‘আমি তোমার মতের সাথে একমত না-ও হতে পারি, তবে তোমার মতামতকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়োজনে আমি জীবন বাজি রাখতেও রাজি আছি।’ জনৈক মনীষী এরকম একটা কথা বলে গেছেন।
কথা হলো ‘মত‘ বা ‘মতামত’ বা ‘মুক্ত চিন্তা’ বলতে আমরা কী বুঝি?
যে-কোনো বিষয়, ব্যক্তি বা দেশের উপর যুক্তিনির্ভর আলোচনার মূল উদ্দেশ্য হলো বক্ষ্যমাণ বিষয়ের উপর পরিষ্কার ধারণা লাভ করা এবং তদ্বারা সমাজকল্যাণকর পন্থা বা পদ্ধতিসমূহের অনুসন্ধান করা। কিন্তু পরিষ্কার ধারণা লাভ করার পরিবর্তে যখনই আমরা উক্ত বিষয়ের উপর নিজের কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিস্তার বা নিজের বিজয় লাভের উদ্দেশ্যে মরিয়া হয়ে উঠি, তখন আলোচনার মূল উদ্দেশ্য ব্যহত হয়।
মত বা মতামত বা মুক্ত চিন্তার অর্থ কোনো ব্যক্তি, দেশ বা গোত্র বা প্রতিষ্ঠিত কোনো বিশ্বাসকে আক্রমণ করা নয়। কাউকে গালিগালাজ করা বা কারো বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করা মতামত বা মুক্তচিন্তা নয়। কাউকে অপমানিত বা হেয় প্রতিপন্ন করা, বা তুচ্ছতাচ্ছিল্য করাকে মুক্ত চিন্তা বলা হয় না।
রহিম মোল্লা একজন নাস্তিক। কারণ, তিনি একজন মুক্তচিন্তাবিদ, মুক্তমনা এবং বিজ্ঞানমনস্ক। অন্যদিকে সুমন চ্যাটার্জি মুক্তমনা নন, কারণ তিনি একজন আস্তিক। একজন ব্যক্তি নাস্তিক হলেই যে মুক্তমনা বা বিজ্ঞানমনস্ক হবেন, কিংবা আস্তিক হলেই তিনি মুক্তমনা নন; অন্যদিকে নাস্তিক না হলে মুক্তমনা বা বিজ্ঞানমনস্ক হওয়া যাবে না, কিংবা আস্তিকরা মুক্তমনা বা বিজ্ঞানমনস্ক নন- এ ধরনের মতামত ভুল এবং পক্ষপাতদুষ্ট। কেবল মূর্খেরাই এভাবে ভাবতে পারেন। এটা এরকম না যে, আস্তিকরা বিজ্ঞান পড়েন না, বা বিজ্ঞানীমাত্রই নাস্তিক। জ্ঞান আহোরণ এবং প্রতিভা বা মেধা বিকাশ ব্যক্তি-আকাঙ্ক্ষা বা ব্যক্তিগত কলা বা নৈপুণ্য।
আবার আস্তিক বা নাস্তিক হওয়া কোনো নির্দিষ্ট ধর্মগোষ্ঠীর জন্য প্রযোজ্য নয়। এটা যে-কারো ব্যক্তিবিশ্বাস। হয়তো প্রশ্ন উঠবে- নাস্তিকের আবার ধর্ম কী? নাস্তিকদের জীবনী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনো ধর্মীয় গোষ্ঠীতে জন্মগ্রহণ করেছেন। জীবনের কোনো এক পর্যায়ে ধর্ম ত্যাগ করে নাস্তিক্য গ্রহণ করেছেন। তবে, বৃহত্তর অর্থে নাস্তিক্যবাদও একটা ধর্ম। আস্তিকতা যেমন একটা বিশ্বাস, নাস্তিকতাও তেমনি একটা বিশ্বাস।
আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবারই মতামত পেশ করার মৌলিক অধিকার রয়েছে। অন্যদিকে, মুক্ত চিন্তাবিদ বা মুক্তমনা কথাগুলো আস্তিক-নাস্তিক নির্বিশেষে সবার জন্যই প্রযোজ্য। এটা এরকম না যে, কেবল আস্তিকগণই মুক্তভাবে চিন্তার বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে সক্ষম, নাস্তিকগণ নয়। কে কতখানি চিন্তার গভীরে ঢুকতে পারেন তা নির্ভর করে তার নিজস্ব মেধা ও সেই মেধার প্রয়োগ ক্ষমতার উপর। ‘আমি একজন মুক্তমনা। আমি একজন মুক্ত চিন্তাবিদ। আমি একজন বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ।’ এসব স্ব-প্রশংসনীয় কথা বাতুলতা। কেউ যদি দাবি করেন ‘আমি খুব মেধাবী’, তা যেমন হাস্যকর, তেমনি নিজেকে ‘মুক্তমনা’, ‘মুক্তচিন্তাবিদ’ বা ‘বিজ্ঞানমনস্ক’ দাবি করা কৌতকপ্রদ ও লজ্জাকর। নিজের প্রশংসা নিজে করা যায় না; যারা করেন তারা গো-মূর্খ এবং গর্দভশ্রেণিভুক্ত। আপনি কতখানি সুদূরপ্রসারী চিন্তাভাবনা করতে পারেন, কতখানি মুক্তভাবে চিন্তার দিগন্ত অতিক্রম করতে পারেন, তা আপনার আলাপচারিতা, তথ্যউপাত্ত সমেত যুক্তি-প্রক্ষেপণ, সাধারণ্যে আপনার বক্তব্য কতখানি গ্রহণযোগ্য হলো, ইত্যাদির উপর নির্ভর করে। আপনার এডুকেশনাল ডিসিপ্লিন যাই হোক না কেন, আপনি আস্তিকই হোন বা নাস্তিকই হোন, বিজ্ঞানের আলোকে নিজের চিন্তাভাবনাকে পরিচালিত করাই বিজ্ঞানমনস্কতার লক্ষণ। আপনি যেমন বিজ্ঞানমনস্ক হতে পারেন, তেমনি যুগপৎ একজন দার্শনিকও হতে পারেন। একজন মানুষের পক্ষে যেমন সব ধরনের নেগেটিভ বৈশিষ্ট্য ধারণ করা সম্ভব, তেমনি সকল মানবীয় গুণাবলিও একজন মানুষের মধ্যে থাকা অসম্ভব নয়।
আমার আদর্শের সাথে আপনার আদর্শের মিল নাও থাকতে পারে। আমার আদর্শগত ত্রুটি আপনার দৃষ্টিগোচর হয়ে থাকলে ত্রুটিগুলো আমাকে ধরিয়ে দিন এবং আমাকে শোধরানোর সুযোগ দিন। তবে এমনও হতে পারে, যেগুলো আপনার চোখে ত্রুটি মনে হচ্ছে সেগুলো আমার বা সাধারণ মানুষের চোখে ত্রুটি নয়। আপনার কনভিনসিং পাওয়ার এবং আমার অ্যাকসেপ্টেনস পাওয়ার ভালো হলে সমস্যা মিটে যাবে। তবে, আমাকে কনভিন্স করতে আপনি ব্যর্থ হয়ে আমার আদর্শ বদলে ফেলার জন্য আপনি চাপ প্রয়োগ করতে পারেন না। তেমনি আমাকে অশ্লীল ভাষায় গালিগালজ করতে পারেন না, এবং আমার আদর্শকেও আপনি ঘৃণ্য ভাষায় কটূক্তি করতে পারেন না। যদি করেন, তাহলে আপনি বিদ্যমান শান্তি বিনষ্ট করার জন্য অপরাধ সংঘটন করলেন। আপনি নিজে উত্তেজিত হলেন এবং আমাকেও উত্তেজিত হওয়ার জন্য প্রণোদনা বা প্ররোচনা সৃষ্টি করলেন। আপনি একজন উসকানিদাতা।
আমরা কখনো কখনো উদ্দেশ্যমূলক ভাবে কোনো ব্যক্তি, বিষয়, গোষ্ঠী বা আদর্শকে আক্রমণ করে থাকি। এগুলো খুব ভেবেচিন্তে যেমন করা হয়, তেমনি কখনো কখনো বিষয়ের উপর পর্যাপ্ত জ্ঞান না থাকায়, কিংবা বাগ্মিতায় অপুটু হওয়ার কারণে, কিংবা কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে তোষামুদি করে মুখ ফসকে কিছু বেফাঁস কথা বলে ফেলি। যেমন, মিতা হক যখন বলেন, যেসব মহিলা ঘোমটা পরে তারা আর যাই হোক, বাঙালি নয়। তার ভিডিও ক্লিপ দেখতে দেখতে মনে হয় তিনি এসব বিষয়ে যথযথ জ্ঞানের অধিকারী নন। তিনি আলোচনার সময় মোটামুটি অপ্রতিভ ছিলেন এবং যাও দু-চারটা কথা বলছিলেন, খুব অগোছালোভাবে বলছিলেন। স্রেফ আলোচনায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যেই বেশ জড়তা বা তোতলামি করে কথা বলার প্রাক্কালে হঠাৎ এ বেফাঁস কথাটি তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। নিজের ভিডিও দেখার পর নিজের বিবেকের কাছে তিনি নিশ্চয়ই অপরিসীম লজ্জা বোধ করেছেন, আমার বিশ্বাস। আপনারা জানেন, কোনো টক শোতে আপনি সক্রিয় অংশগ্রহণ করতে না পারলে পরবর্তীতে আর ডাক পাবেন না। নিজের সক্রিয়তা বজায় রাখতে গিয়ে মিতা হকের কপালে এ বিপত্তি ঘটেছিল বলে আমি মনে করি।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কালে ‘মুক্ত চিন্তা’ বা ‘মুক্ত মনা’ হিসাবে আমরা যা দেখতে পাচ্ছি, তা পুরোপুরি মুক্ত চিন্তা বা মুক্তমনাসুলভ আলোচনা নয়। এদের বেশিরভাগই হলো ব্যক্তি আক্রমণ, কুৎসা রটনা এবং অন্যের উপর আধিপত্য বা বিজয় লাভের প্রচেষ্টা। এ আলোচনায় যারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় তারা উভয়েই হয় মুক্তান্ধ, অথবা ধর্মান্ধ।
‘মুক্তান্ধ’ কোনো প্রতিষ্ঠিত বা আভিধানিক শব্দবন্ধ নয়, এটি আমার কথা। ‘মুক্ত চিন্তা’, মুক্ত বুদ্ধি বা মুক্ত মনা নামে যারা অন্যের মতামতের কোনো গুরুত্ব না দিয়ে একচেটিয়াভবে কেবল নিজেদের কথা অপরের মস্তিষ্কে ইনজেক্ট করার চেষ্টা করেন, অপর পক্ষকে কুৎসিত ভাষায় আক্রমণ করেন, আমার কাছে তাদেরকে ‘অন্ধ’ মনে হয়; তারাই মুক্তান্ধ। ‘ধর্মান্ধ’ শব্দের ব্যাখ্যা আমরা সবাই জানি।
মুক্তান্ধ এবং ধর্মান্ধ- দু গোষ্ঠীই সাম্প্রদায়িক উসকানির জন্ম দিয়ে থাকে। আমাদের দেশের অনেকের ধারণা যে, ইসলাম ধর্ম, মুসলমান জনগোষ্ঠী এবং হজরত মুহম্মদ (সঃ)-এর সম্পর্কে সমালোচনা, ত্রুটি অনুসন্ধান, কুৎসা রটনা, অসত্য ও আপত্তিকর কাহিনি রচনা ও প্রোপাগান্ডার নামই হলো মুক্তবুদ্ধির চর্চা। তারা মনে করেন যে, আস্তিক মানেই মৌলবাদী এবং মৌলবাদী অর্থই হলো সন্ত্রাসী। তারা ধর্ম সংক্রান্ত আলোচনাকে কূপণ্ডকতা মনে করেন, আর নাস্তিক হওয়া বা নাস্তিক্যবাদের অনুসারী হওয়াকে প্রগতিশীলতা বা মুক্তমনা বিবেচনা করেন। কাউকে যা খুশি বলা মানেই তারা বাক্স্বাধীনতা মনে করেন।
আস্তিকদের বিরুদ্ধাচরণ করাই মুক্তবুদ্ধিচর্চা নয়। অকথ্য ভাষায় অপর পক্ষকে গালিগালাজ করাকে বাক্স্বাধীনতা বলা যায় না। নাস্তিক মানেই মুক্তমনা নয়।
মুক্তমনা বা মুক্তবুদ্ধিচর্চার জন্য আপনাকে আলোচ্য বিষয়ে যথাযথ জ্ঞান থাকতে হবে। সেই জ্ঞান না থাকলেই আপনি কূপমণ্ডক বা সংকীর্ণমনা- আপনি নাস্তিক বা আস্তিক যাই হোন না কেন। আপনার অর্জিত জ্ঞানকে যুক্তিনির্ভর বক্তব্য দ্বারা অপর পক্ষের বক্তব্যের সাথে তুলনা করতে হবে। আপনার মধ্যে অপর পক্ষের যুক্তিসমূহ শ্রবণ, অনুধাবন, উপলব্ধি ও বোঝার ক্ষমতা থাকতে হবে। আপনাকে ধৈর্যশীল ও পরমতসহিষ্ণু হতে হবে। অপর পক্ষের কাজ থেকে শিখবার এবং অপরের বক্তব্য মেনে নেবার ক্ষমতা আপনার মধ্যে থাকতে হবে। অর্জিত জ্ঞান জনহিতকর কাজে ব্যবহার করাই হলো জ্ঞানার্জনের মূল লক্ষ্য। আপনাকে আপনার বিবেক দ্বারা পরিচালিত হতে দিন।
মুক্ত চিন্তাবিদ বলতে এ পর্যন্ত যাদের সাক্ষাৎ পেয়েছি তাদের চিন্তা হয়তো অনেক মুক্ত বা জ্ঞানগরিমাও হয়তো অনেক বেশি, কিন্তু তা তারা ব্যবহার করছেন ইসলামের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার মাধ্যমে। থাবা বাবা হযরত মুহম্মদ (সঃ)-কে মোহাম্মক (মোহাম্মদ+আহাম্মক), এবং অভিজিৎ রায় মহাউন্মাদ (মোহাম্মদ+উন্মাদ) বলতেন। এর নাম মুক্ত আলোচনা বা ‘মতামত’ নয়; এগুলো হলো ইসলামের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক কথা। তাদেরকে আমার নাস্তিক মনে হয় না, ইসলাম বিদ্বেষী মনে হয়। ভিতরে ভিতরে তারা ঠিকই আস্তিক্যবাদে বিশ্বাসী বলে আমি মনে করি। ইসলাম বিদ্বেষ দ্বারা তারা পশ্চিমা বিশ্বের দৃষ্টি আকর্ষণ ও দয়াদাক্ষিণ্য বা করুণা কামনা করেন, যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ তসলিমা নাসরিন ও আসিফ মহিউদ্দিন। এরা ইসলাম, মুসলিম, কোরান আর হজরত মুহম্মদ (সঃ)-কে যেভাবে অপমান করে কথা বলেন, অন্য কোনো ধর্ম বা গোষ্ঠীকে সেভাবে কখনো আক্রমণ করেন নি। তাহলে কি ইসলামকে আক্রমণের নামই কি মুক্তমনা বা মুক্ত চিন্তাবিদ হওয়া?
যে মনীষীর কথা দিয়ে শুরু করেছিলাম, শেষ করি সেই কথাটি দিয়েই। ‘আমি তোমার মতের সাথে একমত না-ও হতে পারি, তবে তোমার মতামতকে সমুন্নত রাখার জন্য প্রয়োজনে আমি জীবন বাজি রাখতেও রাজি আছি।’ গোঁড়ামি বা উগ্রতা সমাজে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে। আমি আমার ধর্মবিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হবো। আল্লাহ আছেন- যিনি এটা অবিশ্বাস করেন, আমার ক্ষমতা দ্বারা যদি তাকে কনভিন্স করতে পারি, তিনি অবশ্যই আল্লাহর পথে ফিরে আসবেন; যদি না পারি তাহলে সেটা আমার ব্যর্থতা; তিনি যেন তার বিশ্বাস বুকে ধারণ করে নিরাপদে জীবন যাপন করতে পারেন, সে ব্যাপারে আমার প্রাণপণ চেষ্টা থাকতে হবে। কিন্তু তার জীবন হরণ করার ক্ষমতা আমার আল্লাহ আমাকে দেন নি। যদি তা করি, তাহলে আমি একজন উগ্রপন্থী। একজন উগ্রপন্থী আস্তিক আর তথাকথিত নাস্তিক মুক্ত চিন্তাবিদের মধ্যে কোনো পার্থক্য দেখি না।
আসুন, আমরা ‘মুক্তান্ধতা’ ও ‘ধর্মান্ধতা’ পরিহার করে প্রকৃত মুক্তমনা বা প্রকৃত ধর্মবিশ্বাসী হই; যুক্তি নির্ভর আলোচনার মাধ্যমে দেশ ও জাতির উন্নয়নের জন্য সঠিক পথের অনুসন্ধান করি।
০৮ আগস্ট ২০১৫
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই আগস্ট, ২০১৫ সকাল ১০:২৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


