somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

কয়েকজন শিক্ষকদের গল্প ।

১২ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ৯:৩৫
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আমার জীবনে যত শিক্ষক পেয়েছি তাদের মাঝে কয়েকজনের গল্প বলব ।

প্রথমেই আসি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা । ছোট বেলায় শিক্ষকদের আমরা ছাত্রছাত্রীরা খুব ভয় করতাম ,ভয় না করে উপায় ছিলনা । পড়া না পারলেই ঠাস ঠাস বেতের বাড়ি মাফ ছিলনা । তবে অল্প কয়েকদিনের জন্য এক ম্যাডামকে পেয়ছিলাম । ম্যাডামের নামটা ঠিক মনে নাই । গ্রামের সরকারি স্কুলে পড়তাম । ম্যাডাম কিছুদিনের জন্য এসেছিলেন ,পরে বদলি হয়ে চলে গেছেন ।২-৩ মাসের মত ছিল । তার ব্যবহার , পড়ানোর স্টাইল ছিল ইউনিক । তিনি কখনই বেত দিয়ে মারতেন না ।পড়া না পারলে কাছে ডেকে আদর করে বুঝাতেন,তখন লজ্জায় পরে সবাই পড়া পরে আসত । ম্যাডামকে আজ লিখতে গিয়ে হঠাৎ করে মনে পড়ল ,ভুলেই গিয়েছিলাম ।

আমাদের স্কুলের সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং মারমুখী স্যার ছিলেন কার্তিক স্যার । তিনি ম্যাট্রিক পাস ছিলেন , কিন্তু গনিতে অনেক দক্ষ ছিলেন ,ভাল করে বুঝাতে পারতেন । কিন্তু প্রচুর মারতেন ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের । সবার কাছে তিনি ছিলেন বিভীষিকা ।আশেপাশে থাকলেই ক্লাসের সবচেয়ে দুষ্ট ছেলেটাও শান্ত হয়ে যেত ।মজার ব্যাপার হল , স্যার হিন্দু হলেও মাঝে মাঝে স্যার না থাকলে আমাদের ইসলাম শিক্ষা পড়াতেন । তিনি কয়েকটা সূরা মুগস্থও বলতে পারতেন ।
সবসময় তিনি বেত নিয়ে ঘুরতেন । তবে তার কাঠিন্যের ভিতরও একটা কোমল হৃদয় ছিল । খুব মজাও করতে পারতেন ।
সবসময় ছাত্রছাত্রীদের ভাল চাইতেন । মাঝে মাঝে আমাদের বাড়িতে আসত সরকারি কাজে ।তখন মাথায় হাত বুলিয়ে স্নেহ করতেন । তখন তাকে মহামানুষ মনে হত । এখন তিনি আর স্কুলে পড়ান না , অবসর নিয়েছেন । গ্রামের বাড়িতে গেলে বাজারে তাকে বাজারের ব্যাগ নিয়ে দেখা যায় ,দেখেই মনটা ছোক ছোক করে ।তার হাতে বাজারের ব্যাগ মানায় না । চক ডাস্টার আর বেতই ভাল মানাত । এখন শুনেছি স্কুলে বেত দিয়ে মারা নিষেধ ।


পরে যে স্যারের কথা বলব ,তিনি ছিলেন গ্রামের ছেলেপেলেদের গৃহশিক্ষক । তার নামও ছিল অন্য রকম । এলাকায় ভক্কা স্যার নামে পরিচিত ছিল । তার কাছেই আমার হাতেখড়ি হয়েছিল । কাকডাকা ভোরে এসে আমাদের বাড়িতে হাজির হত , হাতে থাকত বেত । তখন আজানের সময়ে উঠে বাথরুম সেরে পড়ার টেবিলে বসে থাকা লাগত ,এসে যদি তিনি পড়ার টেবিলে না পেতেন তাহলে বেতের বাড়ি নিশ্চিত । তিনি ছিলেন ছাত্রছাত্রীদের কাছে ত্রাস । তাকে সবাই ভয় পেত । যদিও তিনি মেট্রিক পাসও করতে পারেন নি । তবে ক্লাস
৫ম শ্রেণী পর্যন্ত প্রাইভেট পড়াতেন । অনেক ভালই পড়াতেন । আমি ক্লাস থ্রি পর্যন্ত তার কাছে পড়ছিলাম ,পরে কি এক কারনে আমাদের বাড়িতে পড়ানো ছেড়ে দিয়েছিলেন । তিনি ছিলেন আমাদের ফ্যামিলি মেম্বারের মত , আমাদের সাথে মাঝে মাঝে ভাল খাবার হলে খেতে আসত । একসাথে শুক্রবার বাংলা ছবিও দেখত ।

ছোটবেলায় সঠিক গাইড লাইন দিত পারত ভাল ।স্যার এখন আর প্রাইভেট পড়ান না । আগে মাইকের ব্যাবসা ছিল ,এখন একটা নসিমন আছে ।সেটা তদারকি করেন । মজার ব্যাপার , তিনি এখনো বিয়ে করেন নি ,আর করবেনও না । ক্লাস নাইন না জানি টেনে থাকতে তার মা মারা যান , বাড়িতে সৎ ভাই ছিল ।বের করে দেয় বাড়ি থেকে তাকে ।বাবা আগেই মারা গেছিল তার । পরে ছেলে মেয়েদের টিউশনি করিয়ে জীবন যাপন করেছেন ।স্যার একজন প্রকৃত সংগ্রামী লোক ।তাকে দেখলেও এখনো কষ্ট লাগে । সারাজীবন কষ্ট করেই গেলেন ,অথচ অনেকেরই জীবন ছোটবেলায় গড়ে দিয়েছেন ।


পরের যে স্যারের কথা বলব ,তিনি এখন আমাদের পাশের এলাকায় একটা স্কুলের প্রধান শিক্ষক এখন । তার একটা ব্যাপার কখনো ভুলবনা । ক্লাসে এসেই তিনি সবাইকে লিখতে দিয়ে চেয়ারে বসে আরাম করে নাক ডেকে ঘুমাতেন । আমরা সবাই লেখা শেষ করে জমা দিতাম । ঘুমের ভিতরো তিনি খাতা দেখতেন । খাতায় সাইন দিতে গিয়ে পৃষ্ঠা চিঁড়েও ফেলতেন ।
তিনি গোমরা টাইপের ছিলেন । মাঝে মাঝে খুব বেত দিয়ে মারতেন । তাকে কেন জানি আমার খুব বিরক্তিকর লাগত ।

নাজমুল নামে এক তরুন শিক্ষক ছিলেন । আমাদের বিজ্ঞান ক্লাস নিত । খুব ভাল করে পড়াতেন । মাঝে মাঝে খুব সুন্দর সুন্দর গল্প বলতেন । আমাদের কুইজ টেস্ট নিতেন । পড়া না পারলে মাইরও দিতেন ।একদিন তালপাতার হাত পাখা দিয়ে মারছিলেন ,পরে পাখাটা ভেংগে গিয়েছিল । স্যারকে আমার খুব ভাল লাগত । রোজার সময়ে ,বাসা থকে টিফিন দিয়ে দিয়েছিল । লেইজার টাইমে খাওয়া হয়নি । লেইজারের পরের টাইমে স্যারের ক্লাস থাকত । স্যারের ক্লাসে আমি চুপিচুপি পরাটা খাচ্ছিলাম , স্যার দেখে ফেলেছিলেন এবং খুব সরম দিয়েছিলেন ।স্যার আমাদের সবাইকে নিয়ে একটা বিশেষ গান গাইতেন ,গানটা ভুলে গেছি ।



এখন যে স্যারের কথা বলব ,তিনি ছিলেন ক্লাস ফাইভে বৃত্তি পাওয়ানো স্পেশালিস্ট স্যার । নাম খোকন স্যার । যমের অরুচি ছিলেন যাকে বলে । শুধুমাত্র ক্লাস ফাইভে ক্লাস নিতেন ,মাঝে মাঝে টিচার না থাকলে ফোরেও নিতেন ,খুব কম । স্যারের একটা ব্যপার কখনো ভুলবনা । স্যার ক্লাসে ঢুকেই ময়লার ঝুলিতে কালো কালো পিক ফেলত । হাতে থাকত জোড়া বেত । খুব ভয়ংকর দৃশ্য ছিল তখন । স্যার যারা যারা বৃত্তি দিবে মানে ক্লাসের ভাল ছাত্র ছাত্রীদের প্রাইভেটও পড়াতেন ।প্রাইভেটেও পড়া না পারলে বেত দিয়ে মারতেন ।

একবার স্যারের জোড়া বেতের মার খেয়েছিলাম ,প্যাণ্ট খুলে যাওয়ার মত অবস্থা হয়েছিল । একদিন খুব মজার ঘটনা ঘটছিল । স্যার ইংরেজী ক্লাসে বানর এবং টুপির একটা গল্প পড়া দিয়েছিলেন ,পরদিন ঐ গল্প থেকে ট্রান্সলেশন লিখতে দিবেন ।বাংলায় বলবেন ,ইংরেজীতে লিখতে হবে । মানে পুরো গল্পটা আরকি মুখস্থ করতে হবে আরকি । তো পরদিন কারো পড়া হয়নি ।সবাই ভয়ে আতস্থ ।
স্যার ক্লাসে আসলেন । আমরা তো রীতিমত সবাই ভয়ে কাঁপতেছি । দোয়া দুরুদও পড়তেছি ।স্যার বইটা খুলে লিখতে দিবেন ,ঠিক তখনই এক লোক আসল ,স্যারকে কিছু বলল ।স্যার সাথে সাথে চলে গেল । অন্য একজন স্যার এসে ক্লাস নিয়েছিল এবং ঐদিন কেউ মাইর খায়নায় ।

স্যার চলে গেছিলেন কারন স্যারের ছোট বাচ্চা মেয়ের আছাড় খেয়ে দাঁত পড়ে গিয়েছিল । হয়ত ,ঐদিন আমাদের কারো দোয়া কবুল হইছিল । নাহলে সবাইকে ঐদিন জোড়া বেতের মার খেতে হত । অন্য কোন স্যার মারের সময় একটু দয়া মায়া করতেন । বেশি হলে ৭-৮ টা বেতের বাড়ি দিতেন ।কিন্তু এই খোকন স্যার মাইর শুরু করলে হুঁশ থাকতনা ।একসাথে ২০-৩০ টা বেতের বাড়ি মেরে তারপর ছাড়তেন । এজন্য সবাই তাকে খুব ভয় পেত । এখনো স্যার আছেন আমাদের সেই স্কুলে কিন্তু আগের মত আর মারেন না ।


এই লেখাটা যারা পড়ছেন ,তারা মনে মনে খুব বিরক্তি হইছেন মনে হয়েছে । যাইহোক যদি ভাল লাগে তাহলে আরো কিছু গল্প নিয়ে আসব । গল্প হলেও সত্যি কিন্তু যা লিখেছি ।











সর্বশেষ এডিট : ১২ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ১১:৪১
৬টি মন্তব্য ৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

লিখেছেন নতুন নকিব, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১:৩৬

আপনার একান্ত মুহূর্ত কি লুকানো ক্যামেরায় বন্দি হচ্ছে, জেনে নিন শনাক্তের উপায়

USB Charger এর ভেতরে লুকানো ক্যামেরার ছবিটি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

ভূমিকা

ভ্রমণ মানেই নতুন জায়গা দেখা, প্রিয়জনের সাথে সময় কাটানো... ...বাকিটুকু পড়ুন

সেই মানুষগুলো কোথায় গেলো

লিখেছেন অর্ক, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ দুপুর ২:২৬



স্বাধীনতা পরবর্তী, পচাত্তর পরবর্তী সময়ের ঘটনা। পচাত্তরের পনেরোই আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। ক্যু হয়েছে দেশে। সামরিক বাহিনীতে সংঘাত। বহু সদস্য হতাহত। জেনারেল জিয়া অবৈধভাবে ক্ষমতা কুক্ষিগত... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাঝা

লিখেছেন রাজীব নুর, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:০৬



বর্তমানে জনসংখ্যার বিচারে 'বিহার' ভারতের তৃতীয় বৃহত্তম রাজ্য।
বিহারের রাজধানী পাটনা। বিহার মূলত দরিদ্র অঞ্চল বলা যেতে পারে। এখানে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় আছে। অনেক পুরাতন বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা ছিলো মূলত... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাংলাদেশ কি ক্যাশলেস সোসাইটি এর জন্য কি পারফেক্ট?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ২৩ শে জুলাই, ২০২৬ বিকাল ৩:৪০



এটা বাংলা কিউ আর কোড। বাংলাদেশ ব্যাংক সকল ব্যাবসায়ীদের বাংলা কিউ আর কোড বাধ্যতামূলক করেছেনভ এটার ভালো দিক ও খারাপ দিক দুইটাই আছে। বাংলাদেশের সিস্টেম, কারিগরি দক্ষতা,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাহরাম নয়, এমন পুরুষকে কি একজন স্ত্রীলোক নিজের স্তনের দুধ পান করাতে পারবেন?

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ২৪ শে জুলাই, ২০২৬ সকাল ৯:২১

আয়েশা (রা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: সাহলা বিনতে সুহাইল নবী করীম ﷺ-এর নিকট এসে বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমার নিকট সালেমের আসাটা আবু হুযাইফা ভালো মনে করছেন না। নবী বললেন:... ...বাকিটুকু পড়ুন

×