বসল আমার বিচার। বাসার সবার থমথমে মুখ দেখে আবার ফোঁপানি শুরু করতেই আব্বুর হাতে আর একটা রাম থাপ্পর এর দাগ বসে গেল গালে। এরপর মাথা নীচু করে শুধুই শুনে গেলাম, বড় হইয়া তুই গুন্ডা হবি, ভাদাইম্মা হবি, তোরে দিয়া আর লেখাপড়া হবে না, বস্তির পোলাপান এর মত টোকাই হবি তুই, সাথে ছিল আব্বুর সর্বশেষ অস্ত্র...তোরে ছাগল নাইয়ায় পাঠায়া দিব (ছাগল নাইয়া আমার কাছে তখন এক আতঙ্কের নাম ছিল। ঐখানে এক কুখ্যাত মাদ্রাসায় কিভাবে ছেলেদের লেংটা করে পিটায় সেই গল্প শুনলেই আমি কাবু হয়ে যেতাম) এইদিনের পর থেকেই আমার হোস্টেলে যাওয়া মোটামোটি কনফার্ম হয়ে গেল।
কিছুদিনের মধ্যেই আমি হোস্টেলে চলে গেলাম। মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত। কিন্তু একসময় মোস্তফার কথা ভুলেও গেলাম। ছুটিতে বাসায় আসলে কখনো কখনো ঢুকে যেতাম পর্দার পিছনে। কিন্তু আগের মত আর আকর্ষন করত না লাস্যময়ী হান্না। এরপর বাসায় কম্পিউটার চলে আসল। ধুমধাম করে বড় হয়ে গেলাম।শুরু হল এক নতুন যুগ। এক নতুন নেশা।

যত যাই বলি না কেন, মোস্তফা ছোটবেলার এমন এক অধ্যায় যা আমাকে আজও রোমাঞ্চিত করে। খেলতে বসলে এখন আর তেমন উত্তেজিত হই না-আর সেটাই তো স্বাভাবিক, অনেক বড় হয়ে গেছি যে !
সর্বশেষ এডিট : ০২ রা ডিসেম্বর, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:২২
১১টি মন্তব্য ১১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

তারেক রহমানের প্রথম সফর কেন ভারতেই হওয়া উচিত ছিল?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ৩:৩৯


দিল্লির ইন্দিরা গান্ধী বিমানবন্দরে আড়াই ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান কলম্বোর পথ ধরে দেশে ফিরে আসেন । তিনি ভারতে ঢোকার অনুমতি পেয়েছিলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

২০২৪শের শহীদ নাকি প্রতারক ⁉️

লিখেছেন ক্লোন রাফা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৫:৪৭



'বায়বীয় গুলিতে আহত হয়ে নিহত' এক শহীদের উপাখ্যান।

ইনুস বাটপারের ভূয়া শহীদের বিতর্কিত 'জুলাই শহীদ গেজেট' যে অসংখ্য মিথ্যা, প্রতারনা, জালিয়াতিতে ভর্তি একটা বড় রকমের মিথ্যাচার, বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম... ...বাকিটুকু পড়ুন

গল্পঃ প্রত্যাবর্তন

লিখেছেন ইসিয়াক, ১৮ ই জুন, ২০২৬ ভোর ৬:৪৪


চন্দ্রা পশ্চিমের বারান্দায় উদাস হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।আকাশে ছড়ানো ছেটানো  মেঘ, সেই মেঘের মতই তার মনটা আজ  বিক্ষিপ্ত ।
ইদানীং মা কি সব সন্দেহ করে তাকে।অকারণই মনে হয় তার কাছে। তারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

ষো-ল-ব-ছ-রঃ আর কি বর্ষপূর্তি পোস্ট লেখা হবে?

লিখেছেন আমি তুমি আমরা, ১৮ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:০৬



অবাক হয়েই চেয়ে দেখি
কখন এমন হলো?
এইতো আমার ব্লগবাড়ীটার
বয়স হল ষোল।

দুরুদুরু বুকে তখন
খুলেছিলাম ‘নিক’।
ফেলতে পলক, পেরিয়ে গেল
ষোল বছর ঠিক।

ফেসবুক আর ইউটিউবের
আছড়ে পরে ঢেউ।
সামুপাড়ায় এখন কি আর
উঁকি মারে... ...বাকিটুকু পড়ুন

জীবন পর্ব -১

লিখেছেন মায়াস্পর্শ, ১৮ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:৫২



(শালবন ভ্রমণ)
২০১২ সাল। সদ্য পাশ করে বের হয়েছি। কঠিন সময় পার করছিলাম। এদিক-সেদিক স্টেজ শো করে যে পেমেন্ট পেতাম, বাড়িতে ফিরতে ফিরতেই প্রায় শেষ হয়ে যেত। সকালে মায়ের হাতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×