
মহাকাশে প্রথম স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের কৃতিত্ব সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর উৎক্ষেপিত স্পুটনিক ১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহটির নকশা করেছিলেন সের্গেই করালিওভ নামের একজন ইউক্রেনীয় ।
প্রথম আবহাওয়া সংক্রান্ত স্যাটেলাইট ভ্যানগার্ড-২ , ১৯৫৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। এটা আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাতে পারত ।
স্যাটেলাইট বলতে মূলত বোঝায় একটি কৃত্রিম বস্তু যা তথ্য সংগ্রহের জন্য অথবা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পৃথিবী বা চাঁদ বা অন্য কোনো গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়।একটি কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যেমনিভাবে একটি বাদামকে সুতায় বেঁধে দ্রুত ঘোরানো যায়। এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখীন শক্তি ওকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে কিন্তু পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। উভয় শক্তি স্যাটেলাইটকে ভারসাম্য প্রদান করে এবং সাটেলাইটটি পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করে।
যেহেতু মহাকাশে বায়ুর অস্তিত্ব নেই তাই বাধাহীনভাবে পরিক্রমণ করে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা পৃথিবীর নিকটতম স্থানে প্রবেশ করে এবং উচ্চস্তরীয় বায়ুমণ্ডল স্যাটেলাইটকে টেনে আনবে এবং তার গতি মন্থর করে দেবে। স্যাটেলাইটগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির। তার পৃথিবীর নিকটতম পরিক্রমণ স্থানকে বলে পেরেগি এবং দূরতম পরিক্রমণ স্থানকে বলে এপগি।
১৯৫৭ সালের পর থেকে প্রায় ২ হাজার এর বেশি কৃত্রিম স্যাটেলাইট নিক্ষেপ করা হয়েছে। বর্তমানে এই স্যাটেলাইটগুলো অনেক প্রয়োজনীয় কর্মসাধন করছে। মেটিরিওলজিক্যাল স্যাটেলাইট, আবহাওয়া সংক্রান্ত কাজে সাহায্যকারী কৃত্রিম স্যাটেলাইটের কথাই ধরা যাক ঃ বিস্তারিতভাবে আবহাওয়ার অবস্থা পরীক্ষা করার জন্য মেটিরিওলজিক্যাল স্যাটেলাইট নির্মাণ করা হয়।
পৃথিবীর পৃষ্ঠদেশ থেকে কয়েক শ মাইল উপরে আবহাওয়া সংক্রান্ত স্যাটেলাইট নিজ কক্ষপথে পৃথিবীর চারদিকে পরিভ্রমণ করে। এগুলো বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা নির্ণয় করে এবং বায়ুর মধ্যে আর্দ্রতা বা ঈষৎ আর্দ্রতার পরিমাণ নির্ণয় করে। পৃথিবীর ওপর মেঘ ও ঝড়ের অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ ঝড়-বৃষ্টির সম্ভাবনা সম্পর্কে টেলিভিশনে গৃহীত ছবি পৃথিবীতে প্রেরণ করে। এভাবে সংবাদ পাওয়ার ফলে বৈজ্ঞানিকরা অধিকতর নিশ্চয়তার সাথে নির্দিষ্ট এলাকার আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানতে পারেন এবং ঝড়ের সম্ভাবনা সম্পর্কে মানুষকে সচেতন করতে পারেন।
মানুষ জীবন ও ধনসম্পত্তির ক্ষতি প্রতিরোধ করার জন্য আবহাওয়া সংক্রান্ত স্যাটেলাইটগুলো হারিকেন, বন্যা ও অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে আগেই সতর্কতা প্রদান করে থাকে। প্রায় সব স্যাটেলাইট মেঘের ফটোগ্রাফ গ্রহণ করে। ম্যাগনেটিক টেপে সংবাদ জমা করে এবং তারপর টেলিমিটার দিয়ে গ্রাউন্ড স্টেশনে রক্ষিত কম্পিউটারে সোজাসুজি প্রেরণ করে। পৃথিবীর ওপর সেই সময় অবস্থানকারী মেঘের প্রণালীর ছবি পুনরুৎপাদনে সক্ষম হয়।
স্যাটেলাইট পাঠানোর পদ্ধতি ;
কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপন করার জন্য আলাদা মহাশূন্য যান রয়েছে। একে বলা হয় “উৎক্ষেপণ যন্ত্র (Launch Vehicle)“। কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয়, তা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ এবং মহাশূন্য যানটির গতির সমতা রক্ষা করা। কারণ অভিকর্ষজ ত্বরণ আমাদের উৎক্ষেপণ যন্ত্রকে পৃথিবীর দিকে টানতে থাকে।
দুই ধরনের উৎক্ষেপণ যন্ত্র রয়েছে – অপচয়যোগ্য রকেট এবং মহাশূন্য শাটল। অপচয়যোগ্য রকেটগুলো স্যাটেলাইট স্থাপন শেষে ধ্বংস হয়ে যায়। অপরদিকে মহাশূন্য শাটলগুলো স্যাটেলাইট স্থাপনের কাজে বারবার ব্যবহার করা যায়। উৎক্ষেপণ যন্ত্রের গতিবেগ উচ্চতার উপর অনেকটা নির্ভর করে। কম উচ্চতার কক্ষপথে (Low Earth Orbit = LEO) এর বেগ ৭.৮ কি.মি./সেকেন্ড, বেশি উচ্চতার কক্ষপথে (Geostationary Earth Orbit =GEO) এর বেগ ৩.১ কিমি/সে ।
স্যাটেলাইট এর প্রকারভেদ ;
LEO ( Low Earth Orbit ) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ১৬০-২০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলো এই কক্ষপথে থাকে। পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছে থাকায় এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন এই কক্ষপথে অবস্থিত।
MEO ( Medium Earth Orbit) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২০০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইট গুলো এই কক্ষপথে থাকে। এই কক্ষপথের স্যাটেলাইট গুলোর গতিবেগ মন্থর। এই স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়।
GEO (Geostationary Earth Orbit) – GEO পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৩৬০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। এই কক্ষপথে অ্যান্টেনা এর অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে। সাধারণত রেডিও এবং টিভি এর ট্রান্সমিশনের কাজে ব্যাবহার করা হয়।
এবার জেনা আসা যাক বঙ্গবন্ধু-১(বিএস-ওয়ান) স্যাটেলাইট নিয়ে কিছু তথ্য ;
১) মহাকাশে প্রায় ৫০টির উপর দেশের দুই হাজারের উপর স্যাটেলাইট বিদ্যমান। এগুলোর মধ্যে রয়েছে-আবহাওয়া স্যাটেলাইট, পর্যবেক্ষক স্যাটেলাইট, ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট ইত্যাদি। তবে বিএস-ওয়ান হল যোগাযোগ ও সম্প্রচার স্যাটেলাইট ।
২) টিভি চ্যানেলগুলোর স্যাটেলাইট সেবা নিশ্চিত করাই বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের প্রধান কাজ। এর সাহায্যে চালু করা যাবে ডিটিএইচ বা ডিরেক্ট টু হোম ডিশ সার্ভিস।এছাড়া যেসব জায়গায় অপটিক কেবল বা সাবমেরিন কেবল পৌছায় নি সেসব জায়গায় এ স্যাটেলাইটের সাহায্যে নিশ্চিত হতে পারে ইন্টারনেট সংযোগ।
৩) বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের অবস্থান ১১৯.১ ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে। এর ফুটপ্রিন্ট বা কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত।শক্তিশালী কেইউ ও সি ব্যান্ডের মাধ্যমে এটি সবচেয়ে ভালো কাভার করবে পুরো বাংলাদেশ, সার্কভুক্ত দেশসমূহ, ফিলিপাইন এবং ইন্দোনেশিয়া।
৪) ১৫ বছরের জন্য রাশিয়ার কাছ থেকে অরবিটাল স্লট কেনা হয়েছে। তবে বিএস ওয়ানের স্থায়িত্ব হতে পারে ১৮ বছর পর্যন্ত।
৫) ৩.৭ টন ওজনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটটির ডিজাইন এবং তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। আর যে রকেট এটাকে মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে সেটি বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স।
৬) শুরুতে বাজেট ধরা হয় ২৯৬৭.৯৫ কোটি টাকা। শেষ পর্যন্ত অবশ্য ২৭৬৫ কোটি টাকায় এ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হল। এর মধ্যে ১৩১৫ কোটি টাকা দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার আর বাকিটা বিদেশি অর্থায়ন।
৭) আর্থ স্টেশন থেকে ৩৫ হাজার ৭৮৬ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে স্যাটেলাইটটির কক্ষপথে যেতে সময় লাগবে ৮-১১ দিন। আর পুরোপুরি কাজের জন্য প্রস্তুত হবে ৩ মাসের মধ্যে।
এরপর প্রথম ৩ বছর থ্যালাস অ্যালেনিয়ার সহায়তায় এটির দেখভাল করবে বাংলাদেশ। পরে পুরোপুরি বাংলাদেশী প্রকৌশলীদের হাতেই গাজীপুর ও রাঙামাটির বেতবুনিয়া আর্থ স্টেশন থেকে নিয়ন্ত্রিত হবে এটি।
তথ্যসূত্র ;
বিবিসি বাংলা ,উইকিপিডিয়া , ইন্টারনেট ।
ফটো ; গুগল
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই মে, ২০১৮ বিকাল ৩:৫৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


