শবে বরাতের রাতে ছেলেটির সাথে দেখা। নামাজ পড়ে দাঁড়িয়ে আছি এমন সময় এসে পাশে দাঁড়ায় ছেলেটি, প্রথমে চিনতে পারিনি। পরিচয় দেয়ার পর চিনি। শেষ দেখেছিলাম যতদূর মনে পড়ে, আমি তখন ক্লাস সিক্স এ পড়ি! সে জানতে চাইল আমি কি করছি। বললাম এবার ম্যাট্রিক দিয়েছি। তার খবর জানতে চাইলাম, সে বললো প্রথম বিভাগ ক্রিকেট খেলছে!
শুনে কিছুটা হলেও বিস্মিত হলাম! বয়সে সে আমার চেয়ে বড়জোর ২ বছরের বড় হবে। আমরা যে কোয়ার্টারে থাকতাম সেখানেই থাকতো। তার বাবা ছিল পেশায় বাস-ড্রাইভার। আমরা একসাথেই ক্রিকেট খেলতাম বড় ভাইদের সাথে। শেষের দিকে ২/৩ বল ব্যাটিং করতে পারতাম কপালে থাকলে আর বোলিং পেতাম কালে ভদ্রে! আমি যখন দুপুরের ক্লান্ত রোদে ব্যাগের ভারে ন্যুব্জ হয়ে প্রাইভেট পড়তে যেতাম, ওকে দেখতাম বল দিয়ে ক্যাচিং প্র্যাকটিস করত। হঠাত একদিন তার বাবা তাকে বাসের কন্ডাক্টর হিসেবে নিয়োগ দিল। কিন্তু সে তার ক্রিকেটের ক্যাচিং প্র্যাকটিস করতই সময় পেলে।
প্রতি রাতে মা-কে নিয়ে হাটতে বেড়োলে শুনতে পেতাম তার বাসায় যেন কুরুক্ষেত্র চলছে! একটা রাত যায়নি এমন যে তার মা-বাবা ঝগড়া না করে ঘুমাতে যায়নি! তার মা কে নিয়ে সবাই কানাঘুষা করতো। ছোট ছিলাম, অত কিছু মাথায় ঢুকতো না।
একদিন জানলাম তারা বাসা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। এরপর একদিনের জন্যেও তার সাথে দেখা হয়নি।
তারা এখান থেকে চলে যাওয়ার পর তার মা বাবা কে ডিভোর্স দেয় এবং সমাজের এক গন্যমাণ্য ব্যাক্তিকে বিয়ে করে। কয়দিন পর বাবা ও একজন জোয়ান মেয়েকে বিয়ে করে সে আর তার বোন কে রেখে চলে যায়। সে তার পেট চালাতে একটি বাস কোম্পানিতে কন্ডাকটর এর চাকরি নেয়। কয়দিন পর বোন ও অবৈধ পেশার ফাদে পরে তাকে ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়!
সে চাকরি করতো এবং ভাল ক্রিকেট খেলার সুবাদে খ্যাপ খেলার ডাক পেত। এভাবে সে একটি ক্লাবের কোচের নজর কাড়ে। তিনি তাকে ক্লাবে খেলার সুযোগ করে দেন। অন্যের ছেড়া প্যাড,গ্লাভস দিয়ে কাজ চালাতে হত তাকে। কিন্তু এখন তাকে আর অতটা কষ্ট করতে হয় না।
বেশিক্ষন আর কথা বলার সুযোগ পেলাম না ওর সাথে। পরদিন ওর বগুড়া যাওয়ার কথা দলের সাথে সফরে। আমার দৃঢ় বিশ্বাস সে খুব তারাতারি জাতিয় দলে খেলবে
এই ছেলেটা কিসের মধ্যে দিয়ে দিনানিপাত করতো তা মনে করার চেষ্টা করলাম শুধু! একটা দিন সে শান্তিতে ঘুমাতে যেতে পারেনি। অবজ্ঞা অবহেলায় তার জীবন ছিল মোড়ানো। কিন্তু সে তার স্বপ্নে বেচে ছিল। আজ সে সফলতার একদম দ্বারপ্রান্তে।
আমরা অনেকেই অল্পতেই হতাশ হয়ে পরি। কিন্তু আমাদের চারিদিকে ছড়িয়ে আছে এমন অনুপ্রেরণার হাজারো গল্প! অনুপ্রেরণার জন্য বড় মানুষের জীবনি পড়তে হয় না, অনুপ্রেরণা নিতে হয় জীবন থেকে। নিজের স্বপ্নে বেচে থাকলে সাফল্য আসতে বাধ্য

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

