somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

'একাত্তরের দিনগুলি' পাঠে আত্মোপলব্ধি

২৬ শে মার্চ, ২০১৬ ভোর ৪:১৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



আজ ২৬ মার্চ।স্বাধীনতা দিবস।স্বাধীনতার ৪৫ বছর পূর্তিতে এসে পড়া শেষ করলাম ‘একাত্তরের দিনগুলি’।বড্ড বেশি দেরি হয়ে গেল!
শহীদ জননী জাহানারা ইমামের এই রোজনামচা আরো আগেই পড়ার কথা ছিল।কিন্তু হয়ে ওঠে নি যে কোন কারণেই হোক।মনে আছে,একবার আমাদের ‘আশরাফুল ইমাম শাকিল গ্রন্থাগার’ থেকে এই বই পড়ব বলে মনস্থির করি।কিন্তু অন্য পাঠকের কাছে বইটা থাকায় আর পড়া হয় নি।সেইবার নিয়ে এসেছিলাম জাহানারা ইমামের ‘ক্যান্সারের সাথে বসবাস’।পড়ে মুগ্ধ হচ্ছিলাম লেখিকার লেখনীতে,তাঁর ব্যক্তিত্বে।উনার সম্পর্কে অনেক কিছু জেনেছিলাম।তখন বুঝেছিলাম কতটা দৃঢ় চরিত্রের অধিকারী তিনি।কিন্তু পুরোটা জানা হয় নি।আজ এত বছর পর এসে যখন এই অমূল্য দলিল পড়লাম,চোখের সামনে স্লাইড শো’র মত দেখলাম একাত্তরের মার্চ থেকে ডিসেম্বরের একেকটা দিনকে-শিহরিত হলাম।কী কঠিন ত্যাগ করেছেন এই জননী;কী অপূর্ব সাহসিকতায়!শ্রদ্ধার পারদ তরতর করে কয়েকগুণ উপরে উঠে গেল।
রুমী-জামী –অনেক শুনেছি এই নাম দুটো।কিন্তু এভাবে চিনি নি আগে।রুমীর ফুপা একরাম সাহেবের বয়ানে রুমী সম্পর্কে একটা ধারণা জন্মে।উনি বললেন, ‘রুমীর সঙ্গে আলাপ করে আমি তো হতবাক! এইটুকু ছেলে এই বয়েসে এতো পড়াশুনা করে ফেলেছে? আগে তো ভাবতাম বড়লোকের ছাওয়াল হুশ হুশ করে গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায়, চোঙ্গা প্যান্ট পরে, গ্যাটম্যাট করে ইংরেজি কয়, আলালের ঘরের দুলাল। কিন্তু এখন দেখতিছি এ বড় সাংঘাতিক চিজ! মার্কস এঙ্গেলস একেবারে গুলে খেয়েছে। মাও সে তুং-য়ের মিলিটারি রাইটিংস সব পড়ে হজম করে নিয়েছে। এই বয়েসে এমন মাথা, এমন ক্লিয়ার কনসেপশান, বাউরে, আমি তো আর দেখি নাই’।

রুমীর দূরদৃষ্টির পরিচয় পাই ২৫ শে মার্চ দিনের বেলা মায়ের সাথে কথোপকথনে।রুমীর মুখে দুদিনের খোঁচা খোঁচা দাড়ি।মাথার চুল খামচে ধরে রুমী বলল, “আম্মা বুঝতে পারছ না মুজিব-ইয়াহিয়া আলোচনা ব্যর্থ হতে বাধ্য। এটা ওদের সময় নেবার অজুহাত মাত্র। ওরা আমাদের স্বাধীনতা দেবে না। স্বাধীনতা আমাদের ছিনিয়ে নিতে হবে সশস্ত্র সংগ্রাম করে”।

কতই বয়স তার!মাত্র ২০!সদ্য কৈশোর পেরুনো রুমী।সবেমাত্র ইন্টারমিডিয়েট পাশ করে ইঙ্গিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হয়েছে।আমেরিকার ভার্সিটিতে স্কলারশীপ পেয়েছিল।ভার্সিটির ডরমেটরীর রুম নাম্বারও তাকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল।কিন্তু রুমীর চিন্তা ছিল অন্যরকম।

রুমী বলেছিল “আম্মা শোন, ছাত্রজীবন লেখাপড়া করার সময় এসবই চিরকালীন সত্য; কিন্তু ১৯৭১ সালের এই এপ্রিল মাসে এই চিরকালীন সত্যটা কি মিথ্যে হয়ে যায় নি? ........ হাত আর চোখ বেঁধে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে, কটকট করে কতকগুলো গুলি ছুটে যাচ্ছে, মুহূর্তে লোকগুলো মরে যাচ্ছে। এইরকম অবস্থার মধ্য থেকে লেখাপড়া করে মানুষ হবার প্রক্রিয়াটা খুব বেশী সেকেলে বলে মনে হচ্ছে না কি? আম্মা, দেশের এই রকম অবস্থায় তুমি যদি আমাকে জোর করে আমেরিকায় পাঠিয়ে দাও, আমি হয়তো যাব শেষ পর্যন্ত। কিন্তু তাহলে আমার বিবেক চিরকালের মত অপরাধী করে রাখবে আমাকে। আমেরিকা থেকে হয়ত বড় ডিগ্রী নিয়ে এসে বড় ইঞ্জিনিয়ার হবো; কিন্তু বিবেকের ভ্রুকুটির সামনে কোনদিনও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারব না। তুমি কি তাই চাও আম্মা?”

তার্কিক ছেলের যুক্তিতে হার মানেন মা।বুকে পাথর বেঁধে,চোখ বন্ধ করে বলেন-‘না,তা চাই নে।ঠিক আছে,তোর কথাই মেনে নিলাম।দিলাম তোকে দেশের জন্য কোরবানি করে।যা,তুই যুদ্ধে যা’।


রুমী যুদ্ধে যায়।সেক্টর টুতে খালেদ মোশাররফ রুমীদের নায়ক।ঢাকায় আসে রুমীরা কজন একটা অপারেশনের জন্য।২৫ আগস্ট একটা দূর্দান্ত অপারেশন সফল করে ওরা।

রুমীর গান শোনা আর বই পড়ার বাতিক।২৮ আগস্ট মায়ের সাথে গল্পের মাঝেই টম জোনসের ‘গ্রীন গ্রীন গ্রাস’ নামের গানটা রুমী রেকর্ড বাজিয়ে শোনায় তার মাকে।বহুবার শোনা এ গান।রুমী প্রায়ই বাজায়।তিন মিনিটের গানটা শেষ হলে রুমী আস্তে আস্তে বলল,‘গানটার কথাগুলো শুনবে? এক ফাঁসির আসামী তার সেলের ভেতর ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল সে তার গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছে। সে ট্রেন থেকে নেমেই দেখে তার বাবা-মা আর প্রেয়সী মেরি তাকে নিতে এসেছে। সে দেখল তার আজন্মের পুরনো বাড়ি সেই একই রকম রয়ে গেছে। তার চারপাশ দিয়ে ঢেউ খেলে যাচ্ছে সবুজ সবুজ ঘাস। তার এত ভাল লাগল তার মা-বাবাকে দেখে, তার প্রেয়সী মেরিকে দেখে। তার ভাল লাগল তার গ্রামের সবুজ সবুজ ঘাসে হাত রাখতে। তারপর হঠাৎ সে চমকে দেখে সে ধূসর পাথরের তৈরি চার দেয়ালের ভেতরে শুয়ে আছে। সে বুঝতে পারে সে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিল’।মায়ের চোখ টলমল করে পানিতে।সাথে আমারও।হাত বাড়িয়ে রুমীর মাথাটা বুকে টেনে মা বললেন-‘রুমী। রুমী। এত কম বয়স তোর, পৃথিবীর কিছুই তো দেখলি না। জীবনের কিছুই তো জানলি না।’
রুমী মুখ তুলে কি একরকম যেন হাসি হাসল, মনে হলো অনেক বেদনা সেই হাসিতে। একটু চুপ করে থেকে বলল, “ ‘বিন্দুতে সিন্ধু’ দর্শন একটা কথা আছে না আম্মা? হয়ত জীবনের পুরোটা তোমাদের মতো জানিনি, ভোগও করিনি, কিন্তু জীবনের যত রস-মাধুর্য-তিক্ততা-বিষ-সব কিছুর স্বাদ আমি এর মধ্যেই পেয়েছি আম্মা। যদি চলেও যাই, কোন আক্ষেপ নিয়ে যাব না”।

২৯ আগস্ট রুমীকে ধরে নিয়ে যায় মিলিটারি পুলিশ।সাথে তার বাবা,ভাইকেও।ওদের ছেড়ে দেয় দুদিন পর।কিন্তু রুমী ছাড়া পায় না।সব দায় নিজের ঘাড়ে নিয়ে ‘ভাংব,তবু মচকাব না’ নীতিতে অটল থাকে রুমী।ঐ রুমীর শেষ দেখা তার মায়ের সাথে।

রুমীকে নিয়ে লেখা শেষ হবে না।শেষ হবে না শহীদ জননীকে নিয়ে লিখলেও।আমি পড়ি আর চোখের জল ফেলি।কীভাবে রুমীর মা সব মুক্তিযদ্ধার মা হয়ে ওঠেন-উপলব্ধি করি একটু একটু করে।

পড়া শেষ করে রেশ কাটে না।শেষের দিকে এসে মনে হয়-আরেকটু বড় হলে ভালো হতো বইটা।আমি বই নিয়ে গুগল সার্চ করা শুরু করলাম।রুমীর বন্ধু হ্যারিসের কাছ থেকে পাওয়া ফটোগ্রাফ খুঁজে পেয়ে আমার যে কী আনন্দ হলো!জানলাম আরো অনেক অনেক অজানা।



অন্যজনের ব্যক্তিগত একটা ডায়েরী যে আরেকজনের এতটা আপন হতে পারে-আমার জানা ছিল না।কী অসাধারণ একটা বই!যেন জীবন্ত চলচ্চিত্র দেখলাম।পরিচিত কত নাম পেলাম এই বইয়ে।এই বই একটা অবশ্য পাঠ্য বই মনে হয়েছে আমার কাছে।আর চলচ্চিত্রের বাস্তবায়ন দেখার অপেক্ষায় রইলাম।এই বই আমার জানার তৃষ্ণাকে বাড়িয়ে দিয়েছে কয়েকগুণ।মনে মনে তালিকা তৈরি করেছি বইয়ের।মহান মুক্তিযুদ্ধের এই মহানায়কদের তো জানতে হবে আরো ভাল করে।আজ ৪৫ তম স্বাধীনতা দিবসে এটাই শপথ নিলাম।
সর্বশেষ এডিট : ২৬ শে মার্চ, ২০১৬ ভোর ৪:৩১
২টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্য ড্রাগ কিং

লিখেছেন শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:১৫


সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। বাস্তব একটি অপরাধের কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে পাঠকদের জন্য এর চরিত্র, নাম এবং স্থান পরিবর্তন করে গল্পটি সাজানো হয়েছে।

খুলনা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

ইজিবাইক চলাচলের প্রকৃত কর্তৃপক্ষ কে?

লিখেছেন মাহদী হাসান শিহাব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:৩৪



দেশের বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ইজিবাইক নামে একটি যানবাহন চলাচল করে। কিন্তু এর পরিচালনা, লাইসেন্সিং এবং চলাচলের ক্ষেত্র সম্পর্কে সুস্পষ্ট ও সর্বজনবিদিত কোনো নীতিমালা সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান নয়।

শহরের ভেতরে,... ...বাকিটুকু পড়ুন

মন কথনিকা-৪৮৭৩-৭৪

লিখেছেন কাজী ফাতেমা ছবি, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৯

মন কথনিকা-৪৮৭৩
তোমার আমার মতামতে আকাশ পাতাল সীমা
আমার বুলি বরফ জলের তোমার যেন বোমা,
তুমি বলো রোদের তেজে আমি বর্ষার মতন
বুকের ভিতর বন্ধু বুঝি পাথর পুষো যতন।

মন কথনিকা-৪৮৭৪
পিঠে ব্যথা ভাল্লাগে না, মন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×