somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

পোস্টটি যিনি লিখেছেন

এক নিরুদ্দেশ পথিক
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব,ইইই প্রকৌশলী। মতিঝিল আইডিয়াল, ঢাকা কলেজ, বুয়েট এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র।টেলিকমিউনিকেশন এক্সপার্ট। Sustainable development activist, writer of technology and infrastructural aspects of socio economy.

নিভে গেছে সেই দ্বীপ্তিমান প্রদীপ, দশ দিগন্ত আলোকিত করেছেন যিনি!

০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ২:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
প্রফেসর ডঃ 'মোহাম্মদ আলী চৌধুরী' শ্রদ্ধাঞ্জলি-
নিভে গেছে সেই দ্বীপ্তিমান প্রদীপ, দশ দিগন্ত আলোকিত করেছেন যিনি!


বাংলাদেশে ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার উচ্চমানের বিকাশ ও জনপ্রিয় করণে রোল মডেল হিসেবে আবির্ভুত হয়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষাবিদ শিক্ষা ও ব্যক্তিত্ব্যের আলো ছাড়িয়ে শিক্ষার্থী মননে দাগ কাটতে সক্ষম হয়েছেন কিনা, তা বিতর্ক সাপেক্ষ। তবে একজন ছিলেন যিনি সুবিধাবাদী, অলস, অসৎ ও লোভীদের সমাজে স্রোতের বিপরীতে চলে মহৎ প্রাণের জানান দিয়ে গেছে জীবনব্যাপী, মেধা ও মননে, উচ্চমান কর্ম ও কর্ম গভীরতায়। তাঁর প্রতিটি চিন্তা ছিল প্রয়োগমূখী, প্রতিটি চর্চা ছিল মহৎ ও নিবেদিত। "মানুষ" এর অভাব থাকা "ব্যক্তিত্ব" হীন সমাজে ব্যতিক্রমধর্মী এই শিক্ষাবিদ "মানুষ" হলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের সদ্য প্রয়াত অধ্যাপক মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। স্রোতের বিপরীতে চলা শক্তিশালী মনোবলের একজন নিবেদিতপ্রাণ, প্রচারবিমুখ ও সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত শিক্ষাবিদ ছিলেন তিনি। প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন ২৯ জানুয়ারি। জ্ঞানী, প্রাজ্ঞ, কীর্তিমান, মহানুভব, সহজ, সরল সর্ব শ্রদ্ধেয় এই মাটির মানুষটিকে সমাজ কতটা মনে রাখবে এবং কিভাবে মনে রাখবে সেই আলোচনা টানা জরুরী।

কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ ট্রেন্ডের আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার কোর্স কারিকুলাম ডাইনামিক করা ও সেভাবে বিভাগ ও সাবজেক্ট বিন্যস্ত করা, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষাকে ইন্ডাস্ট্রির সংযোগ দেয়া, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষায় থিসিসের পরিসর বাড়ানো, রিসার্চ বেইজ উচ্চমান করা, শিক্ষক মূল্যায়ন ব্যবস্থা চালুর মত বহু কাজের চিন্তা ও চর্চা করেছেন প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আলী চৌধুরী। শিক্ষকদের কম্ফোর্ট জোন থেকে বের করে এনে নিবেদিত করার প্রচেষ্টা যেখানে দেশের আমলাতান্ত্রিক শিক্ষা প্রশাসন, অলস ও ফাঁকিবাজ শিক্ষকদের দ্বারাই ব্যহত হয়েছে সেখানে একজন শিক্ষক হয়েও প্রফেসর চৌধুরী আক্ষরিক অর্থেই বছরের পর বছর ফজর থেকে এশা এশা পর্যন্ত সময় দিয়ে গেছেন শিক্ষার্থীদের, লেকচার প্রিপারেশনে, ওয়ান টু ওয়ান টপিক এক্সপ্লানেশনে, থিসিস নির্ধারণ ও গবেষণা সহায়তায়, ছাত্র ছাত্রীদের পোষ্ট গ্র্যাড শিক্ষার পেপার ওয়ার্ক তৈরি ও স্কলারশিপ প্রাপ্তিতে, ক্যারিয়ার মেন্টরিং এবং ইইই'র বিভাগীয় উতকর্ষ আনয়নের নিরন্তর চেষ্টায়। সাধারণ ছাত্র ছাত্রীদের সমস্যা সমাধানের অপেক্ষায় নিজ অফিসে পড়ে থেকেছেন গভীর রাত অবধি, আপ্যায়নের ব্যবস্থা সহ। গতানুগতিক এবং মুখস্ত লেকচার নেয়ার বিপরীতে স্বীকৃত মেধা (সিকি শতাব্দী আগে শ্রেষ্ঠ গবেষণাপত্রের জন্য আইইইইর পুরস্কার পেয়েছিলেন) ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতার জ্ঞানভান্ডার থাকার পরেও এই শিক্ষাবিদ প্রিপারেশনহীন ক্লাসে নিয়েছেন বলে যানা যায়নি। ফলে তড়িৎ ও কম্পিউটার কৌশলের বিভাগের সবচেয়ে ফাঁকিবাজ ছাত্রটিও স্যারের ক্লাস মিসের চিন্তা করেনি, বরং একই ক্লাস অন্য সেকশনের সাথে উপর্যুপরি করেছে, ফলে স্যারকে কখনও রোল কল করতে হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে পেশাজীবী হয়ে পড়া সাবেক ছাত্রদেরও কারিগরি জিজ্ঞাসার উত্তর দিয়েছেন অফলাইনে ও অনলাইনে।


ক্যান্সার আক্রান্ত এই ব্যক্তিত্ব নিয়ে মে'১৬ তে এক লিখনীতে ডঃ মোহাম্মদ কায়কোবাদ লিখেছিলেন "তাঁর রোজনামচা অসাধারণ। ফজরের নামাজ পড়েই অফিসে চলে আসেন। দেশি কিংবা অতিথি পাখির খাবারের ব্যবস্থা করা, চারা গাছে পানি দেওয়া, লেখালেখি, কম্পিউটারে কাজ, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের নানা বই ডাউনলোড করে লাইব্রেরিতে দেওয়া, ক্লাসে যাওয়ার আগে পুরো বক্তৃতা স্বহস্তে লেখা, সমস্যা সমাধান করা। এর মাঝে বাজার, ভ্রমণ করা এবং দিন শেষে রাত নয়-দশটার দিকে বাসায় ফেরা। সারা দিন, সপ্তাহে সাত দিন, বছরে ৫২ সপ্তাহ। প্রতি ধর্মীয় উৎসবে সুবিধাবঞ্চিত দারিদ্র্যপীড়িত লোকদের রিকশা কিনে দিতেন, যাতে তাঁরা স্বাবলম্বী হয়। অনেকেই এই সুযোগের অপব্যবহার করেছে। তাই এখন অর্ধশতক রিকশাওয়ালাকে ধর্মীয় উৎসবে এককালীন অর্থ প্রদান করেন। আতিথেয়তা, বিনয় তাঁর চরিত্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা তাঁকে কখনো চিন্তাভাবনা করে করতে হয় না। নানা স্বাস্থ্য-সমস্যায় ভুগেছেন, অনেক ছাত্র ও শুভাকাঙ্ক্ষী থাকা সত্ত্বেও কারও মুখাপেক্ষী কখনো হননি আজীবন অকৃতদার এই মানুষটি। কোনো বিষয়েই তেমন কোনো অভিযোগ নেই কারও প্রতি।"। মোট কথা মেধা ও মননে শিক্ষার তরে একজন মাত্র ব্যক্তির এতটা সময় ইনভেস্টমেন্ট বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। স্যার একটি পূর্ণ জীবন আবর্তিত করেছেন শিক্ষা দানে! নিবেদনের এই মডেল অভূতপূর্ব!

আজ অবধি বাংলাদেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত কোন স্তরের শ্রেণী শিক্ষাকেই আনন্দঘন করে ছাত্র ছাত্রীর কাছে উপস্থাপন করা যায়নি, সেখানে এই প্রফেসরের পদাঙ্ক কিভাবে শিক্ষালয়ে অনুসরণ করা হবে তা নিয়ে ভাবা দরকার। অনন্ত প্রেরণার এই উৎসকে আমরা একটি ভবন কিংবা একটি ল্যাব কিংবা একটি সড়কের নামকরণের মধ্য দিয়ে স্মরণ করতে পারি তবে তা হবে নিতান্তই লোক দেখানো। আমাদের দরকার ছিল স্যার এর উচ্চ মান জ্ঞান ভান্ডারকে "রিপ্রডিউস" করে রাখা। অর্থাৎ আমাদের ছাত্রদের বুঝার ক্যাপাবিলিটি ও কমন গ্যাপ গুলোকে সামনে রেখে আমাদের মেধা ব্যবস্থাপনাকে উচ্চ মান করতে স্যারকে দিয়ে মাতৃভাষা বাংলা ও কর্মসংস্থানের ভাষা ইংরেজিতে ইলেক্ট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডোমেইনে প্রচুর টেক্সট বই লিখিয়ে নেয়া, পারিশ্রমিক সহ। ক্লাস গুলোর অডিও ভিজুয়াল রেকর্ড রাখার প্রয়োজন ছিল। যদি কারো কাছে তা থেকে থাকে তাহলে সেগুলো ডকুমেন্টেড ও আর্কাইভ করে রাখা দরকার। এখনও বিভিন্ন ডোমেইনে এই রকম যারা বেঁচে আছেন তাঁদের উৎসাহ দেয়া ও রিপ্রডিউস করে জ্ঞান ধরে রাখার একটা চেষ্টা হওয়া চাই। চাই সেসব বই ছাপানোর জন্য ফান্ড তৈরির ব্যবস্থা করা। এই কাজটি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডমি কিংবা ব্যানবেইস কিংবা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের করার কথা। দুর্ভাগ্য যে, আমরা কোন দূরদর্শী রাষ্ট্রীয় ইন্সটিটুশন পাইনি।

দুর্বিত্তায়িত মেধাহীন শিক্ষক নিয়োগ, দুর্বিনীতি অপ রাজনৈতিক প্রভাব, দখল সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি নির্ভর মারমূখী ছাত্র রাজনীতি, দলীয় লেজুড়বৃত্তির শিক্ষক রাজনীতি, গবেষণাহীন, ইন্ডাস্ট্রি সংশ্লিষ্টতা হীন শিক্ষা মডেল, শিক্ষা বাণিজ্যিকিকরণ, বেপারোয়া প্রশ্ন ফাঁস ও উত্তরপত্র যাচাইয়ের সহনীয় পাশমূখী মডেলের শিক্ষা ব্যবস্থা প্রফেসর ডঃ মোহাম্মদ আলির চৌধুরীর মত উচ্চ মান শিক্ষক প্রডিউস করার ক্যাপাবিলিটি রাখে না। শিক্ষায় মেধা, মান ও মনন বলতে যা কিছু রয়েছে সেসবের সৃষ্টিতে এই শিক্ষা ব্যবস্থা নিদারুণ ভাবে অযোগ্য ও ব্যর্থ। তাই যে যে ডোমেইনে এখনও ভালো'রা জীবিত আছেন তাঁদের জ্ঞান রিপ্রডিউস করে রাখা কর্তব্য।
শিক্ষা ব্যবস্থা কিভাবে প্রফেসর মোহাম্মদ আলী চৌধুরীর মত মান ও মননের নিবেদিত শিক্ষক তৈরি করতে পারবে, সেইরকম একটি মেধা ব্যবস্থাপনার একটা শুভ চিন্তার সূচনা দরকার নেতৃত্ব ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে এবং শিক্ষা প্রশাসনে স্তরে স্তরে। তবেই স্যারের মহৎ প্রাণের নিবেদন সর্বজনের তরে অর্থবহ করে তোলা যাবে।

পরম দয়ালু আল্লাহ্‌তায়ালা তাঁকে সর্বোচ্চ প্রতিদান দিন-এই দোয়া করি।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ রাত ৩:২১
২১টি মন্তব্য ২০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মাইক্রোপ্লাস্টিক: অদৃশ্য প্লাস্টিক কীভাবে আমাদের খাবার ও শরীরে ঢুকছে?

লিখেছেন কাবিল, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:০৪


মাইক্রোপ্লাস্টিক (Microplastic) হলো খুব ছোট প্লাস্টিকের কণা। সাধারণভাবে ৫ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। এর থেকেও অনেক ক্ষুদ্র কণা আছে—সেগুলোকে ন্যানোপ্লাস্টিক বলা হয়। এগুলো এত ছোট হতে... ...বাকিটুকু পড়ুন

এনসিপিকে মারছে কেন? (অথবা) এনসিপি মার খাচ্ছে কেন?

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ১:৪০


(ইহা নাকি এনসিপিকে পিষিয়ে মারবে!)

এনসিপিকে মারছে কেন (?) অথবা এনসিপি মার খাচ্ছে কেন? প্রশ্ন দুটো হলেও আদতে প্রশ্ন একটাই উত্তরও একটাই। বিগত ১৫/১৬ বছর অর্থাৎ খুনি হাসিনার আমলে যাহারা... ...বাকিটুকু পড়ুন

সংকীর্ণ মন

লিখেছেন আলমগীর সরকার লিটন, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ দুপুর ২:৩৮


রাস্তার মোড় যেনো সংকীর্ণ মন
ঘর উঠনে রাখবে আর কত কাল
চোখের নেশায় লালসার আগুন
জ্বলছে নিভবে না আর অমরণ

কখন মন জানালায় দেখেছ পায়রা
ভাবনার সফলী মাঠে যাচ্ছে উড়ে
দেখো নাই যে শান্তির পায়রা মন-
সংকীর্ণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

জুলাই আন্দোলনের সম্ভাবনাময়, রৌদ্রোজ্জ্বল মুখগুলো ডানপন্থার অনুরাগী হচ্ছে! দায় কার?

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৩ রা আগস্ট, ২০২৬ সন্ধ্যা ৭:০৩



জুলাই আন্দোলনের অন্যতম সেই আইকনিক ফটো--যেখানে দেখা যাচ্ছিল একটা ভার্সিটির ফাস্ট কি সেকেন্ড ইয়ারের মেয়ে পুলিশের গাড়ি আটকাচ্ছে, ওর ভার্সিটির এক বড় ভাইকে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যাওয়ার পর।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ছাত্রদলকে সামলাতে না পারলে ক্যাম্পাসগুলো সহিংসতায় পূর্ণ হবে।

লিখেছেন সৈয়দ মশিউর রহমান, ০৪ ঠা আগস্ট, ২০২৬ বিকাল ৩:০৮


রাতে রংপুর, সকালে জগন্নাথ। আজকে জগন্নাথে ছাত্রদলের হামলার শিকার একযোগে সব বিরোধী দল। এসব কি ছাত্রদলের কাজ? নাকি ছাত্রদলের ভেতর ছাত্রলীগ প্রবেশ করেছে? জকসু জিএসের জীবন আশংকাজনক। দেশে যখন... ...বাকিটুকু পড়ুন

×