গতকাল রাতে ঘুমাইছিলাম ৩ টার পরে। সকাল ৯ টায় ঘুম ভাঙ্গলো বাংলালিংক কল সেন্টার এর এক রমণীর কলে, ওরা এখন হয়তো বোঝে “সময়ের এক ফোট আর অসময়ের দশ ফোট”। সাড়ে দশটায় অফিসে গেলাম, অফিস শেষ হল ৫ টায় তারপর বাসায় আসতে আসতে আব্বু কল দিলো, বললো ছোট ফুফার অবস্থা হয়ত খুব খারাপ, যেন আমি যাই।
পকেট এ তেমন টাকা ছিলোনা, টাকা জোগাড় করে যখন সোহরাওয়ার্দী হসপিটাল এর দিকে রউনা হলাম তখন বাজে ৭.১৫। স্টার কাবাব থেকে নান রুটি আর কাবাব নিলাম ফুফু-ফুফার জন্য।
আব্বুর ফোনে যেমনটা শুনছিলাম ফুফু ও তেমন ই বললেন। ১% সম্ভবনা যক্ষ্মা আর ৯৯% সম্ভবনা ক্যান্সার! আমার বাবার ব্লাড ক্যান্সার ধরা পড়ছে ৩ বৎসর হল তাই ফুফার কথা ভাবতেই সারাদিনের ক্লান্ত শরীর যেন পাথর হয়ে গেল। স্তব্ধ হয়ে গেলেও মাথা আর মন দুটাই ব্যাস্ত থাকলো ফুফার চিন্তায়।
রিকশা ঠিক করলাম ধানমণ্ডি ফিরব বলে। ৩০ টাকায় রাজি হচ্ছিল না, ৪/৫ জনের পরে একজন ৩৫ চাচ্ছিল। তারপর সে ৩০ এ রাজি হল। দামাদামির সময় লক্ষ করছিলাম লোকটা কিছুটা তোতলা অথবা অন্য কোন উচ্চারণগত সমস্যা আছে। তাতে কি আসে যায়! পরশুদিন রাতে যখন রিকশায় ধানমণ্ডিতে ফিরি তখন রিকশাওয়ালার সাথে অনেক কথা বলছিলাম। কিন্তু আজ আমি ছিলাম অনেক ক্লান্ত আর ফুফার চিন্তায় বিভোর, তাই কথা হলনা তোতলা রিক্সাওয়ালার সাথে!
রিক্সাটা তখন মোহাম্মদপুর বাস স্ট্যান্ড এর পাশের মিনা বাজার এর মোড়ে, রাস্তাটা পার হবার পথে। সবথেকে বামের রিক্সাটা পার হয়ে গেল, মাঝে ছিল একটা কার। আর আমার রিক্সাটা সবথেকে ডানে। এতোটুকুই শুনতে পেলাম যে, আমার রিকশাওয়ালা কারের (১) ড্রাইভার কে উদ্দেশ্য করে বললো “এই চালা”।
।
।
।
তারপর শুঠাম দেহের কারের ড্রাইভার (হয়ত মালিক!) কারের ভিতর থেকেই তার সিলেটী বেতের লাঠিটা বের করে রিকশাওয়ালাকে দুইটা বাড়ি দিলো। (অতো মোটা লাঠি আমি কখনো কোন কারে দেখি নাই। কমপক্ষে দেড় ইঞ্ছি ব্যাস হবে।) আমি যেন তখন অন্য কোন ভুবনে আছি, আমি ভেবেই পাচ্ছিলাম না যে কি কারনে কারের ড্রাইভার লোকটা রিকশাওয়ালাকে মারল। রিকশাওয়ালা হাত জোর করে ক্ষমা চাইতে থাকলো আর ড্রাইভার লোকটি কার থেকে লাঠি নিয়ে বের হবার উপক্রম হল। আমার রিকশাটার থেকে কার টার দূরত্ব এক ফুট এর মতো ছিল তাই ড্রাইভার লোকটার বের হতে সমস্যা হচ্ছিলো, তবু সে গাড়িতে দাগ পড়বে জেনেও ধাক্কা দিয়ে কার এর দরজা খুলল এবং বের হয়ে গরু পিটানোর মতো রিকশাওয়ালাকে পিটানো শুরু করল। আমি তখনো নিস্তব্ধ শুধু ভাবছি “এই চালা” কথাটা বলা এততাই অন্যায় হল!
আমি কি গর্দভ একবার মনেও পড়ল না, বললাম ও না যে; রিকশাওয়ালা লোকটা তোতলা, হয়ত সে কোন দূরের গ্রাম থেকে এসেছে যেখানে সবাই সবাইকে তুই করে বলে। সেই ক্লিষ্ট দেহটায় ড্রাইভার লোকটা ৮ থেকে ১০ টা বাড়ি মারল। তার পিঠে, বুকে, পায়ে মারল। ড্রাইভার লোকটা যখন ক্লান্ত হয়ে মারা শেষ করল তখন রিকশাওয়ালা লোকটার দাঁড়ানোর শক্তি নাই। একটা লোক ও ড্রাইভার লোক টাকে থামানোর চেষ্টা করল না, কোন প্রতিবাদ হল না। তখন আমার কান যেন আমার সাথে বিশ্বাস ঘাতকতা করল, সে শুনতে পেল কেউ একজন বলছে “এতো আস্তে মারে নাকি”! (২) ৪০/৫০ সেকেন্ড পরে সে তার রিক্সাটা ঠেলে পিছের দিকে নিলো, আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম রিক্সা চালাতে পারবেন? সে না বলল। আমি তাকে ২০ টা টাকা দিয়ে চলে আসলাম।
আমি নিশ্চিত রিকশাওয়ালা লোকটা আগামী দুই দিন রিক্সা চালাতে পারবে না, আমি নিশ্চিত তার আজ ওষুধ কিনতে হবে, আমি নিশ্চিত সে আজ পৃথিবীর সব নোংরা গালি গুলা দেবে ওই ড্রাইভার লোকটাকে মনে করে, সে আমাকেও বকা দেবে, সে মনুষ্য জাতিকে তুলে গালি দিব, জানি তার সন্তান আর বউটা আজ থেকে ঘৃণা করবে ওই কারে চলা মানুষ গুলার, জানি রিকশাওয়ালার শরীরের ব্যাথাটা তাকে ঘুমাতে দিবেনা সারা রাত, সে কাঁদবে আর বারবার সৃষ্টি কর্তাকে স্মরণ করবে। .........সে আজ সৃষ্টিকর্তাকে প্রশ্ন করবে আমরা কি মানুষ না? গরীবের ঘরে জন্ম নেয়ায় যদি অপরাধ তবে সৃষ্টিকর্তা সে দোষ তোমার না আমার? আমার তোতলা কণ্ঠের দোষ কার, তোমার না আমার? তার হাজারো প্রশ্ন সৃষ্টিকর্তার কর্ণদ্বারে পৌঁছাবে কি না জানিনা!
আর উত্তর?
তাইতো সৃষ্টিকর্তা নয় মানুষ বলে দাবি করা পাঠকদের কাছে প্রশ্ন এই কি আপনাদের বিচার? এই কি মনুষ্যত্ব? রিকশাওয়ালা কি মানুষ?
পাদটীকা:
(১)। কারটা ২০০৭ থেকে ২০০৯ মডেল হবে, নাম্বার জানিনা, দেখলেও হয়তো চিনবো না।
(২)। ছিঃ ছিঃ ছিঃ , আসে পাশের ঐ প্রাণী গুলাকি মানুষ?

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

