মনে হয় শিক্ষক হিসেবে আমি যথেষ্ট কড়া। নিজের মেয়েদের পড়াশুনার ব্যপারে কোন “এক্সকিউজ” বা “মারসি” বিষয়টা আমার কাছে কম গুরুত্বপূর্ণ। অথচ স্টুডেন্ট হিসেবে.........Oh my God. বলা যায়-পুরো বিপরীত না হলেও অনেকটাই ..................। শৈশবে আমাকে পড়া ধরানো ও স্কুলে পাঠাবার উপযোগী করতেই আমার পরিবারের সময় লেগেছে পাক্কা দুই বছর। আমার গোটা শৈশব আর কৈশোরের একটি বড় অংশ কেটেছে আমার নানাবাড়ীতে। আমার নানা ছিলেন বেশ পশারওয়ালা ডাক্তার। ছিল তাঁর একটি ঔষধ কোম্পানিও। নানার বাসায় ছিল সার্বক্ষণিকভাবে নানা ধরনের লোকজনের সমাগম, বিশেষতঃ ঔষধ কোম্পানির ল্যাবরেটরীর লোকজনের। ওই ল্যাবের কর্মচারীরা সবাই যেন ছিল নানার ভাই আর আমার নানা। এভাবে নিজের নানা ছাড়াও আরো অন্ততঃ ৬/৭ জন নানা ছিলেন আমার। এই নানাদেরই একজন ছিলেন-আমার প্রিয় কার্তিক নানা। তিনি অনেকটা দুর্গা-পূত্র কার্তিকের মতোই দেখতে ছিলেন আর ছিলেন আমার নানার অত্যন্ত স্নেহভাজন-বিশ্বস্ত কর্মচারী । আরো ছিলেন সিদ্দিক নানা, খলিল নানা, কায়েস নানা............কিন্তু সব নানাদের মধ্যে আমার সবচেয়ে প্রিয় নানা ছিলেন- কার্তিক নানা। কারন, তিনি ছিলেন খুব শান্ত আর তাঁর ধৈর্য ছিল অপরিসীম- না হলে আমার মতো এমন একজন (!) নাতনীকে সামলাবেন কি করে! আমার সব উল্টা-পাল্টা আবদার তিনি হাসিমুখে মেনে নিতেন, অন্য নানারা যখন দরকারে আমার নানার কাছে আমার নামে নালিশের পেটরা খুলতেন, কার্তিক নানা তখন মুখে কুলূপ এঁটে রাখতেন। নানার বাসায় বাজার করা আর আমাকে কোলে-কাঁখে-কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর জন্য ছিলেন হান্নান ভাই। তো এভাবে সবার কোলে-কাঁখে-কাঁধে করে ঘুরে ফিরেই কাটছিলো আমার দিন। যখন সময় এলো পড়াশুনা শুরু করার বিপত্তিটা বাঁধল তখনই। নানা-নানু, মামা-মামীমা, আমার মা সবাই নানাভাবে চেষ্টা শুরু করলেন আমাকে শিক্ষার আলোতে আনতে কিন্তু অচিরেই ব্যর্থ হলেন। তাঁরা সবাই দ্রুতই বুঝতে পারলেন – ঠিক traditional way টা আমার শিক্ষা শুরুর জন্য উপযুক্ত নয়। খোঁজ খোঁজ, চারিদিকে খোঁজ পড়ে গেলো আমার জন্য এমন একজন শিক্ষাগুরুর যিনি সক্ষম হবেন আমার সিকোলজী বুঝতে, আমার মুড বুঝতে আর আমার ভেতর input দেবার proper way টা খুঁজতে ।
মা, নানা, মামারা খুঁজে খুঁজে অবশেষে পেয়েও গেলেন এমন একজনকে – তিনি হরিপদ স্যার। তিনি আমার মায়েরও শিক্ষক। মা বললেন-“ স্যার এর মুখে সারাক্ষন হাসি লেগেই থাকে; দেখতে সুন্দর আর উনার ধৈর্য ও অসম্ভব বেশী। পারলে এক উনিই পারবেন ওকে (আমাকে) ম্যানেজ করতে।“ হলোও তাই, আমার মায়ের বিশ্বাসই সত্যি হল। হরিপদ স্যার এলেন, হাসলেন, কাছে ডাকলেন, কোলে নিলেন, গল্প করলেন, বন্ধু হলেন তারও অনেক পরে আমার শিক্ষাগুরু হলেন। স্কুলে মর্নিং শিফটে ছিল স্যার এর ক্লাশ। স্কুল শেষে প্রতিদিন তিনি ১০.৩০ এর দিকে নানার বাসায় আমাকে পড়াতে (!) আসতেন। এসেই কতক্ষন আমাকে কোলে নিয়ে ঘুরতেন, তারপর কোলে করেই নানার বাসার দো-তলার স্টাডি রুমে নিয়ে যেতেন এটা-সেটা গল্প করতে করতে। স্টাডি রুমে নিয়ে গিয়েও কতক্ষন গল্প শোনাতেন, স্টাডি রুম এরই এক কোনে রাখা আমার পুতুলের বাক্সগুলো আনতে বলতেন (আমার মামাদের বড় বড় “বাটা” জুতার ২/৩ টি বাক্সে ছিল আমার পুতুলের সংসার)। স্যার আর আমি মিলে পুতুলগুলোর গতকালের কাপড় পাল্টে দিতাম, ওদের সংসারের খোঁজ খবর নিতাম, ওদের সংসারের গল্প বানাতাম.........এরপর আমার মর্জি হলে, মর্জি হতো- স্যার মর্জি তৈরি করতেন। মর্জি হবার পর কিছুক্ষন পড়তাম, কিন্তু সমস্যা হল দ্রুতই আবার মর্জি চলে যেতো। তখন আবার আমার মাথায় ভর করতো “বিউটিশিয়ান”। হরিপদ স্যারকে আমি ডাকতাম “দাদু”। দাদুকে তখন বলতাম-“ দাদু, আমার সাজুনীবাক্স টা নিয়ে আসি নীচ থেকে, একটু দাঁড়াও।“ দাদু বলতেন-“আবার সাগুনীবাক্স কেন?” আমি বলতাম-“হুম, অনেক পড়েছি। এখন আমি তোমাকে সাজাবো।“ শুনে দাদু হেসে ফেলতেন আর বলতেন-“ যা রে পাগলী যা, নিয়ে আয় তোর সাজুনীবাক্স।“ দো-তলা থেকে এক ছুটে চলে যেতাম নীচতলায়। নীচে নেমে হয়তো ভুলেই যেতাম দাদুর কথা, রাস্তায় নেমে পড়তাম পাড়াতো ছোট মামাদের সাথে “ডাংগুলি” বা “সাতচারা” খেলায়। কিছুক্ষন অপেক্ষা করে দাদু দো-তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তাঁর তথাকথিত ছাত্রীর (!), মানে আমার কারয-কলাপ দেখতেন আর হাসতেন। দো-তলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে থেকেই হাসতে হাসতে ডাকতেন – “কই দাদুভাই, এবার আয় না, তোর সাজুনীবাক্সটা নিয়ে চলে আয়।“ “ডাংগুলি” তে একটা চাটি হয়তো মারা হয়েছে, দাদুর ডাক শুনে তখন আবার মনে পড়ে যেতো আমার “সাজুনীবাক্সের” কথা। দাদু ডাকছেন, মহা উৎসাহে তখন “সাজুনীবাক্সটি” নিয়ে চলে যেতাম দো-তলায় দাদুকে সাজাতে। হাঃ হাঃ.........এবার আমার “বিউটিশিয়ান” হবার পালা। এবার আমার “বিউটিশিয়ান” গিরি খেলার সামগ্রী হবেন হরিপদ দাদু, মানে experiment টা চালাবো তাঁর উপর দিয়েই। দাদু একদম নড়চড়া করতেন না, উনার চেয়ারে চুপটি করে বসে থাকতেন আর আমি উনার মুখে পাউডারের পাফ বুলাতাম, আইভ্রু পেন্সিল দিয়ে তাঁর ভ্রু এঁকে দিতাম, চোখে কাজল দিতাম, ঠোঁটে লিপস্টিক দিয়ে দিতাম আর কপালে দিয়ে দিতাম টিপ। কোন কারনে দাদু একটু নড়াচড়া করলেই বিরক্ত হতাম, বলতাম-“উহু, নড়ে না দাদু, চুপটি করে বস। নড়লে কিন্তু মেকআপ নষ্ট হয়ে যাবে। তুমিতো লক্ষ্মীছেলে, নড়োনা দাদু, কেমন?” দাদুও স্মিত হাসি ঠোঁটে নিয়ে চুপটি করে বসে থাকতেন। “বিউটিশিয়ান” গিরি খেলা শেষ হলে দাদু বলতেন- “অনেক তো হল, এবার একটু পড়ি দাদুভাই?” রাজী হতাম, কারন by this time আমার আবার পড়ার মুড চলে আসতো। এভাবে “খেলা আর পড়া” নামক খেলা চলতো দুপুর ১২।৩০/ ১২.৪৫ পর্যন্ত । দুপুরের আজান হলে দাদু নীচে এসে সাবান দিয়ে মুখ ধুয়ে মেকআপ তুলে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা করতেন। উনি বিদায় নেবার আগেও বিশেষ আবদার ছিল- উনার গলা জড়িয়ে ধরে উনার পিঠে চড়ে কিছুক্ষন ঘুরাঘুরি করার। হাসি মুখে দাদু তা-ই করতেন। আজ এত বছর পর যখন সেই দিনগুলোর দিকে তাকাই-চোখ ভিজে আসে, কি করে উনি সহ্য করতেন এসব! “হায়রে! ভালবাসা কাকে বলে!” অক্ষর শিখানোর পাশাপাশি ভালবাসার এক বিরাট দীক্ষাও তিনি আমাকে দিয়েছেন। আমার শিক্ষাজীবনের শুরুটা অর্থাৎ আমার শিক্ষাশুরুর প্রতিটি বর্ণ, প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি শব্দ হরিপদ দাদুর কাছে যেমন ঋণী তেমনি আমার ভালবাসার দীক্ষাও তাঁর কাছে ঋণী । যখন আমি পঞ্চম শ্রেনীতে পড়ি, দাদু মারা যান তখন। আমাদের স্কুল থেকে বিরাট এক শোক মিছিল যায় তাঁর বাড়ির দিকে, তারপর উনার লাশ নিয়ে শ্মশানে। সেই বিরাট শোক মিছিলের অংশ হয়ে সবার সাথে আমি পায়ে পায়ে হেঁটেছি আর ভেতরে ভেতরে ভেঙে হাজার টুকরো হয়ে গেছি। নিজে বুঝেছি, কিন্তু তখন কারো কাছে প্রকাশ করতে পারিনি –“হায়! কি হারিয়েছি আমি!”
(লেখাটি ৪ পর্বে সমাপ্য)
সর্বশেষ এডিট : ১০ ই অক্টোবর, ২০১২ দুপুর ১:১১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




