ছোটবেলায় রূপকথার অনেক গল্প শুনেছি । রূপকথার সবই কল্পনা তবে আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই কিছু অংশ আছে যা অতিবাহিত হওয়ার পর রূপকথার মতই মনে হয়। আমার বয়স খুব বেশি না তারপর নিজের দেখা কিছু জিনিস এখন রূপকথার মতই মনে হয়।
দাদীদের গল্প
আমাদের সময় একটু বড় হতেই আমরা অধিকাংশই থাকতাম দাদীদের কাছে। তাদের মুখে শুনতাম নানা ধরনের কিচ্ছা-কাহিনী। প্রতিরাতে ঘুমানোর আগে তাদের কাছ থেকে গল্প না শুনলে ঘুমই আসত না। দাদীদের মুখে শুনতাম রাজকন্যার গল্প, রাক্ষসের গল্প, ভুতের গল্প, বিভিন্ন ধরনের কিচ্ছা প্রভৃতি। বর্তমান সময়ে যা রূপকথার মতই লাগে আমার কাছে ।
রমাজানের মজা
এই রমজান মাস আমাদের সময়ে ছিল খুবই মজার। রমজান মাসের চাদ দেখা গেলে সবাই বিলাতো সেমাই, ক্ষীর যার অধিকাংশই বিলি হত আমাদের হাত দিয়েই। ইফতারের সময় ছেলে-মেয়েরা সবাই একসাথে মুড়ি নিয়ে বের হতাম বাসা থেকে। সবাই একসাথে বসে খেতাম আর করতাম নানা ধরনের গল্প। সেই সাথে চলত মুড়ি আর ইফতারি সামগ্রীর বিনিময়।
ঈদের মজা
ঈদের চাদ দেখার সাথে সাথেই সবাই চিল্লায় চিল্লায় বলতাম চাঁদ দেখা গেছে ! সেই সাথে সবার বাড়ি বাড়ি গিয়ে সবাইকে ডেকে বের করতাম চাঁদ দেখানোর জন্য। ঈদের জন্য মেহেদী গাছ হতে পাতা সংগ্রহ করতাম হাতে মেহেদী দেওয়ার জন্য। ঈদের ভোরে সবাইকে ডেকে উঠাতাম একে একে । সেই সাথে নামাজের যাওয়ার আগে চলত পোশাক দেখানোর আয়োজন।
ইলিশ মাছ
ইলিশ মাছ বর্তমানে অনেক দামী হলেও আগে কিন্তু এত দাম ছিলনা। প্রায় সবার সাধ্যের মধ্যেই থাকতো ইলিশ মাছের দাম। সেই সাথে ইলিশের যে গন্ধ আর স্বাদ ছিল তা অতুলনীয়। এক বাড়িতে রান্না করলে আশপাশের কয়েকবাড়িতে টের পাওয়া যেত যে ইলিশ রান্না হচ্ছে। ইলিশ বাস্তবিকই এখন রূপকথার কাতারে চলে গেছে। নেই সেই স্বাদ , গন্ধ আর সহজলভ্যতা।
মাছে ভাতে বাঙ্গালী
আমার বাসা বগুড়া অঞ্চলে হলেও ছোট বেলায় আমাদের এদিকে বর্ষাকালে জমিতে প্রচুর মাছ পাওয়া যেত। প্রায় সবরকম দেশীয় মাছই পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে। রাতে জাল পেতে রেখে আসতাম আর ভোরে সেগুলো উঠিয়ে নিয়ে আসতাম প্রচুর মাছ সহ! শিং মাছ, টাকি মাছ, মাগুর মাছ, গুচি মাছ, কই মাছ , শোল মাছ,টেংরা মাছ পাওয়া যেত প্রচুর পরিমাণে। বর্তমানে জমিতে বর্ষাকালেও পানি জমেই না প্রায়, সেই সাথে মাছও আর আগের মত নাই । টাকি ছাড়া বাকি মাছগুলো পাওয়া যায়না বললেই চলে।
গ্রাম্য খেলা
আগে বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে খেলাই ছিল প্রধান উৎস। ছেলে-মেয়ে দল বেধে বদন, লুডু, পুতুল, পাতা লুকানো, বৌছি সহ নাম না জানা আরও অনেক ধরনের খেলা খেলতাম। এগুলোর মধ্যে সবার অন্যতম প্রিয় খেলা ছিল বদন আর পাতা লুকানো!
আলিফ লায়লা আর বিটিভি
প্রতিশুক্রবার আমাদের জন্য ছিল বিশেষ দিন। সপ্তাহের এই দিনটাতে স্কুল থাকতো না সেই সাথে এলাকায় ছিল হাটবার। সাথে বিকেলে বিটিভিতে সিনেমা এবং সন্ধ্যায় আলিফ লায়লা ! সকাল থেকেই আমরা সবাই বলতাম, আল্লাহ সন্ধ্যায় যেন বিদ্যুৎ না যায়! আমার পাড়াতে আমাদের বাসাতেই টিভি ছিল শুধু। শুক্রবারে টিভি বাহিরের খোলাতে এনে রাখতে হত প্রচুর মানুষের কারণে! সবাই মজা করে দেখতাম আলিফ লায়লা আর বিটিভি!
যাত্রাপালা
গ্রামে প্রতিবছর যাত্রাপালার আয়োজন হতে যাতে গ্রামের লোকজনই বিভিন্ন চরিত্রে অভিনয় করত। তাদের রিহার্সেল দেখতে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়তাম! সেই সাথে যেদিন যাত্রা হতো সেদিন বাসার সকলে মিলে একত্রে যাত্রা দেখতাম। যাত্রা দেখতাম আর চেনা মানুষগুলো অচেনা রূপ দেখে কখনো হাসতাম, কখনো অবাক হতাম।
আরও বেশকিছু জিনিস রয়েছে যা এখন রূপকথার মতই মনে হয়। রূপকথা অবাস্তব নয়, মানুষের অতিবাহিত সময়গুলোই রূপকথা ….
সর্বশেষ এডিট : ১৭ ই মে, ২০১৯ রাত ২:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



