somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ছোট গল্প: যে সূর্যটা রানুর জন্য উঠেছিল

২৮ শে জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৪:২৭
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




-আপা, তোমাদের বাড়িটায় কেমন যেন একটা অশুভ ব্যাপার আছে।
-হুম, হানাবাড়ি টাইপের, না?
-সিরিয়াসলি কেমন যেন একটা অনুভূতি হচ্ছে।
-একদম বাজে বকবি না। ঢাকা শহরের আটতলা এপার্টমেন্টকে তোর হানাবাড়ি বলে মনে হচ্ছে! আমার সাথে ফাজলামো করিস?
-মোটেও না। তুমি আসলে সিরিয়াসলি নিচ্ছো না ব্যাপারটা। আমি এরকম কিছু কিছু বিষয় ধরতে পারি।
-হুম।
-বিল্ডিংটা তো একদম নতুন। আশেপাশের বেশ কয়েকটা প্লটও খালি। এমন তো হতে পারে যে, এই প্লটটাতে অভিশপ্ত কিছু একটা ছিল। হয়তো এখানে কেউ গলায় ফাঁস দিয়ে মারা গেছে কিংবা আরো খারাপ কিছু। এ বিষয়গুলো তো কেউ সহজে প্রকাশ করতে চায় না।
-হিমুগিরি আর কত করবি! চাপাবাজি বাদ দে। এসব ভাওতাবাজী দিয়ে আমাকে ভয় দেখাতে পারবি না। তোর ঘটনা তো আমি বুঝি। ধানমন্ডির বাসাটা তোর হোস্টেল থেকে কাছাকাছি ছিল যখন তখন আসতে পারতি। আর উত্তরা একটু দূর হয়ে যায়। তাই না?
মাজেদ মাথা চুলকাতে থাকে। ব্যাপারটা রানু আপা যে সহজেই ধরে ফেলবে তা সে বুঝতে পারেনি। বললো, ঠিক তা না। তবে তুমি তো আমাকে পাত্তা দিলা না, ব্যাপারটা দুলাভাইকে জানাতে হবে।
-তোর দুলাভাই রাত এগারোটার আগে ফিরবে না। কাজেই রাতটা থাকতে হবে। থাকবি?
-রাতে থাকা যাবে না। সকালে ক্লাশ আছে।
-তাহলে পরেরবার এসে তোর দুলাভাইকে বলে যাস।
রান্নাঘরের দিকে চলে গেল রানু। ঢাকা কলেজে অনার্স পড়ুয়া চাচাতো ভাইটার জন্য মায়া হয় রানুর। ধানমন্ডির বাসায় থাকতে দু’একদিন পরপর আসতো। ছেলে মেয়ে দুইটাও ওর খুব নেওটা। ছোটমামা বলতে প্রায় পাগল। মাজেদ বাসায় এলে বরং ভালোই লাগে। আত্মীয়হীন ঢাকা শহরে নিজের মানুষ পাওয়া তো খুবই মুশকিল একটা ব্যাপার। ওদিকে, বছর বছর বাড়ি ভাড়া বেড়ে প্রায় সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছিলো ধানমন্ডির বাসাটা। তাছাড়া আবরারের বাবার অফিসটাও গাজীপুর শিফট হলো। আবরার এখনো ছোট ক্লাশে পড়ে, মিতুর এখনো স্কুল শুরু হয়নি। কাজেই এলাকা পাল্টানোর জন্য এটা একটা ভালো সুযোগ পাওয়া গেছে। তবে এই বাসাটা একটু বেশি ভেতরে। লিফট চালু হয়নি এখনো। তাই ছয়তলায় ওঠানামাতে ওদের একটু কষ্টই হচ্ছে।

রাত নয়টার দিকে ডাইনিং টেবিলে খেতে বসেছে মাজেদ। আবরার পাশের চেয়ারে বসে মামাকে তার ব্যাটারী চালিত লাল গাড়িটা কিভাবে স্ক্রু-ড্রাইভার দিয়ে খুলে আবার জোড়া লাগিয়েছে তার বর্ণনা দিচ্ছে। মাজেদও মন দিয়ে শুনছে। ভাগ্নের এসব খুঁটিনাটি বিষয় তার কাছে খুবই ইন্টারেস্টিং মনে হয়। গ্রাম থেকে ঢাকা এসে প্রথম কম্পিউটার গেইম কিভাবে খেলতে হয় তা এই ভাগ্নের কাছেই শেখা। খেলা শেষ হবার পর যে কম্পিউটার ‘শাট-ডাউন’ দিতে হয় সেটাও ভাগ্নেই দেখিয়েছে। এগুলো নেহাতই তিন-চার বছর আগের স্মৃতি। তবে এরপরের সময়গুলোতে বন্ধনটা আরো বেশি দৃঢ় হয়েছে। কাজেই ওরা বাসা শিফট করে উত্তরা চলে আসায় একটু বেকায়দা তো হয়েছেই। আবরার বললো, আচ্ছা মামা, তুমি আমাকে একটা রিয়েল ক্রিকেট ব্যাট কিনে দেবে?
-ব্যাট তো তোর আছেই। আবার আরেকটা লাগবে কেন?
-ওটা তো টেনিস বলের। আমার রিয়েলটা লাগবে। সাকিব ভাইয়া যেটা দিয়ে খেলে ওরকম।
-কাঠের বলের জন্য?
-হ্যাঁ মামা। বাবা বলেছে, আমাকে ক্রিকেট একাডেমীতে ভর্তি করে দেবে। আরেকটু বড় হয়ে বিকেএসপিতে ভর্তি হবো। তারপর সাকিব ভাইয়ার মতো আইপিএল-বিপিএল খেলে বেড়াবো।
-সাকিব ভাইয়া তো শুধু আইপিএল-বিপিএল খেলে না, জাতীয় দলেও খেলে। জাতীয় দলে খেলবি না? বাংলাদেশ দলে?
-খেলবো। সব খেলবো।
-গুড। আগে জাতীয় দল, তারপর আইপিএল-বিপিএল।
-আচ্ছা মামা, সাকিব ভাইয়াকে আমিও ভাইয়া বলি, তুমিও ভাইয়া বলো। তুমি ভাইয়া বললে তো সে আমার মামা হবে। তাহলে আমি কি মামা ডাকবো?
-মামা ডাকার দরকার নাই। সাকিব ভাইয়া হলো সবার ভাইয়া। যেমন চাঁদ মামা হলো সবার মামা তেমনি সাকিব ভাইয়াকে তুই ভাইয়া বললেও সমস্যা নাই। ঠিক আছে?
-ওকে বুঝেছি। তাহলে আমাকে একটা ব্যাট কিনে দিও।
-আচ্ছা দেবো।

ডিংডং।
কলিংবেল বাজতেই আবরার ছুটে গেল দরজার দিকে। রানু দরজার আইহোলে চোখ রেখে বললো, বাবা আসেনি। চারতলার আন্টি এসেছে।
রানু দরজার খোলার আগেই আবরার ছুটে গেল মামার পাশের চেয়ারটার উদ্দেশ্যে। কাছাকাছি যেতেই দেখলো মিতু ইতিমধ্যে চেয়ার দখল করে ফেলেছে। আসন্ন সংঘাতের ইঙ্গিত দিয়ে আবরার দ্বিতীয় মাত্রার চিৎকার দিলো, আম্মু!
আবরারের ডাক শুনেও যেন শুনলো না রানু। দরজার খুলতেই চারতলার ভাবী হাসি হাসি মুখে বললেন, ভাবী কাঁচামরিচ আছে?
-আছে, ভেতরে আসুন।
ভেতরে আসবো না ভাবী- বলেও গুটি গুটি পায়ে ভেতরে এলেন চারতলার ভাবী। বললেন, মেয়েটা এতো জ্বালায় আর বলবেন না ভাবী। চিকেন খাবে চিকেন খাবে করে সন্ধ্যা থেকে অস্থির, আর এখন খেতে বসে বলছে ডিম মামলেট খাবে।
-বাচ্চা মানুষ, একটু তো জ্বালাবেই।
-বাসায় কাঁচামরিচ নেই। ওদিকে দারোয়ানটাও ফোন ধরছে না। নামায পড়তে মসজিদে গেছে কিনা কে জানে! বয়স্ক একটা দারোয়ান! কবে যে পাল্টাবে?
-মনে হয় না সহজে দারোয়ান চেঞ্জ করা হবে। তবে এখনো তো অনেক ইউনিট খালি আছে। সবগুলোতে মানুষ উঠে গেলে আরেকটা দারোয়ান রাখতে হবে। বসেন ভাবী, আমি মরিচ আনছি।
এই ভাবী প্রচুর কথা বলে। একবার গল্প শুরু করলে আর থামানো যাবে না। কাজেই তাড়াতাড়ি বিদায় করতে হবে। হাতে করে কাঁচামরিচের বাটিটা এনে রানু বললো, যে ক’টা লাগে নেন।
কাঁচামরিচ হাতে নিতে নিতে চারতলার ভাবী বললেন, বাসায় কি গেস্ট এসেছে?
-হ্যাঁ ভাবী। কাজিন এসেছে। ঢাকা কলেজে পড়ে।
-ও। তাহলে আর ডিস্টার্ব না করি।
-না না ডিস্টার্বের কী আছে।
-কিসে পড়ছে কাজিন?
-ম্যাথে, সেকেন্ড ইয়ার।
-বাহ্, ভালো তো। ঠিক আছে ভাবী, আজ উঠি।
রানু কিছু বলার আগেই ভাবী উঠে পড়লেন। দরজার কাছাকাছি গিয়ে হঠাৎ ঘুরে দাঁড়ালেন। বললেন, আচ্ছা ভাবী, বাসায় কেমন যেন একটা স্মেল পাচ্ছি।
-মাঝে মাঝে আমিও পাই। সম্ভবত গ্যাসের গন্ধ।
-ঠিক, গ্যাসের স্মেল।
-গ্যাসের লাইনে সমস্যা আছে। তবে সবসময় গন্ধ পাই না, মাঝে মধ্যে পাই। আবরারের বাবা ফ্ল্যাট মালিকের সাথে কথা বলেছে। দুয়েক দিনের মধ্যেই মিস্ত্রি পাঠানোর কথা আছে।
-সাবধানে থাকবেন ভাবী।
রানু একটা অর্থপূর্ণ হাসি দেবার চেষ্টা করলো।
- আরেকটা কথা ভাবী, কিচেনের এগজোস্ট ফ্যানটা চালিয়ে রাখবেন সবসময়।
রানু আবারো হাসার চেষ্টা করলো। চারতলার ভাবী বিদেয় হলেন। দরজা লাগিয়ে ভেতরে ঢুকতেই মাজেদ বললো, বললাম না, বাসায় অশুভ কিছু একটা আছে। আমাকে তো পাত্তাই দিলে না।
-কোনো পাত্তা টাত্তা নাই। তুই খা। আরেকটা মাছ নিবি?
-বেশি থাকলে দাও।
মাজেদের প্লেটে আরেকটা মাছ তুলে দিতে দিতে রানু বললো, তোর জন্য একটা ভালো আইডিয়া পেয়েছি।
-কী?
-উত্তরায় একটা টিউশনি শুরু কর। সপ্তাহে তিন/চার দিন আসবি। পড়াবি। আর এখানে এসেও ঘুরে যাবি।
-মন্দ বলো নি। কিন্তু টিউশনি পাওয়াটা একটু কঠিন ইদানিং।
-দাঁড়া দেখি, ম্যানেজ করা যায় কিনা। চারতলার ভাবীর মেয়েটা ক্লাশ থ্রিতে পড়ে। ওর জন্য টিউটর খুঁজছে। এতো ভেতরে বাসা যে, টিউটর আসতে চায় না। কথা বলবো?
-বলো বলো। খুবই ভালো হয়।
রানু ভাবলো, কাল বিকালে বাচ্চারা যখন ছাদে খেলতে যাবে, তখন বিষয়টা নিয়ে ভাবীর সাথে আলাপ করতে হবে।

আবরারের বাবা ফিরলো রাত সাড়ে-বারোটায়।
বাচ্চারা সাধারণত দশটা-সাড়ে দশটার মধ্যেই ঘুমিয়ে যায়। মাজেদ চলে যাবার পরে বাচ্চারা খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে গেছে। রানু এগারো পর্যন্ত অপেক্ষার পর রাতের খাবার খেয়ে নিয়েছে। আবরারের বাবার কাজেই চাপ বেড়ে গেছে ইদানিং। মাঝে মধ্যেই মাঝ রাতে ফেরেন। অফিসের গাড়ি এসে বাসার গেটে নামিয়ে দিয়ে যায়। কাজেই খুব একটা টেনশন হয় না। তবে দারোয়ান চাচা তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়েন, তাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে হয় আরকি।
রাতের খাবার সেরে একটা গল্পের বই নিয়ে কিছুক্ষণ সোফায় লেপ্টে থাকলো রানু। অন্যান্য ভাবীদের মতো টিভি সিরিয়াল দেখার অভ্যাস তার নেই, তবে বই পড়ার অভ্যাস আছে। পড়তে পড়তেই ক্লান্তিতে চোখ বুজে আসছিলো বারবার তবুও আবরারের বাবার খোঁজ নেই। সাধারণত দেরি হলে ফোন করে জানায়। আজ কল করেনি, তারমানে খুব একটা দেরি হবে না। মানুষটা ইদানিং খুব পরিশ্রম করে। ওর খুব ইচ্ছা দেশের বাইরে সেটেল হয়ে যাবে। দেশে নাকি ভালো লাগে না। বিদেশে নাকি নাগরিক সুযোগ সুবিধা অনেক ভালো। তাছাড়া এখন বিদেশ গেলে বাচ্চাদের এডজাস্ট হতে খুব একটা সমস্যা হবে না। ওদের পড়াশোনাও ভালো হবে। ইত্যাদি ইত্যাদি। তবে রানুর এসব ভালো লাগে না। নিজের মানুষ ছেড়ে নিজের দেশ ছেড়ে বিদেশ যাবার কথা একবারের জন্যও তার মাথায় আসে না। বিয়ের পর প্রথম প্রথম ঢাকায় এসেই বাড়ির জন্য, বাড়ির মানুষগুলোর জন্য তার মন অনেক কেঁদেছে। কিন্তু আবরারের বাবার ভিন্ন মত।
রাতে আবরারের বাবার সাথে খুব একটা কথা হলো না রানুর। মানুষটা বোধ হয় আজ একটু বেশি ক্লান্ত। ডাইনিং টেবিলে টুকটাক কথা হলো। কাল সন্ধ্যায় রানুকে রেডি থাকতে বলেছে, অফিসের কোনো এক কলিগের বিয়ের প্রোগ্রাম। কাজেই অফিস থেকে একটু আগেই ফিরবে কাল, তারপর একসাথে প্রোগ্রামে যাবে।

রানুর ঘুম ভাঙ্গলো ভোর ছয়টায়।
আগে এলার্ম দিতে হতো। ইদানিং অভ্যাস হয়ে গেছে। মাঝে মধ্যে যেদিন একটু দেরি হয়ে যায়, সেদিন আর ফজরের নামাযটা পড়া হয় না। শীতের শুরু, এখনো ভোরের আলো ফুটেনি। আরেকটু পরেই পূর্ব আকাশে লাল সূর্যটা ফুটবে, চারপাশে খানিকটা কুয়াশার চাদর থাকার সম্ভাবনা আছে যদিও। তবে ফজরের নামাযটা পড়ার সময় আছে।
চোখ ডলতে ডলতে রান্নাঘরের দিকে এগোলো রানু। ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা খাবার অভ্যাস ওর অনেক পুরোনো। চায়ের পানিটা বসিয়ে দিয়ে ওযু করতে যাবে। তারপর নামায পড়ে এসে এক কাপ গ্রীন-টি খাবে।
প্রতিদিনের এই রুটিনটা আজ ঠিকঠাক মতো চললো না। রান্নাঘরের বাতি জ্বালিয়ে চায়ের পাতিলটা চুলায় তোলার পর ম্যাচের কাঠিটা জ্বালতেই ভয়ংকর শব্দে বিস্ফোরণ হলো। রানু ছিটকে পড়ে গেল মেঝেতে। কী হলো, কেন হলো কিছু বুঝে ওঠার আগেই রানু দেখলো সারাবাড়িময় আগুন আর আগুন। ওর শাড়ীতেও আগুন জ্বলছে। আগুনের শিখা আর উত্তাপে চোখ মেলতে পারছে না। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৌড়ে শোবার ঘরে চলে এলো সে। সেখানে আগুনের মাত্রা আরো কয়েকগুণ বেশি। বিকট শব্দের কারণে আবরারের বাবার ঘুম ভেঙ্গে গেছে। সে নিজেও বুঝতে পারছে না কী হচ্ছে! চারপাশে এতো আগুন কেন? তার শরীরে, বাচ্চাদের শরীরে আগুন লেগে গেছে। বাচ্চারা ঘুমের মধ্যেই চিৎকার করছে কিংবা তাদেরও ঘুম ভেঙ্গে গেছে। রানু জানে না কী করবে। সে চিৎকার করলো, আবরারের বাবা, তুমি বাচ্চাদের নিয়ে বের হও আমি নিচে যাচ্ছি সবাইকে ডাকতে।
আবরারের বাবা রানুর কথা শুনলো কিনা তা রানু জানলো না। সে দৌড়ে নামা শুরু করলো সিঁড়ি দিয়ে। চারতলার দরজার সামনে আচমকা দাঁড়ালো। কলিংবেল টিপলো টানা কয়েকবার তারপর পাগলের মতো দরজার ধাক্কালো। চিৎকার করে বলছে, ভাবী গেট খুলেন। আমাদের বাসায় আগুন লেগেছে। আমার বাচ্চা দুইটা আগুনে পুড়ছে। ওদের বাঁচান।
দ্রুতই চারতলার ভাবী দরজার খুললেন ঘুম ঘুম চোখে। তবে সারা গায়ে আগুন নিয়ে একটা মানুষকে চিৎকার করতে দেখে তিনি সাথে সাথেই দরজা বন্ধ করে ফেললেন। তিনি জানেন না এটা কেন করলেন! হয়তো তিনি রানুকে চিনতে পারেননি কিংবা চিনতে পারলেনও জ্বলন্ত একটা মানুষকে দেখে ভয় পেয়ে গেছেন কিংবা অন্য কিছু। যা কেবলমাত্র এই অদ্ভুত শহরের মানুষের পক্ষেই সম্ভব।
রানু সাহায্যের আশা করেছিল। কিন্তু মুখের ওপর দরজা লাগিয়ে দেবার পরে সে আর কিছু বলতে পারেনি। দুই সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইলো কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে, তারপর দৌড়ে নামতে থাকে নিচের দিকে। অন্য কোনো বাসায় নক করার কথা তার মাথায় এলো না। শাড়ীর প্রায় বেশিরভাগ অংশই জ্বলে গিয়ে চামড়া পর্যন্ত আগুন চলে যাচ্ছিলো ফলে জ্বালাতন বাড়তে লাগলো।
বয়স্ক দারোয়ান চাচা সবে মসজিদ থেকে নামায থেকে ফিরে চৌকিতে শুয়েছেন। সিঁড়ি দিয়ে জ্বলন্ত রানুকে নামাতে দেখার আগেই খানিকটা চিৎকার চেঁচামেচী শুনেছেন তিনি। রানুর সারা শরীরে আগুন দেখে তিনি ছিটকে উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর চৌকিতে পাতা পাতলা তোষক দিয়ে জড়িয়ে ধরলেন রানুকে। রানুর শরীরে আগুন তখনো জ্বলছে। দ্রুতই কোথা থেকে যেন আধ-বালতি পানি এনে ঢাকলেন তোষকে। ধোঁয়ায় ভরে গেল পুরো গ্যারেজ। দারোয়ান চাচা বাড়ির মেইন গেটের তালা খুলে ফেললেন তারপর চিৎকার করে আশেপাশের মানুষ ডাকার চেষ্টা করলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই একদল মানুষ বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। ছয়তলায় উঠে আগুন নেভানোর কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। কেউ হয়তো ফায়ার সার্ভিসে ফোন করেছিলো ফলে দূর থেকে সাইরেন বাজিয়ে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাহসী মানুষদের গাড়ি আসতে শোনা গেল। আর একটা সবুজ রঙ্গের সিএনজি অটো রিক্সায় করে দারোয়ান চাচাকে দেখা গেল রানুকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে।

এরপরে কী হয়েছিলো তা আমরা আলোচনা করতে চাই না। হয়তো রানু বেঁচে গিয়েছিলো কিংবা শ্বাসনালীসহ শরীরের প্রায় সত্তরভাগ পুড়ে যাবার কারণে সে মারা গিয়েছিলো। আবরার, মিতু কিংবা তাদের বাবার খবর আমরা টেলিভিশনের খবরে কিংবা পত্রিকার মাধ্যমে পাই। কিন্তু ফ্ল্যাটের মালিক যে সময়মতো গ্যাসের লাইন মেরামত করেনি কিংবা সেই ডেভেলোপার কোম্পানী যারা সবকাজ ঠিক মতো শেষ না করে বা সবকিছু সঠিকভাবে চেক না করে বিল্ডিং হ্যান্ডওভার করেছে তাদের কথা কিংবা চারতলার সেই ভাবী যিনি আগের সন্ধ্যায় কাঁচামরিচ ধার নিয়েছিলেন যা আর কখনো ফিরিয়ে দিতে পারেননি- তাদের কথা আমরা কখনো জানতে পারি না। শুধু জানতে পারি, সেদিন কুয়াশা কেটে গিয়ে একটা টকটকে লাল সূর্য উঠেছিল। যে সূর্যটা ঢাকাবাসীর কারো জন্য ওঠেনি, শুধুমাত্র সিএনজি অটোরিক্সার গ্রিলের ভেতর কাঁতরাতে থাকা রানুর জন্য উঠেছিল।
সর্বশেষ এডিট : ২৮ শে জানুয়ারি, ২০২০ বিকাল ৫:৫০
২৩টি মন্তব্য ২৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রুবা আমি তোমাকে ভুলিনি

লিখেছেন রাজীব নুর, ১১ ই জুলাই, ২০২০ রাত ১২:৫৫



আমার বন্ধু রফিকের বিয়ে।
সে সাত বছর পর কুয়েত থেকে এসেছে। বিয়ে করার জন্যই এসেছে। রফিক একদিন আমার বাসায় এসে হাজির। আমি তাকে প্রথমে দেখে চিনতেই পারি নাই।... ...বাকিটুকু পড়ুন

রম্যরচনাঃ ক্যামেরা ফেস

লিখেছেন আবুহেনা মোঃ আশরাফুল ইসলাম, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সকাল ৮:৫৯


খুব ছোট বেলায় আমাদের শহরে স্টার স্টুডিও নামে ছবি তোলার একটা দোকান ছিল। সেটা পঞ্চাশের দশকের কথা। সে সময় সম্ভবত সেটিই ছিল এই শহরের একমাত্র ছবি তোলার দোকান। আধা... ...বাকিটুকু পড়ুন

আবাসন ব্যাবসায় অশনি সংকেত

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১১ ই জুলাই, ২০২০ বিকাল ৫:২২




জুলাইয়ের শুরুতে একটি বিজ্ঞাপন দেখা গেল একটি আবাসন নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের । তারা ৫০ পারসেনট কমে ফ্লাট বিক্রি করছে । মুখ চেপে হাসলাম এত দুঃখের মাঝেও... ...বাকিটুকু পড়ুন

রৌপ্যময় নভোনীল

লিখেছেন স্বর্ণবন্ধন, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:০৯


একটা অদ্ভুত বৃত্তে পাক খাচ্ছে আত্মা মন,
বিশ্বকর্মার হাতুড়ির অগ্ন্যুৎপাতে গড়া ভাস্কর্যের মতো গাড়-
হাড় চামড়ার আবরণ; গোল হয়ে নৃত্যরত সারসের সাথে-
গান গায়; সারসীরা মরেছে বিবর্তনে,
জলাভুমি জলে নীল মার্বেলে সবুজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

""--- ভাগ্য বটে ---

লিখেছেন ফয়াদ খান, ১১ ই জুলাই, ২০২০ সন্ধ্যা ৬:৪৪

" ভাগ্য বটে "
আরে! সে কী ভাগ্য আমার
এ যে দেখি মন্ত্রিমশায় !!
তা বলুন দেখি আছেন কেমন
চলছে কেমন ধানায় পানায় ?
কিসের ভয়ে এতো জড়োসড়ো
লুকিয়ে আজি ঘরের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×