ছোট বেলাটা কাটিয়েছি রেল কলোনীতে, প্রচুর বু্দ্ধিমান ছেলেদের সাথে। ওদের একটা পছন্দের কাজ ছিল - নেড়ী কুকুর তাড়ানো। বাবা-মাকে ফাকি দিয়ে আমিও যে সেই আনন্দে শরিক হইনি - সেটা বলবো না। কিন্তু কুকুরের বিষয়ে একটা প্রশ্ন মনের মধ্যে তখন থেকেই বাসা বেঁধে উঠছিলো। ৪র্থ বা ৬ম শ্রেনীর বাংলা বইএ একটা গল্প ছিল - তাতে দেখানো হয় একটা কুকুর কিভাবে জাহাজ থেকে পড়ে যাওয়া একটা বালককে উদ্ধার করে নিজেই মারা যায়। এহেন উপকারী প্রানী সম্পর্কের মানুষের একটা নেতিবাচক বিশ্বাস - “কুত্তা নাপাক” - কেমন যে একটা বিপরীতমুখী মনে হতো।
একসময় জীবনের তাগিদে চলে এলাম নেদারল্যান্ড। সেখানে এসে কুত্তাকে আর কুত্তা বলে কুকুর বলাটাই শ্রেয় বিবেচনা করলাম। দেখি মানুষ আর কুকুর প্রায় সমান মর্যাদা ভোগ করছে - অর্থাত মানবাধিকার আর কুকুরাধিকারে কোন ভেদাবেদ নেই। দেখলাম নানান কিসিমের কুকুর - বড়-মাঝারি-ছোট আর কত রংগ আর কত তাদের ভঙ্গী। দেখলাম কুকুরের হাসপাতাল - কুকুরের জন্যে বিশেষ খাবার আর একদিন কুকুরের জন্মদিনের অনুষ্ঠানের খবরের তো পুরা হতবাক হলাম। সেটাগুলো কোন ভাবেই আমাকে বিরক্ত করলো না - শুধু মাত্র যত্রতত্র কুকুরের বিষ্টা আর সেগুলো পরিষ্কারের বিষয়ে পৌরকর্তৃপক্ষের অনীহা আমাকে বেশ বিব্রত করতো। হাটার সময় সচেতন না থাকরে বিষ্টা নিয়ে বাসায় আসার সম্ভাবনা ছিল বলে - প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগের চাইতে - পথিপাশে থাকা সারমেয় বিষ্টার দিকেই বেশী সময় নজর রাখতে হতো।
পরে কানাডায় আসার পর দেখলাম - এখানে একটা সাম্যাবস্থা বিরাজ করছে। কেহ ইচ্ছা করলে কুকুরকে কুকুরাদিকার দিয়ে সর্বোচ্চ সেবা দিতে পারেন - কিন্তু খোলা যায়গায় কুকুরের বিষ্ঠা ত্যাগের কারনে মালিককে ১৬৫ ডলার জরিমানা গুনতে হয় বলে কিছুটা বাঁচা। এছাড়াও অনেক এপার্টমেন্ট বিল্ডিং আচে যেখানে “পশূ” পালন নিষিদ্ধ। তাই কিছুটা বাঁচা।
কিন্তু ক্যানাডায় আসার পর কুকুর নিয়ে সেমি-কনজারভেটিব মনোভাবের কারনে “কুত্তা নাপাক” বিষয়টা আবার মাথায় চলে আসে। এই বিষয়ে বেশ কয়েকজন জ্ঞানী মানুষের সাথে আলাপ করি। এরা মূলত পরিচ্ছতা এবং কুকুরের পছন্দের খাদ্য তালিকায় পুরীষ থাকাটাকে বেশী গুরুত্ব দেওয়ায় বেশী কনভিন্সড হই নি। কারন দেখছি কুকুরের খাদ্যের বিষয়ে এবং স্বাস্থ্য নিয়ে বেশ ব্যবসা হয় বলে এরা মানুষের জন্যে হুমকী নয়।
এই অবস্থায় এক বড় ভাই বললেন - কুকুরের নাপাকির বিষয়টা আসলে প্রতীকি এবং সেটা বুঝতে হলে তোমাকে শিয়ালের চরিত্র বুঝা দরকার।
এবার পড়লাম বিপদে। আমাদের কাছে শিয়াল মানেই মুরগী চোর আর কুকুর মুরগীর পাহারাদার। সেখানে কুকুরই বরঞ্চ মানুষের জন্যে উপকারী। বড়ভাই বললেন - ভাবো, এখানেই তোমার প্রশ্নের উত্তর পাবা।
ভাবনার অংশ হিসাব শিয়াল বা শৃগালের বিষয়ে কিছু জানার চেষ্টা করতে গিয়ে দেখি কোঁচো খুড়তে সাপ। শিয়াল আসলে কৃষকের নিরব বন্ধু, এক একটা শিয়াল দিনে গড়ে ১০ টা ইদুর খায় - ফলে কোন ধান খেতের পাশে যদি শিয়াল বাসা করে তবে কৃষক ৪-৫% বেশী ফসল পায়। যদি বাংলাদেশের সকল জমিকে হিসাবে আনি তবে কত বড় উপকার করে শিয়াল পন্ডিত ভাবাই যায় না। অন্যদিকে কুকুর অধিকাংশ সময় ঘুমায় আর মালিককে খুশী রাখার জন্যে ঘেউ ঘেউ করে একটা শোরগোল করে।
এখান থেকে শিয়াল সম্পর্ক একটা ইতিবাচক মনোভাব তৈরী হওয়ার পর আরো গভীরে যাওয়ার চেষ্টা করলাম। দেখলাম শিয়াল এবং কুকুরের মধ্যে বড় পার্থক্যটা হলো কুকুর যে কোন মূল্যের বিনিময়ে তার প্রভুকে খুশী করতে চায় - এই জন্যে তার স্বজাতিকে কামড়ে রক্তাক্ত করতেও পিছপা হয় না। অন্যদিকে শিয়াল জীবনের বিনিময়ে হলেও “স্বাধীনতা” রক্ষা করে। এক ঘটনা জনলাম - আমাদের গ্রামের একজন একটা শিয়ালের বাচ্চা এনে লোহার খাঁচা তৈরী করে লালন পালন করা শুরু করে। মুরগী শিয়ালের প্রিয় খাদ্য বিবেচনায় প্রতিদিন মুরগী বা মাংস দিতে থাকে। শিয়ালটা এক বছর পর একদিন মাটিতে গভীর গর্ত খুড়ে লাপাত্তা। ঘটনাটা শিয়ালের স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় প্রত্যয়ের বিষয়ে আমার আগ্রহ আরো বাড়ায়্
পরিশেষ দেখা গেল যে, কুকুরের প্রভুভক্তি এবং “পরাধীনতা”কে জীবনের লক্ষ্য মেনে স্বজাতীর প্রতি দালালীই কুকুরকে অপবিত্র করেছে।
লেখকের নিজস্ব চিন্তাই: - মনুষ্য সমাজেও কুকুরের এই বিশেষ স্বভাবের মানুষ দেখা যায় - যারা প্রভুর সেবার জন্যে নিজের দেশের স্বাধীনতাকে উপেক্ষা করে। যেমনটা দেখা গেছে পলাশীতে মীরজাফর, ১৯৭১ সালে রাজাকার আল বদর আর আল শামস আর ১৯৭৫ সালে খন্দকার মুসতাক। একনও দেখি প্রভুভক্তিকে কোন কোন বাংলাদেশী পাকিস্থান ক্রিকেটে বিজয়ী হলে বাংলা ব্লগে বাংলায় প্রনতি জানায় ( হায়, যদি পাকিরা বাংলা পড়তে পারতো - তা হলে না হয় কথা ছিল, কার উদ্যেশ্য ভক্তর এই আকুতি?)
বিপরীত দিকে দেখা যাবে ক্ষুদিরাম, মাস্টার দা, বিনয় সেন, তীতুমীর বা ইলা মিত্র জানতো যে তারা চরম শান্তি পাবে - কিন্তু স্বাধীনতার আকাঙখা থেকে সরে যায়নি। ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধারা তাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদকেও বাজী রেখে একটা স্বাধীন দেশ আমাদের জন্যে রেখে গেছেন। আমরা সবাই আমাদের মনে গভীর থেকে এই পবিত্র মানুষদেরকে শ্রদ্ধার সাথে সব সময় স্মরনে রাখি।
আর “নাপাক” দালালদের থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখি, যদিও ছোঁয়া লেগে যায় - ৩ বার , মতান্তরে ৭ সাতবার নিজেদের পরিচ্ছন্ন করি সেই ৩০ লক্ষ পবিত্র আত্নাকে স্মরন করে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




