somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

"শাহনামা রিলোডেড "

২৪ শে মে, ২০১৫ দুপুর ২:১৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৯৭ সাল!
১৭ বছর অাগের শাহানা অার অাজকের শাহানাকে অামি মিলাতে পারতেছিনা।
কি রুপ, যৌবন, লাস্যময়তা, স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ জীবন্ত ছিলো, চন্ছল ছিলো শাহানা।
অার এখনকার শাহানাকে কোনো ভাবেই মিলাতে পারতেছিনা!

শাহানা ছিলো অামাদের মফস্বলের সবচেয়ে অাকর্ষণীয়, প্রাণবন্ত, সাংস্কৃতিমনা, অাধুনিক মেয়ে।
শাহানা'রা ৬ বোন ছিলো।
৩ জন অবিবাহিত প্রায় সমবয়সী।
৩ বোনের সেকি কলকলানি জীবন যাপন ছিলো।
বাড়িতে বাগান করতো।
পাড়ার সব ছেলেরা শুধু শাহানাদের দেখার জন্য ২১ ফেব্রুয়ারিতে ফুল অানতে যেতো।
ঈদের ঠিক অাগের দিন শাহানা'রা তাদের বাড়ির দেয়ালে 'ঈদ মোবারাক ' লিখতো।
অার কি সুন্দর ফুল, পাখি, লতাপাতা এঁকে রাখতো মাটির দেয়ালে।
তখনকার অজঁপাড়া গায়ে শাহানাই ছিলো অামাদের অলঙ্কার।
বি.কম পড়তো শাহানা।
অামাদের প্রাইমারী, সেকেন্ডারী স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার মূল অাকর্ষন থাকতো শাহানার গান, কবিতা অাবৃত্তি।
মাঝেমাঝেই শাহানা'রা সব বোনেরা অামাদের বাড়িতে অাসতো।
মা'র সাথে গল্প করতো। বেড়াতে যাবার জন্য মায়ের সুন্দর শাড়ি নিতো।

শাহানাকে পাবার জন্য মফস্বলের সকল যুবকের লাইন থাকতো অামাদের পাড়ায়।
কিন্তু শাহানার অবঃ প্রাপ্ত মেলিটারী বাবার কারণে কেও মুখ ফুটাতে পারতোনা।

বিধি বাম! একজন পেড়েছিলো। "মুক্তার ভাই "।
মুক্তার ভাই ছিলো অামাদের মফস্বলের সবচেয়ে হ্যান্ডসাম ছেলে।
কাঁশবনের মতো ঢেউ খেলানো চুল ছিলো মাথা ভর্তি।
শ্যামবর্নের মুক্তার ভাইয়ের চুলের স্টাইল অার জ্বলজ্বলে চুখের কারনে অামরা সবাই তাকিয়ে থাকতাম।
অার মুক্তার ভাইয়ের মতো হবার চেষ্টা করতাম।
মুক্তার ভাই অামাদের থানায় নামকড়া ফুটবল খেলোয়ার ছিলো।
কতো হেরে যাওয়া ম্যাচ মুক্তার ভাই জিতিয়েছে।
মুক্তার ভাইয়ের খেলা দেখার জন্য পাড়ার সবাই দল বেঁধে মাঠে যেতো।

অারেকজনও যেতো মাঠে, শাহানা।

মুক্তার গোল দিলে পুকুর পাড় থেকে দুহাত উপরে তুলে চিৎকার করে নেঁচে উঠতো শাহানা।
১১ বৎসরের বালক, তখন বুঝতামনা ; মুক্তার গোল দিলে শাহানা কেনো চিৎকার করে উঠে "গোওওওল......!
অামার জীবনের অন্যতম নিঃষ্ঠুর, হৃদয় বিদারক দিনটায় বুঝলাম, কারণটা "স্টুপিড ভালবাসা "।

মুক্তার অার শাহানার প্রেম জেনো অামাদের মফস্বলে একটা রুপকথা হতে থাকলো।
কারণ, শাহানার বাবার ভয়কে পাত্তা না দিয়ে 'প্রেম ' করা রুপকথা বৈকি।

তাদের প্রেম চলতে থাকলো চুপিসারে। মুক্তার ভাই কলেজ কামাই করে শুধু শাহানাদের বাড়ির দিকে ঘুরঘুর করতো।
শাহানাও ছলেবলে বাউন্ডারির বাইরে অাসতো।
এক পলক দেখেই মুক্তার ভাই ফুটবল টেবাতে টেবাতে চলে যেতো।

ব্যাপারটা জানাজানি হলে, শাহানার বাবা মুক্তার ভাইয়ের বাড়িতে নালিশ দেয়।
মুক্তার ভাই তার বাবাকে বলে 'শাহানাকে বিয়ে করবে '। মুক্তার ছিলো তার বাবার বড় ছেলে। মোটামুটি স্বচ্ছল পরিবার।
মুক্তারের বাবা শাহানার বাবাকে বিয়ের প্রস্তাব দেয়। যথারীতি শাহানার বাবা ফিরিয়েও দেয়।

শুরু হয় তাদের টানাপোড়ন। প্রায়ই শাহানাদের বাড়ি থেকে শাহানার কান্নার চিৎকার ভেসে অাসে। পাড়ার সবাই শাহানার বাবাকে বুঝানোর চেষ্টা করে।
কিন্তু শাহানার ধাম্ভিক, অহংকারী বাবা কারো কথা পাত্তা দেয়না।
মুক্তার ভাই পাড়ার এমন কেও নাই যার হাতে পায়ে ধরেনি।
কোনো ফায়দা হয়না।

১৯৯৭ সালের অাষাঢ় মাস। তারিখটা এখন ঠিক মনে পড়তেছেনা।
খুব সকালে মানুষের চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম ভেঙ্গে যায়।
মানুষজন দলবেঁধে দেখি শাহানাদের বাড়িতে যাচ্ছে।
প্রতিটা মানুষ কাঁদতেছে অার বলতেছে "মুক্তাররে মাইরা লাইছে "।
শাহানাদের বাড়ির ওঠানে মুক্তারের রক্তাক্ত লাশ পড়ে অাছে। চারদিকে পুলিশ।
অার শাহানার চিৎকার "মুক্তার! মুক্তার! মুক্তার!

সেদিন মুক্তার গিয়েছিলো রাতে শাহানার সাথে দেখা করতে। কিন্তু উৎ পেতেছিলো শাহানার বাবা এবং চাচারা।
মুক্তারকে তারা সারারাত বেদম মার-ধর করে।
মুক্তারের প্রতিটা অাঙ্গুলের নখের ভিতরে সুঁই ঢুকায়!
পায়ের অাঙ্গুলে সুঁই ঢুকায়!
মুক্তারের যৌনাঙ্গ দিয়ে সুঁই ঢুকায়!
সেভেন অাপের বোতলে গড়ম পানি দিয়ে বেদম প্রহার করে!

সবই ঘটে শাহানার চুখের সামনে।
শাহানাকে তার বাপ মুখ-হাত বেঁধে পৃথিবীর সবচেয়ে কঠোর, নিঃষ্ঠুর শাস্তিটা দেয়।
তাঁর চুখের সামনে তার "মুক্তারকে " খুচিয়ে খুচিয়ে মারে তার বাবা।

শাহানার জবানবন্দীতে শাহানার বাবার মৃত্যুদন্ড দেয় অাদালত।
৫ বছর জেলে থাকার পর অসুুস্থ হয়ে শাহানার বাবা জেলেই মারা যায়।
মারা যাবার ২ বৎসর অাগেই শাহানার বাবা বোবা & লুলা হয়ে যায়।

তারপর এলাকায় অনেকেই বলাবলি করতো যে, শাহানাই ঐদিন রাতে তার বাবার সাথে হাত মিলিয়ে মুক্তারকে রাতে অাসতে বলে।

কিন্তু, শাহানা প্রমাণ করে দেয়, অাদালতে তার বাবার নির্মম অত্যাচারের কথা বিচারককে বলে।
অামার অাব্বা বলেছিলো, জাজ সাহেব নাকি শাহানার কথা শুনে বারবার কেঁদে উঠতেন। কোর্ট রুমের প্রতিটা মানুষ শাহানার কথা শুনে বিলাপ করে কেঁদেছে।

তারপরে শাহানা প্রায়ই অামাদের বাড়িতে এসে রাতে অামাদের সাথে ঘুমাতো।
শাহানা নিচে খেজুর পাটি বিছিয়ে তাঁর "মুক্তারের " কথা বলতো, তাদের ভালবাসার কথা বলতো।
তাঁর বেঁচে থাকার অবলম্বনের কথা বলতো।
অার মুখচোরা অামি মা'র বুকে গুটিসুটি মেরে চুপিচুপি চুখ মুছতাম।
স্টুপিড ভালবাসার কথা শুনতাম কান পেতে!

শাহানা বিয়ে করে পারিবারিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়বদ্বতার দায়ে।
কিন্তু "মুক্তারের " কবরে শাহানার ফুল ঠিকই অাষাঢ়ের ঐদিনটাতে শোভা পায়।
শাহানা তার স্বামী-সন্তান নিয়ে মুক্তারের কবর জিয়ারাত করতে যায়।
স্টুপিড ভালবাসা!

শাহানা'কে হঠাৎ অাজকে মিরপুরে দেখি।
কথা হয় অল্প-বিস্তর। অাগের শাহানার সাথে অাজকের শাহানাকে দেখে, কেবলি মনে হচ্ছিলো,
"অামাকে যদি খোদা বিশেষ কোনো ক্ষমতা দিতো, তবে রিভার্স করে সেই দৃশ্যে ফিরে যেতাম "মুক্তার ভাই, গোল দিছে, অার শাহানা চিৎকার করে উঠছে 'গোওওওওওল...... '

ভূমিকম্প, চাকরী, টার্গেট, প্রান্ত স্ট্রোক করে মারা যায়, ব্লগার খুন, জাফর স্যার ব্লগার, সাগরে লাশ ভাসে, পিওন বলে 'স্যার মাথাতো স্টেডিয়াম ', ভাতিজা-ভাতিজি স্কুল পালায়, মেসে বাজার, সবকিছু ছাপিয়ে শুধু কানে ভেসে অাসতাছে "গোওওওওওল! " অার,
"মুক্তার! মুক্তার! মুক্তার!.....!



[[বিঃদ্রঃ লাইলি মজনু অামার চেয়ে কি হাজার বছরের বড়ো হবেনা বয়সে! কিছু চরিত্র থাকে অামাদের জীবনে, যাদের নামের শেষে কোনো সর্বনাম লাগেনা। তেমনি, শাহানা অামার চেয়ে ১৫ বছরের বড়ো হয়েও শুধুই " শাহানা "।
অামার দেখা ভালবাসার কিংবদন্তি। ]]
২টি মন্তব্য ২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Sajna

লিখেছেন আরমান আরজু, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৩:৩১



Sajna
Love is sacred;
Commences from the intense mystery of pure souls.
Has a beginning, but no end;
Here, only peace prevails.
So, love—
Solely for the sincere and the disenchanted,
Not for the pharisaic.
...বাকিটুকু পড়ুন

বিপ্লব সংহতি দিবস সফল ও সার্থক হোক.....

লিখেছেন কলিমুদ্দি দফাদার, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:১১



আজকে নাকি বিপ্লব সংহতি দিবস। দল ক্ষমতায় থাকলে অনেক রকমের দিবস পালিত হয়। আওয়ামী লীগের সময় শেখ জামাল-কামালের বিবাহ দিবস, শিশু শহীদ শেখ রাসেলের সুন্নাতে খৎতা দিবস আরো কতো কি?... ...বাকিটুকু পড়ুন

ঝাল্লাগে ভাল্লাগে- ২

লিখেছেন শেরজা তপন, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ বিকাল ৫:৪৯


"যে-রাঁধুনী জানে তার তরকারিতে স্বাদ হয়নি, সে নিমেষে লঙ্কার কৌটো উপুড় করে দেবে। তারপর অতিথি যখন কান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে হাঁউমাউ করবে, রাঁধুনী তখন মিটিমিটি হেসে বলবে—‘একটু ঝাল বেশি... ...বাকিটুকু পড়ুন

চা এর আড্ডা।

লিখেছেন নাহল তরকারি, ০৭ ই নভেম্বর, ২০২৬ রাত ৮:১৬



শনিবার
৭ নভেম্বর ২০২৬
২২ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
২৬ জমাদিউল আ. ১৪৪৮ হিজরি

কিছু মুহূর্ত কখনো হারিয়ে যায় না, সময়ের স্রোতে শুধু স্মৃতি হয়ে মনের গভীরে জমা থাকে।

২০১১ সাল। তখন আমি ইন্টারে পড়ি। নানীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

২৪'র ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশে ডানপন্থা ও মৌলবাদী চেতনা-রাজনীতির চরম উত্থান

লিখেছেন শেহজাদ আমান, ০৮ ই নভেম্বর, ২০২৬ সকাল ১১:২৩



২৪-এর ৫ আগস্টের পর দেশ দীর্ঘদিনের স্বৈ/রাচারী শাসন থেকে মুক্ত হয়েছিল ঠিকই; কিন্তু দুঃখজনকভাবে দেশ চলে গিয়েছিল বিপুল সংখ্যক ডা*নপন্থী বা মৌ*লবাদী চেতনা বা রাজনীতির ধারক-বাহক-সমর্থকদের কবলে।
হ্যাঁ, হাসিনার পতনে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×