হরিপদ দাদুর শিক্ষা আমার জন্য এতটাই ফলপ্রসূ হয়েছিল যে- আমি ট্রিপল প্রমোশন পেয়ে স্কুলে সরাসরি ক্লাশ ফোরে ভর্তির সুযোগ পেয়ে গেলাম, যদিও বয়স বিবেচনা করে একসপ্তাহের মাথায়ই আমাকে ডিমোশন দিয়ে ক্লাশ থ্রী তে নামিয়ে দেয়া হয়। ক্লাশ থ্রী তে ভর্তির পর থেকেই জানিনা কিভাবে যেন সবাই আমাকে অলিখিতভাবে “ক্লাশ ক্যাপ্টেন” বানিয়ে দিল। শিক্ষকরাও আমাকে বিশেষভাবে ক্ষমতাইত করলেন। কিন্তু এই ক্ষমতা, মান্যতা কেন যেন আমার তেমন ভাল লাগতো না, আমাকে টানতো না । কারো অনুরোধে নয়, আমি নিজে থেকেই- আমার ও বন্ধুদের সকল নিষ্পাপ অন্যায় (!) সদাসর্বদা শিক্ষকদের চোখের আড়ালে লুকিয়ে রাখতাম। এজন্য নানা ফন্দি-ফিকির করতে হয়েছে, করেছিও। আমাদের ক্লাশে মঞ্জু, ভগবতী ও বন্দনা নামে তিনটি মেয়ে ছিল। এক বন্দনা ছাড়া বাকী দুজন ছিল পড়াশুনায় দুর্বল। প্রায়ই অন্যদের সাথে এ দুজনকেও শিক্ষকদের হাতে শাস্তি পেতে হতো। “ক্লাশ ক্যাপ্টেন” হিসেবে আমার দায়িত্ব পড়তো “বেত” খুঁজে নিয়ে আসা। আমি যেতাম ঠিকই তবে অফিস রুম, বারান্দা, কলপাড় ইতিউতি ঘুরে বেশ খনিকটা সময় পাড় করে ক্লাশে এসে বলতাম –“স্যার/আপা, এত খুঁজলাম কোথাও ‘বেত’ পাওয়া গেল না।“ শিক্ষক বুঝতে পারতেন নিশ্চয়ই কিন্তু কিছু বলতেন না, আমার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে পড়ানোতে মন দিতেন। ক্লাশ হাফ ছেড়ে বাঁচত, যেন।
ক্লাশ ফাইভে আমাদেরকে ইংরেজী পড়াতেন অসম্ভব রুপবান এক পুরুষ রণজিৎ স্যার। খুব ভালো পড়াতেন, আর বড় ব্যাপার হল স্যার এত সরল অথবা এত বুদ্ধিমান ছিলেন যে- আমাদের কাছে, আমার কাছে সারাক্ষন বোকা হয়ে থাকতেন। স্কুলের একেবারে পাশেই উনার বাসা হওয়াতে আমরা সময় - অসময়ে গিয়ে উনার বাসায় হাজির হতাম। তাঁকে প্রায়ই অপ্রস্তুত করে দিতাম। স্যারের ছিল সবুজ চোখ, আমরা উনার বাসায় গেলে স্যার মুখে ধমকের মত করে “এই” বলতেন কিন্তু সেই সবুজ সবুজ চোখে মায়া ছড়িয়ে পরতো । ওই বাসায় মজা ছিল স্যারের মা মানে দিদিমাকে বিরক্ত করা। হুট করে বাসায় ডুকেই বলতাম “দিদিমা, দুটো সন্দেশ দিন; নয়তো আপনার জলের কলস ফুটো করে দিলাম” বলেই এগিয়ে যেতাম উনাদের বারান্দায় রাখা জলের কলসের দিকে। “হা হা” করে উঠতেন দিদিমা; ছুটে যেতেন ঘরে, মিটসেফে রাখা বয়াম থেকে দুটো সন্দেশ হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলতেন-“ আমার সহজ-সরল ছেলেটাকে তোরা এত জ্বালাস কেন? ঘরে ফিরে আমার ছেলেটা দু দন্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ও নিতে পারে না।“ এসব শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা স্যারের রূপমুগ্ধ সদ্য বিবাহিত বালিকা বধূ খিলখিল করে হেসে উঠতেন ।
যখন আমরা ক্লাশ সিক্সে উঠলাম, একদিন শুনলাম-আমাদের বন্ধু বন্দনার ভীষণ অসুখ । কি যে জ্বর হয়েছে, ছাড়েই না। গেলাম ওকে দেখতে। বন্দনা শুকিয়ে কাঠ! মন্টা খুব খারাপ হল । ওকে সান্তনা দিয়ে বললাম – শুধু ওর জন্যই যে কত কত গেইম প্ল্যান আটকে রেখেছি। সুস্থ হয়ে ও যখন স্কুলে আসবে তখন সবাই মিলে একসাথে খেলবো । বন্দনা করুন চোখে আমাদের দিকে তাকিয়ে থাকে আর ম্লান ভাবে হাসে । দিন যায়, সপ্তাহ যায়, মাস যায়-বন্দনা আর স্কুলে আসেনা। একদিন ও চলেই যায়, দূরে, বহুদূরে- না ফেরার দেশে। প্রিয় বন্ধুর জন্য পাগল পাগল লাগে, বুঝাতে পারিনা কাউকে কিন্তু মন চায় – কোথাও কোনভাবে ওর স্মৃতি ধরে রাখি । নিজেই উদ্যোগ নিলাম (তখনকার সামরথ অনুযায়ী) বন্দনার স্মরণে একটি দেয়াল পত্রিকা বের করার । লিখা নিলাম অনেকের, পত্রিকা তৈরি করে বন্ধুর জন্য tribute হিসেবে এটি সেঁটে দিলাম নোটিশ বক্সের কাছে । আমি দূর থেকে দেখি-সবাই পত্রিকা দেখে আর চোখ মোছে। আমার বুকটা হু হু করে উঠে ! কর্কট-ব্যাধি এত নিষ্ঠুর কেন ?
ক্লাশ নাইনে উঠে চলে এলাম বিদ্যাময়ী স্কুলে । আমার বাবা তখন পিএইচ, ডি করার জন্য বিদেশে যাওয়ায় আমার মা চলে যান নানাবাড়ি আর আমাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় বিদ্যাময়ী স্কুলের হোস্টেলে । আমি যে রকম স্বজন – সংলগ্ন মানুষ , তার জন্য আত্মীয় – স্বজনের ভালবাসা ছাড়া, বন্দিত্বে (!) ভরা স্কুল হোস্টেল ছিল একটা কারাগার। ফলে পড়াশুনার প্রতি আমার মনোযোগ উঠলো শিকেয় (!)। যদিও এখানে এসে সাগরেদ হিসেবে পেয়েছিলাম অনিতা (গারো মেয়ে) আর স্বপ্না কে (হাজং মেয়েকে)- জনসেবা (!) / মাতব্বরি (!) করার জন্য। হোস্টেলে মেয়েদের মধ্যে কোন সমস্যা হলে বিশেষতঃ ”পারস্পরিক সম্পর্ক” বিষয়ক, ছোট বড় সবাই আসতো - “তুমিই বলো এখন কিভাবে কি করা যায়!” হোস্টেলের রঙহীন জীবনে এই “পাত্তা” টুকুও মন্দ ছিল না। সাথে তো ছিলই ওই দুই সাগরেদ- অনিতা আর স্বপ্না । সারাদিন এসব করলেও পড়াশুনাটা তো মিনিমাম না করলেই নয়। স্কুলে জ্ঞানবাবু স্যার আমাদের অংক পড়াতেন। হোস্টেলে থাকা অবস্থায় হোস্টেলের মেয়েদের বাইরে প্রাইভেট পড়তে যাবার অনুমতি ছিল না, তাই আমাদের অভিবাবকদের অনুরোধে জ্ঞানবাবু স্যারই হোস্টেলে আসতেন আমাদের পড়াতে । জ্ঞানবাবু স্যার আসেন, যতটা না অংক করার দিকে মনোযোগ তার থেকে বেশি ঝোঁক হল স্যার এর সাথে গল্পের ঝাপি খুলে বসাতে অথবা স্কুল শেষে পড়াতে আসা স্যারকে ঘুমুতে সুযোগ দিয়ে অন্যদের নিয়ে স্যারকে কেন্দ্র করে নাটক সাজাতে।
সময়ের দূরত্বে এসে বুঝি – আপাতঃ সহজ সরল জ্ঞানবাবু স্যার কি এসবের কিছুই বুঝতেন না ? নিশ্চয়ই বুঝতেন, তারপরও কতগুলো বন্দি কিশোরীর (!) মনের দিকে তাকিয়ে হয়তো বুঝে শুনেই উনি ওদের “খোলা জানালা” হতেন।
(লেখাটি ৪ পর্বে সমাপ্য)
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই অক্টোবর, ২০১২ সকাল ১১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।




