somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

আধুনিক পুজিবাদ ও মালিকানা সমস্যা

২৪ শে এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১০:১২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :



পুজিবাদ আর সাম্যবাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় পার্থক্যগুলোর একটা হচ্ছে মালিকানা। যেখানে সাম্যবাদে ব্যাক্তি মালিকানা বলতে কিছু নেই, সেখানে পুজিবাদ দাড়িয়েই আছে ব্যাক্তি মালিকানার উপর। কিন্তু আদৌ কত ভাগ মালিকানা আছে আপনার নিজের ব্যবহার্য পণ্যের উপর? সময়ের সাথে সাথে পুজিবাদই কি আরও মন্দের দিকে যাচ্ছে? ব্যাক্তিজীবনে সেটার সাথে আমাদের সম্পর্কটাই বা কি?


একটা সময় পুজিবাদ ছিল আদর্শভাবে যেভাবে এটাকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ঠিক তেমন। সুবিধার ব্যাক্তি মালিকানার পরিবর্তনে মুনাফা ও আয়ের মাধ্যমে সম্পদ বৃদ্ধি করার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। টাকার বিনিয়মে স্থানীয় বাজার থেকে চাল কেনা, কাঠমিস্ত্রি দিয়ে ফার্নিচার বানাতে দেয়া ইত্যাদি আদর্শগতভাবে সেই পুজিবাদি ব্যবস্থার রুট-লেভেল উদাহরন হতে পারে। এখানে মালিকানার সম্পূর্ণভাবে আপনার হয়ে যায়। আপনি সেই ফার্নিচার ব্যবহার করবেন নাকি নদীতে ভাসায় দিবেন সেটা একান্তই আপনার ইচ্ছা। আর এটা এক হিসেবে ভাল। যখন কোন পরিবর্তন প্রয়োজন হয় তখন চাইলেই নিজের মত করে পরিবর্তন করা যায়। কোন কাঠমিস্ত্রির এখানে কোন আপত্তি থাকবে না কেনার পর আপনি সেটা কি করবেন। কিন্তু এখন মালিকানার গঠন একেবারেই বদলে গিয়েছে। আর সেটা নিয়েই যত সমস্যা।


বর্তমান সময়ে আমাদের অধিকাংশ জিনিসেরই ইলেক্ট্রনিক বিকল্প এসেছে। আগে মানুষ ঘড়ি কিনে অ্যালার্ম সেট করে ঘুমাতো। এখন মোবাইলেই সেই কাজ করা যায় একাধিকবার করা যায়। এভাবে সংবাদপত্র, ক্যাসেট প্লেয়ার, বইপত্র, নোটখাতা-ডায়েরি, চিঠিপত্র এমনকি মুদ্রা পর্যন্ত রূপান্তরক হিসেবে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমকে খুজে পেয়েছে; নির্ভরযোগ্য, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সহজে পরিচালনা করার পন্থা হিসেবে। কিন্তু মালিকানা আর আপনার হাতে নেই। যে অডিও প্লেয়ার অ্যাপ আছে, কিন্তু সেটার প্রিমিয়াম সেবা ক্রয় করার পরও আপনি সেটাকে পরিবর্তন করতে অক্ষম। আপনি যখনই অ্যাপটা কিনেন তখন টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশনের মাধ্যমে আপনি অ্যাপ ডেভেলপারের সাথে একমত হন যে আপনি শুধু তাদের সেবাই ব্যবহার করবেন, কোন পরিবর্তন করা চুক্তি ভঙ্গ করার সামিল ও শাস্তিযোগ্য অপরাধও বটে। শুধু অ্যাপ না, আপনার কেনা মোবাইল, এমনকি আধুনিক সময়ের রিয়েলস্টেট কোম্পানিগুলোও পুজিবাদের মালিকানার কনসেপ্টটাই বদলে ফেলেছে।


প্রাথমিকভাবে চিন্তা করলে এটাকে বড় সমস্যা মনে হবে না। "মালিকানা নাই তো কি হয়েছে? আমি স্বাচ্ছন্দ্যের সাথেই আগের থেকে বেশি সুবিধা পাচ্ছি"। প্রযুক্তির উন্নয়নের সাথে সাথে সুবিধার উন্নতি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আদৌ কি মালিকানার অভাবে আমাদের সুবিধা বেশি হচ্ছে? চিন্তা করে দেখুন, প্রতিটা মানুষ এক একটা ভিন্ন কেস। একই সেবাতে যে ভিন্নতা আপনি আশা করছেন আপনার বন্ধুর হয়তো সেটা লাগবে না। কিন্তু কোম্পানি দিচ্ছে হাতেগুনা কিছু অপশন। যদি নিজেদের কাস্টমাইজ করার প্রথা চালু থাকতো তাহলে আরেক প্রকারের সংস্কৃতির উদয় হত। সামগ্রিক উদ্ভাবন। সবাই তখন উদ্ভাবনের নেশায় মগ্ন থাকতো, যে সেবা আমরা এখন পাচ্ছি তার থেকে শতাব্দী এগিয়ে যেতাম আমরা, সকল ক্ষেত্রেই। তখন কোম্পানিগুলোর থেকে উদ্ভাবকরাই বেশি সংবাদে জায়গা করে নিত । এমন সংস্কৃতিই হতো বুদ্ধিমান মানবসমাজের আদর্শরূপ। কিন্তু হচ্ছে ঠিক বিপরীত।


একটা সামান্য উদাহরন দেই, জন ডেরে; একটা যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিজ যন্ত্রপাতি তৈরিকারন ব্র্যান্ড। তারা কৃষকদের কাছে ট্র্যাক্টর বিক্রি করে। এখন সমস্যা হচ্ছে সেটার কোড হচ্ছে প্রপাইটরি, মানে কোম্পানিই শুধুমাত্র সেটার উন্নতিকরন ও পরিবর্তন করতে পারবে। কৃষক নিজে পরিবর্তন করলে সেটা অবৈধ ও দণ্ডনীয় অপরাধ হবে। এখন স্বল্প আয়ের কৃষক উন্নততর ও সাশ্রয়ী অন্য ব্র্যান্ড-এর ট্রান্সপ্লেন্টার লাগাতে পারছে না। কারন ট্র্যাক্টরের কোড পরিবর্তন করা যায় না। ফলে অন্য কোম্পানির ট্রান্সপ্লেন্টার এই ট্র্যাক্টরের Diagnosis Software এর কারনে একেবারেই অকেজো। তাই কৃষকরা বাধ্য হয়ে পুরাতন পদ্ধতির ব্যবহার করছে। যেখানে চায়নার একই সমস্যা সমাধান হচ্ছে কোডকে ওপেনসোর্স করায়। ঝামেলাহীন উন্নততর পদ্ধতির ব্যবহারের মাধ্যমে যে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে সেটা দিনশেষে পণ্যের দামেও একটা প্রভাব ফেলছে। ফলে সবাই স্থিতিশীল ও ক্রয়ক্ষমতার মধ্যেই কিনতে পারছে। এটা থেকে খুবই সহজেই বুঝা যাচ্ছে কোম্পানিগুলো উগ্র প্রতিযোগিতার অজুহাতে পুজিবাদের মালিকানার কনসেপ্টকে পরিবর্তন করে শুধুই যে উদ্ভাবনের স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করছেনা; সাথে সাথে আমাদের অন্যায্যতা ও শোষণেরও কারন হচ্ছে; যা ক্রমশ আরও বিস্তৃতি লাভ করেছে।


পৃথিবীর ১% ধনীরা এখন পৃথিবীর ৯৯% সম্পদের মালিক, লাল বিপ্লবের যুগেরও এত খারাপ অবস্থা ছিল না। আমি এমন ৫টা কোম্পানির নাম বলতে পারবো যেগুলো বন্ধ হয়ে গেলে অধিকাংশ মানুষই বিশাল ব্যাক্তিগত জিনিস হারিয়ে ফেলবে। সহজেই বোঝা যায় এইসব বড় কোম্পানি যাদের উচিতই না আমাদের ব্যাক্তিগত জিনিসের মালিকানা রাখার, তারা আমাদের স্বাচ্ছন্দ্যের সুযোগ নিয়ে কতটা গভীরভাবে আমাদের সবকিছুতে জায়গা করে নিচ্ছে। আমাদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে যাচ্ছে আর উল্টো আমরা তাদের উপর চরমভাবে নির্ভরশীলও হচ্ছি। এখন অধিকাংশ দেশগুলোই সমাজতন্ত্র ও পুজিবাদের ভাল দিকগুলো গ্রহণ করে রাষ্ট্রগঠন করার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু পুজিবাদী শোষণশক্তির বিষ কোন অংশে কমছে না, বরং বাড়ছে।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে এপ্রিল, ২০১৭ রাত ১০:১৩
০টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

মার্কিন সেনা কর্মকর্তা কর্মকর্তার মেজর নিদাল্ল হাসানের মৃত্যুদণ্ড.....

লিখেছেন জুল ভার্ন, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ দুপুর ২:৩২



নিদাল হাসান (পুরো নাম: নিদাল মালিক হাসান) হলেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর একজন সাবেক মেজর এবং মনোরোগ বিশেষজ্ঞ (Psychiatrist)।

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে সংগঠিত এক... ...বাকিটুকু পড়ুন

আপার ফিরে আসার পদ্ধতি কি?

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ বিকাল ৫:২৩



আপা কেন ভারতে বেড়াতে গেলেন সেটা সবাই জানে। আগামী ডিসেম্বরে আপা দেশে ফিরে আসার আগ্রহের কথা জানিয়েছেন সেটাও সবাই জানে। আপা কিভাবে দেশ থেকে রাষ্ট্রীয় সফরে ভারতে গেলেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কি আসলেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন?

লিখেছেন অন্তর্জাল পরিব্রাজক, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৮:৪৪



“রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করেছিলেন “, “মূর্খের দেশে আবার কীসের বিশ্ববিদ্যালয়” – এসব প্রচারণা আমাদের দেশে অনেকদিন ধরেই হয়ে আসছে। বিশেষ করে ফেসবুকে আকছারই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১৯৭১ঃ নদী-নালায় ভেসে থাকা স্বদেশের কান্নাঃ শহীদদের প্রতি নিবেদিত একটি কাব্যগাথা জাতির রক্ত, অশ্রু ও স্বাধীনতার অমর ইতিহাস

লিখেছেন ডঃ এম এ আলী, ১০ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৫


পঁচিশে মার্চ ১৯৭১
রাত্রি তখন গভীর, নগরীর বাতিগুলো
যেন অনাগত বিপদের সামনে অসহায়
ঢাকার আকাশে হঠাৎ গর্জে উঠল কামান
ট্যাংকের চাকার নিচে কেঁপে উঠল রাজপথ
গুলি ছুটে গেল মানুষের ঘুমন্ত জানালায়
আগুন ছড়িয়ে পড়ল... ...বাকিটুকু পড়ুন

শরিয়াতন্ত্রের নিষ্ঠুরতা, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও নৈতিক দেউলিয়াপনা

লিখেছেন শ্রাবণধারা, ১১ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১২:৪৭


পৃথিবীজুড়ে মুসলমানদের প্রতি ঘৃণা বাড়ছে। এই বিদ্বেষ শুধু ইসরায়েল বা তার পৃষ্ঠপোষক ডানপন্থী দেশগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কানাডার মতো তুলনামূলকভাবে মধ্যপন্থী এবং ফিলিস্তিনের প্রতি জোরালো রাজনৈতিক সমর্থন থাকা আয়ারল্যান্ডের মতো... ...বাকিটুকু পড়ুন

×