somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নিউক্লিয়ার রিএক্টর ডিজাইন!

০৬ ই মার্চ, ২০১৬ ভোর ৪:০৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(এই পোস্ট পড়বার আগে এই লেখাটা পড়া অতীব জরুরী মনে করি কারন এই পোস্টে আমার নিজের করা একটা ল্যাব এক্সপেরিম্যান্টনিয়ে লিখেছিলাম যা দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম এই তেজস্ক্রিয়তা জিনিসটা আমাদের প্রাত্যহিক জীবনে কি প্রভাব ফেলে। এছাড়া ফেসবুকে আরো একটা স্ট্যাটাস আছে যেখানে মূলত লেখা আছে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হলে কি কি করা যেতে পারে।)

বাংলাদেশ কিছুদিনের মধ্যে নিউক্লিয়ার পাওয়ার জেনারেশনের যুগে ঢুকতে যাচ্ছে। ভালো মতো দক্ষতার সাথে চালাতে পারলে হয়তো আমাদের বিদ্যুতের অভাব থাকবে না এবং পাওয়ার এনার্জীর অভাবে যেসব বিনিয়োগ মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে তখন হয়তো বিনিয়োগ আরো বাড়বে এবং দেশের জনগনের জীবনমান উন্নত হবে আর বেকারত্ব দূর হবে। যদিও অনেকে নিউক্লিয়ার পাওয়ারের নাম শুনলেই চেরোনোবিল, ইন্ডিয়ার ভূপাল আর জাপানের ফুকুশিমার নামটা খুব জোরে শোরে উচ্চারন করেন। আবার এটাও বলে থাকেন রাশিয়ার কাছ থেকে পুরোনো মডেল কিনে আনছে এটা তো আরো ভয়ংকর বিষয়। এরকম নানা ইস্যুতে জনমনে একটা নেগেটিভ প্রতিক্রিয়া কাজ করে।

তবে যে যাই উপর দিয়ে বলুক যখন তাদের এসব যুক্তিযুক্ত লেখা গুলো পড়ি মনে হয় অনেক টেকনিক্যাল ব্যাপার তারা জেনেই হোক বা না জেনে, সেগুলোর উল্লেখ করেননি। টেকনোলজিক্যাল এডাভান্সম্যান্ট তার সাথে বিভিন্ন মডেলের সেফটি চেক এমনকি যেসব প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা যেগুলোর ভবিষ্যতবানী কখনোই করা হয় নি সেগুলো নিয়েও তারা কোনো মতামত দেননি এমনকি তারা এটাও বলেননি যে একটা নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট থেকে পরিবেশে যে তেজস্ক্রিয়তার নিঃসরন হয় চালু অবস্থায় তার পরিমান একটা কয়লা চালিত পাওয়ার প্লান্ট থেকে নিঃসরিত সেই তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা থেকে প্রায় ১০০ ভাগ কম।তবে এটাও ঠিক যে সিজিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার তীব্রতা কলায় থাকা পটাসিয়ামের তেজস্ক্রিয়তার তীব্রতা থেকে অনেক ভয়াবহ। এবং তখন এর মাত্রা খুব একটা গন্য হয় না।

যাই হোক, পক পক অনেক করলাম। শুরু করি নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্টগুলো কিভাবে ডিজাইন করা হয়। অনেকেই হয়তো বলবেন পাওয়ার প্লান্ট কিভাবে কাজ করে সেটাই তো জানি না। যারা জানেন না তারা শাহরুখ খানের হিন্দি ছবি স্বদেশ দেখতে পারেন।

পুঁচকে পাওয়ার প্লান্ট কনসেপ্ট:

আপনি বাজার থেকে চা পানি গরম করার জন্য পুরোনো দিনের এলুমিনিয়ামের কেটলি কিনে আনলেন। তো সেটাতে পানি ভরে কেটলির ঢাকনা ঢেকে চুলোতে চড়িয়ে দিন। দেখবেন যখন তাপমাত্রা বাড়তে থাকবে এবং পানি ফুটন্ত অবস্থায় যাবে তখন কেটলির চোঙ্গা দিয়ে ভুরভুর করে গরম স্টিম বা উত্তপ্ত জলীয়বাস্প বের হতে থাকবে। এখন পানির তাপমাত্রা যতবাড়বে জলীয়বাস্প বের হবার গতি তত বাড়বে। এখন আপনি যদি ঐ চোঙ্গার মুখ আরো সরু করেন তাহলে দেখবেন কেটলির ঢাকনা কাপতে থাকবে এবং চোঙ্গা দিয়ে জলীয়বাস্প আরও প্রচন্ড গতিতে বের হতে থাকবে।


আপনি যদি এরকম কেটলির ভেতর পুরো একটা পুকুরের পানি এমন প্রচন্ড উত্তপ্ত করে ছোট ছিদ্র দিয়ে বের করতে যান তাহলে এর গতি থাকবে আরও প্রচন্ড রকম বেশী, ধরতে পারেন সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টনি ট্রাক উড়াতে সক্ষম। এখন আপনি কেটলির গরম বাস্পের ওদিকে একটা কাগজের পাখা ধরেন। দেখবেন খুব সুন্দর এবং বেশ ভালো গতিতে ঘুরছে।এটাই হলো পাওয়ার প্লান্টের মূল কনসেপ্ট। যদিও এটা শিশুতোষ কনসেপ্ট কারন সত্যিকার পাওয়ার প্লান্টে ম্যাকানিকালে অনেক থিওরী থাকবে, অনেক পদার্থবিজ্ঞান, ঢেড় ঢেড় ইলেক্ট্রিক্যাল, ঢেড় ঢেড় ক্যামিস্ট্রি কাজ করবে। কিন্তু আমার মনে হয় আমার এই নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট ডিজাইন পড়ার জন্য এই কনসেপ্ট মাথায় থাকলেই চলবে।

এখন ফ্যান ঘুরলে কারেন্ট কোথা থেকে আসবে? এখন আপনি যদি কেটলির জায়গায় এমন একটা স্থান বানালেন যেখানে একটা পুস্কুনির পানি প্রচন্ড উত্তপ্ত করে সরু স্থান দিয়ে প্রচন্ড গতিতে বের করে ৫ টনি ট্রাক উল্টানোর মতো ক্ষমতা অর্জন করানোর পর ঐ কাগজের ফ্যানের জায়গায় বাজার থেকে একটা জেনারেটর কিনে তার প্রপেলারটা ঐবাস্প বরাবর রেখে দেন। প্রপেলার যত বেশী ঘুরবে বিদ্যুত ততবেশী উৎপন্ন হবে। আর সেই প্রচুর পরিমান বিদ্যুত আপনি বাসা বাড়িতে সংযোগ দিলেন।

ইজিপিজি!

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট:



চিত্র: নিউক্লিয়ার প্লান্টের ব্যাবচ্ছেদ

বর্তমানে বিদ্যুৎ উতপাদনের জন্য যত রিএক্টর আছে প্রায় সবগুলোই নিউক্লিয়ার ফিশন পদ্ধতিতে চেইনরিএকশন ঘটায়। নিউক্লিয়ার ফিশন হলো ইউরেনিয়াম-২৩৫ বা প্লুটোনিয়াম-২৩৯ এর বড় আইসোটোপে নিউট্রন দিয়ে আঘাত করলে সেই অনুগুলো ভেঙ্গে যায় এবং বিপুল পরিমান শক্তি তাপ এবং গামা রেডিয়েশন আরও নিউট্রন উৎপন্ন হয়। এই মুক্ত নিউট্রন তখন সামনে থাকা আরও ভারী অনুগুলোকে আঘাত করে। এখন এরকম করে বিরতিহীন ভাবে চেইন রিএকশন ঘটতে থাকলে বিস্ফোরনের সম্ভাবনা থাকে তাই এই রিএকশনের মধ্যে কন্ট্রোল রড প্রবেশ করিয়ে দেয়া হয় যাতে করে অতিরিক্ত নিউট্রন শোষন করে এই রিএকশনকে নিয়ন্ত্রন করা যায়।

সারা বিশ্বে যত কমার্শিয়াল রিএক্টর আছে সব দু প্রকারের: প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএক্টর এবং বয়েলিং ওয়াটার রিএক্টর।


চিত্র: প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএক্টর



চিত্র: বয়েলিং ওয়াটার রিএক্টর

এছাড়া আরো কয়েক প্রকারের রিএক্টর বিদ্যমান তবে সেগুলোর ব্যাবহার তেমন নাই। এগুলো সব তৃতীয় প্রজন্মের রিএক্টর। তো যত প্রকারের রিএক্টরই থাক নীচের এই চারটি বিষয় অবশ্যই থাকতে হবে:

১) নিউক্লিয়ার জ্বালানী :

নিউক্লিয়ার জ্বালানী হিসেবে ইউরেনিয়াম-২৩৫ বা প্লুটোনিয়াম-২৩৯ অথবা থোরিয়াম ব্যাবহার করা হয়। ইউরেনিয়াম মাইনিং নিয়ে পড়তে চাইলে এখান থেকেপড়া যেতে পারে। হিসাব করলে দেখা যায় যে এক অনু ইউরেনিয়াম যে শক্তি পাওয়া যায় তা এক অনু কয়লা থেকে ১০ মিলিয়ন গুন বেশী। প্রকৃতিতে আমরা যে ইউরেনিয়াম পাই তা মূলত ইউরেনিয়াম ২৩৫ আর ইউরেনিয়াম ২৩৮ আইসোটোপের মিশ্রন। ইউরেনিয়াম ২৩৫ সরাসরি রিএক্টরে ব্যাব হার করা গেলেও ইউরেনিয়াম ২৩৮ সে পর্যায়ে কাজে লাগতে পারে না যতক্ষন না প্লুটোনিয়ামের আইসোটোপে পরিনত হয়। প্রকৃতি থেকে আহরিত মিশ্রনে ৯৯.৩% ইউরেনিয়াম-২৩৮ আর .৭% ইউরেনিয়াম ২৩৫ আইসোটোপ পাওয়া যায়। পরে এগুলো জটিল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রসেসের মাধ্যমে ঐ .৭% ইউরেনিয়াম ২৩৫ এর অনুপাতকে ৪ থেকে ৫ পারসেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। এই প্রক্রিয়ায় খরচা অনেক বেড়ে যায় কিন্তু ইউরেনিয়াম ২৩৮ এর মিশ্রন আবার ব্রীডার রিএক্টরে সরাসরি ব্যাব হার করা যায়। কানাডার কান্ডু রিএক্টর তেমনি এক রিএক্টর যেটাতে ইউরেনিয়াম ২৩৮ সরাসরি ব্যাবহার করা যায় কারন এখানে মডারেটর হিসেবে ভারী পানি ব্যবহার করা হয়। খরচা শেষে গিয়ে একই পড়ে যায়।

বর্তমানে যত রিএক্টর আছে সবাই যেভাবে ইউরেনিয়াম ২৩৫ ব্যবহার করছে তাতে করে আরও কয়েকশ বছর এটা নিশ্চিন্তে ব্যবহার করতে পারবে। বার্নার্ড কোহেন একটা হিসাব কষে দেখিয়েছেন যে ব্রীডার রিএক্টরের মতো যদি ব্যাব হার করা শুরু হয় তাহলে কয়েকবিলিয়ন বছর পর্যন্ত আপনি খুব স হজে বিদ্যুতের যোগন দিতে পারবেন এই ইউরেনিয়ামের মজুদ দিয়ে। কোহেনের সবচেয়ে বড় যুক্তি ছিলো সমুদ্রের পানিতে যে ইউরেনিয়াম মিশে আছে। তারপর কয়লার খনিতে যে বেজাল ইউরেনিয়াম আছে সেগুলো এখনো ব্যাব হার করা হয়নি। ব্যাবহার করা যায়নি গ্রানাইটের মধ্যে থাকা ইউরেনিয়াম।এগুলোও বাদ, এখন যে ইউরেনিয়ামের খনি আছে সেখান দিয়েই পরবর্তি ১ হাজার বছর চলে যাবে বিদ্যুতের যোগানের জন্য!


চিত্র: ইউরেনিয়ামের রড


চিত্র: মিৎসুবিশির প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএক্টরের জন্য ফুয়েল রড এসেম্বলী।

পাওয়ার প্লান্টে যে ইউরেনিয়াম অক্সাইডের রড সেটা দেখতে ২ থেকে ৪ ইন্ঞ্চি লম্বা সিলিন্ডারের কালো কিউব। প্রতিটা কলামে ৮ থেকে ১০ টা থাকে এমনকি ৪০ টার মতো ফুয়েল রড থাকে, নির্ভর করে কি পরিমান বিদ্যুত কত দিনের জন্য উৎপাদিত হবে। এসব একেকটা ফুয়েল রডের কলাম সমূহ আমেরিকায় ১৮ মাস ধরে রিএক্টরে অবিরত ফিশন প্রক্রিয়ায় শক্তির যোগান দেয়। এরকম অনেকগুলো ডান্ডা থাকে যেগুলো পুরোপুরি ব্যাবহার করে উঠাতে প্রায় ২৪ মাসও লেগে যায়। জাপান করে ১৩ মাস। মোটামোটি হিসাবে ২০০ টনের U3O8 দিয়ে ১ বছরে আপনি অবিরত ১০০০মেগাওয়াট বিদ্যুত উতপাদন করতে পারেন।আবার ২৭ টন UO2 দিয়ে একই পরিমান বিদ্যুৎ ১ বছরে উৎপাদন করতে পারবেন। আরেকটা আশ্চর্য্য তথ্য দেই, এত এনরিচম্যান্টের পরও যদি আমরা থিওরেটিক্যালী চিন্তা করি তাহলে মাত্র ৩ কেজি শুদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকে যে শক্তি পাওয়া যাবে তা দিয়ে পুরো একটা আমেরিকা ১ বছর চালানো যাবে।


২) মডারেটর:

তাপীয় রিএক্টরে নিউক্লিয়ার ফিশন চলার সময় যে নিউট্রন উৎপন্ন হয় প্রথম দিকে এগুলার প্রচন্ড এনার্জী আর বেগ থাকে ফলে প্রথম থেকেই যদি কন্ট্রোল করা না হয় তাহলে পারমনাবিক বিস্ফোরন ঘটার সম্ভাবনা থাকে।এখন এই নিউট্রনের গতি আর এর ফ্লাক্স কমানোর জন্য যত জ্বালানীর রড আছে সব পানিতে চুবানো হয়। ডিউটেরিয়াম, গ্রাফাইট, বেরিয়াম, হাইড্রোজেন, পানি খুব ভালো মডারেটরের কাজ করে। এগুলো নিউট্রোন শুষে ফেলে না (যদি শুষেই ফেলে তাহলে পরবর্তী চেইন রিএকশনের জন্য নিঊট্রন খুজে পাওয়া যাবে না), কিন্তু এর গতি স্লথ করে এবং পরবর্তী টার্গেট রডে রিএকশন করার সুযোগ দেয়। কিন্তু সমস্যা হলো আপনি যদি রড কম দেন পানি বেশী দেন তাহলে রিএকশন শুরু হবার আগেই মরে যাবে কারন রিএকশনের জন্য প্রয়োজনীয় নিউট্রন পাওয়া যাবে না। আবার যদি বেশী রড দিয়ে দেন কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে পানি বাস্পীভূত হবেতখন মডারেটর হবে পানিশূন্য। তাই নিউট্রনের ঘনত্বের হিসাব খুবই গুরুত্বপূর্ন।

ফিউশন প্রক্রিয়ার শুরুতেই যে নিউট্রন উৎপন্ন হয় তার এনার্জী থাকে ১ মেগাইলেক্ট্রনভোল্ট। কিন্তু তখন পানি বা মডারেটরের সংস্পর্শে আসলে সেটা ১ ইলেক্ট্রনভোল্টে গিয়ে দাড়ায়। এই নিউট্রন গুলোকে বলায় তাপীয় নিউট্রন এবং তখন এই নিউট্রন গুলো অনেকটা স্থিতিস্থাপকতার মতো আচরন করে যখন তারা পরবর্তী অনুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হবে। যখন নিউট্রন সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তখন তার মধ্যে থাকা ১ মেগা ইলেক্ট্রনভোল্ট ই অনুর ভেতরে স্থানান্তর করে এবং সংঘর্ষটা স্থিতিস্থাপকতার কারনে একটু বেশী সময় ধরে চলতে থাকে।ফলে আপনার শক্তির নিঃসরন হঠাৎ করে না হয়ে ধীরে হয়ে যাবে।
এই ঘটনাটা গলফ খেলার সাথে তুলনা করতে পারেন। ধরুন আপনার বলটা (গলফের বল, অন্য বল না ;)) গর্ত থেকে একটু দূরে এবং আপনি গাড়ি থেকে নেমে দৌড়ে গিয়ে দিলেন বাড়ি বলটাকে। তার চেয়ে বরং আপনি গাড়ি থেকে নেমে ধীরে সুস্থে গিয়ে বলটাকে আস্তে করে মেরে গর্তের দিকে ঠেলে দেন তাহলে সফলতার পরিমান বেশী বলটা গর্তে পড়ার!

এতে গেলো প্রেসারাইজড ওয়াটার রিএক্টরের কথা কিন্তু যদি বয়েলিং ওয়াটার রিএক্টর হয় তাহলে জলীয় বাস্পের ঘনত্বের সাথে নিউট্রনের পরিমানের সম্পর্ক সম্বন্ধে বিষদ ধারনা থাকতে হবে। উদাহরন স্বরুপ লাইট ওয়াটার রিএক্টরে নিউট্রন আর প্রোটনের ভর হিসাব করে বলা যায় কমপক্ষে ২৭ টা কলিশন হলে ফিউশনের জন্য প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া যাবে যেহেতু পানি হলো মডারেটর। কার্বন হাইড্রোজেন অপেক্ষা ১২ গুন ভারী এবং এর জন্য দরকার কমপক্ষে ১১৯ টা কলিশন।
ক্যাডমিয়াম আর বোরনের নিউট্রন শুষে নেবার ক্ষমতা সবচেয়ে বেশী। একটা বোরন অনু যখন একটা নিউট্রন শুষে নেয় তখন ভেঙ্গে লিথিয়াম আর হিলিয়াম তৈরী করে এবং ২.৮ মেগাইলেক্ট্রনভোল্টের শক্তি উৎপন্ন করে। আবার একটা নিউট্রন বের হয়ে আরেকটা ফিশনের জন্য কলিশনে যেতে যে সময় লাগে তাকে বলা হয় জেনারেশন টাইম। এখন আপনার মনে হলো নিউট্রনের গতি বাড়িয়ে আপনাকে রিএকশনের হার দ্বিগুন করতে চান তাহলে আপনাকে নীচের সূত্র ফলো করতে হবে:

K^N= ২ যেখানে K= ১.০০১ = রিপ্রোডাকশন কনস্টেন্ট আর N রিএকশন দ্বিগুন করার জন্য নিউট্রন জেনারেশন রেট
=) (১.০০১)^N=২
=) N ln(১.০০১)= ln ২
=) N = ln ২/ ln(১.০০১) = ৬৯৩টা

যদি একটা নিউট্রন কন্ম হয়ে আরেকটা ফিসাইল অনুকে আঘাত করতে .০০১সেকেন্ড লাগে তাহলে রিএকশন রেট দ্বিগুন হবে ৬৯৩/.০০১= .৬৯৩ সেকেন্ড। তাহলে হয়তো খুব বেশী সময় হাতে পাওয়া যাবে না!

৩) কন্ট্রোল রড:

কন্ট্রোল রডের কাজ হলো সরাসরি নিউট্রনের ফ্লাক্স শুষে নিয়ে ফিশনের গতির হারকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রনে রাখা। যখন ফিশন তার ক্রিটিক্যাল তাপীয় মাত্রা অতিক্রম করে তখন এর হার খুব দ্রুত বাড়তে থাকে। এই সময়টায় তাপীয় উৎপাদন সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করবার আগেই নিউট্রন শুষে নিয়ে যায়। এর জন্য ক্যাডমিয়াম আর বোরনের ব্যব হার করা হয় কারন এগুলো সরাসরি নিউট্রন শুষে নেয়ার ক্ষমতা রাখে।

বর্তমান রিএক্টর গুলো সব ক্রিটিকাল স্টেটে চলে। এটা মূলত এজন্য করা হয় যে প্রতিটা রিএক্টর যেনো তার নরমাল তাপমাত্রায় সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উতপাদন করতে পারে। তবে ইচ্ছা করলে রিএক্টর যেনো সাবক্রিটিক্যাল স্টেটে কাজ করতে পারে সেভাবেও ডিজাইন করা যায়।

সাধারনত একটা রিএক্টরে ২০টা কন্ট্রোল রড থাকে যার মধ্যে কিছু রডে কন্ট্রোল এলিমেন্ট যেমন ক্যাডমিয়াম, বোরন, ইন্ডিয়াম, সিলভার, কোবাল্ট, জিরকোনিয়াম ডিওডোরাইট ইত্যাদি এর ঘনত্ব থাকে বেশী যাতে করে আপনি ইচ্ছে করলে খুব দ্রুত ফিশনের হার কমিয়ে ফেলতে পারেন এমনকি খুব দ্রুত ফিশন প্রক্রিয়া বন্ধ করে ফেলতে পারেন।


ফুয়েল সাইকেল:

নিউক্লিয়ার ফুয়েল সাইকেল মানে নিউক্লিয়ার জ্বালানী চক্র বলতে বোঝায় যে নিউক্লিয়ার প্লান্টে যে জ্বালানী ব্যাব হার করা হয় তার প্রথম ধাপ: জ্বালানী তৈরী এবং তার এনরীচম্যান্ট, পরবর্তী ধাপে রিএক্টরে সজ্জা করে ঢুকিয়ে তাকে কাজে লাগানো, এরপরের ধাপে যে তেজস্ক্রিয় উচ্ছিস্টাংশ তাকে প্রোসেস করা, ম্যানেজ এবং কনটেইন করা। যে নিউক্লিয়ার প্লান্টের উচ্ছিষ্টাংশ প্রসেস করা হয় না সেটাকে উন্মুক্ত ফুয়েল সাইকেল বলা হয় আর যেগুলোরটা প্রসেস করা হয় সেগুলোকে বদ্ধ ফুয়েল সাইকেল বলা হয়।
উন্মুক্ত ফুয়েল সাইকেলে মোটামোটি ইউরেনিয়াম -২৩৫ জ্বালানী নিলেই হয়। এবং ফিশন সাসটেইন হবার পর উৎপাদন হয়ে গেলে একবার সেটাকে আর ব্যাব হার করা যায় না বলে উচ্ছিষ্ট হিসেবে ফেলে দিতে হয়। কিন্তু সমস্যা হলো এই তেজস্ক্রিয় বর্জ্য কোথায় স্টোরেজ করবে বা কোথায় রাখবে সেটা নিয়ে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট উন্মুক্ত ফুয়েল সাইকেলের। আমাদের পরে এটা নিয়ে বিশাল মাথাব্যাথার কারন হবে সবদিক দিয়েই।

আর বদ্ধ ফুয়েল সাইকেলে যে বর্জ্য পাওয়া যায় সেটা থেকে ইউরেনিয়াম আর প্লুটোনিয়াম আলাদা করে ফের ব্যাব হার করা যায় ফলে পাওয়ার প্লান্টের সক্ষমতা বাড়ে আর বর্জ্যের তেজস্ক্রিয়তা অনেক কম হয়। সমস্যা হলো এই সিস্টেমের ফাক গলে ইচ্ছে করলেই বোমা বানানোর জন্য ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ অস্ত্র বানানো যেতে পারে।

ভবিষ্যতের নিউক্লিয়ার রিএক্টর:

বর্তমান চলমান রিএক্টর সমূহ সব তৃতীয় প্রজন্মের। চতুর্থ প্রজন্মের রিএক্টর ডিজাইনের দউয়ার খুলে দিয়েছে মূলত ফ্রান্স। এই রিএক্টর সমূহের মূল লক্ষ হলো অর্থনৈতিক ভাবে আরো সাশ্রয়ী করে তোলা, বর্জ্যের পরিমান কমিয়ে ফেলা, নিরাপত্তা আরো বাড়ানো এবং কোনো প্রকার তেজস্ক্রিয়তার ছড়িয়ে পড়ার হুমকি আরো কমানো।
এই নতুন প্রজন্মের রিএক্টরগুলোকে দু ভাগে ভাগ করা যায় একটা হলো তাপীয় আরেকটা হলো ফাস্ট রিএক্টর। ফাস্ট রিএক্টরের জ্বালানীটে ইউরেনিয়ামের পরিমান বেশী থাকে বলে এর বর্জ্যগুলোতে দ্রুত গতির নিউট্রন থাকে ফলে পুনঃ পুনঃ ব্যাব হার করা যায়, ফলে সবশেষে যে বর্জ্য পাওয়া যায় তার আয়ুস্কাল বেশ কম থাকে।
নীচে কিছু নিউক্লিয়ার রিএক্টরের ডিজাইন সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত ভাবে দেয়া হলো

পেডল বেড রিএক্টর (VHTR): হিলিয়াম এখানে কুলেন্ট হিসেবে ব্যাবহার করা হয়। এর প্রধান লক্ষ্য হলো অতি উচ্চ তাপমাত্রাকে বের করে হয় বিদ্যুত উতপাদনে না হলে হাইড্রোজেন গ্যাস উৎপাদনে ব্যাব হ্রত হয়। এছাড়া গ্রাফাইট এখানে মডারেটর হিসেবে ব্যাবহ্রত হয় নিউট্রনের পরিমান ঠিক রাখতে। এই রিএক্টর ছোট ছোট সাইজে বানানো যায় যাতে করে বিদ্যুতের বর্ধমান চাহিদা মেটানোর জন্য আরো রিএক্টর বানিয়ে তার সাথে বসানো যায়।

মোল্টেন সল্ট রিএক্টর: এই ডিজাইনে নিউক্লিয়ার জ্বালানী খুব ভালো ভাবে গলিত ফ্লোরাইড লবনের সাথে মেশানো থাকে এর ফলে জ্বালানীর গলনাংকের মান অনেক বেশী থাকে। ফলে এর কুলেন্ট রিএকশনের সময় তরলাবস্থায় থাকে। এর ফুয়েল সাইকেল বদ্ধ ফলে এর বর্জ্যে যথেষ্ট পরিমান গরম এবং গতিসম্পন্ন ইলেক্ট্রন থাকায় এগুলো একটু প্রসেস করে নিউট্রন সোর্স হিসেবে আবারও ব্যাব হার করা যায়। এছাড়া এর বর্জ্য গলিত অবস্থায় থাকার কারনে একে সংরক্ষন করাও সহজতর।

সুপারক্রিটিক্যাল ওয়াটার রিএক্টর: এই ডিজাইনে পানি সুপারক্রিটিক্যাল স্টেটে ব্যাব হার করা হয় যেখানে চাপের পরিমান ২২এমপিএ এবং তাপমাত্রা ৬৪৭ কেলভিন।পুরোনো রিএক্টরের ডিজাইন অনুসারেই করা হয় কিন্তু উচ্চ চাপ স হ্য করতে পারে এবং বিদ্যুৎ আরও সাশ্রয়ী উপায়ে তৈরী করতে পারে।

লীড কুলড ফাস্ট রিএক্টর: এই রিএক্টরে তরল লীড ব্যাব হার করা হয় যেখানে এক তরল ধাতু থেকে অন্য তরলে তাপমাত্রা পরিবাহিত হয়। এখানে সুবিধাটা হলো লীডের উচ্চ গলনাংকের কারনে এর জন্য কোনো উচ্চচাপের প্রয়োজন নাই। এর ফুয়েল সাইকেল বদ্ধ এবং এর কোনো মডারেটর লাগবে না।এটাতে উচ্চ তাপমাত্রা কারনে অটিরিক্ত পন্য হিসেবে হাইড্রোজেন পাওয়া যায়।

সোডিয়াম কুলড ফাস্ট রিএক্টর: এখানে কুলেন্ট হিসেবে তরল সোডিয়াম ব্যাবহার করা হয়। এই রিএক্টর পুরো বাস্পনিরোধ করে বন্ধ রাখা হয় নতুবা এই তরল সোডিয়াম পানি আর অক্সিজেনের সাথে খুব দ্রুত বিক্রিয়া করে। জ্বালানী রড সমূহ এখানে সলিড ফর্মেই থাকবে। এর ফলে এখানে উচ্চগতির নিউট্রনকে কাজে লাগানো হয় ফলে যে বর্জ্য উৎপাদিত হবে সেটাকে আবারো কাজে লাগানো যাবে। এখানে সোডিয়ামও লীডের মটো তাপমাত্রা আরেকটা তরলে ট্রান্সফার করবে। এটাতেও কোনো মডারেটরের প্রয়োজন নাই। এই ফাস্ট ব্রীডার রিএক্টরে প্লুটোনিয়াম তৈরী হয় বলে বর্জ্যকে কখনোই সাইটের বাইরে নিতে হয় না। একে পুনঃ পুনঃ কাজে লাগানো যায়।



পোস্টে আরও অনেক কিছুলেখার খায়েষ ছিলো কিন্তু পোস্ট যে বড় হইছে......আমার নিজেরই গলা শুকাইটেছে। প্রতিটা প্যারা নিয়া একেকটা পোস্ট দেয়া যায়। প্রতিটা পোস্টে সবকিছুর খুটিনাটি নিয়া এবং ক্যালকুলেশন আর পদার্থবিজ্ঞান আর ক্যামিস্ট্রি নিয়ে বিষদ আলোচনা করা যায়। যাই হোক। পরে পার্ট পার্ট করে আবারও লেখা যাবে এই পোস্টের থেকে আরও শিশু পোস্ট!
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে মে, ২০১৬ রাত ৮:০৮
১০টি মন্তব্য ১০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

বাবা শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান, ছেলে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা

লিখেছেন মাথা পাগলা, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ২:২১

মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে অনেক হৃদয়বিদারক ঘটনা আছে। কুমিল্লার এমনই একটি ঘটনার কথা বলেছেন একজন মুক্তিযোদ্ধা -

কুমিল্লা শহরের উত্তর দিকে রসুল আহমদ নামে একজন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি ছিলেন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান।... ...বাকিটুকু পড়ুন

শব্দের সীমা (জনস্বাস্থ্য বিষয়ক সতর্কতা!)

লিখেছেন আবু সিদ, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১২:৪০

“সুন্দর শব্দ মধুচক্রের মতো, আত্মার জন্য সুমিষ্ট এবং অস্থির জন্য আরোগ্য।” — প্রবচন ১৬:২৪, বাইবেল

প্রতিদিন বাসা থেকে বের হলেই হাজারো শব্দ উড়ে এসে আছড়ে পড়ে আমাদের কানে। দূর ও নিকট... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন কর্মী ও তার ন্যায্য পাওনা

লিখেছেন কিরকুট, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ দুপুর ১:২০

বাংলাদেশের বেসরকারি খাত নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা সাধারণত বিনিয়োগ, মুনাফা, ব্যবসায়িক প্রবৃদ্ধি, বাজার সম্প্রসারণ কিংবা উদ্যোক্তার ঝুঁকির কথা ভাবি। কিন্তু এই পুরো ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ কর্মীর শ্রম নিয়ে... ...বাকিটুকু পড়ুন

গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের জন্য দায়ী কে?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:১১



২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানের সামরিক, পারমাণবিক ও সরকারি স্থাপনাগুলোতে আকস্মিক বড় ধরনের বিমান হামলা চালায়।প্রথম দফার হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনেয়ীসহ বেশ কয়েকজন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আ-তে আনন্দবাজার, আ-তে আওয়ামী লীগ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৪ ঠা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ রাত ১:১৫


ইন্টারনেটে খবর পড়তে পড়তে হঠাৎ একটা শিরোনাম সামনে এলো। পড়েই কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হলো, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে বুঝি বিশাল কোনো ঘটনা ঘটে গেছে। শিরোনাম, “আধ পয়সা বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

×