অধ্যায় এক
সমুদ্রের হাতছানি
সেই ছোটোবেলা থেকেই নাবিক হবার স্বপ্ন আমার দুচোখে। কিংবা বলা যেতে পারে কোনো বড় জাহাজের ক্যাপ্টেন। ক্যান্টেন ব্লাই, ক্যাপ্টেন উইলিয়াম ব্লাই! ইংল্যান্ডের প্লাইমাউথে বসবাসকারী এক ছোট্ট ছেলের ইচ্ছে পৃথিবীর মানুষ একদিন ঝানু নাবিক হিসেবে তাকে একনামে চিনবে।
ষোলো বছর বয়সে শুরু হয় আমার নাবিকজীবন। বুদ্ধিমত্তা, তীক্ষ্ন দৃষ্টি এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতার কারণেই আমি রাতারাতি সমুদ্রের খুঁিটনাটি সব বুঝে ফেলি একজন ঝানু নাবিকের মতোই।
1771 সালের কথা। ইংল্যান্ডকে তখন বলা হতো সমুদ্রের রানী। বৃটিশ নাবিকরা তখন পৃথিবীর ইতিহাসে নিজেদের জায়গা প্রতিষ্ঠিত করে নিয়েছে। সাদা ফেনার টুপিওয়ালা সমুদ্রের ওপর দিয়ে আমাদের নৌযান উত্তর আমেরিকা থেকে ভারত পর্যন্ত গর্বের সাথে চলাফেরা করতো।
বৃটিশ নৌবাহিনীতে জাহাজীজীবন তখন মোটেই সহজ ব্যাপার ছিলো না। খুব কঠিন পরিশ্রমের কাজ এবং নিয়মকানুনগুলোও খুব কড়া। আইনের হাত থেকে পালিয়ে বেড়ানো এবং রাস্তা থেকে অপহরণ করে আনা আজেবাজে লোকগুলোকে দিয়ে তখন করানো হতো নাবিকের কাজ।
জাহাজের নাবিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়তো প্রায়ই। জাহাজ সচল রাখতে এদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা না করে উপায় ছিলো না। খাবার পচে যেতো প্রায়ই, ফলমূল তো পাওয়াই যেতো না। খাবার পানি এবং ফলমূল আগে থেকেই এনে জড়ো করা হতো জাহাজে যাতে পরে এগুলোর অভাব দেখা না দেয়। কারণ এগুলোর অভাবে মৃতু্য পর্যন্ত হতো নাবিকদের। তাছাড়া কঠিন অসুখ স্কার্ভিও দেখা দিতো। স্কার্ভি রোগ হলে দুর্বল হয়ে পড়তো নাবিকেরা। দাঁতের মাঢ়ি নরম হয়ে যেতো। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ছুটতো যার করুণ পরিণতি হচ্ছে মৃতু্য।
কিন্তু এই কঠিন জীবনটাকেই আমি উপভোগ করতে শুরু করলাম। আমি রপ্ত করে ফেললাম কী করে নিরাপদে মগ্ন চড়া এবং পাথুরে উপকূলের পাশ দিয়ে কৌশলে জাহাজ চালিয়ে নিতে হয়।
আমার বয়স তখন বাইশ। সেই সময় পৃথিবীবিখ্যাত ক্যাপ্টেন জেমস্ কুক-এর তৃতীয় এবং সর্বশেষ সমুদ্রযাত্রায় তার জাহাজের সেইলিং মাস্টার হিসেবে সুযোগ পেলাম আমি। কুকের পছন্দের পাত্র হওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। তার জাহাজে চড়েই বহুদূরের সাউথ সি আইল্যান্ডে এলাম। সেই সময়টা আমি নিজের ভাগ্য নিয়ে দিবাস্বপ্ন দেখে চলছিলাম। কিন্তু ওই জায়গার কিছু কিছু ঘটনা পরবর্তীতে আমার জীবনটাকে পাল্টে দেয়।
দ্যা রেজোলুশন জাহাজের সেইলিং মাস্টার হিসেবে প্রতিদিনের জাহাজ চালানোর ব্যাপারগুলো আমাকেই দেখতে হতো। আমাদের সঙ্গেই সমুদ্রে নেমেছিলো ক্যাপ্টেন চার্লস ক্লার্কের নিয়ন্ত্রনাধীন জাহাজ ডিসকোভারি। সমুদ্রের স্রোত, বাতাস ইত্যাদি বোঝার জন্যে আমাকে জাহাজের প্রতিটি লাইন বুঝতে হতো। আলাদা আলাদা করে প্রতিটি পাল এবং এগুলোর সমন্বয় বুঝতে হতো যাতে জাহাজটাকে আমি আমার ইচ্ছেমতো চালাতে পারি। আমার পদটা দায়িত্বপূর্ণ এবং উপভোগ্যও বটে।
আমরা নর্থওয়েস্ট প্যাসেজ খুঁজছিলাম। এই জলপথটি কানাডা ও উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল হয়ে প্রশান্ত মহাসাগর থেকে আটলান্টিক পর্যন্ত বিসতৃত।
ক্যাপ্টেন কুক এবং আমি ঘন্টার পর ঘন্টা ব্যস্ত থাকতাম লগ এবং নকশা নিয়ে। স্রোতের গতিধারা পুরোপুরি লিখে রাখছি খাতায়। আমরা এই প্রথম উত্তর আমেরিকার আকার হিসেব করে বের করি। পূর্ব-পশ্চিমে এটা চার হাজার মাইল বিসতৃত।
আমরা উত্তর দিকে জাহাজ চালিয়ে নিলাম হাওয়াই দ্বীপের উদ্দেশে। ওখানে গিয়ে বিশ্রাম করতে হবে। জাহাজের কিছু টুকিটাকি সারাইয়ের কাজও আছে। আমাদের খাবারও প্রায় শেষের পথে। একটা অপরিচিত দ্বীপের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দ্বীপটা দেখতে অনেকটা সমুদ্রের বুকে ভাসমান একটা টুপির মতো। জেমস কুক আমার নাম অনুসারে পরে এই দ্বীপের নাম দিয়েছিলেন 'ব্লাইস ক্যাপ'।
1779 সালে আমরা যাত্রা করলাম কিলাকেকুয়া বে-এর উদ্দেশ্যে। এখানেই আমার সাহসী ক্যাপ্টেন, যিনি ছিলেন একাধারে আমার শিক্ষক এবং বন্ধু, খুন হয়েছিলেন আদিবাসীদের হাতে। তাদের ধারণা তিনি ছিলেন ঈশ্বরের প্রতিনিধি এবং অন্য কোনো রূপ ধরে আবার তাদের কাছে ফিরে আসবেন। এই ভয়ানক ঘটনার সময় সমুদ্রপাড়ে ফাঁদে ফেলা কিছু নাবিকের কমান্ডার ছিলাম আমি। জাহাজের মাস্তুল ঠিক করার পর আদিবাসীদের সঙ্গে বিচ্ছিন্নভাবে লড়াই করতে করতেই জাহাজে ফিরে আসতে পারি আমরা। ডিসকভারি জাহাজের ক্যাপ্টেন ক্লার্ক জাহাজের দায়িত্ব নেবার পর আবার শুরু হলো আমাদের যাত্রা।
প্রায় চার বছর সমুদ্র যাত্রার পর আবার ফিরে এলাম ইংল্যান্ডে। ইংল্যান্ড তখন তার উপনিবেশ ফ্রান্স, স্পেন এবং হলান্ডের সাথে ভয়াবহ যুদ্ধে লিপ্ত। আমাকে একটি নৌবহরের মাস্টার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয় এবং অল্প দিনের মধ্যে আমি উত্তর সাগরে একটি ভয়াবহ যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ি। দুমাস পর আমি লেফটেন্যান্ট হয়ে যাই। এবং চাকরির সাত-আট বছর বয়সে কমিশন পেয়ে সর্বোচ্চ মর্যাদা লাভ করি।
যুদ্ধ তখন শেষ হয়ে গেছে। আমার স্ত্রী এবং পরিবারের খরচ মেটানোর জন্যে একটা বাণিজ্য জাহাজে আমি কমান্ডারের চাকরি নেই। জাহাজটি ওয়েস্ট ইন্ডিজে ব্যবসার কাজে যাওয়া-আসা করতো। বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী স্যার জোসেফ ব্যাংক ক্যাপ্টেন কুকের প্রথম সমুদ্র যাত্রায় সঙ্গী ছিলেন। তিনি দক্ষিণ সাগরের তাহিতি থেকে ওয়েস্টইন্ডিজে ব্রেডফ্রুট নামে এক প্রকার পলিনেশীয় বৃক্ষের ফল (যা আগুনের তাপে রুটির মতো হয়) এর গাছ লাগানোর প্রকল্প হাতে নেন। কৃষ্ণাঙ্গ কৃতদাসরা যাতে সস্তায় পুষ্টিকর খাবার পেতে পারে সেজন্যেই তিনি এই উদ্যোগ নিয়েছিলেন। ব্রেডফ্রুট বা রুটিফল এতো বেশি পরিচিত ছিলো যে ক্যাপ্টেন কুকের নিজের লেখা একটা বর্ণনার উদ্বৃতি দিলেই সেটা বোঝা যাবে_
'রুটিফল জন্মায় এক প্রকার বড় গাছে। এই গাছের পাতা প্রায় দেড় ফুট লম্বা, রং গাঢ় সবুজ এবং অনেকটা ডিমাকৃতি দেখতে। ফলটা দেখতে খানিকটা বাচ্চাদের মাথার মতো। গাছের ডালে আপেলের মতো ঝুলে থাকে এই ফল। এর রঙ যখন সবুজ এবং শক্ত হয়ে যায় তখন আদিবাসীরা গাছ থেকে ছিঁড়ে আনে। এরপর তারা একটা চুলায় ওপরে এটাকে ধরে রাখে যতোক্ষণ না এর চামড়া পুড়ে কালো হয়ে যায়। কালো আস্তরণ সরিয়ে ফেলার পর একটা নরম আবরণ বের হয়। এর ভেতরটা নরম এবং সাদা। অনেকটা রুটির মতো দেখতে। এভাবেই আদিবাসীরা তাদের প্রিয় রুটিফলের চাষ করে।'
ব্যাংকস জানতো আমার ষোলো বছরের সমুদ্র জীবনে চার বছরই কেটেছে প্রশান্ত মহাসাগরে নানান অভিযানে। সে আমাকে উপদেশ দিলো ব্রেডফ্রুট বহনকারী কোনো বাণিজ্য জাহাজের নেতৃত্ব দিতে যে জাহাজ তাহিতি থেকে দক্ষিণ আমেরিকার কেপহর্ন হয়ে উত্তরে ওয়েস্টইন্ডিজে ব্রেডফ্রুট নিয়ে আসবে।
এর জন্যে বাছাই করা হলো বাউন্টি নামের একটি জাহাজ। আর যে সমুদ্রযাত্রা আমি শুরু করি তা আমার জীবনে সবচেয়ে দীর্ঘ এবং সবচেয়ে ভয়াবহ এক অধ্যায়। আমার স্মৃতিতে সেই সব স্মৃতি এখনও স্পষ্ট। ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ে এক একটা ঘটনা_ পাম গাছের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া উষ্ণ মিষ্টি বাতাস, সূর্যের উত্তাপে পুড়ে তামাটে হয়ে যাওয়া আদিবাসী নরনারী, সবগুলো পাল উড়িয়ে ছুটে চলা আমার জাহাজের সৌন্দর্য, জাহাজের প্রত্যেকেই যে যার দায়িত্ব পালন করছে.... তারপর হঠাৎ এসব চেনা মানুষগুলোর আমার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা। আমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিলাম না এই অভু্যত্থান, এই বিদ্রোহের কী কারণ!
সর্বশেষ এডিট : ৩১ শে ডিসেম্বর, ১৯৬৯ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


