somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

নবীন কবিদের কবিতা : ‘কঠিন’ শব্দ ও ‘কঠিন’ কবিতা; ‘কাঁচা’ হাত ও ‘কাঁচা’ কবিতা বনাম ‘পরিণত’ হাত ও ‘পরিণত’ কবিতা

১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

কবিতা কাকে বলে সেই ডেফিনিশনে না যেয়ে, এবং কে কবি আর কে কবি নন, সে আলোচনা না করে শুরুতেই ধরে নিচ্ছি যিনি কবিতা লিখেন তিনি কবিতার সংজ্ঞা জানেন; এবং একটা কবিতাকে কবিতা হিসাবে এবং একজন অপরিণত কবিকে পরিণত কবি হিসাবে গড়ে ওঠার পথে কী কী অন্তরায় রয়েছে, এ পোস্টে সে বিষয়টি খুব খোলামেলা ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। পরিণত ও প্রতিষ্ঠিত কবিগণ এ পোস্টের আওতার বাইরে; এবং উঠতি কবিদের উপকারার্থে তাঁদের পরামর্শকে স্বাগত জানানো হচ্ছে।

নবীন কবিদের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ‘শব্দরোগ’। নতুন নতুন শব্দের বদলে তাঁরা হন্যে হয়ে কেবল ‘কঠিন’ শব্দ খোঁজেন। সমস্যা এখানেই শেষ নয়- যখন কবিতা লিখতে বসেন, স্মৃতিতে যতগুলো ‘কঠিন’ শব্দ জমা পড়েছে তার সবগুলোই এক কবিতায় ঢেলে সাজাতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কবিতা লেখা শেষ হলে তৃপ্তির হাসি হেসে মনে মনে বলেন- এইতো, একটা ‘কঠিন’ কবিতা লিখে ফেললাম, এর অর্থ বের করতে পাঠকের এবার প্রাণ ওষ্ঠাগত না হয়ে যাবেই না।

কিছু পাঠক এরূপ ‘কঠিন’ কবিতা পড়ে চমৎকৃত হোন। তাঁরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কবিতাকে বিশদ বিশ্লেষণ করেন; কবিতায় যা বলা হয় নি, গুরুগম্ভীর শব্দে তাও ব্যাখ্যা করার প্রয়াস পান। একদিকে তাঁর ব্যাখ্যাটি দুর্বল ও অ-সঠিক হয়, অন্যদিকে কবি এই ব্যাপক আলোচনা পেয়ে গর্বে আপ্লুত হয়ে ভাবেন- তিনি শীর্ষে উঠে গেছেন। এরূপ পাঠকেরা আদতে কবিতা কম বোঝেন, তাঁদের পরিচিত শব্দসংখ্যা খুব সীমিত; এমনও হতে পারে তাঁরা কবিতা বোঝেন না, শব্দও চেনেন না। ফলে এই কবির ‘সুবিশাল’ শব্দভাণ্ডার দেখে তাঁকে শব্দসম্রাট, শব্দের জাদুকর, শব্দের কারিগর, ইত্যাকার মহৎ অভিধায় ভূষিত করে মাথায় তুলে নাচতে থাকেন। কবি তীব্র সুখে এই আনন্দ উপভোগ করতে থাকেন।

একটা কবিতা ভালো কবিতা হিসাবে দাঁড়িয়ে যায় কিছু ‘কঠিন’ শব্দের উপস্থিতিতে নয়, বরং ঐ শব্দগুলোর সঠিক প্রয়োগে। সঠিক প্রয়োগের ফলে কিছু মামুলি শব্দের সমাহারেও একটা কবিতা অনন্য হয়ে উঠতে পারে। বস্তুত, শব্দ কখনো ‘কঠিন’ হতে পারে না, শব্দের প্রয়োগই তাকে কঠিন করে তোলে। সব ‘কঠিন’ শব্দেরই ‘অভিধানে’ স্থান রয়েছে, যা থেকে তার অর্থ পাওয়া সম্ভব। অর্থ নেই, এমন কোনো শব্দ কবিতায় বসালে তা একটা জটিল কবিতার আকার ধারণ করবে; কেননা,এতে কবিতার কোনো অর্থ সৃষ্টি হয় না। কবিতার ভিতরে আপনি কী বোঝাতে চাইছেন, সেই মূল মর্মটি ‘কঠিন’ হতে পারে- কারণ, সকল দর্শন সকলের কাছেই যে বোধগম্য হবে, ব্যাপারটা এরকম নয়। কবিতার সারমর্ম কোনো শব্দকোষ বা কাব্যকোষে নেই। কবিতার ‘কঠিন’ কিছু থেকে থাকলে সেটি তার শব্দ নয়, অন্তর্নিহিত ভাবার্থ।

একটা উৎকৃষ্ট কবিতার বৈশিষ্ট্য এই নয় যে সেখানে জটিল ও ‘কঠিন’ শব্দ ব্যবহার করতে হবে। কবিতার গাঁথুনি বা নির্মাণশৈলী, এর অন্তর্নিহিত ভাব বা বক্তব্যই কবিতাকে উপরে তোলে। এই গাঁথুনির কাজে শব্দগুলোকে কীভাবে ব্যবহার করা হলো, বা এর বিন্যাস কী রকম- কবিতার গুণগত মান দেখতে হলে সেই জিনিসটাই বিবেচনা করতে হবে।

একটা কবিতাকে শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করার মধ্যেই প্রকৃত সার্থকতা নিহিত। মনের ভিতরে জমা হওয়া সব শব্দকে কবিতায় না বসিয়ে কেবল কবিতার প্রয়োজনে সঠিক অবস্থানে সঠিক শব্দটাকে বসাতে পারলেই একটা কবিতা সাবলীল ও সার্থক হয়ে উঠবে।

অনেকে নতুন নতুন শব্দ তৈরি করেন। এটা খুবই ভালো কথা, এবং সৃজনশীল কাজ। অনেকে এমন শব্দ আবিষ্কার করেন যে আবিষ্কৃত শব্দের কোনো অর্থ নেই। এরূপ ‘অর্থহীন’ শব্দেও কবিতা লিখে প্রতিষ্ঠিত কবিদের কাছ থেকে বাহবা পাওয়া যায় বলে তাঁরা দাবি করেন। যিনি সম্পূর্ণ নতুন একটা শব্দ তৈরি করে কবিতায় ব্যবহার করেন, আমার বিশ্বাস, তিনি নিশ্চয়ই এটার একটা অর্থ কল্পনা করেই এ কাজটি করে থাকেন। তা না করে থাকলে এটা ‘আগডুম, বাগডুম, ঘোড়াডুম’ ধরনের শব্দের মতো হবে, যেগুলো গানের মধ্যে ‘লা লালা লালা লা’, ‘হো হো হো’ ইত্যাদি রূপে ফিলার হিসাবে কাজ করে। প্রকৃতপক্ষে, নতুন শব্দ সৃষ্টি করা কোনো বাহাদুরি নয়। এই দেখুন, কত বিচিত্র ও নতুন নতুন শব্দ বানানো যায়- যোগনূর, যোগতাল, যোগীনূর, যোগামৃত, যোগবল, যোগাসুখ, যোগসুখ, যোগাতুর, যোগার্ত, যোগমৃত, যোগময়, যোগমায়া, যুগঞ্জয়, যোগসিৎ, যোগসিক্ত, যোগালয়, যোগনৃত্য। এগুলো কি কিছু হয়েছে? হ্যাঁ, এর প্রতিটা শব্দেরই অর্থ বের করা সম্ভব।

শব্দকে কীভাবে ভাঙতে হয়, জুড়তে হয়, একজন দক্ষ কবি সেটা জানেন। যদি কোনো কবি শব্দ ভাঙাজোড়ার বদলে নতুন শব্দ বানিয়ে ফেলেন, সেটা বেশ হাস্যকর হয়ে যেতে পারে। শব্দ ঠিক এভাবেই বানানো যায় বলে মনে হয় না; প্রতিটা শব্দের প্রকৃতি বা মূল থাকতে হয়। সতুন, প্রতুন, যতুন, মথুন, অতুন, মর্তুন, মানুশি, প্রনিভা, সুরুনিমা, আলুশিনা, প্রনিতি, বিরূশা, চাপিশা, যশোথী, কপালো, কাপিতা, কপিতা, নপিতা, রানিলা- শব্দগুলো কি নতুন নয়? কিন্তু এই নতুন শব্দগুলোর কোনো মূল নেই, তাই এগুলো অর্থহীন শব্দ। তবে আপনি নতুন শব্দ বানিয়ে যদি তার একটা অর্থ জুড়ে দিতে পারেন, সেটা একটা কাজের কাজ হতে পারে।

কিন্তু পৃথিবীর কোনো ভাষায় কোনো ভাষাবিদ এভাবে নতুন শব্দ সৃষ্টি করেছেন কিনা আমার জানা নেই। শব্দ বা ভাষার উৎপত্তির ইতিহাস এরকম কিনা তাও আমি জানি না। তবে বর্তমান যুগে কেউ যদি এভাবে নতুন শব্দ বানাতে বসে যান তাহলে ভূরি ভূরি নতুন শব্দ বানানো সম্ভব। সেক্ষেত্রে নতুন শব্দের আলাদা একটা অভিধান রচনা করার প্রয়োজন পড়বে বৈকি। এতে অবশ্য বিপত্তি যে কম কিছু হবে না তা নয়- একেক ব্যক্তি যদি নিজ নিজ সৃজনীশক্তি প্রমাণের উদ্দেশ্যে শত শত ‘ব্যক্তিগত নতুন শব্দের অভিধান’ রচনা করে বসেন, অবস্থাটা ভয়াবহ হবে নিঃসন্দেহে। কিন্তু তা দ্বারা ভাষার কী উপকার সাধিত হবে? এজন্য, একটা নতুন শব্দ বানিয়ে ফেলেছি- এতে বিরাট কোনো কিছু ঘটে গেছে বলে আমি মনে করি না। সাহিত্যে, বিশেষ করে কবিতায় শব্দকে ভাঙার ব্যাপারটা অনেক আলোচিত ও সৃজনশীল বিষয়। একটা শব্দকে ভাঙার উদ্দেশ্য কোনো অর্থহীন শব্দ সৃষ্টি করা নয়। কল্পনা করুন, অর্থহীন অনেকগুলো বানানো শব্দ দিয়ে একটা বাক্য লিখলেন; যে-শব্দের কোনো অর্থ নেই, সেই শব্দ দ্বারা গঠিত বাক্যের কি কোনো অর্থ থাকতে পারে? সে ভাষা পাখি বা পশুর ভাষার মতোই অবোধ্য হবে।

কবিতায় শব্দের ব্যবহার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কবিতায় নুতুন নতুন শব্দ, এমনকি অপ্রচলিত শব্দও আমদানি করতে হবে, তবে খেয়াল রাখতে হবে যাতে কোনোক্রমেই এর সহজবোধ্যতা ব্যাহত না হয়। সাবলীলতা কবিতার একটা বড় গুণ। সাবলীলতার গুণে লেখা প্রাঞ্জল ও বোধগম্য হয়ে ওঠে। অন্যথায় লেখা জটিল হয়ে পড়ে, বোধগম্যতার মাত্রা হ্রাস পায়। কবিতায় নতুন শব্দ অবশ্যই ব্যবহার করতে হবে। তবে নতুন শব্দের অর্থ ‘সারবত্তাহীন স্বপ্রণীত’ শব্দকে বোঝায় না।

তবে এটা স্বীকার্য যে, প্রাথমিক অবস্থায় নবীন কবিদের হাতে কেবল শব্দই থাকে। সময়ের সাথে সাথে ভাবনায়, চিন্তায় এবং পাঠ অভিজ্ঞতায় পরিপক্বতা আসে; কবিতা সাবলীল ও সহজ হতে শুরু করে। একজন কবিকে অজস্র ‘কঠিন’ বা ‘দাঁতভাঙা’ শব্দ দ্বারা বাহবা বা প্রশংসা অর্জনের জন্য নয়, বরং কবিতার জন্যই ব্রতী হতে হবে। এজন্য প্রচুর পড়াশোনার মধ্যে থাকতে হবে। এটাও আমাদের একটা বড় সমস্যা যে, আমরা আনন্দের জন্য পড়ি না; কিংবা আমরা আদৌ পড়ি না, অভিধান ঘেঁটে কিছু ‘কঠিন’ শব্দ জড়ো করি, এবং একই কবিতায় সবগুলো ‘কঠিন’ শব্দ ব্যবহার করতে মরিয়া হয়ে উঠি; এমনকি একই শব্দের যতগুলো ‘কঠিন’ প্রতিশব্দ আছে, পারি তো এক লাইনেই সবগুলো বসিয়ে দিই। এতে কবিতা জটিল হয়ে পড়ে।

আনন্দের জন্য পড়তে হবে। শব্দগুলো আমাদের প্রতিষ্ঠিত কবিরা কীভাবে ব্যবহার করেছেন, তা নিবিড়ভাবে খেয়াল করতে হবে। কবিতা লিখবার জন্য শুধু কবিতাই নয়, সব ধরনের লেখাই পড়তে হবে। একটি কবিতা লিখবার আগে অন্তত ১০০টি কবিতা, বিচিত্র স্বাদের অন্তত ১০টি গদ্যরচনা পড়া উচিত। ব্লগ বা ফেইসবুকে অনেকেই দিনভর বিরামহীনভাবে কবিতা পোস্ট করে থাকেন। তাঁদের কবিতা পড়ে সহজেই বোঝা যায় তাঁদের অধ্যয়নের পরিধি অত্যন্ত অপ্রতুল, যার ফলে তাঁরা 'আমি-তুমি-রোদ-বৃষ্টি-ফুল' থেকে বের হয়ে আসতে পারেন না। এতে কবির কল্পনার জগত সম্প্রসারিত হয় না। তিনি যা লিখেন, তা ঘুরে-ফিরে একই বিষয়ে, একই ছন্দে, একই শব্দে ভরা একঘেয়েমিময় বস্তু ছাড়া আর কিছুই হয় না। অর্থাৎ, সবগুলো কবিতাকে একই কবিতা মনে হয়; অর্থাৎ, একটি কবিতা থেকে আরেকটি কবিতাকে আলাদা করা যায় না।

আমাদের মধ্যে এমন প্রতিভা অবশ্যই আছে, যিনি প্রতিদিন ১০টা কবিতা রচনা করার পর হাত-পা ছুঁড়ে এই বলে উল্লাস করতে থাকেন, রবীন্দ্রনাথের রেকর্ডকে তিনি ভঙ্গ করে ফেলেছেন। কিন্তু ওগুলো যে কবিতা হয় নি সেটা তিনি বুঝতেও পারেন না।পাঠক হিসাবেও আমাদের অনেক সীমাবদ্ধতা ও ভাঁড়ামি আছে। আমাদের পর্যাপ্ত কবিতা-জ্ঞান নেই, হয়ত-বা একেবারেই নেই। তো এই অবস্থায় নবীন কবিদের ‘কঠিন’ শব্দসম্ভারে সাজানো কবিতা পড়ে বিস্মিত হই, এবং প্রশংসায় কবিকে মাথায় তুলে ফেলি। কবিও সেটাকে প্রাপ্য প্রশংসাই মনে করেন; তাঁর যে জানার অনেক ঘাটতি রয়েছে এটা বোঝার তাঁর আর কোনো ফুরসতই থাকে না। ফলে তিনি ক্রমাগত একই মানের কবিতা লিখে চলেন, কবিতায় উৎকর্ষ লাভ তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

কী লিখেছি তা পড়তে হবে; বার বার পড়তে হবে। বাক্যগঠন যাতে জটিল না হয়, সেজন্য বার বার লেখাকে ভাঙতে হবে, প্রাঞ্জল করতে হবে, তাহলেই কবিতা সাবলীল হবে। বাংলা ভাষার সেরা কবিতাগুলো সরলরৈখিক, সাবলীল, প্রাঞ্জল বা সহজবোধ্য। আমি খুব জটিল কবিতা লিখেছি, যার অর্থ আমি ছাড়া আর কেউ বোঝে না, এ নিয়ে আমার গর্ব করার কিছু নেই।

দিনভর কবিতা লেখার কোনো মানে নেই, সেই কবিতার যদি কোনো মান না থাকে। কারণ, দিনের শেষে আমার ‘কবিতার সঞ্চয়’ শূন্যতেই পড়ে থাকবে। ভালো মানের কবিতা সপ্তাহে একটা, কিংবা মাসে একটা, এমনকি বৎসরে একটা লিখলেও তা আমার ‘কবিতার ভাণ্ডারে’ মূল্যবান সঞ্চয় হিসাবে জমতে থাকবে।

কঠিন শব্দের কোন মানে হয় না, যদি না তা পাঠককে ছুঁয়ে যায়। কবিতায় অসংখ্য ‘কঠিন’ শব্দ বসিয়ে হয়তো একটু সাময়িক আত্মপ্রসাদ লাভ করা যায়, কিন্তু শেষাবধি বেঁচে থাকে কবিতার বক্তব্য, জীবনঘনিষ্ঠতা।

কবিতা হলো শব্দের খেলা, শব্দের বুনন। পঙ্‌ক্তিস্থিত কোনো শব্দই এককভাবে কবিতা নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত সবগুলো শব্দ নিবিড় বন্ধনে যুক্ত হয়ে একটি ভাব বা অর্থ প্রকাশ না করে। কঠিন শব্দ বলতেই তা মাধুর্যমণ্ডিত শব্দ নয়, তদ্রূপ সহজ শব্দ বলতেই যে সেগুলো রুক্ষ বা রসহীন বা সস্তা, তাও নয়। শব্দভাণ্ডারের কিছু শব্দ খুবই সুন্দর, কিছু শব্দ তত মোলায়েম বা সুন্দর নয়। একটা সুন্দর শব্দ যেমন ভুল প্রয়োগের ফলে পঙ্‌ক্তির সর্বনাশ ঘটাতে পারে, কিছু অতি সাধারণ শব্দ মিলেও কালজয়ী চরণ সৃষ্টি করে ফেলতে পারে। নি, কথা, রাখে, কাটলো, কেউ, বছর, তেত্রিশ- বহুলপ্রচলিত খুব সাধারণ মানের একগুচ্ছ শব্দ। কিন্তু এ থেকে যা সৃষ্টি হয়েছে, তা আমাদের বুক ভেদ করে যায় - কেউ কথা রাখে নি, তেত্রিশ বছর কাটলো।

কারো কারো মতে, আধুনিক কবিতায় কবিতার এক-তৃতীয়াংশ অর্থ উহ্য রাখতে হবে। এ নিয়ম অনুসুরণ করতে গিয়ে আজকাল কিছু কবি এমন কবিতা লেখেন, যেখানে পুরো কবিতাটাই দুর্বোধ্য, কিংবা অবোধ্য হয়ে ওঠে। আর ‘কঠিন’ থেকে ‘কঠিনতর’ শব্দের প্রয়োগে কবিতা হয়ে ওঠে অপাঠ্য। কবিতা হলো রহস্যময়ী নারীর মতো (যখন পুরুষরা ভাবেন)। নারী তাঁর কতখানি রহস্য উন্মোচন করবেন, আর কতখানি গোপন রাখবেন সেটিই হলো তাঁত কলা বা আর্ট। কবিতার ক্ষেত্রেও কি সেটা প্রযোজ্য নয়? কবিই ভালো বুঝবেন তাঁর কবিতাকে আকর্ষণীয় করার জন্য পুরোটাই রহস্যে আবৃত করে রাখবেন, নাকি কিছু অংশ প্রকাশও করবেন। কবিতা যদি অতিমাত্রায় সাংকেতিক হয়ে যায়, তাহলে তা রসকষহীন পাথরের মতো হয়ে যেতে পারে। আবার স্বচ্ছ কাঁচ বা তরল পানির মতো হলে কীরূপ হয়? স্বচ্ছতার মধ্যেও অনন্য মাধুর্য থাকতে পারে। সব প্রকাশের মধ্যেই আবার অব্যক্ত অনেক কিছু রয়ে যেতে পারে। অনেক কম বলেও অনেক বেশি প্রকাশ করা যেতে পারে; এটাই হলো কবির দক্ষতা ও সার্থকতা।

মোটের উপর বাঙালিদের প্রকাশ ক্ষমতা, বিশেষ করে মৌখিক প্রকাশ ক্ষমতা খুব দুর্বল। যিনি যত সুন্দর করে ভাবতে পারেন, তিনি তত প্রাঞ্জল ও সাবলীল ভাষায় প্রকাশ করতে পারেন। আমার ভাবনা যখন জট পাকানো থাকবে, আমার প্রকাশও তখন জটিল হবে। কেউ বুঝবে না। কিন্তু ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, আমরা যখন একটা কবিতা বুঝতে বা হৃদয়ঙ্গম করতে ব্যর্থ হই, মনে করি ওটা খুব গুরুগম্ভীর ও উচ্চমার্গীয় কবিতা।

একজন কবি সবচেয়ে বেশি তৃপ্ত হোন এবং আনন্দ পান বোধ হয় এই কমেন্টে- ‘আপনার কবিতা মাথার উপর দিয়ে গেলো। এটা একটা জটিল কবিতা। আপনি অনেক কঠিন শব্দ লিখেন! এত কঠিন শব্দ আপনি পান কোথায়? কট্ঠিন!’ কবির জন্য এসব বাচ্য বহুমূল্য পুরস্কারের মতো। কবির সুখ তখন বহুগুণ বেড়ে যায়। তিনি মাটিতে পা ফেলেন না; হাওয়ার উপর ভর করে হাঁটেন।

যাঁরা ‘কঠিন’ কবিতা লিখবার মানসে কেবল ‘কঠিন’ শব্দ খুঁজে খুঁজে কবিতায় জুড়ে দেন, পরিণামে তাঁদের কবিতাটি ‘কঠিন’ না হয়ে কৃত্রিম বা আরোপিত, মাঝে মাঝে বিভ্রান্তিকর বা জট-পাকানো হয়ে যায়, যা কোনো মহৎ বাণী প্রকাশের অন্তরায় হয়ে পড়ে। কবিতায় কোন্‌ শব্দগুলো আরোপিত, বা জোড় করে টেনে এনে বসিয়ে দেয়া হয়েছে, কবিতাটা পড়লেই তা বোঝা যায়। এরূপ কবিতা পাঠে প্রায়শ মনে কোনো ভাব জাগে না, কল্পনায় কোনো ছবি ভেসে ওঠে না; কখনোবা পাঠকের মনে বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারে। সহজাত লেখনিতে শব্দরা অনায়াস ভঙ্গিতে এসে পঙ্‌ক্তিতে নিজ জায়গায় বসে পড়ে। কবিতা পড়লে মনে হয় কবি খুব সহজভাবে কথাগুলো বলে গেছেন। শব্দ আরোপিত হলে পড়তে কষ্ট হবে,অর্থ উদ্ধার করতে যেয়ে দেখবেন এর কোনো অর্থ নেই। অনেকে ‘আজাইরা শব্দের বাহাদুরি’ দেখিয়ে কবিতাকে ‘জটিল’ ও ‘দুর্বোধ্য’ করার উদ্দেশ্যে পঙ্‌ক্তির ভিতরে অপ্রযোজ্য কিংবা অপ্রজোনীয় শব্দ বসিয়ে দিয়ে থাকেন।

কেউ কেউ আরও ইন্টারেস্টিং পন্থা অবলম্বন করেন- হুটহাট কিছু ভুল শব্দ বসিয়ে দেন চরণের মধ্যিখানে। এ কবিতার কী মর্ম, পাঠক এবার হাড়ে হাড়ে টের পান, যখন দেখেন এ থেকে কিছুই উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না। বুঝতে-না-পারা বা এরূপ ‘অর্থহীনতা’কে অনেকে কবিতার মাধুর্য বা বহুমাত্রিকতা বলে মনে করেন। তাঁদের ধারণা, কবিতাটার অর্থ না থাকায় একেক পাঠক একেকরকম অর্থ তৈরি করে নিবেন। এতেই নাকি কবিতার প্রকৃত স্বাদ বা মাধুর্য। এরূপ ব্যাখ্যা আমার কাছে খুব হাস্যকর মনে হয়। একটা ভালো কবিতা এমন- এর একটা পঙ্‌ক্তি পড়া মাত্রই একটা ছবি বা ভাব আপনার মনের মধ্যে জেগে উঠবে। পুরো কবিতাটা পাঠ করার পর একটা আনন্দস্রোত আপনার মনেপ্রাণে প্রবাহিত হতে থাকবে।

সামহোয়্যারইনব্লগে এমন কয়েকজন কবির কবিতা আমি পড়েছি, সৃজনশীলতায় যাঁদের কবিতা খুব উচ্চমার্গীয়। এঁদের কবিতা পাঠে আমি চমৎকৃত হই এই দেখে যে- পরিচিত শব্দ, কিন্তু তাঁরা শব্দকে এমনভাবে ভাঙেন আর গড়েন যে, প্রতিটি প্রয়োগই আমার কাছে অভিনব মনে হয়। প্রতিটিই নতুন শব্দ। নতুন ব্যঞ্জনায় উদ্ভাসিত। এটা হলো কবির সৃজনীশক্তি।

তবে কবিতাকে শব্দকোষও বানানো যায়। কবি যদি ইচ্ছাকৃতভাবে এটি করেন, তাহলে শব্দের বাহুল্যে কবিতার মূল বক্তব্য ডুবে যেতে পারে। কবিতা তখন ব্যর্থ। কবির অনন্য সৃজনশীলতাই এটাকে একটা কবিতা হিসাবে প্রতিষ্ঠা দেবে। আর যে কবি ‘অনন্য সৃজনশীলতা’র আধার, তিনি কবিতাকে শব্দকোষ না বানিয়ে ‘ভাবকোষ’ বানিয়ে থাকেন। কবির সার্থকতা এখানে।

নজরুল বা রবীন্দ্রনাথের রেকর্ড ভাঙার জন্য হাইস্কুল লাইফে দিনে ৮-১০টা করে কবিতা লিখতে চেষ্টা করতাম। কবিতায় একটা ট্রাঙ্ক ভরে গিয়েছিল। এসএসসি পরীক্ষার পর ট্রাঙ্কের সব কবিতা ছোটো ভাইকে দিয়ে দিলাম, সের দরে বিক্রি করে চানাচুর খাওয়ার জন্য। ঐগুলো সত্যিই কোনো কবিতা হতে পারে নি (আজও কিছু যে হয়ে ওঠে, তা বলছি না)। তো, আমার সেই হাইস্কুল লাইফে আমাকে কেউ এসব লেকচার শোনালে তাঁকে উলটো দৌড়ের উপর রাখতে সাধ হতো বৈকি। পরিণতিতে কী হতো? সবগুলো (অ)কবিতা ভস্মীভূত করা ছাড়া গতি হতো না। এখানে ‘আমি’ একটা প্রতীকী উদাহরণ। যাঁরা কবি, তাঁদের সবারই ট্রাঙ্কভর্তি কবিতা আছে :) এ কথা বলছি নবীন কবিদের অন্য আরেকটি অসুখের কারণে- সমালোচনা সহ্য করতে না পারা। ভুলভাট কিছু লিখে ফেললেও তার উপর প্রশংসা ছাড়া কোনো সমালোচনা তাঁরা সহ্য করতে পারেন না। ‘নিন্দুকেরে বাসি আমি সবার চেয়ে ভালো’- এ কথাটা তাঁদের জন্য মিথ্যা।

অত্যন্ত পরিতাপের সাথে বলতে হয় যে,ব্লগে প্রচুর সংখ্যক কবিতা দেখা গেলেও এর মধ্যে ভালো মানের কবিতার সংখ্যা খুব কম। আশ্চর্যের বিষয় হলো, আমরা সবাই মনে করি যে আমরা খুব ‘বড় কবি’ হয়ে গেছি। আমরা প্রত্যেকেই মনে করি যে, আমার কবিতায় ‘কঠিন’ শব্দের সংখ্যা এত বেশি যে, সেই কবিতা বোঝার মতো কোনো পাঠক ব্লগে নেই। আমার কবিতার উপর একটা নেগেটিভ পয়েন্ট তুলে ধরছেন তো,অমনি আপনার হাত-পা ভেঙে গুঁড়ো করে দিতে উদ্যত হবো। এরপর দেখবেন, কী ভারী ভারী গম্ভীর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বুলি বর্ষণ শুরু করে দিয়েছি।

আমরা যেমন সমালোচনা সহ্য করতে পারি না, তেমনি অনেক সময় প্রশংসাও গ্রহণ করতে পারি না। যেমন ধরুন, একজন কবির লেখা খুবই কাঁচা, যা কখনোই আমার মনঃপুত হয় না, বা ভালো লাগে না। হঠাৎ তাঁর একটা কবিতা পড়ে আমি মুগ্ধ হলাম। আমি লিখলাম- এটা আপনার এ যাবত কালের সেরা কবিতা। তিনি অমনি মুখ গম্ভীর করে বলবেন- হুহ। আমি সব সময়ই ‘সেরা’ কবিতা লিখি। এটা নতুন কিছু না। তুমি কবিতার কী বোঝো? এরপর তিনি আমার দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। ঐ কবির হয়ত এটাই প্রত্যাশা ছিল আমি তাঁকে বলি- আপনি একজন তুখোড় কবি। আপনার সব কবিতাই আমার ভালো লাগে। আপনার সবগুলো কবিতাই অতি উন্নত মানের … এ হলো আমাদের প্রশংসা গ্রহণের ক্ষমতা।

একজন নবীন কবিকে সবচেয়ে বড় উপকার করেন তিনি, যিনি তাঁদের ভুলগুলো ধরিয়ে দেন। যিনি এটাকে সাদরে গ্রহণ করেন, পরিণামে তাঁর উপকার সাধিত হয়। যিনি ভুলকে ভুল হিসাবে গ্রহণ না করে ‘সঠিক’ হিসাবে প্রমাণের জন্য প্রচুর যুক্তিতর্কের অবতারণা করেন, উচ্ছ্বসিত প্রশংসা কামনা করেন, এবং প্রশংসাকারীকে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের ভাষা হারিয়ে ফেলেন- তাঁর জন্য প্রার্থনা- আমার মতো তাঁকে যেন কবিতার খাতা সের দরে বিক্রি করতে না হয়।

এবার সামহোয়্যারইনব্লগের কয়েকটি কবিতা পাঠকদের জন্য নীচে তুলে দিলাম। এসব কবিতায় আপনি ‘কঠিন’ শব্দের সমাহার দেখবেন না, কবিতার হৃদয়ে যে সুগভীর ভাবরস রয়েছে, এসব কবিতা পাঠে আপনি সেই অনুপম মাধুর্যের আস্বাদ পাবেন।


চোখগুলো যখন আর আমার সাথে থাকে না

ফড়িঙের পাখাবদলদৃশ্য দেখার সময় হয়ে ওঠে না আমার। চলে যায় বসন্ত,
বাসন্তী রঙের আভা রেখে বিদায় নেয় চৈত্র। খরার কথা মনে রেখে সাজিয়ে
রেখেছিলাম যে ছাতা, সে-ও ছায়া প্রদান থেকে বিরত থাকবে বলে ডাকে
ধর্মঘট। আর নগরে যারা ধার্মিক ছিল- তারা আমার পাপের বোঝা দেখে
ঘৃণায় ফিরিয়ে নেয় মুখ। পাপীদের প্রকৃত কোনো পথ থাকে না। তাই অন্ধ
হরিণের মতো উঁকি দিতে গিয়ে দেখি, চোখগুলো আমার সাথে নেই। ভাবি,
এই চোখ দুটি কি আমার ছিল কোনোকালে! যদি আমারই হতো- তাহলে
এত সত্য আমি কেন দেখতে পেলাম না! কেন আঁকতে পারলাম না কালিক
প্রস্থানপ্রবাহ রেখা!


বিষণ্ণতার প্রহর /// আহসান জামান

তারপর ছিঁড়ে, করি কুঁচিকুঁচি
এইসব দিনক্ষণমান। আলো ও অন্ধকারের
সারিসারি ঘর।

যাকিছু হৃদয়ে ছিল, দিয়েছি নিলামে;
শূন্যতা ছাড়া এখন আর কিছুই নেই।
ঝড় কি গড়ে বালিঘর? শান্ত চোখের নীড়!

প্রতিদিন খাতা খুলে, মুছে ফেলি অবাধ
অতীত, নাম-ধাম। মুছে মুছে; ভুলে যাই
কথার বিভাজন।

যত বেশি যোগ করি, ঢের করি বিয়োগ।

অগাধ দিয়েছ তুমি; বেদনা মোড়ানো জীবন।
শুধু স্মৃতিপটে জমে থাকে নরম ক্ষীরের মতো
বিষণ্ণতার প্রহর।


ঘঘুদহ /// মুক্তি মণ্ডল

জীবনের খানা-খন্দ ভরে গেছে
মাংসের ভেতর গেঁথে রাখছি শীতভরতি শিরিঞ্জ
সহসাই কেঁপে উঠছে
দেহখানা

কয়লার তলে জ্বলে ওঠা অগ্নিনায়িকার বাজুবন্ধে
মিলিয়ে যাচ্ছে মৃদু রোদের গতি

একটা পাতার মত
উড়ে উড়ে ফিরে আসছে হলুদ বাটা হাতের কাঁপন

মনে পড়তেছে ঘুঘুদহ

তার পানির নিচে নথ হারানো রমণীর একটা চুলের সাথে
তলিয়ে গেছে কার অন্তর?


আমার ক্ষমতা শুধু তোমাকে বপিত করে দেহে উঠা /// সোনালী ডানার চিল

আমাকে সব ছেড়ে দাগকাটা পাজামাটা পরতে দাও
সামনে বোতাম থাক আর না থাক
আমি ক্ষরিত বেদনায় আমার যৌবন লুকাতে চাই, পরিধানে;
যেখানে বিপরীত কাম খুব বেশি খোলামেলা হয়, সেখানে
আমার শক্ত পৌরুষ ঢলঢলে ছত্রাক হতে হতে বায়ু হয়ে যাবে
নিমিষেই-

খুব ভোরে, যখন শুধু শালিক জাগে
রতিক্লান্ত রাঙ্গাবউ চুপচাপ টুক করে ডুব দেয় দেওয়ান বাড়ির পুকুরে
তখন আমি ঢাকতে চাই আমার নিঙড়ে ফেলা নগ্নতা কাপড়ের বেভুল ভাঁজে

গোপনে যে খেলা চলে তোমার আমার
অবিরাম যে সুখে পাথর আকাশ
আমার ক্ষমতা শুধু তোমাকে বপিত করে দেহে ওঠা, কেমন যেন
প্রাণী প্রাণী ভাব আর শীত শীত কাঁপন
তাই ঢাকতে দাও আমার উরত আচ্ছাদনে, শালিক চোখের বৈরি চাহনি থেকে
নিজস্ব মেরুতে-

এখুনি পেশল রাখাল বেরুবে দঙ্গালে
সকালের কাঁচা মরিচ ভেঙে ভাত খাবে চাষি
আমি কেমনে বলো মগ্ন থাকি এ নগ্নতায়
আমাকে আচ্ছাদিত কর, আমাকে দাও উত্তাপ

সস্তা প্রেমের নাম কি কাম!
সস্তা চুমু কি গ্রাম্য নাবালকের অচেনা বিহার আর জুলফির তিরতিরে ঘাম
সস্তা দেহে কি শামুক গন্ধ এতটা বেহুঁশ করে
সস্তা সুখ মানে কি শরীর খুলে লোমকূপে দাহনের দুঃসাহস!
পিত চামড়া নখে তুলে আনে বিবশ লালা

তাই তো দাগকাটা পাজামাটা চাইছি
ঘুমের শুরুতে যে ছায়াছবি দেখে ঘুমায় মানুষ
সেই সব চরিত্রের কথিত সম্মেলনে তুমি আমি ঢাকবো পরাণপ্রেম!


স্তূপ থেকে আরো কিছু /// আশরাফুল ইসলাম দুর্জয়

আমাকে চিনে নি নীল, আমাকে চিনে নি সরল পথ।
চিনে নি নক্ষত্র, পথের শোভায় অহংকারী ঘাসফুল।
রাখে নি মনে প্রজাপতি, পাখায় লিখেছিলাম শপথ।
আমাকে চিনে নি ভেজা পথে শুয়ে থাকা শীত সকাল।
আমাকে চিনে অন্ধকার, শ্মশানের সে গোর খোদক
দেহ ছুঁয়ে যে গুনে ফেলে যাপিত জীবনের যোগফল।

ও গোর খোদক, তুমি কি শেষের হুইসেল জানো
মৃতের স্বজনকে বাঁচিয়ে রাখা দূরভিসন্ধি মানো?
কেন যে কে নিছক খেলে মিছিমিছি বাঁচিয়ে দেহ
দেহের ভেতর মৃত আত্মায় অভিশপ্ত পৃথিবী স্নেহ।

তুমি বরং নিশ্চিম অন্ধকারের বার্তাবাহক বনো।


ব্যাধ /// কুশল ইশতিয়াক

১.
এখন মাঝরাতে জানালার পাশে
বসে দূর হতে দ্যাখা যায় দেয়ালে লেপ্টানো ছায়া
অথবা, আটতলা থেকে পড়ে যাওয়া মানুষটির থ্যাতলানো মাথা
এও হতে পারে, দেয়ালের সাথে কোনো গোপন আলাপ
আছে তার- আমি জানি না; রাত গভীর হলে হয়তোবা
জড় রা জীবন্ত হয়, আর কেউ কেউ মরে যায়
ঘুমের ঘোরে, তবে ভৌতিক কোনো কিছু নয়-
একথা স্বভাবতই পুরোনো যে, অন্ধকারে-
মাঝে মাঝে এলোমেলো ভাবে জোনাকিরা ওড়ে- অনেক শখ নিয়ে
য্যামন শখ=সবুজ টাংস্টেন মিশ্রিত আলো; কিন্তু লাল কালো
অনেক অধিবৃত্তও দ্যাখা যায়, ওরা ছোটো থেকে বড় হতে হতে
আবার অদৃশ্য।

আমি তোমাকে বলি-
যেভাবে আমি অনুভব করি, তা নিতান্তই একটা অসুখ-
মহাজাগতিক,
ছিল জন্মেরও অনেক আগে, তবে পৃথিবীতে এসে আরও
বহু, বহু শখ জাগে
মোহগ্রস্ত হবার;
তবে পৃথিবীর নয়-

আমি তাই শব্দের ভেতরে ভাসি
প্রকাণ্ড উল্লাসকরণ শেষে, তারপরে খাপছাড়া- কেউ কেউ বলে, এগুলো কবিতা
কিন্তু আমি কবি নই; কারণ আমি যা লিখি
তা লিখি রক্ত দিয়ে;
মূলত রক্তেরও আছে অনেক গোপন অহংকার
এবং অনেক অস্থিরতা-

অতঃপর একটা ঘূর্ণিপাক
এবং আরও, (আরও) ১
পাক খাওয়া-

আমাকে টেনে নেয় একটা বিশাল চোখের ভেতর;

শূন্যতা : তাকে কীই বা বলা যায়?
আমি অনেক সত্যের উপরে গাঢ় প্রলেপ দিয়ে
একটা অবয়ব সাজাই;

পথিমধ্যে ঘূর্ণি- ধাবমান

এবং আমি গুনি
এক
দুই
তিন


চোখ : বিনিদ্র ও নশ্বর;
অথবা, একটা জানালা-
একদিন বন্ধ হবে, তবে তার আগে, যা দ্যাখার সাধ আছে- সবকিছু দেখে নিতে হবে
যদিও মাঠে ঘাটে ইঁদুর-বেড়ালেরা এমনিই মারা যায়,
ওদের চোখ খুলে, তবে সব মানুষেরা নয়-
কদাচিৎ,
কী বিচিত্র!


আমার প্রয়োজন ছিল শুধু একটা শব্দই, মনমতো
তাইতো আমি জেগে থাকি- একটা নো-ম্যান্স-ল্যান্ড-এর স্বপ্নে।

২.
অনেক শব্দ নিয়ে ভাসি
বহুকাল, আমার ভেতরের আমি-কে চিনি না আমি
অহেতুক স্বপ্ন-গনিতায়
আত্মকামী ইথারের মাঝে বাসা বেঁধে
সকল বাহু ডুবিয়ে রাখার স্বাদ আছে।
মা,
সেদিন স্বপ্নে দেখলাম, একটা খোলা মাঠ
আর একটা সবুজ প্রাচীন বারান্দা;
তারপর, কী মনে করে আমি একবার আকাশের দিকে তাকালাম
এবং, দ্যাখা গেলো- একটা কালো ঘুড়ি, শতচ্ছিন্ন কাপড়ের মতো
থেমে আছে
মধ্য আকাশে
নাটাইহীন; একটা ছেঁড়া সুতো নেমে এসেছে নীচে
তারপর- সুতো ধরতেই ও আমাকে টানলো

অনেকবার
ভাসার জন্য,

ও কি জানে, আমি এমনিতেই ভাসমান
হয়ে হেঁটে বেড়াই পৃথিবীতে;

তারপর একছুটে পাড়ি দেই অনন্তকাল।


৩.
শব্দ; মাত্র একটিই, আমার জন্য - আমি জানি না সেটা কী;
আকাশের পিঠে এখন একটা ঘর বানাচ্ছি।


-------------------------------------------

নাই..।


রঙনদীর মাঝি /// প্লিওসিন অথবা গ্লসিয়ার

এরূপ সান্ধ্য নৌকাভ্রমণের জলকোলাহলের ভিতর
দিয়ে অনির্ধারিত পৃথিবীর সবচেয়ে বিষণ্ণ চোখের মেয়েটি
পাখি হয়ে উড়ে গেলো এবং ধরতে পারা গেলো না !
আহ, এ বড় ব্যর্থতা । ঘুড়ির ডানার মত নেমে আসে
অসংখ্য প্রত্নভাষা, ব্যাখাতীত। কে সে ঘুঙুরবিভ্রমের
আড়াল থেকে ডাক দেয় নাম ধরে , সংখ্যাহীন বেদনার দিকে ।
এইসব বেদনা টেদনা ফাও, পৃথিবীর মন হু হু করে উঠলে

সকল নীরবতা মুছে আমি প্রজাপতি ডানার রঙনদীর মাঝি হয়ে গেলাম !


মহীন /// শাহেদ খান

এ-ই তবে 'নীরবতা' - সময়ের গাঢ় ইতিহাস!
চিরকাল শরতের আকাশের চেনা পরিসরে
নিয়ত চলচ্ছবি পিছে ফেলে গেলে বুনোহাঁস,
তারপর ঘোড়াগুলো নেমে আসে পৃথিবীর 'পরে।

সময়ের নিঃশ্বাসে লন্ঠনে অবাধ কাঁপন;
মহীনের ঘোড়াগুলো দেখে হাই তোলে বুড়ি চাঁদ;
কত যুগ কেটে গেল - তাও বুঝি ঘোড়াদের মন
আজও খুঁজে পায়নি যা দেখেছিল একদা অগাধ?

আস্তাবলের পথে কুয়াশা'র আস্তর বাড়ে
ঘোড়াদের স্তব্ধতা প্রাণ পায়। আর নিরাকারে -
লৌকিক সব আলো নিভে গেলে ওরাও তাকায়;
তাকিয়ে তো থাকে জানি, তবে ওরা দেখতে কি পায়?

জীবনানন্দে মেতে এক কবি আজও হেঁটে চলে:
নক্ষত্রের নীচে পৃথিবীর প্রগাঢ় মায়ায়...


সময়ঘড়ি /// আহমেদ আলাউদ্দিন

কেন জানে না, কেন শোনে না
কেন বোঝে না, কেন সময়ের ঘড়ি
দম দেয়া ছাড়াও চলে বিস্তীর্ণ পথ
ধরে, কেন বৈশাখের উৎসবে ঘুমের
গ্রহণ লাগে না; কেন বারবার ভুল
করেও ভুলের সালতামামীতে লালদাগের
পরিবর্তে কুমারী আলোর হাসি
কেন সময় বোঝে না, প্রাণের অর্গল
নিভে গেলে তার আপন বলতে কেউ
থাকে না, কেন বুঝে না সময়।

রাত বাড়ার সাথে সাথে পুরনো রোগেরা
ফিরে আসে, কাশির দমকে, নাভিঃশ্বাস
উঠে প্রাণে; কেন বোঝে না, না বুঝেও সে
চলে চলতে থাকে, আমার আমাদের
কাঙালপনা দেখেও মুচকী হেসে বলে--
'সময়ের ঘড়িতে দম দেয়া লাগে না'

স্রোত হারা নদী মরে গেলেও সময়ের
ঘড়িতে কখনো মরণের নাম নেই।
সে মরে না, ঘুণপোকার দাঁতে সেই ধার নেই
যে ধারে কেটে নিতে পারে সময়ের কাঁটা।
কেন, কী কারণে সময়ের এই ছুটে চলা
মৃত নগরীর পাঁচিল ধরে, আমাদের তৈরি
সুখপ্রাসাদের দেয়ালে! তবে কি সময় দেয়ালে
ঝুলে থাকা সেই তৈলচিত্র যার বয়সের
সাথে সাথে দামের হিসেব নিকেষে অমূল্য
হয়ে ওঠে। তবুও সময়ের ঘড়িতে দমের
ঠিকুজি আমাদের নানাবিধ রচনায়!


হঠাৎ করেই এটা ঘটবে /// স্বদেশ হাসনাইন

আমি জানি এটা ঘটবে খুব হঠাৎ,
আমার সব কিছু সাজানো হুট করে নাই হবে যাবে,
আজকে যাকে আমি বিশ্বাস করে মসৃণতা খুঁজে চলছি, সে শুধু সময় নিচ্ছে
যে কোন ভোরে আমি চোখ মেলতেই দেখবো কিচ্ছু নেই।

খুব আচমকা ঘটবে, বুঝে ওঠার আগেই
ছবিটা তছনছ হয়ে আমাকে বোকা বানাবে,
আজকে যে ছায়া দিয়ে অভ্যস্ত করে ফেলছে, আমি ধরেই নিচ্ছে সে আছে
আর আমিও ধীরে ধীরে আমার যাবতীয় স্থাবর সম্পত্তি তার কাছে লিখে দিচ্ছি
সে এক স্বাক্ষরে আমাকে ভিখিরি করে দেবে,
সে একবার পিছনে ফিরে হাসারও সময় দেবে না
যেমন আজন্ম যার স্নেহ মাতৃদুগ্ধের মত আশ্রয় সে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে
মরে যাবে যে কোন সকাল বা বিকালে
আমি বোঝার আগেই আমাকে নিঃস্ব করে চলে যাবে

আমার আজকে যতটুকু স্বাচ্ছন্দ্য আর আনন্দ এসব ঘটছে কেননা
কিছুটা সময় লাগছে ষড়যন্ত্রের পরিণত হতে,
আমার যখন কিছু রইবে না, আমি অনেকবার ভাববো কেন আগে
জেনেও ব্যবস্থা নেই নি,
আলস্যে ভ্রমরের চাবি ঝুলিয়ে রেখেছিলাম প্রকাশ্য স্থানেই,
খুব মনে হয়েছিল মানুষ বড় মহান, তাই সবচেয়ে ভঙ্গুর মানুষের কাছে
আপাদমস্তক জানিয়ে দিয়েছি।


কবিতার আকুতি /// ইমন তোফাজ্জল

এখানে পলেস্তারা খসে যাওয়া ভবনের প্রতিটি ইটের গাঁথুনি
পুরাতন চুন সুরকি, ছয়া সবুজে ঘেরা পিতামহ বৃদ্ধ দালান ঘর

স্মৃতির খুপড়ি ঘর থেকে নিত্য সঙ্গীরা এসে জড়ো

ছত্রাক ছত্রাক গন্ধ নাকে লেগে চিত্তে জ্বলে উঠে কোমল আলোর পিদিম
আমার গায়েতে জমেছে শ্যামল শ্যাওলা----

আজ সকলের মন খারাপ
তাই দেয়াল ঘরে বিষন্ন বাতাসের আনাগোনা
তোমাদের কেউ একজন ভালো করে ভেবে নাও
গলাটাও একটু সেধে নিতে পারো
ছেঁড়া আর মলিন কবিতার পৃষ্ঠাগুলো সযতনে মেলে
ডায়াসে দাঁড়াও
ভারী চশমার উপর একনজর চেয়ে দেখে
আমাদের কেউ একজন একটি কবিতা শোনাও।

......

এবার চলুন, বাংলা সাহিত্যের বিখ্যাত কবিদের কিছু কবিতা দেখা যাক।


----

গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা।
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।
রাশি রাশি ভারা ভারা
ধান কাটা হল সারা,
ভরা নদী ক্ষুরধারা
খরপরশা।
কাটিতে কাটিতে ধান এল বরষা।

একখানি ছোটো খেত, আমি একেলা,
চারি দিকে বাঁকা জল করিছে খেলা।
পরপারে দেখি আঁকা
তরুছায়ামসীমাখা
গ্রামখানি মেঘে ঢাকা
প্রভাতবেলা—
এ পারেতে ছোটো খেত, আমি একেলা।

গান গেয়ে তরী বেয়ে কে আসে পারে,
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ভরা-পালে চলে যায়,
কোনো দিকে নাহি চায়,
ঢেউগুলি নিরুপায়
ভাঙে দু-ধারে—
দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে।
ওগো, তুমি কোথা যাও কোন্‌ বিদেশে,
বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে।
যেয়ো যেথা যেতে চাও,
যারে খুশি তারে দাও,
শুধু তুমি নিয়ে যাও
ক্ষণিক হেসে
আমার সোনার ধান কূলেতে এসে।

যত চাও তত লও তরণী-’পরে।
আর আছে?— আর নাই, দিয়েছি ভরে।
এতকাল নদীকূলে
যাহা লয়ে ছিনু ভুলে
সকলি দিলাম তুলে
থরে বিথরে—
এখন আমারে লহ করুণা করে।
ঠাঁই নাই, ঠাঁই নাই— ছোটো সে তরী
আমারি সোনার ধানে গিয়েছে ভরি।
শ্রাবণগগন ঘিরে
ঘন মেঘ ঘুরে ফিরে,
শূন্য নদীর তীরে
রহিনু পড়ি—
যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।

উদ্ধৃত কবিতাটিতে এমন কোনো শব্দ দেখি না যা আমাদের নিত্যদেখা শব্দের বাইরে। এই সহজ-সরল শব্দগুলো দিয়ে কবি কোন্‌ মহৎ দর্শন সৃষ্টি করে গেছেন, তা বোদ্ধা পাঠকমাত্রই জানেন। কিন্তু এই সরল সব্দগুলো যে একেকটা পঙ্‌ক্তি বা চরণ রচনা করেছে, তার কোনো একটি কি জটিল বা কৃত্রিম মনে হয়েছে? এটাই সাবলীলতা। গঠন সাবলীল হলে লেখা প্রাঞ্জল হয়ে থাকে। গঠন দুর্বল বা জটিল হলে লেখার প্রাঞ্জল্য হ্রাস পায়।

বল বীর-
বল উন্নত মম শির
শির নেহারি আমারি নতশির ঐ শিখর হিমাদ্রির!
বল বীর-
বল মহাবিশ্বের মহাকাশ ফাড়ি
চন্দ্র সূর্য গ্রহ তারা ছাড়ি
ভূলোক দ্যুলোক গোলক ভেদিয়া
খোদার আসন আরশ ছেদিয়া
উঠিয়াছে চির-বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর!
মম ললাটে রুদ্র ভগবান জ্বলে রাজ-রাজটিকা দীপ্ত জয়শ্রীর
বল বীর-
আমি চির-উন্নত শির!


এখানে কিছু কিছু শব্দ সব পাঠকের কাছে পরিচিত নাও থাকতে পারে। কিন্তু যাঁদের কাছে সবগুলো শব্দই পরিচিত, তাঁরা বিস্মিত হবেন এ পঙ্‌ক্তিগুলো গঠনের অনন্যতা দেখে- এত সাবলীল আর সুদৃঢ়। নজরুলের শব্দচয়নে অনুপ্রাণিত হয়ে হয়তো কোনো কবি লিখে ফেলবেন :

দুর্গম ত্র্যাঙ্গুল নেহারি কান্তার ভ্যূলোক দ্যুলোক ক্রকচ মরু
হিমাদ্রি ভবিতব্য নতশির প্রেমারা দুস্তর পৈশুন্য
খোদার আসন বিশ্ববিধাত্রীর মহাকাশ


শব্দের ব্যবহারে আমাদের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা আছে। লেখালেখির পুরো ব্যাপারটাই স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার একটা সৃজনশীল কাজ। আমাকে কবিতা লিখতে কেউ বাধ্য করেন নি। গল্প লিখতে বাধ্য করেন নি। আমি যখন লিখছি সম্পূর্ণ নিজের মনের তাগিদেই লিখছি। সমগ্র শব্দভাণ্ডার আমার দখলে। ওগুলোকে ইচ্ছেমতো ব্যবহার করার শতভাগ স্বাধীনতা রয়েছে আমার। আসলে, এ প্রসঙ্গে স্বাধীনতা কথাটা মনে হয় অপ্রযোজ্য। তবে, যেটা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো- এসব শব্দ ব্যবহারের যে-স্বাধীনতা আমরা উপভোগ করছি, তা কতখানি সার্থক হচ্ছে? শব্দভাণ্ডার থেকে স্বাধীনভাবে বেছে বেছে নিচের শব্দগুলো নিলাম, পাশাপাশি বসিয়ে কবিতা লিখলাম :

জৈতুন প্রিয়ব্রজ্যা ব্রততী ক্ষারিত আঙ্গার
অবীর সংবেদনা দুণ্ডুভ জিগৎসা
খেচর আর্গল পূরভাষ সমিদ্ধ রক্তিম
বাণকাড়া মনোবাঞ্ছা


বাহ! এখানে আমার কৃতিত্ব হলো এখানকার শব্দগুলোর অর্থ জানার জন্য পাঠককে ঘর্মাক্ত হতে হবে। তাতে আমার প্রভূত প্রসাদ লাভ হবে। আর এ ‘অসাধারণ’ কবিতা লিখতে আমি যে স্বাধীনতা ভোগ করেছি, তা খর্ব করার দুঃসাহস কারো নেই। তবে কেউ যদি এটা পাঠ করে খিক করে হেসে ফেলেন, তাহলে আমার সেই হাসির অর্থ হজম করার শক্তি থাকতে হবে। আর যদি সেই হাসির অর্থ না-ই ধরতে পারি, তাহলে মৃত্যু-অবধি অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করেও সাহিত্যে কিছু কবিতা দান করে যেতে পারবো বলে মনে হয় না।

অধিকন্তু, এখানকার অনেকগুলো শব্দের অর্থ জানার জন্য সাধারণ পাঠককে অভিধানের সাহায্য নিতে হবে। যাঁরা অভিধান না ঘেঁটেই একঝলক লাইনগুলোর দিকে তাকাবেন, বিস্ময়ে নির্বাক হয়ে যাবেন। শব্দের জাদুকর! অসাধারণ মেধাবী এ কবি! তিনি জীবন্ত শব্দকোষ! তবে এ কবিতা যদি কোনো ‘কবির’ হাতে পড়ে, তিনি স্মিত হেসে মনে মনে শুধু এটুকুই বলবেন- ‘বেকুব!’ এরকম ভাবার কারণ হলো কবি এখানে শব্দগুলো অভিধান থেকে নিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু তা দিয়ে সার্থক বা সঠিক পঙ্‌ক্তি গঠনে ব্যর্থ হয়েছেন। এমনও হতে পারে যে, কবি হয়তো নিজেই শব্দগুলোর অর্থ জানেন না। আমার ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু অনেক ভালো কবিতা লিখেন। কিন্তু মাঝে মাঝেই তাঁকে এরকম করতে দেখা যায়। এরকম করার কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি জবাব দেন, ডিকশনারি দেখতে পারি নাই, কিন্তু শব্দগুলো খুব ভালো লাগছে বলে কবিতায় দিয়ে দিলাম। 

………………..


দুয়ারে প্রস্তুত গাড়ি; বেলা দ্বিপ্রহর;
হেমন্তের রৌদ্র ক্রমে হতেছে প্রখর।
জনশূন্য পল্লিপথে ধূলি উড়ে যায়
মধ্যাহ্ন-বাতাসে; স্নিগ্ধ অশত্থের ছায়
ক্লান্ত বৃদ্ধা ভিখারিণী জীর্ণ বস্ত্র পাতি
ঘুমায়ে পড়েছে; যেন রৌদ্রময়ী রাতি
ঝাঁ ঝাঁ করে চারি দিকে নিস্তব্ধ নিঃঝুম —
শুধু মোর ঘরে নাহি বিশ্রামের ঘুম।
গিয়েছে আশ্বিন—পূজার ছুটির শেষে
ফিরে যেতে হবে আজি বহুদূরদেশে
সেই কর্মস্থানে। ভৃত্যগণ ব্যস্ত হয়ে
বাঁধিছে জিনিসপত্র দড়াদড়ি লয়ে,
হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকি এ-ঘরে ও-ঘরে।
ঘরের গৃহিণী, চক্ষু ছলছল করে,
ব্যথিছে বক্ষের কাছে পাষাণের ভার,
তবুও সময় তার নাহি কাঁদিবার
একদণ্ড তরে; বিদায়ের আয়োজনে
ব্যস্ত হয়ে ফিরে; যথেষ্ট না হয় মনে
যত বাড়ে বোঝা। আমি বলি, ‘এ কী কাণ্ড!
এত ঘট এত পট হাঁড়ি সরা ভাণ্ড
বোতল বিছানা বাক্স রাজ্যের বোঝাই
কী করিব লয়ে কিছু এর রেখে যাই
কিছু লই সাথে।’

... ... ...

বাহিরে দ্বারের কাছে বসি অন্যমন
কন্যা মোর চারি বছরের। এতক্ষণ
অন্য দিনে হয়ে যেত স্নান সমাপন,
দুটি অন্ন মুখে না তুলিতে আঁখিপাতা
মুদিয়া আসিত ঘুমে; আজি তার মাতা
দেখে নাই তারে; এত বেলা হয়ে যায়
নাই স্নানাহার। এতক্ষণ ছায়াপ্রায়
ফিরিতেছিল সে মোর কাছে কাছে ঘেঁষে,
চাহিয়া দেখিতেছিল মৌন নির্নিমেষে
বিদায়ের আয়োজন। শ্রান্তদেহে এবে
বাহিরের দ্বারপ্রান্তে কী জানি কী ভেবে
চুপিচাপি বসে ছিল। কহিনু যখন
‘মা গো, আসি’ সে কহিল বিষণ্ন-নয়ন
ম্লান মুখে, ‘যেতে আমি দিব না তোমায়।’

কালোত্তীর্ণ এ কবিতায় ‘কঠিন’ শব্দের কোনো ঝনঝনানি নেই। আছে প্রাঞ্জলতা, সাবলীলতা। আর এর ভিতরে আছে গভীর ভাবাবেগ।

…………..

হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে,
সিংহল সমুদ্র থেকে নিশীথের অন্ধকারে মালয় সাগরে
অনেক ঘুরেছি আমি; বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগতে
সেখানে ছিলাম আমি; আরো দূর অন্ধকারে বিদর্ভ নগরে;
আমি ক্লান্ত প্রাণ এক, চারিদিকে জীবনের সমুদ্র সফেন,
আমারে দুদণ্ড শান্তি দিয়েছিলো নাটোরের বনলতা সেন।


ভাবপ্রবাহের দিকে যাচ্ছি না, শুধু খেয়াল করে দেখেন কী চমৎকার আর সাবলীল শব্দবন্ধন!

………………

মাকে দেখি প্রতিদিন ধ্যানী প্রদক্ষিণে
ছায়াবৃতা আপন সংসারে। তাকে চিনে
নিতে পারি সহজেই যখন নিভৃত অনুভবে বার বার
একটি ভাস্বর নদী, ফুলের বাগান, মাঠ আর
শস্যক্ষেত, দূরের পাহাড়
গলে গিয়ে একই স্রোতে বয়ে যায়, সীমা
মুছে যায় চরাচরে : স্বদেশের স্বতন্ত্র মহিমা
অনন্য উপমা তার। কে যেন চকিতে চেনা স্বরে
বলে শুনি, ‘পাল্কি চড়ে, বেনারসী পরে
যেদিন এলেন তিনি আমাদের ঘরে
চেরাগের মতো কল্যাণের হাত ধরে-
তারই স্মৃতি আছে লেগে অদৃশ্য চাঁপার উন্মীলনে,
সোনার কলসে আর সাঁঝ-নামা দিঘির গহনে।’

মার চোখে শৈশবের ক্রৌঞ্চ দ্বীপ ভাসে?
চোখে বেনেবউ পাখি, চোখে চন্দ্রমল্লিকার দাবি
শঙ্কিত আভাসে আঁকা- ভাবি
রান্না আর কান্না গাঁথা রুক্ষ এই মরুর আকাশে
এখনো কি স্বপ্ন বোনে ঊর্ণনাভ চাঁদ
নাকি স্বপ্নের জরির পাড়ে সবি জাদুকরী ফাঁদ।
চেয়েছে বুকের সূক্ষ্ম সোনালি সুতোয় চিরদিন
সমস্ত জীবন হোক নক্সীকাঁথা : সে ইচ্ছার ঋণ
শুধে দিতে বুঝি হতে হয়
গাছের মতোই এই রৌদ্রজলে মৃন্ময়, তন্ময়।

মাকে দেখি। আজো দেখি কী এক মায়ায়
পাখি তার হাত থেকে স্নেহের খাবার খেয়ে যায়
দু’বেলা আবেগ ভরে। দেখি তসবী গুণে
সন্ধ্যার মিনারে
সত্তার কিনারে
ঐ দূরায়নী আজানের ধ্বনি শুনে
আর সুবে-সাদেকের তীব্র শুভ্রতায় নির্মেঘ আনন্দ শোকে
আজীবন সমর্পিতা কোরানের শ্লোকে।
আমার দুর্ভাগ্য সেই বিশ্বাসের অনড় জমিনে
দেখি না প্রোথিত কোনো অলীক পর্বত- যাকে চিনে
দ্বন্দ্বহীন জীবনের কাছে আত্মবিসর্জনের পাবো স্বর্গসুখ।
মাঝে মাঝে সংশয়ের গলিতে বিমুখ
প্রশ্ন তুলে ধরে ফণা :

আমি কি সঠিক জানি ভদ্রমহিলাকে
- আমি যার একান্ত বিস্তার অনন্ত শুভ্র লোকে-
চিনি তাকে?
ব্যথা হয়ে বাজে
মাঝে-মাঝে তারও চোখ
আমার অস্তিত্ব-পটে : ‘কে এই অচেনা ভদ্রলোক?’

- ‘আমার মাকে’, শামসুর রাহমান

………………….

“অশ্বখুরের নীচে অমানবিক চাবুক
কালো জ্বীভ-দাঁত চাপা পড়ে, থেতলে যায়
ফিনকি ছোটায় কালো রক্তের,
কচুকাটা সব কচুকাটা-

ভুল দেখেছ এটা চোখের জল নয় মানবিক অশ্রু ধারা,
এটা শরীর নয় ক্ষোভ টানটান শিরা-উপশিরায় যোদ্ধা।।“

- বাকী অরিন্দম (ব্লগার অদৃশ্য)

শামসুর রাহমান বা বাকী অরিন্দমের কবিতা দুটোতেও ঐরকম ‘শব্দের বাহাদুরি’ নেই। মনের ভিতরে যে ভাব বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো কূল ছাপিয়ে ভেসে যাচ্ছিল, তার প্রকাশের জন্যই যেন শব্দগুলো অদৃশ্য অমরাবতী থেকে ছুটে এসে পঙ্‌ক্তির সঠিক জায়গাটাতে বসে পড়েছে। খোদ রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে নজরুল, জীবনানন্দ, শামসুর রাহমান – এঁদের যে ক’টা কবিতা উপরে উদ্ধৃত করা হলো, সবগুলো কবিতায়ই স্বচ্ছন্দে ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে শব্দপ্রয়োগ ঘটেছে। এঁদের সকলেই কবিতাকে প্রাঞ্জলভাবে উপস্থাপনে ব্রতী ছিলেন। আমাদের নবীন কবিদের ধারণা এর উলটো বলেই মূলত এ পোস্টের অবতারণা।

কবিতাকে যদি নববধূর সাথে তুলনা করা যায় তাহলে শব্দ ও উপমার প্রয়োগ হলো তার অলঙ্কার। তবে এখানে অবশ্যই খেয়াল রাখতে হবে, যেন অলঙ্কারের ভারে নববধূর হাঁসফাঁস অবস্থা না হয়ে যায়। অলঙ্কার ছাড়া যেমন একজন নববধূ কল্পনা করা যায় না, তেমনি অসামঞ্জস্য অলঙ্কারে নববধূর সৌন্দর্য নষ্ট হয়ে যেতে পারে। উপমা প্রয়োগ ও বিশেষণের বাহুল্যও অনেক সময় কবিতাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। অলঙ্কারের মার্জিত ও যথোপযুক্ত ব্যবহারে সৌন্দর্য বৃদ্ধি ঘটে; বাহুল্যে রূপ ঢাকা পড়ে যায়, তখন কেবল অলঙ্কারের চাকচিক্যই দৃশ্যমান হয়।

কেউ কেউ মনে করেন যে, আমরা অলঙ্কার বা উপমা ব্যবহারের বেলায় অনেক গ্রামার মানার চেষ্টা করি। কবিতা লেখার জন্য এ গ্রামার মানার প্রয়োজনীয়তা আছে কী নেই তা নিয়েও তাঁদের প্রশ্ন অনেক। আমার অবশ্য এরকম মনে হয় না। অলঙ্কার ব্যবহারের জন্য ধরাবাঁধা কোনো গ্রামার যে আছে, বা থাকতে পারে তাও মনে করি না। তবে, কোন্‌ বস্তুটি উপমা বা অলঙ্কার, এটা জানার কি কোনো উপায় আছে? ফর দ্যট ম্যাটার, কোন্‌টা গদ্য, আর কোন্‌টা কবিতা, এটা কে ডিফাইন করেছে? – আমাদের পূর্বসূরিরাই বলে গেছেন- এটা হলো কবিতা, কবিতা এরকম হয়, বা এরকম হতে হয়; আর এটা হলো গল্প বা প্রবন্ধ- যার গড়ন, অবয়ব এরকম। তা যদি না হতো তাহলে কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ- ইত্যাদি আলাদা আলাদা শাখা আমরা সাহিত্যে পেতাম না। হয়তো সবগুলো মিলিয়ে মাত্র একটি ক্যাটাগরিই প্রকাশ করতো- এর নাম সাহিত্য। এমনও তো হতে পারতো- আমরা যাকে কবিতা বা পোয়েট্রি বলি এটা হলো উপন্যাস! আর যাকে উপন্যাস বা নভেল বলে চিনি তাঁর নাম পুঁথি! - কালের বিবর্তনে গদ্যের যেমন একটা ধারা বা প্যাটার্ন দাঁড়িয়ে গেছে, পদ্য বা সাহিত্যের অন্যান্য শাখারও একটা নির্দিষ্ট অবয়ব সৃষ্টি হয়েছে।

এবার তাহলে উপমা বা অলঙ্কারের কথায় আসা যাক। কবিতায় যে উপমা বা অলঙ্কার ব্যবহার করতে হবে, আমাদেরকে এ আদেশ কে শুনিয়েছে? কবিতায় উপমা ব্যবহার করলাম না, তাহলে কি সেটা কবিতা হবে না? যদি না হয়, তাহলে কেন হবে না? আর যদি উপমা ছাড়াও কবিতা লেখা যায়, সেটাই বা আমাদেরকে কে শেখালো? এজন্য আমার মনে হয়, এসবের জন্য যেমন ধরাবাঁধা কোনো নিয়ম নেই, কবি সম্পূর্ণ স্বাধীন এসব ব্যবহার করা বা না-করার জন্য, অন্যদিকে যদি ব্যবহার করিই তাহলে সেগুলো কীভাবে ব্যবহার করতে হবে তা জানার জন্য আমাদের পূর্বসূরিদের লেখা পড়তে হবে। কালক্রমে সেগুলো থেকে মোটামুটি একটা প্যাটার্ন বের হয়ে আসে যে, উপমা বা অলঙ্কার এরকম- এ প্যাটার্নটাই হয়তো একটা প্রচলিত ধারায় পরিণত হয়েছে, যা কেবলই আপডেটেড হতে থাকে।

নজরুল-রবীন্দ্র যেসব উপমা ব্যবহার করেছেন, আপনি-আমিও যদি সেগুলো অবিকল একইভাবে ব্যবহার করি, তাহলে আমাদের স্বকীয়তা বলে কিছু থাকবে না। প্রতিটা কবিই স্বকীয় প্রতিভায় সমুজ্জ্বল। উপমা বা অলঙ্কার প্রয়োগে ভিন্নতাই তাঁদেরকে অনন্যতা দান করে। একজন সচেতন ও ক্রিয়েটিভ কবি শব্দ, বিশেষণ, উপমা, ইত্যাদি ব্যবহারে সর্বদা নতুনত্ব সৃষ্টির চেষ্টা করেন। ‘চন্দ্রভুক অমাবস্যা’ একমাত্র সুনীলই লিখতে পারেন, আমি লিখতে পারি ‘অগ্নিভূক পোকা’। আমি আমার ‘সিঁথি’ কবিতায় ‘অগ্নিভূক পোকা’ শব্দটা ব্যবহার করেছি- এখানে নজরুলের ‘অগ্নিভুক পতঙ্গ’ (আমি সৈনিক) আর সুনীলের ‘চন্দ্রভূক অমবস্যা’র সুস্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। কিন্তু আমি বলে না দিলে এটা কোনো পাঠকের পক্ষেই উদ্ধার করা সম্ভব হতো বলে মনে হয় না- উত্তরসূরিদের কাছে আমাদের ঋণ এরকমই।

নবীন কবিদের এই যে ‘কঠিন’ শব্দের প্রতি এতো মোহ, প্রথমত সেই মোহ তাঁদেরকে কাটিয়ে উঠতে হবে। কবি মনে মনে যা ভাবেন, তা-ই কবিতায় লিখবেন। যা তিনি লিখলেন, তা তিনি নিজে বুঝলেন কিনা তা বারংবার পরীক্ষা করতে হবে। আগেই বলেছি, আপনার ভাবনা পরিষ্কার বা পরিচ্ছন্ন না হলে আপনি কবিতায় কী বলতে চাইছেন তা ফুটে উঠবে না। লিখতে হবে খুব সরল করে। সরল করে লিখতে লিখতে একদিন দেখা যাবে, তিনি ঠিক ঠিক কবিতার আরাধ্য ‘মহারানি’র সান্নিধ্যে পৌঁছে গেছেন।

লিখতে লিখতেই হাত পাকে। তবে, লিখতে লিখতেই যে আমার হাতযশ রবিঠাকুরের পর্যায়ে চলে যাবে, এরূপ ভাবলে সেটা হবে আমার আকাশকুসুম কল্পনা। লিখতে লিখতে হাত সচল হয়। হাত পাকা হতে পর্যাপ্ত সময়ের প্রয়োজন। কালেভদ্রে এমন লেখক বা কবি পাওয়া যায়, শুরু থেকেই যাদের কলমে অগ্নিবর্ষণ হয়।

আমরা অহরহই এমন কবির দেখা পেয়ে থাকি, যারা অনেক বছর ধরে লিখছেন, কিন্তু যেভাবে শুরু করেছিলেন, আজও তেমনি আছেন, সেখানে উন্নতির লেশমাত্র নেই। একেবারে নিস্তেজ, একঘেয়ে, ঘ্যানর ঘ্যানর প্যানপ্যানারির মতো একই টোনে অবিরাম লিখে যাচ্ছেন। একই শব্দ, একই ভাষা, একই ভাব। তেমন ছন্দজ্ঞানও নেই।

কিছু কিছু হাত থাকে যা ধীরে ধীরে ধারালো হতে থাকে। কিছু কিছু হাত থাকে যা আজীবন কাঁচাই থেকে যায়। একজন কবির হাত পাকা হয় না কেন? বা কোন কবির হাত কখনো পরিণত হয় না?

আপনার হাত পরিণত করার জন্য প্রথমত আপনার মনের মধ্যে প্রবল স্পৃহা থাকতে হবে। লেখার চেয়ে পড়ার প্রতি বেশি গুরুত্ব দিতে হবে। ভূরি ভূরি কাঁচা কবিতা লিখে ঘর ভর্তি করে ফেলার কোনো অর্থ নেই; পরিণামে এগুলো আপনার ঘরের জায়গাই খেয়ে ফেলবে, কিন্তু আপনার জন্য কোনো মূল্য বয়ে আনবে না। আপনার একটি ভালো মানের কবিতা একটা হীরক খণ্ডের সমান।

প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন কবির কবিতা পড়তে হবে। তাঁদের কবিতার নির্মাণশৈলী, উপমা প্রয়োগ, বাক্যগঠন, শব্দচয়ন, ইত্যাদি নিবিড়ভাবে খেয়াল করতে হবে। অপরিচিত শব্দগুলো নোট করে অভিধান দেখে সেগুলোর অর্থ জেনে নিতে হবে।

নিজের শব্দভাণ্ডার সমৃদ্ধ করতে হবে। যত পড়বেন, শব্দভাণ্ডার তত সমৃদ্ধ হবে। একটা কাজ করতে পারেন। মাঝে মাঝে অভিধান পড়ুন। যেসব অভিধানে শব্দের অর্থই না শুধু, শব্দের বাক্যগঠন, শব্দের ব্যুৎপত্তি, ইত্যাদি দেয়া আছে, তেমন অভিধান পড়ুন। ‘বাংলা একাডেমী ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ তেমন একটা অভিধান। অভিধান খুলে শব্দ মুখস্থ করতে যাবেন না যেন। ২০টা শব্দ পড়লে দিনশেষে আপনার মনের ভিতর হয়তো গোটা পাঁচেক শব্দ গেঁথে যাবে। ঐ শব্দগুলো তখনই কবিতায় বসাতে গেলে কবিতা ‘আরোপিত’ বা ‘আর্টিফিশিয়াল’ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকবে। প্রতিদিন কিছু কিছু শব্দ মনের গহিনে জড়ো হলে একদিন অটোম্যাটিক্যালি শব্দগুলো আপনার লেখায় এসে যথাস্থানে বসে পড়বে।

যখন মনের মধ্যে একটা প্লট উঁকি দিবে, খপ করে ওটাকে ধরে ফেলুন। লিখতে গিয়ে দেখলেন এগোতে পারছেন না। ছটফট করার দরকার নেই। ওটা ও অবস্থায় রেখে দিন। এরপর কাজে যান, বা পড়ায় মন দিন। কয়েক দিন, বা কয়েক সপ্তাহ পরে ঐ হাফ-ডান লেখাটিতে হাত দিন। ওটাকে এবার ঘষামাজা করুন। লেখাটা সম্পন্ন করে আবার ফেলে রাখুন কিছুদিন। এরপর ওটাতে আবার হাত দিন। আবারো ঘষামাজা করুন। এবার লেখাটি কাউকে পড়তে দিন। আপনার একজন একনিষ্ঠ পাঠক থাকা চাই, যিনি আপনার লেখা পড়ে ভূয়সী প্রশংসা করবেন। তিনি অত্যধিক উচ্ছ্বসিত হলে বুঝবেন লেখাটি অসাধারণ হয়েছে, কম উচ্ছ্বসিত হলে ধরে নিতে হবে ওটা একটা কাঁচা লেখা। এই পাঠকটি এমন হতে হবে যিনি আপনার লেখার কোনো সমালোচনা করবেন না, শুধু প্রশংসাই করবেন। কারণ, সমালোচনা আপনার মনোবলে আঘাত হানবে, আপনি দুর্বল হয়ে যাবেন, লিখবার ইচ্ছা মরে যাবে।

আপনার কবিতাটি কেমন হয়েছে, ফেইসবুক বা ব্লগের কমেন্ট থেকে এর প্রকৃত চিত্র না-ও পেতে পারেন। কারণ, ব্লগ বা ফেইসবুকে আমরা কোনো লেখা কদাচিৎ বিশ্লেষণ করি; অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভালো লাগা/ মন্দ লাগা কথাটা এক শব্দে বা এক বাক্যে লিখে শেষ করে দিই। আপনার লেখাটি বিশ্লেষণ করা গেলে আপনার দুর্বল বা শক্তিশালী দিকগুলো সম্পর্কে জানতে পারতেন।

ব্লগ বা ফেইসবুকে ভালো লিখেন, এমন কাউকে ফ্রেন্ডলিস্টে অন্তর্ভুক্ত করুন। তাকে অনুরোধ করুন আপনার লেখাগুলো পড়ে মন্তব্য করার জন্য- একটু বিশ্লেষণ করে দুর্বলতাটুকু চিহ্নিত করে দিতে বলুন। এরকম কয়েকজনকেই অনুরোধ করতে পারেন। অতঃপর, তাঁদের দিকনির্দেশনাগুলো অনুসরণ করুন।

আপনার প্রতিটি লেখাই কবিতা হয়ে উঠবে না। অগণিত লাইক বা কমেন্টের বাহার দেখে বেশি উৎফুল্ল হয়ে উঠবার কারণ নেই। সারাজীবনে একটি কবিতা যদি কবিতা হয়ে ওঠে, আপনি ধন্য হয়ে যাবেন।

আপনাদের কাঁচা হাত সোনার হাত হয়ে উঠুক, রাশি রাশি সোনা ফলুক সেই হাতে, এই কামনা করি।

সবার জন্য শুভেচ্ছা।

২৮ এপ্রিল ২০১৪


সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০১৭ রাত ৮:০৪
১৯টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আহা লুঙ্গি

লিখেছেন শাহ আজিজ, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ দুপুর ১২:৩২



গেল সপ্তাহে ঢাকার একটি সিনেমা হলে এক লুঙ্গি পরিহিত বয়স্ক মানুষকে হলে ঢুকতে দেয়নি হল দারোয়ানরা । আমার মনে হয়েছিল এ এক তীব্র কষাঘাত জাতির গালে । প্রতিবাদে বিশ্ববিদ্যালয়ের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অরুনা আত্মহত্যা করেছিলো!

লিখেছেন রাজীব নুর, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ দুপুর ২:২২

ছবিঃ আমার তোলা।

লোডশেডিং চলছে। অন্ধকার রাস্তায় সে হাটছে।
রাস্তার বাতি গুলোও আজ জ্বলছে না। আকাশে মেঘ জমতে শুরু করেছে। কিন্তু মাত্রই আকাশে বিশাল এক চাঁদ উঠেছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ব্লগারদের গোপন তথ্য চেয়ে আবেদন!

লিখেছেন কাল্পনিক_ভালোবাসা, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ বিকাল ৫:২৯

একবার আইনশৃংখলা বাহিনীর জনৈক ব্যক্তি ব্লগ টিমের কাছে একজন নির্দিষ্ট ব্লগার সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়ে ফোন দিলেন। ব্লগ টিম সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে জানতে চাইলো - কেন উক্ত ব্লগারের তথ্য... ...বাকিটুকু পড়ুন

ভার্টিগো আর এ যুগের জেন্টস কাদম্বিনী

লিখেছেন জুন, ১০ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ৯:১৩



গুরুত্বপুর্ন একটি নথিতে আমাদের দুজনারই নাম ধাম সব ভুল। তাদের কাছে আমাদের জাতীয় পরিচয় পত্র ,পাসপোর্ট এর ফটোকপি, দলিল দস্তাবেজ থাকার পরও এই মারাত্মক ভুল কি... ...বাকিটুকু পড়ুন

যাপিত জীবনঃ কি যাতনা বিষে বুঝিবে সে কিসে কভু আশীবিষে দংশেনি যারে।

লিখেছেন জাদিদ, ১১ ই আগস্ট, ২০২২ রাত ১:১৪

১।
মেয়েকে রুমে একা রেখে বাথরুমে গিয়েছিলাম। দুই মিনিট পরে বের হতে গিয়ে দেখি দরজা বাইরে থেকে লক। পিলে চমকে উঠে খেয়াল করলাম পকেটে তো মোবাইলও নাই। আমি গেট নক... ...বাকিটুকু পড়ুন

×