
"এবং যদি তুমি কিছু অর্জন করতে চাও ,গোটা পৃথিবী তোমাকে সেটা পেতে সাহায্যের হাত বেড়িয়ে দিবে ।"
পাওলো কোয়েলহোর রচিত বিশ্বজয়ী উপন্যাস "দ্যা আলকেমিষ্টের " সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক উক্তি এটা মনে হয়েছে আমার কাছে ।
উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সান্তিয়াগো নামক একটা বালক যে স্পেনের আন্দালুসিয়ানের পরিত্যক্ত চার্চে এক পাল ভেড়া নিয়ে রাত কাটায় ,দিনে ভেড়া চড়িয়ে বেড়ায় । যার ইচ্ছা সারা বিশ্ব ভ্রমন করা । তার বাবা চেয়েছিল তার ছেলে সান্তিয়াগো বড় হয়ে ধর্মযাজক হবে । কিন্তু সান্তিয়াগো বাবার কথায় সাড়া না দিয়ে একপাল ভেড়া নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে পথে ।
সান্তিয়াগো চার্চে রাত কাটানোর সময়ে দুইবার স্বপ্নে দেখে একটা ছোট বালক তাকে মিশরের পিরামিডের নীচে লুকিয়ে থাকা ধন-রত্ন খোঁজ করতে বলে । কিন্তু ছোট বালকটি যখন গুপ্তধনের লোকেশন বলতে যায় ,তখনই সান্তিয়াগোর ঘুম ভেঙ্গে যায় । সান্তিয়াগো এক জিপসী মহিলার কাছে আসে ,তার স্বপ্নের কথা বলে । জিপসী মহিলা তাকে বলে যেহেতু ছোট বাচ্চা তাকে স্বপ্নে গুপ্তধন দেখাচ্ছে ,অবশ্যই সে গুপ্তধন খুঁজে পাবে এবং অনেক ধনী হবে ।এজন্য তাকে মিশরে পিরামিডে যেতে কিন্তু সেও তাকে বলেনা লোকেশন কোথায় এবং আরো বলে এটাই তার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত । সান্তিয়াগোকে শর্ত দেয় যদি সে গুপ্তধন খুঁজে পায় তবে তার দশভাগের একভাগ তাকে দিতে হবে ।
এখানে একটা খুব ভাল উক্তি আছে লেখকের ;-
" তোমার জীবনের স্বপ্ন সত্যি হবে যখন এটা জীবনকে আরো বেশি আকর্ষনীয় করে তোলবে ।"
আর একটি উক্তি আছে স্বপ্ন নিয়ে ;-
" স্বপ্ন হল ঈশ্বরের কথা বলার ভাষা । "
সান্তিয়াগো জিপসী মহিলার কথা শোনে মোটামুটি হতাশ হয় । তখন তার সাথে এক রহস্যময় লোকের সাথে দেখা হয় যে নিজেকে সালেমের রাজা বলে নিজের পরিচয় দেয় । লোকটি সান্তিয়াগোকে তার স্বপ্নের কথা এবং এই স্বপ্নই তার জীবনের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে । সে সান্তিয়াগোকে সাহায্য করবে গুপ্তধন খুঁজতে কিন্তু তাকে সান্তিয়াগোর ভেড়ার পালের দশভাগের একভাগ দিতে হবে । সান্তিয়াগো একদিন সময় নিয়ে ভাবে ,পরের দিন রহস্যময় লোকটিকে ছয়টি ভেড়া দিয়ে দেয় । লোকটি সান্তিয়াগোকে বলে , তাকে মিশরে যেতে হবে পিরামিডের কাছে । এবং সান্তিয়াগোকে উরিম এবং থুমমিম নামক একটা কালো এবং সাদা পাথর দেয় ।
পাথর দুটি সান্তিয়াগোকে যাত্রাপথে ঈশ্বরের ইঙ্গিত বুঝতে সাহায্য করবে । সান্তিয়াগোকে লোকটি অনেক উপদেশ দেয় , এবং তাকে প্রকৃতির ইঙ্গিত বুঝে চলার জন্য বলে ।
এরমধ্যে বেশ কিছু উক্তি আছে খুবই সুন্দর ;-
" তোমার জীবনের স্বপ্ন সত্যি হবে যখন এটা জীবনকে আরো বেশি আকর্ষনীয় করে তোলবে ।"
"স্বপ্ন অধরার পিছনে কেবল মাত্র একটা অন্তরায় কাজ করে , ভয় এবং ব্যর্থ হবার দুশ্চিন্তা ।"
"সবাই এমন ভাব ধরে যেন তারা একথা জানে কিভাবে অন্যসবার জীবনযাপন করা উচিত কিন্তু নিজেরটা সম্পর্কে তারা
ওয়াকিবহাল না ।"
" মনে রেখ , যেখানে তোমার হৃদয় শুভ ইঙ্গিত দিবে ,সেখানেই তোমার গুপ্তধন খুঁজে পাবে ।"
"যখন তুমি প্রথমবার তাস খেলতে যাবে , তুমি নিশ্চিত থাক যে তোমার জেতার সম্ভাবনাই বেশি । যাকে বলে শুরু করার ভাগ্য ।"
"পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মিথ্যা কি ? - এটা হল , আমাদের জীবনে এমন সময় আসে যখন আমরা কি করছি তার ওপর নিজের কর্তিত্ব
হারিয়ে ফেলি এবং আমাদের জীবন ভাগ্য দ্বারা চালিত হয় "
" যদি তুমি তোমার প্রতি অর্পিত সৌভাগ্যকে দূরে ঠেকে দাও ,সেটা অভিশাপ হয়ে ফিরে আসবে ।"
" যদি প্রত্যেক দিন আগের দিনের মতই একই কাটে , তাহলে বুঝতে হবে তুমি ব্যর্থ হয়েছে যে তোমার জীবনের প্রত্যেকটি দিনে
ভাল কিছু করার জন্য নতুন করে সূর্যোদয় হয় । "
এরপর সান্তিয়াগো পুরো ভেড়ার পাল বিক্রি করে তাঞ্জিনিয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করে ,সেখানে পৌঁছায় । কিন্তু দূর্ভাগ্যবশত সেখানে সে চোরের খপ্পড়ে পড়ে এবং নিঃস্ব হয় । তখন সে আবার খুব হতাশ হয়ে পড়ে এবং রহস্যময় লোকটির কথা বারবার তার মনে পড়ে । তার সব টাকা চুরি হয়ে গেলেও পাথর দুটি তার জামার ভিতরে থাকায় চুরি হয়না । সে লোকটির কথামত প্রকৃতির ইঙ্গিত ফলো করতে থাকে । সে এক আরব লোকের ক্রিস্টালের দোকানে কাজ নেয় । দোকানটি থাকে একটা পাহাড়ের ওপর । আগে সেখানে বাজার বসত কিন্তু নতুন বাজার হওয়ায় ,সেখানে লোকজন কম যায় । সান্তিয়াগো কাজ শুরু করার পর সৌভাগ্যবশত লোকজনের আনাগোনা শুরু হয় এবং বেচাকেনা বাড়ে ,দোকানের মালিক সান্তিয়াগোর প্রতি আরো সদয় হয় ।
সান্তিয়াগো দেখে লোকজন পাহাড়ের সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠে এসে পানীয় পান করেত চায় । সে দোকানের মালিককে বলে চায়ের ব্যবস্থা করে এবং চা ক্রিস্টাল এর কাপে পরিবেশন করে । এর ফলে একটা হিড়িক পরে যায় ,প্রচুর লোক আসে দোকানে । প্রায় এক বছর কাজ করার পর ,সান্তিয়াগোর কাছে আবার মিশরে যাওয়ার জন্য পর্যাপ্ত টাকা জমে । সে তখন যদিও আবার ভেড়া কিনে নিজের দেশে যাওয়ার পরিকল্পনা করেত থেকে কিন্তু আবার মিশরে যাওয়ার ইচ্ছাও পোষন করে । এরকম সময়ে সে পাথর দুটি হাতে নেয় এবং নিজের লক্ষ্য আবার খুঁজে পায় । ইতিমধ্যে সে দোকানের মালিকের কাছ থেকে ভালভাবেই আরবি ভাষা রপ্ত করে ।
সান্তিয়াগো মিশরের পিরামিডে যাবার জন্য আবারো প্রস্তুতি নেয় ।এজন্য তাকে সাহারা মরুভূমি পাড়ি দিতে হবে । সে এক কারাভানের সাথে যাত্রা শুরু করে , কারাভানে এক ইংরেজ লোকের সাথে পরিচয় হয় যে আল-ফাউমে আলকেমিষ্টের সন্ধানে যাচ্ছে । আলকেমিষ্ট হল তারাই যারা লেড বা লোহা থেকে পরশপাথরের সাহায্যে স্বর্ন বানাতে পারে । ইংরেজ লোকের কাছে এ সম্পর্কে অনেক গুলো জার্নাল থাকে ,সে অনেকবার চেষ্টা করেও লোহাকে সোনায় বানাতে পারেনি । এজন্য সে একজন আলকেমিষ্টের সাথে দেখা করে এর গুপ্ত রহস্য সম্পর্কে জানতে আগ্রহী ।
মরুর পথে চলার সময়ে সে মরুভূমি থেকে নানারকম ইংগিত এবং সংকেত সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করে । ইংরেজ লোকটি সান্তিয়াগোকে
তাকে সাহায্য করার জন্য বলে আলকেমিষ্টকে খুঁজে দিতে । আল-ফাউমে তারা এক মরু-উদ্যানে এসে অবস্থান নেয় আলকেমিষ্টকে খোঁজার জন্য । এসময় সান্তিয়াগো এক মেয়ের প্রেমে পড়ে ।মেয়েটিও সান্তিয়াগোর প্রেমে পড়ে ।সান্তিয়াগো তার প্রেমে এমন মত্ত হয় যে ,এখানে সে থেকে যাওয়ার চিন্তা-ভাবনাও শুরু করে ।
এই মরু উদ্যানে তিনশোর মত পরিবারের বসবাস । এবং মরুউদ্যানে একটা নিয়ম আছে ,এখানে কোন সম্প্রদায় আক্রমন করতে পারবেনা । একদিন সান্তিয়াগো এমন একটি ইঙ্গিত পায় যে ,এই মরুদ্যান আক্রমনের সম্মুখীন হচ্ছে । এরপরে কি হয়েছে তা বলবনা , বইটি পরে বাকি কাহিনী জানতে হবে । মরুউদ্যানে সে শেষ পর্যন্ত কাউন্সিলর পদও পায় ।
এতসবের ভিড়ের মাঝেও সে আলকেমিষ্টকে খুঁজে বেড়ায় এবং খুঁজে পায় অবশেষে ২০০ বছর বয়সী এক আলকেমিষ্ট । আলকেমিষ্ট ইংরেজী লোকটাকে তেমন কোন সাহায্যই করেনা বরং সান্তিয়াগোকে তার লক্ষ্য পূরনের কথা বলে কারন সান্তিয়াগোর মাঝে সে ইংগিত দেখতে পেয়েছে ।এরপরে আলকেমিষ্টের সাথে সান্তিয়াগোর নতুন যাত্রা শুরু হয় , সেখানে কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয় সান্তিয়াগোকে , আলকেমিষ্ট তার নিজের বিদ্যাও জাহির করেন । সান্তিয়াগো শেষ সম্বলটুকুও চলে যায় ডাকাতের খপ্পড়ে পড়ে , সে আবার নিঃস্ব হয় ।
সে কি তার জীবনের স্বপ্ন পূরন করতে পারে ? খুঁজে কি পায় গুপ্তধন ? সে কি তার ভালোবাসাকে ফিরে পায় ?
জানতে হলে বইটি পড়তে হবে । এখানে আমি সব বলে দিলে , বইটি পড়ে আর ভাল লাগবেনা কারোরই । আমি বাংলা অনুবাদ পড়ছিলাম এই বইটির আরো দুইবছর আগে ,কিন্তু একটুও ভাল লাগেনি ।কিছুই বুঝিনি বলতে গেলে । সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলেছিলাম বা লেখক ঐভাবে অনুবাদ করতে পারেনি । এবার ইংলিশ অনুবাদ পড়ে ভালই বুঝলাম । বইটি পড়লে ইংলিশ অনুবাদ পড়ার জন্য উপদেশ রইল ।
এই পর্যন্ত আসতে বেশ কিছু অনবদ্য উক্তি রয়েছে ।
" মকতুব বা ভাগ্য (এটা ঈশ্বর কর্তৃক লিখিত ) ।"
" পিছনে যা ফেলে এসেছ তা নিয়ে চিন্তা করোনা ,যদি তোমার উদ্দেশ্য সঠিক থাকে ,সেটা তোমাকে হতাশ করবে না । "
"সজ্ঞা যা নির্দেশ করে সেটা হল পৃথিবীর সমস্ত আত্মার নিমজ্জিত এক নিদর্শন । "
" যদি কোনকিছু একবার ঘটে ,তার আর ঘটবেনা কখনই । কিন্তু একই ঘটনা যদি দুইবার ঘটে তাহলে সেটা তৃতীয়বারও ঘটবে ।"
" মানুষ তার জীবনের যে কোন সময়েই তার স্বপ্ন পূরনের ক্ষমতা রাখে ।"
" প্রতিটি মানুষ যাই করুক না কেন , পৃথিবীর ইতিহাসে সবারই একটা গুরত্বপূর্ন ভূমিকা থাকে " ।
" জীবনে চলার পথের গুপ্ত রহস্য হল ; যদি সাতবার হোঁচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পরের বার আরো শক্ত হয়ে দাঁড়ানো ।"
শেষে আর একটা কথা না বললেই নয় । জীবনে যদি আপনি ৩ টি বই পড়তে চান ,তাহলে আমি তার মধ্যে এই বইটি রাখার কথা বলব ।

সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই আগস্ট, ২০১৮ রাত ১১:০৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



