
রমিজ সাহেব সরকারি উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা । সকালে ঘুম থেকে উঠেই বিদেশী চুরুট টানেন আর পত্রিকা পড়েন । এই চুরুট না টানলে তার কোষ্ঠ পরিষ্কার হয়না । চুরুট তার নিজের কিনতে হয়না , উপহার হিসেবে এমনিতেই দিয়ে যায় ,লোকজন তাকে অনেক সমাদর করে কিনা ।
পত্রিকা খুলেই আজকের রাশিফল পাতায় প্রথমে চোখ বুলালেন প্রতিদিনের মত । তিনি রাশিফলে খুব বিশ্বাসী । এই পত্রিকার রাশিফল লেখা লোকটির সাথে তিনি দেখাও করেছেন ।তার নির্দেশে হাতে রং চং-এ কয়েকটা আংটিও পড়েন । রমিজ সাহেবের রাশি হল বৃষ ।
আজকে রাশিফল পাতায় প্রথমে বৃষ রাশি নিয়ে লিখেছে ।
"বৃষ মানে ষাঁড় ,বলদ ।ইংরেজীতে বুল । বৃষ রাশি অধিকারীদের আজ ভাগ্য সুপ্রসন্ন । যাত্রা শুভ । আত্মীয়দের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার সম্ভাবনা আছে । প্রিয়জন নিয়ে ঘুরতে বের হয়ে পড়ুন সময় থাকলে ।"
রাশিফল পড়ে প্রথমে মন খারাপ হলেও পরে মন ভাল হয়ে গেল রমিজ সাহেবের । বৃষ মানে ষাঁড় এটা তিনি জানতেন ,এটা লেখার কি দরকার ছিল । মনে মনে গালিও দিলেন কুকুরের ছানা বলে ।বেশি কিছু বললেন না , শত হলেও তিনি গুরুমানুষ । পত্রিকা আরো কিছুক্ষন উল্টিয়ে পালটিয়ে দেখার পর চুরুট শেষ করে টাট্টি ঘরে ঢুকলেন । টাট্টি ঘরে ঢুকেই গুনগুন করে গান ধরলেন " চোখের আলোয় দেখেছিলেম চোখের বাহিরে ......... " ।
নাস্তার টেবিলে এসে দেখলেন ,শুকনো দুটো রুটি আর করল্লা ভাজা তার জন্য রাখা হয়েছে ,সাথে চিরতার রস । দেখেই মেজাজ খারাপ হল তার । কিন্তু কিছু করার নেই ,সকাল বেলা বাসায় তার সহধর্মিনী এই খাবারেরই ব্যবস্থা করে । সপ্তাহে একদিন মুরগীর মাংস , আরেকদিন ডিমবাদে বাকি ৫ দিন করল্লা শাকসবজি খেতে হয় । নিজের বউয়ের কাছে তিনি ভেজা বেড়াল ।অবশ্য তার ভালোর জন্য এসব করে , ডায়বেটিস ,হাই প্রেশার দুটোই আছে তার । বয়স এখনো পঞ্চাশ হয়নি । তবে সকাল বেলা একটা চুরুট টানার পারমিশন আছে ।
ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বললেন । তার ড্রাইভার একটা গাধা । সারাদিন পরে পরে ঘুমায় । দেখ যাবে রাস্তায় ৫ মিনিটের জ্যামে পড়েছে ,তার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ছে ড্রাইভিং হুইলের ওপর ।এজন্য তাকে কঠোর শাস্তিও দিয়েছেন তিনি অনেকবার ,কিন্তু কাজ হয়নি ।
এখন রাস্তায় গাড়ির ভিতর উচ্চস্বরে গান বাজিয়ে রাখেন , তারপরেও গাধাটা মাঝে মাঝে ঘুমিয়ে পড়ে ।
গাড়িতে উঠে তিনি প্রথমেই একটা চুরুট ধরালেন । তারপর ড্রাইভারকে বললেন , অমুক হোটেলে যাও ।হোটেলে গিয়ে পেট পুরে ইচ্ছে মত খেয়ে আবার গাড়িতে উঠলেন ।
কিছুদুর যাওয়ার পর ট্রাফিক পুলিশ তাকে থামাল । ড্রাইভার জানলা খুলতেই ট্রাফিক পুলিশ বলল , লাইসেন্স আছে?
রমিজ সাহেবের এই কথা শুনে মেজাজ বিগড়ে গেল । পুলিশকে ডাকলেন , এই হাদারাম এইদিকে আয় । আমাকে চিনস ,এই দেখ আমার আইডি ।
পুলিশ তারপরেও বলল , স্যার ভদ্রভাবে কথা বলুন ।আপনি যে হোননা কেন , উপর থেকে অর্ডার আসছে সব গাড়ির লাইসেন্স চেক করতে হবে । আপনার আইডি আপনার কাছেই রাখুন । স্কুলের ছেলেপেলেরা কয়েকদিন যে ঝামেলা করছে ,ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি চালানো নিষেধ আছে স্যার ।
রমিজ সাহেব আরো খেপে গেলেন । বললেন ," এক থাপ্পড়ে দাঁত ফেলে দেব । তোর যে উপরে স্যার আছে তাকে ডেকে আন ।''
ত্যাঁদরামি করছিস আমার সাথে , চাকরি থাকবেনা কিন্তু হা বলে দিলাম ।
কিছুক্ষন পর আরেকজন পুলিশ অফিসার এসে রমিজ সাহেবকে সালাম দিল । থতমত খেয়ে বলল ,স্যার নতুন এসেছে ,আপনাদের চেনে না ।মাফ করে দেন । ওকে আমি শান্টিং দিয়ে দেব ।
-"বদমাইশ কোথাকার , আস্তা গাধা ।ভাল করে সব বুঝিয়ে শুনিয়ে নাও ,নাহলে তোমার কপালেও দুঃখ আছে ।"
-" তওবা তওবা স্যার ।ও কথা আর বলতে হয় । স্যার আমার ওই ব্যাপারটা যদি একটু দেখতেন ! "
- "সব মনে আছে । পাবে তোমার ভাগেরটা ।"
-"স্যার একটু দাঁড়ান হারামজাদাটাকে বলি আপনার পা ছুঁইয়ে ক্ষমা চাক "।
- " না লাগবেনা , ওকে ভাল করে শেখাও সবকিছু ,নাহলে টিকতে পারবেনা ।''
- " সালাম স্যার " ।
রমিজ সাহেবের মেজাজ খারাপ কমল না , ''সব গুলো গাধার বাচ্চা গাধা " ।এই পুলিশ অফিসারকে নাইক্ষ্যংছড়ি পাঠাতে হবে ,তাহলে বুঝবে কত ধানে কত চাল !
আরেকটা চুরুট ধরালেন তিনি । আচ্ছা কত ধানে কত চাল এই প্রবাদটি তো ভুল । যে কয়টা ধান থাকবে সে কয়টাই তো চাল হবার কথা । অবশ্য কিছু ধান ফুসা থাকে ,চাল তো কম হবার কথা ,তারপরেও কেন আমরা এই প্রবাদ বলি ?
অফিসে এসে নিজের রুমে ঢুকলেন রমিজ সাহেব । সাথে সাথে পি এস এসে ঢুকল ।
-স্যার খুব খারাপ সংবাদ আছে ?
এমনিতেই রমিজ সাহবের মেজার খারাপ ,তার ওপরে পি এস বলে কিনা খারপ সংবাদ আছে। আজকে তো তার রাশি ফল হবার কথা ছিল ,কিন্তু সব উলটা হচ্ছে কেন । কিছুই বুঝতে পারছেন না তিনি ।
যথাসম্ভব রাগ দমিয়ে রেখে কোমল কন্ঠে পিএসকে বললেন ,এদিকে কাছে আয় ।
পিএস ভয় পেয়ে বলল , কেন স্যার ?
"কাছে আসতে বলছি ,কাছে আয় । "-রাগার স্বরে বললেন তিনি ।
পিএস ভয়ে ভয়ে রমিজ সাহেবের কাছ গেল ।
"
রমিজ সাহেব পিএস এর কান ধরে মলে দিল । পরে বলল ," এইযে তোর কান মলে দিলাম রাগ কমেছে এখন , এখন বল কি খারাপ সংবাদ । মেজাজ গরম রেখে তো আর খারাপ সংবাদ শোনা ঠিক না ।"
- স্যার , আপনার লাস্ট ক্লায়েন্ট যার কাছ থেকে বিশাল একটা ধান্দার ব্যবস্থা ছিল
-হা , "কি হয়েছে তার ? মারা গেছে ? "
- "না স্যার , সে আপনার প্রতিপক্ষ মকবুল সাহেবের কাছে চলে গেছে ।"
- "কি বললি এটা , মকবুইল্লা তাহলে এখন আমার ক্লায়েন্টের দিকে হাত বাড়াচ্ছে । " ও এত পাওয়ার পেল কোথায় "? কিছুদিন আগেও তো আমার পায়ের কাছে এসে পড়ে থাকত ।"
- স্যার ,উনি এখন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর খাস লোক ।
- "আমাকে সরাষ্ট্র মন্ত্রী দেখায় , আমি তাকে আগরতলা দেখাব ।" আমাকে চেনে না মকবুইল্লা ! " এখন ভাগ এইখান থেইকা ,একটা চুরুট ধরাইয়া দিয়া যা ।"
রমিজ সাহেব আবারো চুরুট টানা শুরু করলেন । তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে । এটা তো মেনে নেওয়া যায়না । তখন তার চোখ পড়ল হাতের আংটি গুলার ওপর ,রাগে দুঃখে সব গুলো খুলে ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিলেন ।
সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০১৮ সকাল ১১:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



