১.
২০০৮ সালের কথা । কাজিনের বার্থডে পার্টীতে গেছি । অনেকগুলো কাজিন এক সাথে হলে যা হয় । হাসি,ঠাট্টা ,গল্প গুজব চলছে । অঙ্কন,ঐশ্বর্য,আমি জমিয়ে আড্ডা মারছি ।
আরও কিছু পিচ্চি কাজিন আমাদের আড্ডাই নাক গলাচ্ছে । ছোটোদের পাত্তা না দিলেও তারা কেন যেন বড়দের আশেপাশে ঘুর ঘুর করে ।
রোমান্স ভাইয়া ওদিকে বড়দের সাথে বসে আছে । অঙ্কন তো বলেয় বসলো "এখন তো রোমান্স ভাইয়ার ভাব বেড়ে গেছে । আমাদের সাথে থাকেই না । সিনিয়ারিটি দেখায় । " আসলেই ভাইয়া অনেক বদলে গেছিল । অনেক ম্যাচিউরিটি এসে গেছে ভাইয়ার মধ্যে ।
আমাদের মতো পুলাপাইন টাইপ আচরণ এখন আর ও করেনা । জ্ঞানী জ্ঞানী ভাব । আমি অঙ্কনকে বললাম "আরে বাদ দে ওর কথা । ভাইয়া আর কদিন পর ইঞ্জিনিয়ার হয়ে যাবে আমাদের
সাথে বসে বসে গেম খেলার বা আড্ডা মারার টাইম কি তার আছে ।" আমরা আমাদের মতো আড্ডা মারতে থাকলাম ।
একটু পরে ডিনারের ডাক পড়ল । ডিনার শেষে বসে আছি । এইবার রোমান্স ভাইয়া আমাদের সাথে যোগ দিল । এসেই আমাকে জিজ্ঞেস করল পড়ালেখার খবর কি ? ফিজিক্স,ম্যাথ কোন স্যারের কাছে পড়ছি ? এসব প্রশ্ন ।
এরপর নানা উপদেশ দিল । পুরাই বড় ভাই সুলভ আচারণ ।
ওহ ! আগে রোমান্স ভাইয়া সম্পর্কে একটু বলে নেই । ও আমার ফুপাতো ভাই ।
রোমান্স ভাইয়ার মতো ভদ্র আর ইন্টিলিজেন্ট ছেলে আমি কমই দেখেছি । ভাইয়া অনেক স্মার্ট । চেহেরা
রাজপুত্রের মতো । মেধাবী ছাত্র । ক্লাস এইটে বৃত্তি পেয়েছিল । এস.এস.সিতে ভালো রেজাল্ট । নটরডেমে পড়েছে । আর এখন এম.আই.এস.টিতে(মিলিটিরি ইন্সটিটিউট অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলোজি) মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছে ।
আজকের নম্র ভদ্র রোমান্স ভাইয়া আগে কিন্তু এমন ছিলনা । উফ্ফ্ !!! কি ভয়ানক দুষ্টুই না ছিল ভাইয়া । যখনি আমরা একসাথে হতাম ও আমাদেরকে ছোট পেয়ে বোকা বানাতো ।
একবার ও আমাকে বলল "এসো তোমার গায়ে ড্রিয়িং করে দেই ।" ও খুব ভালো আর্ট করতো আমি ভাবলাম ভালই তো দেখি কি আকায় ও । তখন ও আমার পেটে বিশাল একটা সেলাই এর চিত্র একে দিল ।
দেখে মনে হবে অ্যাপেন্ডিক্স এর অপারেশন হয়েছে আমার । মনোপোলি খেলতে গেলে তো কোনদিন জিততে পারতামনা । ও এতো বেশি চিটিং করতো জিতবো কিভাবে ? নতুন নতুন নিয়ম বানাত খেলার । ছোটতে ও অনেক বেশি চঞ্চল ছিল । বাসার সব জিনিস চুপ করে রাস্তায় ফেলে দিত । কে বলবে আজকের এই রোমান্স কি দুর্দান্তই না ছিল ।
২.
সেদিন ছিল ২০০৯ সালের ৯ জুলাই । এইচ.এস.সি এক্সাম শেষ হয়ে গেছে । তাই ভর্তি পরীক্ষার প্রিপারেশন নিচ্ছি । এই দিনটা এবং এর পরের দুটো দিন যে আমার জীবনের সবচেয়ে
স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে সেদিন সকালেও তা জানতাম না । সেদিন সকাল ছিল অন্যান্য দিনের মতই সাধারণ । সকালের নাস্তা খেতে বসেছি এমন সময় দুঃসংবাদ এল দিদিমা মারা গেছেন ।
আমি আমার আপন দিদিমাকে দেখিনি । আমার বাবার বিয়ের আগেই তিনি মারা গেছিলেন । আমার দাদুও আমি যখন ছোট তখন মারা গেছেন । এই দিদিমা আমার দাদুর ছোট বোন ।
দাদুর ভাই বোনদের মধ্যে তিনিই শুধু বেঁচে ছিলেন । দিদিমা কে আমরা সব কাজিনরা নিজের দিদিমাই মনে করি । তিনি আমাদেরকে ভীষণ ভালোবাসতেন ।
মনে হলো আমি একটা নিরাপদ আশ্রয় হারিয়ে ফেললাম । আমাদের সব আত্মীয় স্বজন আসলো বিভিন্ন জায়গা থেকে ।
রোমান্স ভাইয়া তখন নতুন চাকরিতে জয়েন করেছে ডানা গ্রুপে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে । তারপরেও দিদিমা বলে কথা ।
ও ছুটি নিয়ে ঢাকা থেকে চলে এসেছে দিদিমাকে শেষ বারের মতো দেখার জন্য ।
যাই হোক,আমাদের বাসার সামনে একটা ঈদগাহ আছে । জানাজার আগে সেখানে দিদিমার লাশ রাখা হলো ।
আমি আর রোমান্স ভাইয়া সেখানে দাড়িয়ে ছিলাম । আমার মনের অবস্থা যথেষ্ট খারাপ । ওরও অবস্থা যে আমার মতো তা আমি বেশ বুঝতে পারছিলাম । তাই আমি আর ওকে জিজ্ঞেস করলাম না ওর চাকরি কেমন চলছে বা অন্যান্য সাধারণ কথা । আমরা শুধুই চুপচাপ দাড়িয়ে ছিলাম । জানাজা শেষে দিদিমাকে গোরস্থানে নিয়ে যাওয়া হলো । বেশ খানিক পথ রোমান্স ভাইয়া কাঁধে নিলো ।
এরপর আমিও কাঁধে নিলাম । দিদিমার দাফন সম্পন্ন করে ভারাক্রান্ত মনে বাসায় ফিরে এলাম ।
আজকের এই লেখাটা এই পর্যন্ত এসে থেমে গেলেই ভালো হতো কারণ এখানেই ঘটনার শেষ না ।
আর একটি মর্মান্তিক ঘটনা,না ভুল বললাম দুর্ঘটনার শুরু । রোমান্স ভাইয়া,ফুফা,ফুফু আর চাচা,চাচি ঢাকা থেকে মাইক্রো ভাড়া করে রাজশাহী এসেছিল । ওর যেহেতু নতুন চাকরি তাই
ওর যাওয়া জরুরি হয়ে পড়ে তাই রোমান্স ভাইয়া পর দিনই চাচা চাচির সাথে রওনা দেয় । আমার চাচা চাচি তারমানে ওর মামা মামী । আর ফুফা ফুফু রাজশাহীতে থেকে যান ।
ওরা তিনজন রাজশাহী থেকে ঢাকা যাবার পথে হাইওয়ে রেস্টুরেন্টে গাড়ি থামিয়ে খাওয়া দাওয়া সারে । এরপর রওনা দিলে যমুনা সেতু পেরিয়েই ঘটে সেই দুর্ঘটনা । মাইক্রো টাঙ্গইল পৌঁছালে সেখানে
একটি দ্রুতগামী বাস ওভারটেক করার সময় মাইক্রোকে ধাক্কা দেয় । মাইক্রো গিয়ে পড়ে রাস্তার পাশের খাঁদে । সবাই গাড়ি থেকে ছিটকে বাইরে পড়ে । চাচা,চাচি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন ।
তাদের যখন জ্ঞান ফিরে তখন কিছু মানুষ জড়ো হয়েছিল । চাচা দ্রুত রোমান্স ভাইয়ার কাছে গিয়ে দেখেন তার জ্ঞান নেই । তিনি তাকে চেড়ে নিয়ে রাস্তায় আসেন । ওদিকে চাচি পা ভেঙে পড়ে আছেন ।
এরকম বিভষিকাময় পরিস্থিতি আসলে আমার পক্ষে বর্ণনা করা সম্ভব নয় । তবুও চেষ্টা করে দেখলাম ।
এরপর ওখানকার কিছু লোকজনের সাহায্যে তারা তিন জন হাসপাতালে পৌছায় ।
কিন্তু ততোক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে । রোমান্স ভাইয়াকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি । চাচির পায়ের গোড়ালির নিচে ভেঙে কুচি হয়ে গেছিল । চাচার কলার বোন ভেঙে গেছে ।
আমারা খবর পেলাম বিকালের দিকে । তবে স্পষ্ট খবর না ।
আমরা জানতে পারলাম এক্সিডেন্ট হয়েছে কিন্তু কারো কিছু হয়েছে কিনা সেটা জানা যাচ্ছিলোনা । রাজশাহী থেকে আমার বড়চাচা সহ আরও কয়েক জন রওনা দেন টাঙ্গাইল ।
সন্ধ্যার সময় আমি জানতে পারি রোমান্স ভাইয়া মারা গেছে । কিন্তু আমি কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিলামনা । মৃত্যু কথাটার মানে আমি সেই মুহূর্তে ঠিক ধরতে পারছিলাম না ।
কেন যেন সেই সময় আমি কাঁদতে ভুলে গেছিলাম । বাসায় মেয়েদের কেউই জানত না ব্যাপারটা । ফুফা ফুফুর একমাত্র সন্তান ছিল রোমান্স ভাইয়া । আমরা ঠিক করলাম তাদেরকে এখন জানানো যাবে না । জানালে হয়তো তাদেরও কিছু হয়ে যাবে । আমি তাদের রুমে যেতেই আমাকে ফুফু জিজ্ঞেস করল "অঞ্জন কেউ কিছু বলছেনা আমাকে । তুইই বল রোমান্সের কি হয়েছে ?
আমার বাবুর কি হয়েছে ? " আমি এতক্ষণ কাঁদছিলামনা । আসলে আমি বুঝে উঠতে পারছিলাম না কি হচ্ছে । ফুফুর এই প্রশ্নে আমি ঝরঝর করে কেঁদে ফেললাম যদিও আমাকে ফুফুর সামনে
কাঁদতে মানা করা হয়েছিল । আমি কাঁদতে কাঁদতেই বললাম "কিছু হয়নি । রোমান্স ভাইয়ার কিছু হয়নি ।"
ফুফু আর্তনাদ করে বলে উঠলো " তাহলে তুই কাঁদছিস কেন ? " আমার কাছে এই প্রশ্নের কোন উত্তর ছিলনা । একজন মাকে তার একমাত্র সন্তানের মৃত্যু সংবাদ দেওয়া মনে হয় পৃথিবীর সব চেয়ে কঠিন কাজ । আমি যথেষ্ট শক্ত মনের মানুষ তবুও আমি এই কঠিণ কাজটা করতে পারলাম না ।
রোমান্স ভাইয়ার লাশ বাসাই আসলো রাত সাড়ে তিনটার দিকে । আমরা কেউ চোখের পাতা এক করিনি । শুধু কেঁদেই গেছি । রোমান্স ভাইয়ার কাছে গেলাম দেখে মনে হয়না সে
এক্সিডেন্টে মারা গেছে । আমার মনে হলো সে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে । আঘাতের তেমন কোন চিন্হ নেই ওর শরীরে । আমার এক ফুফু গ্রীসে থাকেন । তিনি বললেন তিনি না আসা পর্যন্ত যেন মাটি না দেওয়া হয় । দিদিমা মারা গেছেন
তাকে তিনি দেখতে পাননি এরপর ভাইয়া । আমারা তাই কফিনে বরফ দিয়ে ভাইয়ার লাশ রেখে দিলাম ।
আমার ফুফুর জ্ঞান ছিল না । এতো বড় শক তিনি সহ্য করতে পারছিলেন না ।
ফুফা পাগলের মতো করছিলেন । মোট কথায় সে এক দুঃসহ পরিবেশ । এদিকে আমার চাচার প্রেশার হাই হয়ে গেছে । আমি রিলেক্সিন কিনতে গেলাম ওষুধের দোকানে । তারা বলে এই ওষুধ নাই ।
যে দোকানে যাই সেখানেই একি কথা । পরে বুঝলাম ব্যাপারটা কি । এই দুইদিন আমি একটুও ঘুমাইনি । আমার উপর দিয়ে যে চাপ গেছে তাতে যে আসল ঘটনা জানেনা সে দেখেই বলবে আমি
ড্রাগ এডিক্ট ।
যাই হোক রিলাক্সিন না পেয়ে সেডিল নিয়ে গেলাম ।
রোমান্স ভাইয়া কে দিদিমার পাশেই কবর দেওয়া হয়েছিল ।
জাফর ইকবাল তার রঙ্গিন চশমা বইয়ে একটি কথা লিখেছিলেন । আমারও আজ সে কথাটি লিখতে ইচ্ছে করছে " হঠাৎ মনে হল আমার বয়স বুঝি অনেক বেড়ে গেছে " ।
৩.
ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হয়েছি । তাই এখন ঢাকাই থাকি । একদিন আম্মুর সাথে ফুফুর বাসায় গেলাম তাদের দেখতে । তারা সারাদিন কান্নাকাটি করেন । পুরা বাসা জুড়ে রোমান্স ভাইয়ার ছবি । তাদের একমাত্র সন্তানের স্মৃতি তারা ভুলবে কিভাবে ।
ফুফু রোমান্স ভাইয়ার কিছু বই আমাকে দিলেন । তার ফটো এ্যালবাম দিলেন । একটা ছবি আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করল
একটি জ্বলন্ত মোমবাতি তার সামনে খোলা ডায়রি, ডেয়ারির ওপর চশমা । ডেয়ারিতে লিখাছিল " সত্য সুন্দর । কিন্তু একটি অসুন্দর সত্যও আছে আর তা হলো মৃত্যু ।"

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




