
বহুদিন ব্লগে ঘোরাঘুরি করা হয় না। গত সপ্তাহে কি মনে হলো, ভাবলাম একটু ঘোরাঘুরি করি। তো ঘুরতে ঘুরতে কিছু পোষ্ট পড়লাম; কিছু মন্তব্যও নজরে আসলো, বিশেষভাবে দুইটা মন্তব্য। যার একটা হলো.........ভারত পৃথিবীর সবচে বড় গণতান্ত্রিক দেশ। ৩য় বিশ্বের একমাত্র গণতান্ত্রিক দেশ। ভারতে সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার সমান। আর আরেকটা এমন...........ভারত বিশ্বের ৪র্থ বড় অর্থনীতি, পাকিস্তান টাউট দেশ, বাংলাদেশ ভিক্ষুকদের দেশ? উত্তরটা সহজ, ভারতে সামরিক ক্যু হয়নি কখনো। আমি এমনিতে কৌতুকপ্রিয় মানুষ, প্রথমে কৌতুক হিসাবেই নিয়েছিলাম। তবে পরে ভাবলাম যুক্তিহীন ভাবে পশ্চাদ্দেশের কাপড় খুলে দিয়ে দালালি করাকে কৌতুক হিসাবে নেয়া ঠিক না। চলেন, মন্তব্য দু'টা নিয়ে খানিকটা আলোচনা করা যাক।
আমি সবসময়ে বলে এসেছি যে, কম জানা কিংবা অশিক্ষা দোষের কিছু না। বিভিন্ন কারনে যে কারও ক্ষেত্রে এটা ঘটতেই পারে। তবে কুশিক্ষা এবং কম জানা সত্ত্বেও বেশি জানার ভাব ধরা দোষের। একপেশে, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং অতিসরলীকৃত রাজনৈতিক স্লোগান বা রেটোরিক বয়ানের উৎপাদন না করে আমাদের উচিত পড়ালেখা করা; তথ্যভিত্তিক আলোচনার সাথে সাথে দায়িত্বপূর্ণ আচরণ করা। কারন ব্লগ হচ্ছে একটা বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনার জায়গা। এখানে শিশুসুলভ মন্তব্য আর বালখিল্য আচরণ কিছু অনাকাঙ্খিত পরিস্থিতিরই সৃষ্টি করে, কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমাদের উপর আসমানি বানী যেহেতু নাজিল হয় না, তাই কষ্ট করে জ্ঞান অর্জনের চাইতে ভালো কোন উপায় আমার অন্ততঃ জানা নাই!!!
যাই হোক, প্রথম মন্তব্যে আসি।
ভারতের বর্তমান শাসনব্যবস্থা "প্রকৃত গণতন্ত্র" নাকি "স্বৈরতন্ত্রের আড়ালে গণতন্ত্র" তা নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে গভীর বিতর্ক রয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গণতন্ত্র গবেষণা সংস্থাসমূহ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতকে একটি হাইব্রিড শাসনব্যবস্থা (Hybrid Regime) বা ছদ্মবেশী গণতন্ত্র হিসেবে অভিহিত করছে। বিশ্বের অন্যতম স্বনামধন্য তিনটি গণতান্ত্রিক পর্যবেক্ষণ সংস্থা ভারতকে নিচের ক্যাটাগরিতে বিভক্ত করেছে:
সুইডেন-ভিত্তিক বিখ্যাত গবেষণা সংস্থা ভি-ডেম (V-Dem) ইনস্টিটিউট তাদের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে ভারতকে Electoral Autocracy বা "নির্বাচনী স্বৈরতন্ত্র" হিসেবে শ্রেণীবদ্ধ করেছে। এর অর্থ হলো—ভারতে নিয়মিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় এবং জনগণ ভোট দিতে পারে, কিন্তু নির্বাচনের বাইরে ভিন্নমতের ওপর দমন-পীড়ন, বিচার বিভাগের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধী দলকে কোণঠাসা করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের মূল চেতনাকে সংকুচিত করা হয়।
আমেরিকার মানবাধিকার সংস্থা ফ্রিডম হাউস (Freedom House) ভারতকে "মুক্ত বা স্বাধীন" দেশের তালিকা থেকে নামিয়ে "আংশিক মুক্ত" দেশের তালিকায় রেখেছে।
দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (EIU) ভারতকে একটি "ত্রুটিপূর্ণ গণতন্ত্র" (Flawed Democracy) হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে গণতান্ত্রিক কাঠামো সচল থাকলেও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা প্রকট।
রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (RSF) প্রকাশিত ২০২৬ সালের বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম সূচকে (Press Freedom Index) ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৫২তম স্থানে রয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতা সত্ত্বেও পাকিস্তান ১৫৩তম স্থানে আর তথাকথিত মহান গণতন্ত্রের ভারত আছে ১৫৭তম স্থানে!!!
এতো গেলো ভারতের গণতন্ত্র সম্পর্কে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মুল্যায়ন। ভুয়া গণতন্ত্রের অকাট্য প্রমাণসহ আভ্যন্তরীণ পর্যবেক্ষকদের মুল্যায়ন জানতে চাইলে ধ্রুব রাঠি, সুব্রত বসু, আকাশ ব্যানার্জী, অনিকেত চট্টোপাধ্যয়সহ আরো অনেকের করা ভিডিওগুলো দেখতে পারেন, বিস্তারিত জানতে পারবেন।
আর ভারতে সকল ধর্মীয় সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার সমানের প্রশ্ন তো দূর কি বাত, তাদের সবচাইতে চর্চিত হিন্দুধর্মের সকল সম্প্রদায়ের নাগরিক অধিকার সমান কি না, সেটা জানাটা আগে জরুরী। এই প্রসঙ্গে তাদের ২০ কোটি জনসংখ্যার দলিত শ্রেণীর অবস্থা নিয়ে খানিকটা পড়ালেখা করা উচিত আগ্রহীদের........থলের বিড়াল লাফ দিয়ে সামনে বের হবে।
এবার আসি দ্বিতীয় মন্তব্যে।
''ভারত বিশ্বের ৪র্থ বড় অর্থনীতি''.........আবাল ভাইয়ের এটাও জানা নাই যে, বর্তমানে ভারতের অবস্থান ৪র্থ না, ৬ষ্ঠ; আর এই অবস্থান Nominal GDP অনুযায়ী। অর্থনীতি সম্পর্কে প্রাথমিক ধারনা যাদের আছে, তারাও জানে যে এই অবস্থানের তেমন কোন মুল্য নাই। একটা দেশ "বৃহৎ অর্থনীতি" হওয়া মানেই দেশটার অর্থনীতির অবস্থা ভালো, তা না। কাজেই এটা নিয়ে কচলা কচলি করে ভাব ধরার কিছু নাই। ভারতের বিশাল জনসংখ্যার কারণেই মোট জিডিপির আকার অনেক বড়। বরং মাথাপিছু আয়ের (Per Capita Income) আন্তর্জাতিক পরিমাপে ভারতের অবস্থান বৈশ্বিকভাবে বেশ পেছনে (১৯৭টি দেশের মধ্যে ১৩৬তম), যেটা আরো অনেক অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এতো স্বল্প পরিসরে অর্থনীতি নিয়ে বেশি ব্যাখ্যায় যাবো না, সেটা আমার এই পোষ্টের উদ্দেশ্যও না; শুধু একটা তথ্য আপনাদের জানাই। Nominal GDP অনুযায়ী উন্নত বিশ্বের দেশ ডেনমার্ক, পর্তুগাল, ফিনল্যান্ড, নিউজিল্যান্ড ইত্যাদিসহ আরো অনেক দেশও বাংলাদেশের পিছনে; এখন এটা নিয়ে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে রাজা-উজির মারা মুর্খতারই নামান্তর, নয় কি? আপনারা আপনাদের বিবেচনায় বাকিটা বুঝে নেন!!!
একটা দেশের অর্থনীতির প্রধানতম সামগ্রিক লক্ষ্য হলো নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করা। দেশটা বৈশ্বিকভাবে কতোটা উন্নত, তার ধারনা পাওয়ার জন্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনেকগুলো সূচক আছে। আসেন, কিছু সূচকের তুলনামূলক চিত্র দেখি। এর ফলে উন্নত দেশ ভারত, টাউট দেশ পাকিস্তান আর ভিক্ষুকদের দেশ বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কে আপনারা কিছু ধারনা পাবেন।
নিরাপদ সুপেয় পানি ও পরিবেশ (Environmental Performance Index), যার প্রধান পরিমাপকগুলো হলো বায়ুর মান, সুপেয় পানি ও স্যানিটেশন, পরিবেশ সুরক্ষা। এখানে বাংলাদেশ (১৭৫) ভারতের (১৭৬) একধাপ উপরে অবস্থান করছে।
বিশ্ব সুখ সূচক (World Happiness Report), প্রধান পরিমাপকগুলো হলো মানুষের মানসিক শান্তি, সামাজিক নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টি। এখানে পাকিস্তান (১০৪) ভারতের (১১৬) উপরে অবস্থান করছে।
বৈশ্বিক ক্ষুধা সূচক (Global Hunger Index), প্রধান পরিমাপকগুলো হলো অপুষ্টি, শিশুমৃত্যু এবং শিশুদের উচ্চতা অনুযায়ী কম ওজন। বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫তম। পাকিস্তান ৮৬তম। আর ভারত..........১০২তম।
মানব উন্নয়ন সূচক (Human Development Index), প্রধান পরিমাপকগুলো হলো গড় আয়ু, শিক্ষা এবং মাথাপিছু আয়ের সমন্বিত মান। এখানে উন্নত ভারত আর ভিক্ষুক বাংলাদেশ সমানে সমান.........১৩০তম।
বৈশ্বিক শান্তি সূচক (Global Peace Index), প্রধান পরিমাপকগুলো হলো অভ্যন্তরীণ সংঘাত, অপরাধের হার ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের অবস্থান ৯৩তম। আর ভারত..........১২৬তম।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ওপেন ডোরস (Open Doors) এর রিপোর্ট অনুযায়ী বিশ্ব নিপীড়ন তালিকায় (World Watch List) ভারত বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সবচেয়ে বিপজ্জনক দেশের মধ্যে অবস্থান করছে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষার ওপর ভিত্তি করে এই তালিকা তৈরি করা হয়। এছাড়াও সংখ্যার বিচারে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ আধুনিক দাসত্বের (জোরপূর্বক শ্রম, বন্ধকী শ্রম এবং মানব পাচার) শিকার হয় ভারতে। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখের বেশি মানুষ এই পরিস্থিতির মধ্যে বাস করছে বলে আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। জানাচ্ছে বৈশ্বিক দাসত্ব সূচক (Global Slavery Index)।
ইনডেক্সগুলোর ইংরেজি নামও ব্র্যাকেটে দিয়ে দিলাম, যাতে করে আগ্রহী যে কেউ এগুলো সম্পর্কে গুগল করে বিস্তারিত জেনে নিতে পারেন। এছাড়াও স্বাস্থ্য ও গড় আয়ু, নারীর অগ্রগতি (লিঙ্গ বৈষম্য), স্যানিটেশন ও প্রাথমিক শিক্ষা, সামাজিক সহিংসতা রোধ, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর ওপর পদ্ধতিগত সহিংসতা বা গণহত্যার ঝুকি ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভারতের চাইতে ভালো অবস্থানে। মুক্ত সাংবাদিকতা ও বাক-স্বাধীনতা (Press Freedom Index) এর কথা তো আগেই বলেছি। এখানে উল্লেখ্য, ''স্বচ্ছ ভারত মিশন''র ব্যাপক কার্যক্রমের পরও ভারতে প্রায় ১৫ কোটি মানুষ এখনও পথে-ঘাটে, বনে-জঙ্গলে হাগে। বাংলাদেশে এটা প্রায় শুন্যের কোঠায়!!!
আরো অনেক প্রশংসা বাকি থাকলো। আসলে উন্নত ভারতের উন্নতির কথা টাইপ করতে করতে টায়ার্ড হয়ে গিয়েছি, তাই আপাততঃ ক্ষান্ত দেই। ব্যাপার হলো, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মের পর থেকে যেসব ক্যু আর অস্থিরতার মধ্যে দিয়ে গিয়েছে, তা ভারতের তুলনায় অনেক অনেক বেশী। তারপরেও দেশগুলোর আজকের এই অবস্থান। বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এইসব টালমাটাল অবস্থায় না থাকলে ভারতের চাইতে আরো অনেক এগিয়ে থাকতো নিঃসন্দেহে।
আরেকটা কথা, উন্নত বিশ্বে সাধারনভাবে ভারতীয়দের ইমেজ কি এখন? জানেন কেউ?............ উন্নত দেশগুলোর সুপার মার্কেটে চুরি, যত্র-তত্র ময়লা ফেলা, উন্মুক্ত জয়াগায় প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করা আর নিজ দেশে পর্যটক, বিশেষ করে নারী পর্যটকদেরকে উত্যক্ত করা!!! আমি বানিয়ে বানিয়ে কিছু বলছি না, কিংবা বিদেশীদের কথাও বলছি না। এটা ভারতে বা ভারতের বাইরে অবস্থান করা অল্প কিছু উন্নত মানসিকতার ভারতীয়দেরই মন্তব্য। যার যার প্রমাণ দরকার, জানাবেন। হাজার হাজার প্রমাণ আছে।
একদা জনপ্রিয় একজন ব্লগার বলেছিলেন, বান্দরের হাতে একে ৪৭ রাইফেল আর আবাল ব্লগারের হাতে কি-বোর্ড নাকি একই ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনে। সত্যি-মিথ্যা জানি না, আপনারাই ভালো বলতে পারবেন।
জয় শ্রীরাম!! জয় ভারতমাতা কি জয়!!!!
ছবি সূত্র।
সর্বশেষ এডিট : ০৮ ই জুলাই, ২০২৬ দুপুর ১২:২৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

