এটি 'এফএসআইবি শিশু কিশোর বিজ্ঞান কংগ্রেস ২০১৪' প্রতিযোগিতায় সিনিয়র ক্যাটাগরিতে ২য় হওয়া পোস্টার। পোস্টার বানিয়েছিল টিম ম্যাথমেটিকা। দলনেতা ছিলাম আমি।
-------------------------------------------------------------------
ভূমিকা:
বর্তমান যুগ শিল্পায়ন-নগরায়নের যুগ। শিল্পায়ন-নগরায়নের অবধারিত ফল হিসেবেই কমে যাচ্ছে খেলার মাঠ। তারা নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে কম্পিউটার-মোবাইল গেমসের উপর। শিশু-কিশোরদের এই অবস্থা বিশ্বব্যাপী চিন্তার কারণ হয়ে উঠেছে। কেননা, মানব মস্তিষ্কের উপর কম্পিউটার গেমস এমন কিছু নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে যা তাদের দৈনন্দিন ব্যবহারে খারাপ প্রভাব ফেলছে। আবার অন্যদিকে কিছু ভাল প্রভাব ও আছে যা কিছুক্ষেত্রে তাদের কৌশলি করে তুলছে।
সমস্যাঃ
কম্পিউটার গেমস মানব মস্তিষ্কে কিরকম প্রভাব ফেলে?

কার্যপদ্ধতিঃ
আমরা ৫০ জন গেমারের উপর জরিপ চালিয়েছিলাম। মূলত দুটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালানো হয়। ৭ম থেকে ১০ম শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রী, যাদের বয়স ১২ থেকে ১৬ এর মধ্যে এবং যারা প্রতিদিন গেম খেলে তাদের উপর জরিপটি চালানো হয়। জরিপে মোট সাতটি প্রশ্ন ছিল। প্রশ্নগুলোর মাধ্যমে আমরা তাদের মস্তিষ্কের উপর গেমিং এর প্রভাব বুঝতে চেয়েছি। এরপর প্রাপ্ত তথ্য থেকে ডাটা বিশ্লেষণ করে ফলাফল পেয়েছি।

হাইপোথিসিসঃ
১। কম্পিউটার গেমসের ভাল প্রভাব বেশি
২। কম্পিউটার গেমসের মন্দ প্রভাব বেশি
৩। কম্পিউটার গেমসের ভাল প্রভব কম।
৪। কম্পিউটার গেমসের মন্দ প্রভাব কম।
৫। কম্পিউটার গেমস থেকে শুধুমাত্র ভাল দিক বের করে আনা সম্ভব।
৬। কম্পিউটার গেমস থেকে ভাল দিক বের করে আনতে গেলে কিছু মন্দ দিক ও চলে আসে।

ডাটা বিশ্লেষণঃ
আমরা ১২ থেকে ১৭ বছরের ৫০ জন শিক্ষার্থীর উপর জরিপ চালিয়ে কিছু তথ্য পেয়েছি যা নিচে গ্রাফের সাহায্যে দেখানো হল।










আলোচনাঃ
৩ নং পাই চিত্র থেকে পাই 58.82% শিক্ষার্থী ১ ঘন্টার বেশি একশন গেম খেলে, যা বিজ্ঞদের কাছে ভায়োলেন্ট গেম নামে অভিহিত। ১ সপ্তাহ এসব সহিংস গেম খেলার ফলে বিভিন্ন আবেগিক কাজের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের Left Inferior Frontal Lobe এর কার্যকারিতা কমে যায়। একই সাথে এসব গেম বিভিন্ন হিসাব-নিকাশের কাজে Anterior Cingulate Cortex এর কার্যকারিতা কমিয়ে দেয়।
এসব গেমারদের ৯১.১৮% সেসব ব্যক্তির উপর নানারূপ বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখায় যাদের কারণে তাদের গেম ওভার হয়েছিল। ভায়োলেন্ট গেম খেলার ফলে আক্রমণাত্মক আচরণ বেড়ে যায় যার প্রধান কারণ Prefrontal Lobe এর কার্যকারিতা হ্রাস। যা আমরা দেখতে পাই ৪ নং পাই চার্টে।
আমাদের মস্তিষ্কে কোন ঘটনা তখনই স্থায়ী হয়ে যায়, যখন সে জিনিসটি প্রতিনিয়ত দেখা, শোনা, বলা এবং প্রত্যক্ষ ভাবে কাজটি করা হয়। মানব মস্তিষ্কের সেরেব্রাম অংশটি এসব নিয়ন্ত্রণ করে এবং সেরেবেলাম অংশটি প্রত্যক্ষ কাজ করতে সাহায্য করে। ৫ নং পাই চার্টে দেখা যায় ৬০% গেমার তাদের পড়াশোনার সময় মনযোগের ঘাটতিতে ভোগে। এর কারণ প্রতিনিয়ত গেম খেলার ফলে মস্তিষ্কের ঐ অংশদুটি সক্রিয় হয়ে থাকে। ফলে পড়াশোনায় মনসংযোগের ব্যাঘাত ঘটে। কিন্তু এর ফলে গেমের বিষয়গুলো বেশ কিছুদিন মনে থাকে, যা ৭ নং পাই চার্টের ৭৩.৫৩% শিক্ষার্থী মতামত দিয়েছে।
কম্পিউটার গেমসের চরিত্রগুলো কাল্পনিক, যা বাস্তব জীবনে হওয়া অধিকাংশ ক্ষেত্রে সম্ভব না। সুতরাং, কম্পিউটার গেম খেলার সময় গেমাররা সেসব চরিত্রের উপর মনযোগ না দিয়ে কিভাবে লেভেল পার করা যায়, স্কোর বাড়ানো যায়, গেম ওভার করা যায় সেদিকে অধিক মনোযোগ দেয়। মানব মস্তিষ্কের থ্যালামাস অংশটি ব্যক্তিত্ব ও আচরণের উপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু চরিত্রগুলো অধিকাংশই বাস্তবসম্মত না হওয়ায়, তা থ্যালামাসের উপর প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয় না। যা ৮ নং পাই চার্টে ফুটে উঠেছে।
মস্তিষ্কের Prefrontal Cortex যুক্তি তৈরি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাজ করে। বিভিন্ন ধরণের গেম মস্তিষ্কের এই অংশকে সক্রিয় করে তোলে যার প্রভাব আমরা দেখতে পাই ৬ নং পাই চার্টে। এখানে দেখা যায় ৭৬% গেমারের মতে তারা গেমের কোন না কোন দক্ষতা বাস্তবে প্রয়োগ করতে পারে।
আমাদের পূর্বানুমান ছিল ১ ঘন্টার কম গেমারদের ক্ষেত্রে গেমিং এর খারাপ প্রভাবগুলো পড়ে না। কিন্তু পাই চার্ট নম্বর ৯ এবং ১০ থেকে দেখা যায় এদের উপর খারাপ প্রভাবগুলো কিছুটা কম পড়লেও তার শতকরা পরিমাণ একেবারে কম নয়। সুতরাং আমাদের পুর্বানুমান সত্য হয় নি।
ফলাফলঃ
১। আলোচনা থেকে দেখা যাচ্ছে যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে (যেমনঃ লেখাপড়ায় অমনযোগিতা, আক্রমণাত্মক আচরণ ইত্যাদি) কম্পিউটার গেমস মানব মস্তিষ্কের উপর খারাপ প্রভাব ফেলছে।
২। কিন্তু অল্প কিছু জিনিস (যেমনঃ গেমের বিভিন্ন দক্ষতা, গেমের শিক্ষনীয় বিষয় মনে রাখা) প্রভৃতি ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের উপর গেমসের প্রভাব মন্দ নয়।
৩। ভাল এবং খারাপ প্রভাবগুলো সময়ের উপর নির্ভর করে না। সুতরাং গেমের শুধুমাত্র ভাল দিকগুলো অর্জন করা সম্ভব নয়।
৪। গেমের ভাল দিকগুলো ( যেমনঃ শিক্ষনীয় বিষয় মনে রাখা, দক্ষতা কাজে লাগানো ইত্যাদি ) বই পড়া, মাঠে খেলাধুলা, হাতেকলমে কাজ করার মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।
সিদ্ধান্তঃ
১। কম্পিউটার গেমসের মস্তিষ্কের উপর কিছু ভাল প্রভাব যেমন ফেলে তেমনি কিছু খারাপ প্রভাব ও ফেলে। এবং খারাপ প্রভাবের সংখ্যা ভাল প্রভাবের চেয়ে বেশি।
২। গেম খেলার সময় সীমিত রাখলে সময়ের অপব্যবহার হয় না। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, গেম সীমিত সময়ে খেললেও খারাপ প্রভাবগুলো পড়ে কিন্তু এর হার গেম আসক্ত দের চেয়ে কম। অর্থাৎ, গেমের শুধুমাত্র ভাল দিকগুলো বের করে আনা সম্ভব নয়। সাথে কিছু খারাপ প্রভাব অবশ্যই চলে আসে।
৩। তাই সার্বিক কল্যাণের জন্য আমাদের ভিডিও গেম খেলা ছেড়ে দেয়া উচিৎ। এর বদলে অবসর সময়ে উচিৎ মাঠে গিয়ে খেলা অথবা শিক্ষনীয় বই পড়া।
৪। সুতরাং হাইপোথিসিসের ২, ৩, এবং ৬ নং পয়েন্টগুলো সত্য।
তথ্যসূত্রঃ
1. http://en.m.wikipedia.org/wiki/Game_brain
2. Click This Link
3. Click This Link
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ
আমাদের কাজে অনেকেই আমাদের সহযোগিতা করেছেন। তাদের কাছে আমরা ঋণী। বিশেষ করেঃ
-মোহাম্মদ আলী খন্দকার; পরিচালক, রেডন।
-মোঃ আবু সোহেল রানা; স্নাতক ৩য় বর্ষ, দিনাজপুর সরকারী কলেজ।
-জোনায়েদ ইসলাম জজ; ইইই ডিপার্টমেন্ট, ২য় বর্ষ, আমেরিকান ইন্ট্যারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।
-হাসিবুল আমিন হিমেল; কোর টিম-মেম্বার, সিএস কংগ্রেস।
-শিবলী বিন সারোয়ার; ইইই ডিপার্টমেন্ট, ৪র্থ বর্ষ, আমেরিকান ইন্ট্যারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ।


অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

